আগে বাড়িতে দু’-একটা আয়না থাকত। এখন হাতে, পকেটে, ল্যাপটপে— সর্বত্রই হাজির ডিজিটাল আয়না। কখনও তা সমাজমাধ্যমের জানলা, কখনও ভিডিয়ো কল, কখনও সেলফির অ্যাঙ্গল। এই আয়নাগুলো রূপকথার হিংসুটে রানির চেয়ে কম নয়, কেবলই তুলনা করতে শেখায়। এর জন্যই সমাজে দেখা দিচ্ছে এক ধরনের মনের কষ্ট, বডি ডিসমর্ফিক ডিজ়অর্ডার বা বিডিডি। এ ক্ষেত্রে আক্রান্ত নিজের শরীরের কোনও তথাকথিত ত্রুটি নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তায় ভোগেন। বার বার আয়নায় নিজেকে দেখেন ও বলেন, ‘আমার কি চোখ দুটো ছোট?’ বা ‘নাকটা মোটা?’ ‘গায়ের রং চাপা’? সেই ব্যক্তি অতিরিক্ত আত্মসচেতন বলে উপেক্ষা করলে চলবে না। বিডিডি কিন্তু আত্মবিশ্বাস, সম্পর্ক, পড়াশোনা, কেরিয়ারে প্রভাব ফেলতে পারে, জীবনের প্রতি আগ্রহ নষ্ট করতে পারে।
উৎস কোথায়?
বিডিডি আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে নাকি সচেতনতা বাড়ায় রোগ বেশি ধরা পড়ছে— এ নিয়ে গবেষণা চলছে। তবে এই সমস্যা নতুন নয়। একটি নির্দিষ্ট গড়ন, ত্বকের রংকেই বরাবর ‘সুন্দর’ মনে করার প্রবণতা ছিল। সেই ভাবনার সঙ্গে যাদের চেহারা মিলত না, তাদের সামাজিক চাপ, অবহেলার মুখোমুখি হতে হয়েছে। সময় এগোলেও মানুষের মন পিছিয়েছে। পণ্যবিক্রয়ের কারসাজি হিসেবে ব্যাকরণ-মাফিক চেহারা, চুলের ঢালের সৌন্দর্যের সংজ্ঞা গড়ে রেখেছে বাজার। টিভি, সিনেমার পর্দায় তারই প্রদর্শনী চলেছে। নায়ক-নায়িকার মতো স্বাস্থ্য, ত্বক, হাসির মায়ায় সবচেয়ে বেশি পড়েছে কিশোর-কিশোরী, উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েরা।
ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট দেবারতি আচার্য বললেন, “সব মানুষের উপরই এর প্রভাব পড়ে। তবে বয়ঃসন্ধির ছেলেমেয়েরা নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়, শরীর-মন অপরিণত, বন্ধুদের গুরুত্ব তাদের জীবনে খুব বেশি। ফলে কাঁচা বয়সে তারা বাজারের তৈরি এই ফাঁদে বেশি পড়ে আর মন খারাপ করে। ইদানীং ফিল্টার-এডিটের কল্যাণে সমাজমাধ্যমে নিখুঁত চেহারার ছবি বেড়েছে। ফলে সারাক্ষণ নিজেকে তারকাসুলভ দেখানোর চাপ তৈরি হচ্ছে। উপরন্তু রয়েছে নানা ধরনের সৌন্দর্য-চিকিৎসার প্রলোভন— ধারালো চোয়াল, রোমমুক্ত পেলব ত্বক ইত্যাদি। বাড়িতে ভাই-বোনদের মধ্যে তুলনাও কিন্তু সমস্যাটিকে বাড়ায়।” ‘দাদা সুন্দর তুমি তো সে রকম নও, দিদির ত্বক ভাল, তোমার এত ব্রণ কেন?’— এ সব শুনলে অপমানিত হয় তারা, আত্মবিশ্বাস টলে যায়। ছেলে বা মেয়েটি তখন ভাবতে থাকে কী ভাবে ত্রুটি মেরামত করবে, হয়তো তাতে তার কদর বাড়বে।
চোখে চোখে রাখুন
এ সব ক্ষেত্রে আক্রান্ত এমন কিছু নিয়ে দুশ্চিন্তা করে যা খুবই সামান্য বা বাইরে থেকে হয়তো বোঝাই যায় না। দেবারতির কাছে একটি অল্পবয়সি ছেলে এসে জানিয়েছিল, তার কান বাঁকা, সে শল্যচিকিৎসা করিয়ে এক বিশেষ নায়কের মতো কান তৈরি করতে চায়। এই ধরনের চিন্তাভাবনা কিন্তু বহু ছেলেমেয়েদেরই মন, জীবন গ্রাস করছে। বিজ্ঞাপন, সমাজমাধ্যমের প্রভাবে সৌন্দর্যের মাপকাঠি প্রায় অবাস্তবের পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছে। ছোটরা তাই দেখে নিজেদের চুলচেরা বিশ্লেষণ করছে। ভুলে যাচ্ছে, সবাইকে একই ধাঁচের দেখালে নিজস্বতার জৌলুসটাই হারিয়ে যাবে।
একে বয়সের ধর্ম ভেবে লঘু করা যাবে না। অনেক সময়ে পঞ্চাশ-ষাটের কোঠাতেও এমন সমস্যা দেখা দেয়। বয়স হলে চুল পেকে গেলে, ত্বকে বলিরেখা পড়লে, চামড়া কুঞ্চিত হয়ে গেলে, শরীর ভারী হয়ে গেলে অনেকেই প্রথমে সেগুলো মেনে নিতে পারেন না। বিশেষত মেনোপজ়ের পরে অনেক মহিলারই চেহারায় বদল আসে। সেই পরিবর্তন মেনে নিতে না পারলে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যেও অবসাদ দেখা দেয়। অনেকে কাটিয়ে ওঠেন, অনেকে ক্রমশ আড়ালে চলে যেতে থাকেন।
যাদের মনের জোর কম, বুলিং, প্রত্যাখ্যানের অভিজ্ঞতা রয়েছে, তাদের বিডিডি-র কবলে পড়ার সম্ভাবনা বেশি। চেহারা নিয়ে সচেতনতায় চিন্তা নেই, তবে খেয়াল রাখুন বিশেষ কিছু লক্ষণ দেখতে পাচ্ছেন কি না। যেমন— চেহারা নিয়ে অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা, বারবার আয়না দেখা, নিজস্বী তুলে খুঁটিনাটি বিচার, বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা বা উৎসব-অনুষ্ঠানে বাইরে যাওয়ায় অনীহা, আগে যা করত তাতে আগ্রহে ঘাটতি, শরীরের কোনও অংশ আড়াল করার চেষ্টা— এগুলি বিডিডির স্পষ্ট সঙ্কেত।
দীর্ঘ দিন এমন সমস্যা চললে অবসাদ, উদ্বেগ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিজ়অঅর্ডার প্রভৃতি রোগ হতে পারে। কান্নাকাটি, হতাশামূলক কথাবার্তা শুনলে কালক্ষেপ না করে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন দেবারতি। সেখানে সাইকোথেরাপি, কগনিটিভ বিহেভিয়রাল থেরাপি, ওষুধের মাধ্যমে সুস্থ জীবনে ফেরা সম্ভব। এমন সমস্যায় দীর্ঘমেয়াদে হতাশা দেখা দেয়, একাকিত্বে ভোগার সমস্যা থাকে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে বিডিডি থাকলে আত্মহত্যার চিন্তা, আত্মহত্যার চেষ্টা সাধারণ মানুষের চেয়ে বেশি হয়। অতএব, সমস্যা হচ্ছে মনে হলে, একদম ঝুঁকি নেবেন না।
সমাজের দায়িত্ব
বিভিন্ন দেশে ছোটদের সমাজমাধ্যম ব্যবহার নিয়ে নানা বিধিনিষেধ আসছে। সেগুলি কতটা কার্যকর সন্দেহ আছে, ফলে রাশ টানতে হবে নিজেদেরই। দেবারতি বললেন, “ছোটদের নিয়ন্ত্রিত সমাজমাধ্যম ব্যবহার অভ্যাস করান। সমাজ এবং পরিবারকেও অন্যের সঙ্গে তুলনা, সমালোচনা, বকাঝকা, উপেক্ষার মতো ক্ষতিকর আচরণগুলিকে পরিহার করতে শিখতে হবে।”
সৌন্দর্য নিয়ে এত আকুতি বহিরঙ্গেই শেষ। মানুষের আকর্ষণ তো তার অন্তরে— মেধায়, মননে, রসবোধে, সৃষ্টিশীলতায়, সততায়, ব্যক্তিত্বে। এটা বোঝাতে হবে ছোটদের। বন্ধুর রূপ দেখে নয়, তার গুণের টানে, তার সঙ্গে কথা বলা ও সময় কাটানোর আনন্দের জন্যই তো আমরা তার সঙ্গে মিশি। প্রতিটা মানুষেরই বিশেষ ক্ষমতা আছে। সেই দীপ্তিকে চিনতে হবে। অন্য কর্মকাণ্ডে স্বীকৃতি, প্রশংসা পেলে আত্মবিশ্বাসও বাড়বে। গুণই কিন্তু প্রকৃত সৌন্দর্য যা কখনও নষ্ট হয় না, নাম-যশ-খ্যাতির পথে নিয়ে যায়।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)