×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

২৩ এপ্রিল ২০২১ ই-পেপার

বিরোধীরা যে ভুল করছেন

০৩ মার্চ ২০২১ ০৫:৪০
বিকল্প? ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে বামপন্থী দল, কংগ্রেস ও ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট-এর যৌথ জনসভা। ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২১।

বিকল্প? ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে বামপন্থী দল, কংগ্রেস ও ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট-এর যৌথ জনসভা। ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২১।

বিজেপিকে ঠেকাতে পুরনো বিবাদ ভোলা জরুির। নয়তো পরিণতি উত্তরপ্রদেশের মতো হতে পারে। বললেন অর্থনীতিবিদ প্রণব বর্ধন

প্রশ্ন: ক্ষমতায় এলে পশ্চিমবঙ্গে প্রভূত উন্নয়ন করবে বলে বিজেপি প্রচার করছে। বিজেপি ক্ষমতায় থাকলেই উন্নয়ন হবে, এই কথাটা কি আপনি মানবেন?

Advertisement

প্রণব বর্ধন: বিজেপি নরেন্দ্র মোদীকে ‘বিকাশপুরুষ’ হিসেবে দেখায়। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে থেকেই। তবে, ২০১৯ সালে কিন্তু বিকাশ বা উন্নয়নের কথা বিশেষ ছিল না। সেই নির্বাচনে বালাকোট, পাকিস্তান এই সব কথা ছিল। অমিত শাহ এখন আবার উন্নয়নের কথা বলছেন। বিজেপি দিল্লিতে ক্ষমতায় এসেছে প্রায় সাত বছর হল। এই সাত বছরে আর্থিক নীতিতে সরকারের বড় রকমের ব্যর্থতা প্রমাণিত হয়ে গিয়েছে। ২০১৪ সালে মোদী বলেছিলেন, ক্ষমতায় এলে বছরে এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান করবেন। অতিমারির আগেই বৃদ্ধির হার কমছিল, নতুন চাকরি তৈরি হওয়া দূরে থাক, অনেক জায়গায় পুরনো চাকরি কমেছে।

উন্নয়নের প্রসঙ্গ উঠলেই গুজরাত মডেলের কথাও আসবে। গুজরাতে আর্থিক বৃদ্ধির হার ভাল, অনেক দশক ধরেই ভাল। কিন্তু, সেই আর্থিক বৃদ্ধির ফলে রাজ্যে কর্মসংস্থান তেমন তৈরি হয়নি। বৃদ্ধি হয়েছে মূলত পুঁজিনিবিড়। অন্য দিকে, সামাজিক সূচকের ক্ষেত্রে গুজরাত ভারতের পিছিয়ে-পড়া রাজ্যগুলোর তালিকায় পড়ে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নারীপ্রগতি, শিশুপুষ্টি— কোনও সূচকেই গুজরাতের অবস্থা ভাল নয়। বরং নানা দিক দিয়ে যে রাজ্য অনেক বেশি অগ্রসর, সেটা তামিলনাড়ু। সেখানে আর্থিক বৃদ্ধি যেমন ভাল হয়েছে, তেমনই সামাজিক সূচকগুলিরও প্রভূত উন্নতি হয়েছে।

একটা অন্য রাজ্যের উদাহরণ দিই— উত্তরপ্রদেশ। সেখানে বিভিন্ন দফায় শাসন করেছে বিজেপি। গত চার বছর রাজ্যে বিজেপির সরকার, এবং কেন্দ্রেও বিজেপিরই সরকার। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে বিজেপি যে যুক্তি দিচ্ছে, অর্থাৎ কেন্দ্র এবং রাজ্যে একই দলের সরকার থাকলে উন্নয়নে গতি আসে, সেই যুক্তিতে উত্তরপ্রদেশে তো বিপুল উন্নয়ন হওয়ার কথা এই চার বছরে। হয়েছে কি? না হয়নি। বরং সেখানে খুন-ধর্ষণ আর সংখ্যালঘু পীড়নের জঙ্গলরাজ চলছে।

অন্য সব ব্যাপারের মতো অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিচালনায়ও এদের মুখেই বড় বড় কথা, আসল কাজের ব্যাপারে যাকে বলে বহ্বারম্ভে লঘুক্রিয়া। শুধু তা-ই নয়, গরিব মানুষের জীবিকার উপর এরা একাধিক বার আক্রমণ চালিয়েছে। নোট বাতিলের কথাই ধরা যাক। অসংগঠিত ক্ষেত্রের উপর এই সিদ্ধান্তের কী ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে, তার পুরো ছবিটা এখনও অবধি দেখা যায়নি। লকডাউনের সময় পরিযায়ী শ্রমিকরা কতখানি বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিলেন, সেটা টেলিভিশনে, খবরের কাগজে প্রকাশিত ছবিতে বোঝা গিয়েছিল। নোট বাতিলের ফলে অসংগঠিত ক্ষেত্রের বিপদের এ রকম কোনও ছবি হওয়া সম্ভব ছিল না। যে ভাবে জাতীয় আয়ের হিসেব কষা হয়, তাতে অসংগঠিত ক্ষেত্রের অবস্থার পুরো ছবিটা আসে না।

আর না ভেবে-চিন্তে হঠাৎ লকডাউনের ঘোষণায় বহু গরিব মানুষের জীবিকা চুরমার হয়ে গেছে। তার নিরসনের ব্যাপারেও সরকারের নিদারুণ কার্পণ্য ও সহানুভূতির অভাব।

প্র: অর্থব্যবস্থা পরিচালনা করতে না পারাই কি বিজেপির সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা?

উ: আমি বলব, সবচেয়ে বড় বিপদ অন্য জায়গায়। প্রথমত, বিজেপি দেশের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোটাকেই ভেঙে তছনছ করে দিচ্ছে। সব সিদ্ধান্তই হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে। যে সব বিষয় রাজ্যের আওতাভুক্ত, কেন্দ্রীয় সরকার সেখানেও রাজ্যগুলিকে এড়িয়ে সিদ্ধান্ত করে চলেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, আইন-শৃঙ্খলা, শ্রমনীতি— কোনও ক্ষেত্রেই রাজ্যগুলির মতামত নেওয়া হয়নি। রাজস্বের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে চলেছে। করের বদলে সেস-এর মাধ্যমে টাকা তুলছে কেন্দ্র, যাতে রাজ্যগুলোর কোনও ভাগ নেই। যোজনা কমিশন তুলে দেওয়া হল। আগে সেখানে রাজ্যগুলো নিজেদের কিছু দাবিদাওয়া পেশ করতে পারত। এ বিষয়ে রাজ্যগুলোর সতর্ক হওয়া জরুরি। রাজনৈতিক প্রশ্নেও একই অবস্থা। যে ভাবে কাশ্মীরের রাজনৈতিক ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হল, তাকে রাজ্য থেকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করা হল, সেটা সেই রাজ্যের সব মানুষের পক্ষে অপমানজনক। কিন্তু, দেশের অন্য রাজ্যগুলো তাতে তেমন প্রতিবাদ করল কোথায়?

দ্বিতীয়ত, বিজেপি দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে একেবারে শেষ করে দিচ্ছে। বিজেপি সমর্থকরা প্রায়শই একটা কথা ব্যবহার করেন— ‘টুকরে টুকরে গ্যাং’। আমি বলব, বিজেপির চেয়ে বড় টুকরে টুকরে গ্যাং আর হতেই পারে না। তারা দেশের সামাজিক ঐক্য ভাঙছে। দাঙ্গা লাগলে, সাম্প্রদায়িক হানাহানি বাড়লে যাদের ভোট বাড়ে, তারা সামাজিক ঐক্য রক্ষা করতে পারে না। আমি বিজেপির সমালোচক বলেই এই কথাগুলো বলছি না। নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকরাও একই কথা বলছেন। সুইডেনের ভি-ডেম ইনস্টিটিউট গোটা দুনিয়ায় দেশগুলোর গণতন্ত্রের পুঙ্খানুপুঙ্খ পরিমাপ করে। তারা বলছে, ২০১৪ সাল থেকে বিশ্ব-সূচকে ভারতের স্থান ক্রমেই নেমেছে। ২০২০ সালে পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, ভি-ডেম ইনস্টিটিউটের রিপোর্ট বলছে, ভারতকে আদৌ গণতন্ত্র বলা চলে কি না, এখন তা নিয়েই সন্দেহ।

এটা কতখানি লজ্জার কথা, আমাদের হামবড়া নেতারা ভাবছেন না। বিজেপি প্রায়শই বলে, বিরোধীরা দুনিয়ার সামনে ভারতের সম্মান নষ্ট করছেন। দেশের গণতন্ত্রকে এমন ভাবে পদদলিত করে কারা দেশের সম্মান নষ্ট করছে, সেটা স্পষ্ট করে বলা প্রয়োজন। দিশা রবি মেয়েটির কথাই ধরা যাক। যে ভাবে তাঁকে হেনস্থা করা হল, তাতে কি দেশের সম্মান বাড়ল? সাংবাদিকদের বা প্রতিবাদী কৃষকদের যারা দেশদ্রোহী বলছে, আসলে তারাই ভারতীয় গণতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদের কলঙ্ক।

দেশের শাসনব্যবস্থা যে প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর দাঁড়িয়ে থাকে, সেগুলোরও সর্বনাশ করেছে বিজেপি। নির্বাচন কমিশন থেকে পুলিশ, কারও নিরপেক্ষতাই এখন আর প্রশ্নাতীত নয়। দিল্লির হিংসার এক বছর পেরিয়ে গেল, এ দিকে পুলিশ মুসলমান আক্রান্তদেরই হেনস্থা করে চলেছে। বিজেপির যে নেতারা হিংসার বিষ ছড়ালেন, তাঁরা বহাল তবিয়তেই ঘুরে বেড়াচ্ছেন। সিবিআই, ইডি, আয়কর দফতর, সব প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করা হচ্ছে বিরোধীদের শায়েস্তা করার কাজে। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক হল, যে বিচারবিভাগের উপর দেশের খানিকটা আস্থা ছিল, এখন তাকে নিয়েও অনেকে প্রশ্ন তুলতে আরম্ভ করেছেন।

প্র: গণতন্ত্রের মধ্যে এই ভাবে অন্তর্ঘাত ঘটানোর কাজটা কিন্তু পুরোটা গায়ের জোরে নয়, তাই না?

উ: হ্যাঁ। মিডিয়ার কথাই ধরা যাক। বৈদ্যুতিন সংবাদমাধ্যমের বেশির ভাগ এখন নির্লজ্জ ভাবে শাসকদের পদলেহন করছে। স্বেচ্ছায়, সোল্লাসে। উপরে যে শাসন-প্রতিষ্ঠানগুলোর কথা বললাম, সেই প্রতিষ্ঠানগুলোও রাজনৈতিক চাপের যথেষ্ট প্রতিরোধ করছে না। গুটিকয়েক বিশ্ববিদ্যালয় বাদে বাকিগুলোর কর্তৃপক্ষও স্বেচ্ছায় এ চাপ মানছেন।

এর পাশাপাশি আছে বিজেপির আইটি সেল— ক্রমাগত বিষ ছড়িয়েই চলেছে। হিটলারের বিশ্বস্ত গোয়েবেলস-এর একটা তত্ত্ব ছিল— মিথ্যে কথা যখন বলবে, তখন খুচরো মিথ্যে বলে লাভ নেই। বড় মাপের মিথ্যে বলবে, এবং ক্রমাগত সেই মিথ্যের পুনরাবৃত্তি করে চলবে। লোকে তা হলে খাবে। আইটি সেল সেই তত্ত্বই প্রয়োগ করে চলেছে।

বিজেপির নেতাদের দ্বিচারিতার শেষ নেই— মুখে বলব ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’, আর কাজের বেলায় ঘৃণার বেসাতি করব। প্রধানমন্ত্রীর ছেঁদো কথায় সংবিধান ভারতের পবিত্র গ্রন্থ— এ দিকে কার্যত তাকে পদদলিত করা চলছেই। উনি সংসদে প্রবেশ করার আগে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করেছিলেন। আর, সেই সংসদে কোনও বিল আলোচনাই করছেন না— একতরফা অধ্যাদেশের মাধ্যমে, বা বিনা আলোচনায় আইন তৈরি হয়ে যাচ্ছে। সংসদ থেকে প্রশ্নোত্তর পর্বটাই উঠিয়ে দেওয়া হল। এখন আছে শুধু একতরফা ‘মন কি বাত’, যেখানে কোনও প্রশ্ন করারই অবকাশ নেই। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস কনফারেন্স ব্যাপারটা উঠে গেছে, পাছে কেউ অস্বস্তিকর প্রশ্ন করে, এই ভয়ে।

প্র: পশ্চিমবঙ্গের প্রসঙ্গে আসি। বিজেপির বিপদটা ঠিক কতখানি, এই রাজ্যের রাজনীতি কি তা বুঝতে পারছে?

উ: সিপিআইএম বা কংগ্রেস, কোনও পক্ষই এই বিপদটা পুরোটা বুঝতে পারছে বলে মনে হয় না। শুনছি, বামপন্থীরা নাকি বলছেন, ‘২১-এ রাম, ২৬-এ বাম’। সত্যিই যদি পার্টি এই কথাটা মনে করে, তা হলে বলব, তাঁরা আত্ম-প্রবঞ্চনার শিকার। আবারও নাৎসি জার্মানির কথা বলব। ১৯৩৩ সালে হিটলার ক্ষমতায় না আসা পর্যন্ত সেখানে কমিউনিস্ট আর সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটরা নিজেদের মধ্যে খেয়োখেয়ি করে গিয়েছে, হিটলারকে ঠেকানোর যথেষ্ট চেষ্টা করেনি। পশ্চিমবঙ্গেরও সেই রকম অবস্থা।

বিজেপি-সংক্রান্ত বিপদটা ঠিক কতখানি, সেটা বোঝার জন্য বেশি দূরে তাকানোর দরকার নেই। ত্রিপুরার অভিজ্ঞতাই যথেষ্ট। মানিক সরকার যা বলছেন, সেই কথাটা মন দিয়ে শোনা প্রয়োজন। এখানে আমি নিজের অবস্থানটা স্পষ্ট করে নিতে চাই। এই রাজ্যে সিপিআইএম যখন ক্ষমতায় ছিল, আমি তখন প্রায়শই তাদের সমালোচক ছিলাম। তৃণমূল কংগ্রেসেরও প্রচুর সমালোচনা করেছি— এই সংবাদপত্রেই। কিন্তু এখন শিরে সংক্রান্তি। শুনছি, বামপন্থীরা তৃণমূল কংগ্রেসকে সমর্থন করতে চান না, কারণ গ্রামেগঞ্জে তৃণমূলের লোকরা তাঁদের মারধর করেছে। কথাটা মিথ্যে নয়, কিন্তু সিপিআইএম তো কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করেছে। অতীতে কংগ্রেসের হাতে কি বামপন্থীরা কম মার খেয়েছেন? বৃহত্তর বিপদের সময় এই পুরনো বিবাদ, অভিযোগ ভুলতে হয়, একটা মোটামাপের বোঝাপড়ায় আসতে হয়। এই কথাটা সমর্থকদের বোঝানো বাম নেতৃত্বের কাজ। পশ্চিমবঙ্গের মতুয়া বা রাজবংশী নেতাদেরও বোঝা প্রয়োজন যে, নির্বাচনের খাতিরে যতই মিষ্টি কথা বলুক, আরএসএস-বিজেপির নেতারা ব্রাহ্মণ্যভাবধারার মতাদর্শে বিশ্বাসী।

প্র: কিন্তু, আপনি কি মনে করেন না যে, তৃণমূল আমলে রাজ্যে তোলাবাজির রমরমা হয়েছে?

উ: যে রাজ্যে বড় শিল্প নেই, যুবকদের যথেষ্ট চাকরি নেই, সেখানেই তোলাবাজি-গুন্ডামি হবে। উত্তরপ্রদেশেও একই রকম অবস্থা। সেখানে তো বিজেপি ক্ষমতায়। কেন্দ্র থেকে টাকা এনে রাজ্যে কর্মসংসস্থান হয়েছে? না কি, গুজরাত মডেল হয়েছে? পশ্চিমবঙ্গে গত কয়েক বছরে কিছু কিছু জনকল্যাণমূলক প্রকল্প ভাল কাজ করেছে। আর একটা জিনিস— এই রাজ্যের মানুষ ধরেই নিয়েছেন যে, কাটমানি-তোলাবাজির পরেও, এ সব খাতে তাঁদের হাতে শেষ অবধি কিছু টাকা এসে পৌঁছবে। আর দুর্নীতিগ্রস্ত কিছু তৃণমূল নেতা এখন তো বিজেপিতে আপ্যায়িত অতিথি।

কিন্তু বড় প্রশ্নটা হল, এই রাজ্যে বড় শিল্প আসে না কেন? তার অনেকগুলো কারণ। পশ্চিমবঙ্গে পরিকাঠামো বেশ অনুন্নত মানের; জমির প্রশ্নটা সম্পূর্ণ জট পাকিয়ে আছে; লালফিতের ফাঁস বেশ জোরদার; আর বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের অভাব। ফলে, বিজেপি এলেই যে রাতারাতি রাজ্যে শিল্প আসতে আরম্ভ করবে, এমনটা মনে করার কিন্তু কোনও কারণ নেই।

প্র: বিজেপিকে ‘বহিরাগত’ বলায় বেশ একটা বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

উ: ঘটনা হল, সাংস্কৃতিক বাঙালিত্বের সঙ্গে বিজেপির যোগসূত্র ক্ষীণ। বিজেপির ঝুলিতে কোনও বাঙালি মনীষী নেই। তাই তারা এখন বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ, সুভাষচন্দ্রকে নিয়ে টানাটানি করছে। কিন্তু, বিজেপির উগ্র হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদের সঙ্গে এই মনীষীদের মেলানো খুবই মুশকিল। ওই অজ্ঞরা জানে না যে, বঙ্কিমচন্দ্রের দুর্গেশনন্দিনী, রাজসিংহ ও চন্দ্রশেখর উপন্যাসে কিছু উচ্চমানের মুসলমান চরিত্র রয়েছে। উনি লেখক মির মোসারফ হুসেনের গুণগ্রাহী ছিলেন, তাঁর কারবালার যুদ্ধের উপর বইয়ের ভূমিকা লিখে দেন। হাসিম শেখ ও রামা কৈবর্তের শ্রীবৃদ্ধি না হলে দেশের শ্রীবৃদ্ধি হয়েছে বলতে বঙ্কিমচন্দ্র নারাজ। সুভাষচন্দ্র ছিলেন সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক। শ্যামাপ্রসাদ যখন হিন্দুমহাসভায় যোগ দিলেন, সুভাষচন্দ্র ওঁকে কড়া কথা শুনিয়ে দিয়েছিলেন। বিবেকানন্দও গীতার পাশাপাশি কোরান, বাইবেল সবাইকে পাঠ করতে বলতেন, হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের কথা বলতেন। আর, রবীন্দ্রনাথের কথা বলা বাহুল্য। স্বদেশি আন্দোলনের উগ্র জাতীয়তাবাদ থেকে মুসলমানরা দূরে সরে থাকছেন, রবীন্দ্রনাথ তা খেয়াল করেছিলেন। তাতে তাঁর আপত্তি ছিল।

এই সব মানুষের চিন্তা নিয়েই বাঙালির আত্মপরিচয়। এটা শুধু তথাকথিত ভদ্রলোক শ্রেণির ব্যাপার নয়। বাউল-ফকিরের পল্লিগীতিতেও একই উদার বহুমাত্রিকতার ছাপ, যা হিন্দুত্ববাদী নেতার পক্ষে এক জন বাউলের বাড়িতে এক বেলা খেয়ে হজম করার নয়। বিজেপির রাজনীতি এই বাঙালিত্বের বিপ্রতীপ। বাংলায় দীর্ঘ দিন ধরেই ভিন‌্‌রাজ্যের, ভিন্ভাষার মানুষ এসেছেন, থেকেছেন। ভিন‌্‌রাজ্য থেকে আসার কারণে নয়, বিজেপির সংস্কৃতি বাঙালির আত্মপরিচিতির বিরোধী বলেই তা বহিরাগত। এই যে হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্থানের ধারণাটা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে, জোর-জবরদস্তি করে ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে হবে, এটা বাংলার সংস্কৃতিবিরোধী।

রবীন্দ্রনাথের কথা দিয়ে শেষ করি। তাঁর নৈবেদ্য কাব্যগ্রন্থের একটা কবিতা পড়লে মনে হয়, এটি আজকের বিজেপি সম্পর্কে প্রযোজ্য: “ভদ্রবেশী বর্বরতা উঠিয়াছে জাগি/ পঙ্কশয্যা হতে। লজ্জা শরম তেয়াগি/ জাতিপ্রেম নাম ধরি প্রচণ্ড অন্যায়/ ধর্মেরে ভাসাতে চাহে বলের বন্যায়।”

সাক্ষাৎকার: অমিতাভ গুপ্ত

Advertisement