এসআইআর-এর গুঁতোয় উথালপাতাল বাংলা, পারস্পরিক দোষারোপের পালা। প্রচারের উত্তাপে ও উত্তেজনায় অনেক সময়ই ভাষার অপপ্রয়োগ ঘটে, এমনকি উল্টো দিকের প্রার্থীকে বা দলকে আক্রমণ করতে গিয়ে তথ্যের উনিশ-বিশ ঘটে; কিন্তু তাই বলে নয়-কে নিরানব্বই বলা কি মানা যায়!
বহু ক্ষেত্রে নির্বাচনী জনসভায় দাঁড়িয়ে বিজেপি কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য নেতৃবর্গ রাজ্যের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে যে অভিযোগগুলি তুলছেন, তা স্রেফ নস্যাৎ হয়ে যায় বিজেপির কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রকের বা দফতরের দেওয়া তথ্যের কাছেই।
যেমন সুরক্ষা। আর জি কর কাণ্ডের পর সুরক্ষা, বিশেষ করে মহিলাদের সুরক্ষা, এ বারের নির্বাচনে বড় বিষয় এবং নির্যাতিতার মায়ের বিজেপির হয়ে নির্বাচনে দাঁড়ানো ওই মর্মান্তিক ঘটনাকে একেবারে সামনের সারিতে এনে ফেলেছে। বিজেপির পনেরো দফার চার্জশিটেও উপরের দিকে রয়েছে আইনি ব্যবস্থা ভেঙে পড়া এবং রাজ্যে ও শহর কলকাতায় নারী-সুরক্ষার প্রশ্ন। কিন্তু বিজেপি সরকারের অমিত শাহের স্বরাষ্ট্র দফতরের অধীন ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো-র ২০২৫-এর রিপোর্ট বলছে সম্পূর্ণ অন্য কথা। গত চার বছর ধরে কলকাতা দেশের বড় শহরগুলির মধ্যে সবচেয়ে সুরক্ষিত, এখানে ২০২৩ সালে এক লক্ষ মানুষ প্রতি ৮৪টি অপরাধ হয়েছে। মহিলাদের মধ্যে অপরাধের ক্ষেত্রেও বড় শহরগুলির মধ্যে কলকাতা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নিরাপদ, চেন্নাইয়ের পরে, যেখানে অপরাধের পরিমাণ ২০২৩-এ ছিল এক লক্ষ মানুষ প্রতি ২৬টির কম। কলকাতার তুলনায় রাজ্যের পরিস্থিতি খারাপ, কিন্তু তা অঙ্কের হিসাবে দিল্লি, হরিয়ানা, রাজস্থান, এমনকি কেরল বা মহারাষ্ট্রের তুলনায় ভাল। দেশের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ দিল্লি, যেখানকার পুলিশ সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের অধীন। রাজ্যে সুরক্ষা নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে; কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারেরই তথ্য মানলে এ রাজ্যে নারীনিরাপত্তা ‘একদম ভেঙে পড়েছে’ বলা যাবে না কিছুতেই।
তার পর অর্থনীতি, শিল্পোন্নয়ন ও উন্নয়ন। চার্জশিটে তো বটেই, দিল্লির নেতাদের থেকে অলিগলির বিজেপি নেতারাও বার বার রাজ্যের আর্থিক পরিস্থিতির চূড়ান্ত অবনতি, শিল্পোন্নয়নের করুণ অবস্থা নিয়ে সরব হচ্ছেন। ব্রিটিশ আমলে শিল্পোন্নয়নে দেশের সামনের সারিতে থাকা বাংলার ষাটের দশক থেকে ক্রম-অবনয়ন হয়েছে, সেটা ঐতিহাসিক ঘটনা। আগের বাম ফ্রন্ট সরকার এবং সাম্প্রতিক তিন দফায় রাজ্যে ক্ষমতায় থাকা তৃণমূল কংগ্রেসের সময় যে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে সেটাও স্বীকৃত। কিন্তু কতটা খারাপ হলে ‘খুব খারাপ’ বলা যায়? কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি আয়োগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী গত পনেরো বছরে রাজ্যের জিডিপি চার গুণ বেড়েছে, সম্প্রতি কলকাতা দেশের তৃতীয় ধনীতম শহরের তকমা পেয়েছে বেঙ্গালুরু এবং চেন্নাইকে পিছনে ফেলে। সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সার্বিক অর্থনীতির মাপকাঠিতে এখন দেশের মধ্যে ছয় নম্বর স্থানে। দিল্লি, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ এবং কেরলকে পিছনে ফেলে, কেন্দ্রীয় সরকারের হিসাব অনুযায়ী, ২০২২-২৩ থেকে ২০২৪-২৫’এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার গুজরাত এবং মহারাষ্ট্রের থেকেও বেশি।
সুস্থায়ী উন্নয়নের প্রশ্নে নীতি আয়োগের তথ্য অনুযায়ী এ রাজ্য ২০২৩-২৪ আর্থিক বছরে দশম স্থানে। কিন্তু লক্ষণীয়, ২০২১-২২ সালের তুলনায় উন্নয়নের অঙ্কে দেশের মধ্যে প্রথম। কে ঠিক বলছে? দল না সরকার? একই ভাবে স্বাস্থ্যের বিভিন্ন মাপকাঠিতে, যেমন গড় আয়ু বা শিশু মৃত্যুর হারে, পশ্চিমবঙ্গ উপরের দিকে। জনস্বাস্থ্য পরিষেবা দেওয়ার নিরিখেও।
প্রশ্ন হল, এ রাজ্যে সবই কি ভাল অবস্থায় আছে? তৃণমূলের আগমার্কা সমর্থকও এমনটা বোধ হয় বলবেন না। নিশ্চিত ভাবেই বহু মাপকাঠিতে রাজ্য পিছিয়ে দেশের মধ্যে, এবং সেগুলিও স্পষ্ট সরকারি তথ্যেই। যেমন বড় মাপের উৎপাদন ও শিল্প বিনিয়োগে, পরিকাঠামোয়, জন-প্রতি আয়ের হিসাবে। আসলে কোনও কিছুই সম্পূর্ণ কালো বা সাদা হয় না, উদাহরণ রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থা। সীমাহীন দুর্নীতির অভিযোগে হাজার হাজার মানুষের চাকরি যাওয়া থেকে শিক্ষামন্ত্রীর জেল; নিশ্চিত ভাবেই শিক্ষা দফতর তৃণমূল সরকারের অন্যতম দুর্বল জায়গা। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্যই বলছে যে, সব মিলিয়ে শিক্ষার ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ সব রাজ্যের মধ্যে মাঝামাঝি অবস্থানে রয়েছে— সাক্ষরতার মতো বিষয়ে একেবারে প্রথমে, আবার মাধ্যমিক স্তরে স্কুলছুট হওয়ার হিসাবে প্রায় তলানিতে।
গণতন্ত্রে যে কোনও দল অবশ্যই অন্য দলের, বিশেষ করে সরকারে থাকা দলের, দুর্বলতাগুলিকে সামনে আনবে, সমালোচনা করবে— কিন্তু সত্যিকে উল্টে দিয়ে নয়! প্রচারে মিথ্যা বা অর্ধসত্য বলার অধিকার থাকাটা গণতন্ত্রে উচিত নয়, কেননা তার উপরে দাঁড়িয়ে ভোট-ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয়।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)