অতীতে সর্বময় শাসকের কথাই ছিল আইন। বাদশাহ তাঁর দিওয়ান-ই-আশরফ বা অর্থমন্ত্রীকে যাকে খুশি, যে কোনও উদ্দেশ্যে, যখন খুশি অর্থ বিতরণের নির্দেশ দিতে পারতেন। বিধিবদ্ধ গণতন্ত্রে মুখ্যমন্ত্রীদের পক্ষে— এমনকি প্রধানমন্ত্রীর পক্ষেও— এখন আইনত আর তা সম্ভব নয়। তাঁদের ক্ষমতা এখন সংবিধান দ্বারা সীমাবদ্ধ। বিবেচনামূলক ক্ষমতা সীমিত রয়েছে ‘কনটিনজেন্সি ফান্ড’-এ, যা অপ্রত্যাশিত ব্যয় মেটানোর জন্য একটি অগ্রিম তহবিলের মতো গঠিত। এমন ব্যয়ও পরে সংবিধানের ২০৫ বা ২০৬ অনুচ্ছেদের অধীনে বিধানসভার অনুমোদনসাপেক্ষ। কিছু রাজ্য, যেমন পশ্চিমবঙ্গ, এই তহবিল খুব সংযত ভাবে ব্যবহার করে। এই তহবিলে সর্বশেষ অর্থ স্থানান্তর হয়েছিল ২০২১-২২ সালে, পরিমাণ ছিল ১৮০ কোটি টাকা।
সংবিধান অনুযায়ী, ‘কনসোলিডেটেড ফান্ড’-এর উপরে ‘চার্জড’ ব্যয় (যেমন রাজ্যপালের বেতন এবং সুদ পরিশোধবাবদ ব্যয়) বাদে অন্য সব ব্যয় রাজ্য সরকারগুলি কেবলমাত্র বিধানসভার যথাযথ অনুমোদনের পরেই করতে পারে। নির্বাচনের আগে ‘জনপ্রিয়’ প্রকল্পগুলি দ্রুত বাস্তবায়নের তাড়নায়, এই নিয়মগুলি কি কিছু ক্ষেত্রে— যেমন, পশ্চিমবঙ্গে— উপেক্ষিত হচ্ছে?
কল্যাণমূলক প্রকল্পগুলি, বিশেষত মহিলাদের জন্য নির্দিষ্ট প্রকল্পগুলি, নির্বাচনমুখী রাজ্যগুলিতে ক্ষমতাসীন দলগুলির কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। যেমন, অসম ২০২০ সালে ‘অরুণোদয়’ প্রকল্প চালু করে, যেখানে পরিবারপ্রধান মহিলাদের প্রতি মাসে ৮৩০ টাকা থেকে ১,১০০ টাকা অবধি দেওয়া হয়। এর পর রয়েছে মধ্যপ্রদেশের ‘লাড়লি বেহনা’ (মার্চ ২০২৩), যেখানে মাসে ১,০০০-১,২৫০ টাকা দেওয়া হয়; মহারাষ্ট্রের ‘মাঝি লাডকি বহিন’ (অগস্ট ২০২৪), যেখানে ২১-৬৫ বছর বয়সি মহিলাদের মাসে ১,৫০০ টাকা দেওয়া হয়; ঝাড়খণ্ডের ‘মাইয়া সম্মান’ (অগস্ট ২০২৪), যেখানে প্রথমে ১,১০০ টাকা দেওয়া হত, যা পরে নির্বাচনের ঠিক আগে বাড়িয়ে ২,৫০০ টাকা করা হয়; এবং বিহারের ‘মহিলা রোজগার যোজনা’, যা ২০২৫ সালের নির্বাচনের কয়েক মাস আগে চালু হয়, যেখানে রয়েছে এককালীন ১০,০০০ টাকা সহায়তা এবং সর্বোচ্চ দু’লক্ষ টাকা সহায়তার ব্যবস্থা।
মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, ঝাড়খণ্ড এবং বিহার— এই চারটি রাজ্যেই ক্ষমতাসীন সরকার আগের চেয়ে বেশি আসন পেয়ে নির্বাচনে জয়ী হয়েছে। মধ্যপ্রদেশে ২৩০টি আসনের মধ্যে শাসক দলের আসন ১০৯ থেকে বেড়ে ১৬৩ হয়েছে; মহারাষ্ট্রে ২৮৮টি আসনের মধ্যে ১৬১ থেকে বেড়ে হয়েছে ২৩৬; ঝাড়খণ্ডে জেএমএম-কংগ্রেস-আরজেডি জোটের আসনসংখ্যা ৪৭ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৬; এবং বিহারে ২৪৩টি আসনের মধ্যে এনডিএ জোটের আসনসংখ্যা ১২৫ থেকে বেড়ে হয়েছে ২০২। অসমে নির্বাচন হয়ে গিয়েছে, ৪ মে ফল প্রকাশিত হবে— সে দিন বোঝা যাবে যে, শাসক দলের লাভ হল কি না। অনেকে বলছেন, এই ধরনের প্রকল্প ঘোষণার ক্ষমতা ‘অ্যান্টি-ইনকাম্বেন্সি’ বা শাসক-বিরোধী মনোভাবকে ‘প্রো-ইনকাম্বেন্সি’ বা শাসক-সমর্থক মনোভাবে পরিণত করেছে।
এই ধারাবাহিক অভিজ্ঞতায়, অন্যান্য রাজ্যের ক্ষমতাসীন দলগুলির পক্ষেও এমন প্রকল্প চালু করা বা সুবিধা বাড়ানোর প্রলোভন এড়ানো কঠিন। বিশেষত পশ্চিমবঙ্গে, যেখানে তৃণমূল কংগ্রেস সরকার ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ প্রকল্প চালু করেছিল, যা আর্থিক ভাবে দুর্বল মহিলাদের সহায়তা প্রদান করে। ২৫-৬০ বছর বয়সি এবং ‘স্বাস্থ্য সাথী’ প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত মহিলাদের প্রতি মাসে তফসিলি জাতি/জনজাতি পরিবারে ১,২০০ টাকা এবং অন্যদের ১,০০০ টাকা দেওয়া হয়। ২০২১ সালের মার্চের বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে চালু হওয়া এই প্রকল্পের সঙ্গে তৃণমূলের আসন সংখ্যা ২০১৬ সালের ২১১ থেকে বেড়ে ২১৫ হওয়ার ঘটনাও মিলে যায়।
২০২৬ সালের এপ্রিলের শেষ দিকে নির্বাচন হওয়ার প্রাক্কালে, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ পেশ করা অন্তর্বর্তী বাজেটে তৃণমূল সরকার ঘোষণা করে যে, ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ প্রকল্পের উপভোক্তার সংখ্যা ২.২১ কোটি থেকে বাড়িয়ে ২.৪২ কোটি করা হবে, এবং ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারি থেকে প্রতি মাসে অতিরিক্ত ৫০০ টাকা দেওয়া হবে। ২০২৬-২৭ সালের জন্য অতিরিক্ত ১৫,০০০ কোটি টাকা বাজেট বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয়, ২০২৫-২৬ সালের জন্য প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত বরাদ্দের, যা ২,০০০ কোটি টাকারও বেশি হতে পারে, কোনও উল্লেখই নেই বাজেটে।
এ ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গ বাজেটে একটি নতুন প্রকল্প ‘বাংলার যুব-সাথী’ ঘোষণা করা হয়, যা ১৫ অগস্ট ২০২৬ থেকে চালু হওয়ার কথা ছিল, এবং যাতে ২১-৪০ বছর বয়সি যুবকদের চাকরি না-পাওয়া পর্যন্ত বা সর্বোচ্চ ৫ বছর পর্যন্ত প্রতি মাসে ১,৫০০ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের জন্য বাজেটে ৫,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়। কিন্তু বাজেট ঘোষণার এক সপ্তাহ না-পেরোতেই মুখ্যমন্ত্রী জানালেন যে, প্রকল্পটি ১৫ অগস্টের পরিবর্তে ১ এপ্রিল থেকেই শুরু হবে। জানা গেছে, আবেদনকারীর সংখ্যা ৮০ লক্ষ এবং এই প্রকল্পে বার্ষিক ব্যয় হবে ১৪,৪০০ কোটি টাকা, যা বরাদ্দ ৫,০০০ কোটি টাকার চেয়ে অনেক বেশি।
এ ছাড়াও রাজ্য সরকারি কর্মচারী এবং পেনশনভোগীদের মহার্ঘ ভাতা সংক্রান্ত দীর্ঘ দিনের একটি সমস্যা ছিল। সরকার আর্থিক সঙ্কটের কথা বলে বার বার এই ভাতা প্রদানের বিরোধিতা করেছে। কিন্তু গত ৫ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্ট রাজ্য সরকারের এই যুক্তি অগ্রাহ্য করে নির্দেশ দেয় যে, ৩১ মার্চের মধ্যে বকেয়ার প্রথম কিস্তি পরিশোধ করতে হবে। রাজ্যের অন্তর্বর্তী বাজেটে এই মহার্ঘ ভাতা বিষয়ক কোনও উল্লেখই ছিল না।
১৫ মার্চ বিকেল চারটেয় নির্বাচন কমিশন পশ্চিমবঙ্গে দু’দফায় বিধানসভা নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণা করে— প্রথম দফা ২৩ এপ্রিল ১৫২টি আসনে, এবং দ্বিতীয় দফা ২৯ এপ্রিল ১৪২টি আসনে। লক্ষণীয়, সে দিনেই দুপুর দুটো চল্লিশে মুখ্যমন্ত্রী মুয়াজ্জিন ও পুরোহিতদের ভাতা প্রতি মাসে ৫০০ টাকা বাড়ান; এবং তার ২৫ মিনিট পর, বিকেল তিনটে পাঁচে ঘোষণা করেন যে, রাজ্য সরকার মার্চ মাস থেকেই রাজ্য সরকারি কর্মচারী ও পেনশনভোগীদের বকেয়া মহার্ঘ ভাতা প্রদান শুরু করবে। এই অর্থ কোথা থেকে আসবে? এর ফলে ২০২৬-২৭ এবং এমনকি ২০২৫-২৬ সালের বাজেটে কী প্রভাব পড়বে?
দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের তুলনায় কল্যাণমূলক প্রকল্পগুলির সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নৈতিক যুক্তি একটি বিতর্কিত বিষয়। কিন্তু প্রক্রিয়াগত দিকটি সরল ও স্পষ্ট। নতুন বা সংশোধিত প্রকল্পগুলির খরচ কি সঠিক ভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে? যদি না হয়ে থাকে, তবে বাজেটের পরিসংখ্যানে তার কী প্রভাব পড়বে? কোনও রাজ্য সরকার কী ভাবে বিধানসভার পূর্ব অনুমোদন ছাড়াই ‘কনসোলিডেটেড ফান্ড’ থেকে অর্থ নিয়ে প্রকল্প ঘোষণা ও বাস্তবায়ন শুরু করে? তা হলে আইনসভার তদারকি কোথায়? বাজেটের যৌক্তিক সত্যতা কী ভাবে বজায় থাকবে?
যখন নতুন ব্যয়ের পরিমাণ বড় হয়, তখন পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করাও সম্ভব না হতে পারে। আমরা যে ভাবে পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটিগুলিকে অবহেলা করতে শুরু করেছি, তাতে নিয়ন্ত্রক ও মহা-হিসাব নিরীক্ষকের (সিএজি) আপত্তিগুলি কি সরকারের কাজের ধরনে কোনও পরিবর্তন আনতে পারবে? যদি আমরা বর্তমান আর্থিক শৃঙ্খলাভঙ্গকে কিছু রাজ্যে আর্থিক সঙ্কটে পরিণত হওয়া থেকে আটকাতে চাই, তবে এই প্রক্রিয়াগত বিষয়গুলির দিকে আরও বেশি মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
বিধায়ক, ভারতীয় জনতা পার্টি
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)