E-Paper

ক্যানসার যুদ্ধের হাতিয়ার

ক্যানসার গবেষণার বর্তমান ধারাটি প্রধানত ‘প্রিসিশন অঙ্কোলজি’ বা ব্যক্তির প্রয়োজন-অনুসারী সুনির্দিষ্ট চিকিৎসার পথ নিয়েছে। এত দিন সব রোগীর জন্যই কেমোথেরাপি, অর্থাৎ কিছু নির্দিষ্ট মাত্রায় রাসায়নিক ঢুকিয়ে ক্যানসারগ্রস্ত কোষগুলিকে ধ্বংস করার পালা চলছিল।

আরণ্যক গোস্বামী

শেষ আপডেট: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:১৯

মানবসমাজের সবচেয়ে নাছোড় প্রতিদ্বন্দ্বীদের অন্যতম হল একটি অসুখ— ক্যানসার। বিগত কয়েক দশক ধরে বিশ্ব জুড়ে বিজ্ঞানীরা জিনের সঙ্কেত এবং কোষের আচরণ বুঝে ক্যানসারকে প্রতিহত করার চেষ্টা করছেন। ২০০০ সালে যখন ‘হলমার্কস অব ক্যানসার’ বা ক্যানসার-আক্রান্ত কোষগুলির আচরণের ছ’টি প্রধান বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করা গিয়েছিল (বর্তমানে ১৪টি চিহ্নিত) তখন মনে হয়েছিল, মানুষ হয়তো যুদ্ধের শেষ প্রান্তে পৌঁছে গিয়েছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বোঝা গিয়েছে, ক্যানসার প্রতিনিয়ত বিবর্তিত হয়। এখন মোকাবিলার নতুন পথ দেখাচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মলিকিউলার বায়োলজির মেলবন্ধন। ভারতের বিজ্ঞানীদের নতুন আবিষ্কার ক্যানসার চিকিৎসায় মোড় ঘোরাতে পারে বলে ভাবা হচ্ছে।

ক্যানসার গবেষণার বর্তমান ধারাটি প্রধানত ‘প্রিসিশন অঙ্কোলজি’ বা ব্যক্তির প্রয়োজন-অনুসারী সুনির্দিষ্ট চিকিৎসার পথ নিয়েছে। এত দিন সব রোগীর জন্যই কেমোথেরাপি, অর্থাৎ কিছু নির্দিষ্ট মাত্রায় রাসায়নিক ঢুকিয়ে ক্যানসারগ্রস্ত কোষগুলিকে ধ্বংস করার পালা চলছিল। এখন আমেরিকা বা ইউরোপের প্রথম সারির ল্যাবরেটরিগুলিতে রোগীর শরীরেরই রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে ক্যানসার ধ্বংস করার (ইমিউনোথেরাপি) চেষ্টা চলছে বড় আকারে। ‘লিকুইড বায়প্সি’ বা রক্তের সামান্য নমুনায় ক্যানসারের ডিএনএ খুঁজে বার করার প্রযুক্তি এখন আর স্বপ্ন নয়। বিশ্ব জুড়ে গবেষকরা চেষ্টা করছেন কী ভাবে ‘বিগ ডেটা’ ব্যবহার করে আগে থেকেই বলে দেওয়া যায়, কার শরীরে ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি বেশি। খুব অল্প সময়ে কোটি কোটি জেনেটিক তথ্যের বিশ্লেষণ করে এ ভাবে রোগের গতিপ্রকৃতি নির্ণয় করা যায়, যা মানব মস্তিষ্কের পক্ষে অসম্ভব। ভারত বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম ক্যানসার গবেষণার কেন্দ্র হয়ে উঠছে। মুম্বইয়ের টাটা মেমোরিয়াল সেন্টার বা দিল্লির এমস-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলি বিশ্বমানের ‘ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল’ পরিচালনা করছে।

অতি সম্প্রতি ভারতের অশোক ইউনিভার্সিটি এবং এস এন বোস ন্যাশনাল সেন্টার ফর বেসিক সায়েন্সেস-এর গবেষকরা ‘অঙ্কোমার্ক এআই ফ্রেমওয়ার্ক’ নামে একটি ব্যবস্থা তৈরি করেছেন, যা ভারতের মেধার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। অঙ্কোমার্ক-এর কার্যপদ্ধতি আগের চেয়ে একেবারে আলাদা— ৩১ লক্ষেরও বেশি ক্যানসারগ্রস্ত কোষের তথ্য ব্যবহার করে এটি রোগীর কোষের অভ্যন্তরীণ ক্রিয়াকলাপ বুঝতে পারে। এটি প্রতিষ্ঠা করেছে যে, ভারত এখন নিজস্ব প্রযুক্তি দিয়ে ক্যানসার কোষের ‘হলমার্ক’ বা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সরাসরি পরিমাপ করতে সক্ষম। ভারতের মতো বৈচিত্রময় জিনগত বৈশিষ্ট্যের দেশে এই ধরনের উদ্ভাবন অত্যন্ত জরুরি। কারণ পশ্চিমের দেশের রোগীদের উপর যে সব ওষুধ কার্যকর হয়, সেগুলি অনেক সময়ে ভারতীয় রোগীদের ক্ষেত্রে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখায়।

ক্যানসার গবেষণার বর্তমান ক্ষেত্রটি তিনটি প্রধান কারণে আশাপ্রদ। এক, এআই মডেলের মাধ্যমে নির্ণয় করা সম্ভব যে একটি প্রাথমিক পর্যায়ের টিউমার ভবিষ্যতে কতটা আক্রমণাত্মক হয়ে উঠবে। দুই, ক্যানসারগ্রস্ত কোষের ভাবগতিক দেখে ওষুধ নির্বাচন করা যাচ্ছে, যা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অনেকটা কমিয়ে দেয়। তিন, ‘মেটাস্ট্যাসিস’ বা ক্যানসার ছড়িয়ে পড়ার আগেই তা শনাক্ত করার প্রযুক্তি এখন বিজ্ঞানীদের হাতের নাগালে।

তবে কিছু কঠিন সীমাবদ্ধতাও আছে। প্রথমত, উচ্চমানের এআই ভিত্তিক পরীক্ষার খরচ এখনও আকাশছোঁয়া। ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশে সাধারণ মানুষ এই চিকিৎসার নাগাল কবে পাবেন, বলা কঠিন। দ্বিতীয়ত, তথ্যের অভাব বা ‘ডেটা গ্যাপ’। রোগ নির্ণয়ের এআই মডেলগুলিকে নিখুঁত করতে চাইলে প্রচুর নিখুঁত ডেটা প্রয়োজন, যা অনেক সময় আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় সংরক্ষিত থাকে না। তৃতীয় এবং সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল পরিকাঠামো। একটি গবেষণাগারে যা সফল, তা সাধারণ হাসপাতালে রোগীর বেড পর্যন্ত পৌঁছতে দীর্ঘ সময় এবং বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়। এ ছাড়া, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা চিকিৎসকদের ক্লিনিক্যাল বিচারবুদ্ধিকে প্রভাবিত করতে পারে কি না, নৈতিক বিতর্ক রয়েই গেছে।

এআই চিকিৎসার পরিকাঠামো তৈরি করতে হলে চাই সমন্বয়। অন্যথায় ক্যানসারের মতো বহুমুখী সমস্যার সমাধান করা অসম্ভব। এখানে এক জন জীববিজ্ঞানীর সঙ্গে কম্পিউটার সায়েন্টিস্ট এবং ক্যানসার বিশেষজ্ঞের এক সঙ্গে কাজ করা প্রয়োজন। ক্যানসার এখন কেবল ওষুধের বিষয় নয়, এঞ্জিনিয়ারিং এবং ডেটা সায়েন্সেরও বিষয়।

বর্তমান সময়টি মানব ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণ। এক দিকে আমেরিকার অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরি, অন্য দিকে ভারতের ‘অঙ্কোমার্ক’-এর মতো উদ্ভাবন— চিকিৎসক ও গবেষকরা এক সমন্বিত যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। যদিও খরচ এবং পরিকাঠামোগত বাধাগুলো পাহাড়প্রমাণ, তবুও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিখুঁত বিশ্লেষণ এবং মানুষের সহজাত উদ্ভাবনী শক্তি আশা জাগাচ্ছে। আজ থেকে এক দশক পর হয়তো ক্যানসার আর কোনও ভয়ঙ্কর মৃত্যুদূতের নাম হবে না, বরং এটি হবে একটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য ক্রনিক অসুখ। বিজ্ঞানের এই অগ্রগতি কেবল ল্যাবরেটরিতে সীমাবদ্ধ না থেকে যদি প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছতে পারে, তবেই এই সমস্ত গবেষণার প্রকৃত সার্থকতা।

কম্পিউটেশনাল বায়োলজি, ইউনিভার্সিটি অব আরকানস’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Cancer medical treatment

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy