E-Paper

‘এই বাঁশিটি বাজালো কে’?

শৈশব-কৈশোরে কলের বাঁশি-মুখর কলকাতায় মুক্ত প্রকৃতি থেকে প্রায়-নির্বাসনই কি রবীন্দ্রনাথকে আবিষ্ট করেছিল মাঠের বাঁশির প্রবল টানে, যে টানে তিনি পরবর্তী কালে চলে এসেছিলেন শান্তিনিকেতনে!

নীলাঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১০ মে ২০২৬ ০৭:৫১
দ্রষ্টা: জাপানের কোবে শহরে এক উদ্যানে রবীন্দ্রনাথ, ১৯২৪। কাজ়ুও আজ়ুমার সংগ্রহ।

দ্রষ্টা: জাপানের কোবে শহরে এক উদ্যানে রবীন্দ্রনাথ, ১৯২৪। কাজ়ুও আজ়ুমার সংগ্রহ।

কৃষ্ণের অধরামৃত পান না করলে এক সামান্য বংশখণ্ড ভারতবর্ষের বৈষ্ণব দর্শন এবং সাহিত্যের বেণু, মুরলী, বংশিকা, মহানন্দা, আকর্ষিণী অথবা আনন্দিনী হয়ে উঠত কি না প্রশ্ন থাকেই! সেই বাঁশির তানই রবীন্দ্রনাথের গানে মিশে যায় বনফুলের মালার গন্ধে— ‘অধর ছুঁয়ে বাঁশিখানি/ চুরি করে হাসিখানি—/ বঁধুর হাসি মধুর গানে প্রাণের পানে ভেসে যায়।’ সেই বংশীধ্বনি শুধুই মানবের ইন্দ্রিয়গোচর হয় না, সমস্ত জড় ও জীবজগৎকে আন্দোলিত করে যায়: ‘কুঞ্জবনের ভ্রমর বুঝি বাঁশির মাঝে গুঞ্জরে,/ বকুলগুলি আকুল হয়ে বাঁশির গানে মুঞ্জরে।’ বৈষ্ণব সাহিত্যের মতোই, ‘নীড়বিরাগী’ রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যে, বিশেষত তাঁর গানে নানা দ্যোতনায় বহুমাত্রিক প্রতীক হিসেবে অহরহ শোনা যায় ‘নীল অতলের কোথা থেকে’ উদাস করা বাঁশির ধ্বনি। তাঁর চেতনায় বাঁশি নিতান্তই এক মধুর ধ্বনিময় বাদ্যযন্ত্র হয়ে থাকেনি।

রাধার কৃষ্ণপ্রেমের আকুতি প্রকাশ করে তিনি লিখেছিলেন, ‘মরি লো মরি, আমায় বাঁশিতে ডেকেছে কে’। নিজের জীবনে কার বাঁশি এত গভীর ভাবে ব্যাকুল করেছিল রবীন্দ্রনাথকে! রবীন্দ্রনাথের বংশীবাদক যেন মুখ্যত দৃশ্যের অতীত ও অধরাই, শুধু তার সুর এক ঐশিক মূর্ছনায় আলোড়িত করে কৃষ্ণ-বিরহকাতর রাধার মতোই জগৎসংসারকে: ‘এখনো তারে চোখে দেখি নি, শুধু বাঁশি শুনেছি—/ মন প্রাণ যাহা ছিল দিয়ে ফেলেছি।’

ছেলেবেলায় মোরান সাহেবের প্রকৃতি-পরিবৃত বাগানবাড়িতে বিশ্বনিখিলের আহ্বান তাঁর কাছে যেন ছিল সৃষ্টিকর্তার বেণু-নিনাদই। উদার, মুক্ত প্রকৃতির অপ্রতিরোধ্য সম্মোহনের কথা স্মরণ করে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, “সেই অতিথিবৎসলা বিশ্বপ্রকৃতি তাঁর অবারিত আঙিনায় সেদিন যখন বালককে বসালেন, তাঁকে কানে কানে বললেন, ‘তোমার বাঁশিটি বাজাও।’ বালক সে দাবি মেনেছিল। ছেলেমানুষের বাঁশি ছেলেমানুষি সুরে যেখানে বাজত সে আমার মনে আছে।” (‘সম্মান’) বিপুল জগৎসংসারের সেই সঞ্জীবনী, আনন্দময় বাঁশিই তাঁর চলার প্রেরণা।

রজতকান্ত রায় মন্তব্য করেছেন, সাজাদপুরে কুঠিবাড়িতে রবীন্দ্রনাথের জীবনদেবতা প্রথম আবির্ভূত হন। নববর্ষার জলভারনত মেঘ ও প্রাণের কল্লোলের আবহে সেই অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বলেন, “আমি যখন সাহাজাদপুরে তখন একটি গভীর আত্মচেতনার দ্বারা প্রবুদ্ধ হয়েছিলাম... আমার এই আত্মিক কর্ণধারকে জীবনদেবতা এই আখ্যা দিয়েছি” (‘তিমির অবগুণ্ঠনে’)। সর্বত্র বিরাজমান বিশ্ববিধাতাই ‘জগতের আনন্দযজ্ঞে’ রবীন্দ্রনাথকে দিয়েছিলেন বিস্ময়সৃষ্টিকারী বাঁশি। সেই প্রাপ্তির কথাই রবীন্দ্রনাথ স্মরণ করে লিখেছেন, ‘তোমার যজ্ঞে দিয়েছ ভার বাজাই আমি বাঁশি/ গানে গানে বয়ে বেড়াই প্রাণের কান্না হাসি’। এখানে রবীন্দ্রনাথ তাঁর অস্তিত্ব ও সৃষ্টির বাঁশরির কথাই হয়তো বলতে চেয়েছেন। এ গানে রবীন্দ্রনাথ যে সত্তাকে ‘তোমার’ সম্বোধন করেছেন তা হয় সৃষ্টিকর্তা, ঈশ্বর, বিশ্ববিধাতা, অথবা তাঁর জীবনদেবতাই।

উপনিষদের ধারায় দীক্ষিত রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রবন্ধে, কবিতায়, গানে এক অনন্ত জ্যোতিঃস্বরূপ, অমৃতস্বরূপ ব্রহ্মোপলব্ধির কথা বলেও বিব্রত অনুসন্ধিৎসায় আবার কৌতূহলী হয়েছেন, কে সেই সত্তা যাঁর ইচ্ছায় ভূতসকল জাত, জাগ্রত, সঞ্চালিত হচ্ছে! একটি গান— ‘দিনের বেলায় বাঁশি তোমার বাজিয়েছিলে অনেক সুরে—/ গানের পরশ প্রাণে এল, আপনি তুমি রইলে দূরে’। গানটি শেষ হয় এ ভাবে, ‘তোমার বাঁশি বাজাও আসি/ আমার প্রাণের অন্তঃপুরে।’ এখানে ‘বাঁশি’ যেন চর্মচক্ষে দেখতে পাওয়া চার পাশের ব্যস্ত বিশ্বচক্রের কেন্দ্রে লহরি তুলে যাওয়া এক অদৃশ্য চালিকাশক্তির বেণুনিনাদ, যা সমস্ত জগৎসংসার, বুদ্ধি-চেতনাধারা আচ্ছন্ন করে রেখেছে। কিন্তু সেই মহাশক্তিধর বংশীবাদক, ‘যাঁ হতে বাহিরে ছড়ায়ে পড়িছে পৃথিবী আকাশ তারা’ (‘রূপান্তর’), সম্ভবত যাঁকে রবীন্দ্রনাথ ‘তোমার’ সম্বোধন করছেন, তাঁর স্বরূপ কি নির্দিষ্ট তাঁর নিজের কাছে? সেই দ্বিধা তিনি রেখে গেছেন গানটির অন্তরায়: ‘শুধাই যত পথের লোকে ‘এই বাঁশিটি বাজাল কে’।’ এই আত্ম-অন্বেষণ তাঁকে কোনও স্পষ্ট উত্তরের অছিলায় বারংবার রেখে যায় এক চির-অমীমাংসিত দ্বন্দ্বেরই দোলাচলে: ‘নানান নামে ভোলায় তারা নানান দ্বারে বেড়াই ঘুরে’। আর একটি গানে রবীন্দ্রনাথ খুঁজেছেন দৃষ্টির অগোচরে থাকা সেই বংশীধরেরই প্রকৃত সত্তাকে: ‘সে কে বাঁশি বাজিয়েছিল কবে প্রথম সুরে তালে,/ প্রাণেরে ডাক দিয়েছিল সুদূর আঁধার আদিকালে।। তার বাঁশির ধ্বনিখানি আজ আষাঢ় দিল আনি,/ সেই অগোচরের তরে আমার হৃদয় নিল হ’রে।’

বাঁশির প্রতি তিনি এত আকৃষ্ট হলেন কেন? নগরবাসী কবি বিহারীলাল চক্রবর্তী কবিতায় পল্লির কৃষকের সঙ্গে ‘বাঁশের বাঁশরী’ বাজিয়ে কাটানোর আকুতি প্রকাশ করায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “কলের বাঁশি যাহারা শুনিতেছে মাঠের ‘বাঁশের বাঁশরী’ শুনিয়া তাহারা ব্যাকুল হয় এবং যাহারা বাঁশের বাঁশরী বাজাইয়া থাকে কলের বাঁশি শুনিলে তাহাদের হৃদয় বিচলিত হইয়া উঠে” (‘বিহারীলাল’)। শৈশব-কৈশোরে কলের বাঁশি-মুখর কলকাতায় মুক্ত প্রকৃতি থেকে প্রায়-নির্বাসনই কি রবীন্দ্রনাথকে আবিষ্ট করেছিল মাঠের বাঁশির প্রবল টানে, যে টানে তিনি পরবর্তী কালে চলে এসেছিলেন শান্তিনিকেতনে! গেয়েছিলেন, ‘মাঠের বাঁশি শুনে শুনে আকাশ খুশি হল/ ঘরেতে আজ কে রবে গো?’ কখনও ‘সুদূরের পিয়াসি’ কবি লেখেন, ‘ওগো সুদূর, বিপুল সুদূর, তুমি যে বাজাও ব্যাকুল বাঁশরি—/ মোর ডানা নাই, আছি এক ঠাঁই সে-কথা যে যাই পাশরি।’

জীবনস্মৃতি-তে রবীন্দ্রনাথ স্মরণ করেছেন, বাদলদিনে বিদ্যাপতির পদে সুর বসিয়ে গাওয়ার আনন্দের কথা। জয়দেব, বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস প্রমুখ মধ্যযুগীয় বৈষ্ণব কবিদের গীতিকাব্যের প্রেরণায় লিখেছিলেন ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী। ষোলো বছর বয়সে লেখা তারই একটি পদ: ‘গহন কুসুমকুঞ্জ-মাঝে মৃদুল মধুর বংশি বাজে,/ বিসরি ত্রাস লোকলাজে সজনি, আও আও লো’। এই পদাবলির বেশ কয়েকটি পদে কৃষ্ণলীলার বর্ণনার ঐতিহ্যে বাঁশির উল্লেখ রয়েছে। সুকুমার সেন মন্তব্য করেছেন, “রবীন্দ্রনাথের কলমে সবচেয়ে ব্যবহৃত সিম্বল হল বাঁশি। বলা বাহুল্য এ সিম্বল বৈষ্ণব পদাবলী থেকে নেওয়া।” (‘রবীন্দ্রশিল্পে প্রেমচৈতন্য’) তাঁর রবীন্দ্রনাথের গান বইয়ে তিনিই বলেছেন, রবীন্দ্রনাথের গানে বাঁশি ‘বিশ্বসত্তার আহ্বানের সিম্বল’। রবীন্দ্রনাথের সমগ্র রচনার পাঠভান্ডার সন্ধান করলে দেখা যাবে, তাঁর চিঠিপত্র বাদে অন্যান্য বাংলা রচনায় রবীন্দ্রনাথ শুধু বাঁশি, বাঁশরি, বংশী, মুরলী, মোহন বাঁশী, বেণু অথবা সানাই-এর মতো শব্দ ব্যবহার করেছেন অসংখ্য বার। প্রকাশ করেছেন নাটকের বই বাঁশরি, কাব্যগ্রন্থ সানাই।

কৃষ্ণের বাঁশি বইয়ে বৈষ্ণব সাহিত্যে বাঁশির সুদীর্ঘ আলোচনায় মিনতি কর লিখেছেন, “বাঁশি শূন্য, তাই সে পূর্ণ হয়ে যায় রসিকরাজের প্রসন্ন শব্দময় ধ্বনিতে। এই সুধাময় ধ্বনি সঞ্চয়ের জন্য নয়— তা দানের জন্য, যা চরাচরকে স্পন্দিত করবে।” তিনি আরও লিখেছেন, শ্রীকৃষ্ণের বংশীবাদন উদ্দেশ্যহীন নয়। সে-আহ্বান “সংসারাসক্ত মানুষদের এই জড় বিষয়াসক্তি থেকে বিমুখীকরণের জন্য,... তাঁর সুরের মধুর মুরলীধ্বনি তাঁর অখণ্ড আনন্দময় সত্তার প্রকাশ।” ‘মাঠের বাঁশি’ হোক বা ‘উৎসবের বাঁশি’, ‘ছুটির সানাই’ হোক বা ‘বেদন বাঁশি’, ‘কালের বাঁশি’ই হোক বা ‘সাপ খেলাবার বাঁশি’, ‘পাতার বাঁশি’ই হোক বা ‘অশ্রুত বাঁশি’— রবীন্দ্রসাহিত্যে বাঁশির উপস্থিতি যেন বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সেই বিশ্বপিতারই আহ্বান। নিঃসন্দেহে রবীন্দ্রনাথের আধ্যাত্মিকতায় বাঁশি এক মহান প্রতীক। প্রেমে, বিচ্ছেদে, বিরহে, শোকে, নিবিড় একাকিত্বে বা জনারণ্যে তিনি সেই সত্যস্বরূপের সদা-আনন্দময় বেণুধ্বনিই শুনতে পেয়েছিলেন। তাঁর দর্শনে সেই উপলব্ধির রেশ রেখে গিয়েছিলেন বিশ্ববোধ জাগ্রত করার বাসনায়। তিনি অনুভব করেছিলেন, ঈশ্বর যে সর্বত্র বিরাজমান এই সহজ সত্যকে, এবং সংসারের কর্মপ্রবাহে সেই ‘আত্মিক কর্ণধার’কে ভুলে থাকাই যেন সাধারণ অভ্যাস। ‘আত্মার দৃষ্টি’ প্রবন্ধে লিখেছেন, চোখ দিয়ে যেমন কোনও কিছুর কাছে আসা যায়, তেমনই যায় আত্মার সঙ্গে আত্মার সংযোগে। “আমি একটা আবরণের মধ্যে আবৃত হয়ে পৃথিবীতে সঞ্চরণ করচি। ডিমের মধ্যে পক্ষীশিশু যেমন পৃথিবীতে জন্মেও জন্মলাভ করে না, এও সেই রকম। এই অস্ফুট চেতনার ডিমের ভিতর থেকে জন্মলাভই আধ্যাত্মিক জন্ম।” যিনি সেই ‘চরম সত্য’, ‘বিশুদ্ধতম জ্যোতি’, ‘নির্ম্মলতম অন্ধকার’, রবীন্দ্রনাথের ‘বাঁশি’র ডাক আসলে যেন তাঁরই আহ্বান। তাঁর সমস্ত জীবনে এই ‘চরম সত্য’কে উপলব্ধির কথা যে এত গুরুত্বের সঙ্গে বলেছিলেন তিনি, সেই সুরে যে বাজিয়েছিলেন তাঁর সৃষ্টির বাঁশি, তার যোগ্য উত্তরাধিকারী কি খুঁজে পেয়েছিলেন তিনি? কেনই বা গেয়েছিলেন, ‘বাঁশি, তোমায় দিয়ে যাব কাহার হাতে?’

আর একটি গান। এক দূরদেশী রাখাল ছেলের গানের সুর উতলা করেছে কবির প্রাণ, কিন্তু সেই গান শুনে অন্যদের কাছে তাঁর প্রশ্ন, ‘বলো দেখি তোমরা কি তার কথার কিছু আভাস পেলে’। রাখাল বালকটির কাছে, তার সুরের আবেশে আচ্ছন্ন কবি জানতে চান, ‘কী তোমারে দিব আনি?’ রাখাল বালক চেয়ে বসে এক নিঃশর্ত প্রেমের অঞ্জলি, ‘আর কিছু নয়, তোমার গলার মালাখানি।’ সেই সহজ চাওয়া যেন সংসারের হিসাবের ভারাবনত ক্ষুদ্রপ্রাণ মানবের মতোই কবির মনে সারা দিনমান এক ভাবনা জাগিয়ে দিয়ে যায়, ‘দিই যদি তো কী দাম দেবে?’ এ যেন বিশ্বসত্তার সাক্ষাৎ পেয়েও পার্থিব তুচ্ছতার কুহকে আত্মার সঙ্গে আত্মার যোগাযোগের সুযোগ হারিয়ে ফেলা কবিসত্তার এক করুণ বোঝাপড়ার মুহূর্ত। গানের শেষে সংসারাসক্ত কবি যেন সহসা খুঁজে পান গভীর, নিবিড় উপলব্ধি— দেখেন, তাঁর জীবনপথে আনন্দময় সুরের প্লাবন এনে দেওয়া, প্রতিদানের প্রত্যাশাহীন সেই রাখালরূপী জগৎস্রষ্টাই যেন শুধু ‘ধুলায় বাঁশিটি তার গেছে ফেলে।’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Rabindranath Tagore Flute Rabindra sangeet

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy