কবি সাহিত্যিক শিল্পীদের মধ্যে বিজ্ঞানচেতনার দৃষ্টান্ত যে খুব বেশি চোখে পড়ে তা নয়। বিজ্ঞানীদের মধ্যে সাহিত্য-শিল্পকলায় আগ্রহের ছবিটাও প্রায় একই রকম— টু কালচারস বইয়ে এই দুই ‘সংস্কৃতি’র ব্যবধানের কথা লিখেছিলেন সি পি স্নো। তবে বিজ্ঞান ও মানবিকবিদ্যার পণ্ডিতদের চিন্তাভাবনা সম্পূর্ণ ভিন্নখাতে বয়— এই ধারণার উজ্জ্বল ব্যতিক্রম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞানে আগ্রহ তাঁর। নিজেই বলেছেন, “আমি বিজ্ঞানের সাধক নই সে কথা বলা বাহুল্য। কিন্তু বাল্যকাল থেকে বিজ্ঞানের রস আস্বাদনে আমার লোভের অন্ত ছিল না।” জীবনস্মৃতি-তে লিখেছেন, “ঠাকুরবাড়ির বালক কিশোরদের সাহিত্য ছাড়াও গণিত, জ্যামিতি, ইতিহাস, পদার্থবিদ্যা, রসায়নবিদ্যার নানান আবিষ্কারের পাঠ নিতে হত গৃহশিক্ষকের কাছে।” প্রকৃতির বিপুল বিস্ময়ের সঙ্গে বালক রবীন্দ্রনাথকে পরিচয় করান দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। বিশ্বপরিচয় গ্রন্থে কবি লিখেছেন, “বয়স তখন হয়তো বারো হবে, পিতৃদেবের সঙ্গে গিয়েছিলুম ডালহৌসি পাহাড়ে... গিরিশৃঙ্গের বেড়া-দেওয়া নিবিড় নীল আকাশের স্বচ্ছ অন্ধকারে তারাগুলি যেন কাছে নেমে আসত।” গ্রহ-নক্ষত্র চেনানোর পাশাপাশি তাদের পারস্পরিক দূরত্ব, প্রদক্ষিণ-সময়ও বুঝিয়েছিলেন পিতা, সেই পরিচয় গভীর ছাপ ফেলেছিল বালক রবির মনে। মহাকাশ ও বিশ্বপ্রকৃতির রহস্য, নিয়মশৃঙ্খলা আর সৌন্দর্য-ভাবনা তাঁর মনে জন্ম দেয় মুগ্ধতাবোধ ও অপার কৌতূহলের, বিজ্ঞানে আগ্রহের। তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় প্রকাশিত হয় কিশোর রবীন্দ্রনাথের নিবন্ধ।
বিশ্বপ্রকৃতির অসীম রহস্যের প্রতি কবির বিস্ময়াবেশের ছাপ রয়ে গেছে তাঁর বহু কবিতা ও গানে, নানা রচনায়। রবীন্দ্র কল্পনায় বিজ্ঞানের অধিকার বইয়ের ভূমিকায় ক্ষুদিরাম দাসের কথাটি প্রণিধানের: “বিশ শতকের আধুনিক বিজ্ঞান বিশেষত মহাকাশ বিজ্ঞান কবির চিত্তকে এমনভাবে দখল করেছিল যে তার ফলে তাঁর কাব্য-কল্পনার স্বভাবই গিয়েছিল বদলে।” জ্যোতির্বিজ্ঞানের মতোই, সমসাময়িক অণু পরমাণু কণার ধারণাও কবিকে কৌতূহলী করেছিল, যার সাক্ষ্য ছড়িয়ে নৈবেদ্য থেকে উৎসর্গ বা গীতাঞ্জলি-র বহু কবিতায়। মহাকাশ, মাধ্যাকর্ষণ শক্তি, রাসায়নিক বিক্রিয়া থেকে শুরু করে বিবর্তনবাদের মতো বিজ্ঞান-ভাবনা ও তত্ত্বের প্রতিফলন দেখা যায় কবির নানা রচনায়।
রবীন্দ্র-যুগ ছিল বিজ্ঞান-প্রযুক্তির অগ্রগমনের এক উল্লেখযোগ্য সময়। বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানীদের বেশ কয়েক জনের সঙ্গে কবির সাক্ষাৎ হয়। জগদীশচন্দ্র বসু, মেঘনাদ সাহা, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, সি ভি রামন প্রমুখ বিজ্ঞানীর সঙ্গে কবির পরিচয়, সখ্য, অন্তরঙ্গতা ছিল। চার বার সাক্ষাৎ হয়েছে আইনস্টাইনের সঙ্গে। জার্মান পদার্থবিদ হাইজ়েনবার্গ কবির অতিথি হয়ে ভারতে এসেছিলেন। সাক্ষাৎ হয়েছে আর্নল্ড সমারফেল্ডের সঙ্গে। এত সংখ্যক বিজ্ঞানীর সঙ্গে কবির এই সংযোগই প্রমাণ, রবীন্দ্রমানসে বিজ্ঞানবোধ কত উন্নত ছিল।
পাশ্চাত্যের বিজ্ঞান-শিক্ষা দেখে এর গুরুত্ব বিষয়ে কবি বলেন, “শিক্ষাস্তরকে সকল দিকে পরিপূর্ণ করে তুলতে হবে... গোড়া থেকেই বিজ্ঞান ধরাইয়া দেওয়া দরকার। বিশেষত ফলিত বিজ্ঞান।” তাঁর বিজ্ঞান-ভাবনার পরিচয় মেলে যে বিশ্বপরিচয় গ্রন্থে, সেটি বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে উৎসর্গ করেছিলেন কবি। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট ফর মেডিক্যাল রিসার্চ (বর্তমানে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব কেমিক্যাল বায়োলজি)— কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত প্রথম বায়ো-মেডিক্যাল গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলায় (১৯৩৫) রবীন্দ্রনাথের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। এক জন কবির এমন ভূমিকার নিদর্শন পৃথিবীতে কমই আছে।
বিজ্ঞান-সচেতনতার প্রসারই অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার থেকে মানুষকে মুক্ত করতে পারে। কবি বিশ্বাস করতেন, বুদ্ধিকে মোহমুক্ত ও সতর্ক করে তোলার কাজে সবচেয়ে বেশি দরকার বিজ্ঞানচর্চা, বিজ্ঞানমনস্কতা। প্রকৃতির রহস্য উদ্ঘাটনে আধুনিক বিজ্ঞানের অগ্রগতি বিষয়ে সকলের জানা প্রয়োজন, এই ছিল তাঁর অভিমত— সৃজনশীল মানুষের কল্পনাশক্তি প্রসারে প্রকৃতিরহস্য বিষয়ে কৌতূহল ও মুগ্ধতা সাহায্য করে: “যে সুন্দরতম বিষয়ে আমার অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারি তা হল প্রাকৃতিক দুর্বোধ্য রহস্য। প্রকৃত সাহিত্য, কলাবিদ্যা, বিজ্ঞান ইত্যাদির মূলে হল এই রহস্যে অভিভূত হওয়া। যে তা জানে না, আশ্চর্য বোধ করে না, বিস্ময় আর বিহ্বল হয়ে যায় না, সে বেঁচে থেকেও মৃত, সে নিঃশেষ হয়ে নিভে যাওয়া একটি মোমবাতির মতো।”
আমাদের জীবনযাত্রা-সহ সমগ্র সভ্যতারই যে বদল ঘটেছে, বিজ্ঞানের সেই অভিযাত্রা কবি-সাহিত্যিকরা তাঁদের লেখায় তুলে ধরলে মানুষের কাছে তা সহজবোধ্য ও গ্রহণযোগ্য হবে, তা নিশ্চিত। বিজ্ঞানী বা বিজ্ঞান-পণ্ডিতদের লেখার চেয়েও এক জন কবি তথা প্রকৃত সাহিত্যিকের ভাষা ও ভাব মানুষের মনে বেশি আগ্রহ জাগিয়ে তোলার ক্ষমতা রাখে। পঁচিশে বৈশাখের রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞানচেতনা নিয়ে তাই জনপরিসরে আরও চর্চা প্রয়োজন।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)