E-Paper

হাঁটতে হাঁটতে অনন্তে

জনজাতি গোষ্ঠীর মুন্ডা সম্প্রদায়ের কার্যত নিরক্ষর জিতু সে সব কাগজপত্র পাবেন কোথায়? তিনি অতশত আইনি জটিলতা বুঝতে পারবেনই বা কী করে?

তাপস সিংহ

শেষ আপডেট: ০৮ মে ২০২৬ ০৭:৪৭
অমানবিক: ব্যাঙ্ক থেকে ফেরার পথে জিতু মুন্ডা, কেওনঝড়, ওড়িশা।

অমানবিক: ব্যাঙ্ক থেকে ফেরার পথে জিতু মুন্ডা, কেওনঝড়, ওড়িশা।

তার পর ওঁরা হাঁটতে থাকেন অনন্তের পথে। দিদির কঙ্কাল কাঁধে নিয়ে জিতু মুন্ডা, স্ত্রীর দেহ নিয়ে দানা মাঝি, দেড়শো কিলোমিটার পথ হাঁটতে হাঁটতে অনন্ত বিশ্রামে চলে যাওয়া বারো বছরের বালিকা জামলো মকদম। ওঁরা হাঁটা ছাড়া আর কিছু জানেন না যে!

এখন গণতন্ত্রের আইপিএলের মরসুম। সবার নজর টিভির পর্দায়। সংবিধান ও গণতন্ত্র বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টায় সব দলের নেতা-নেত্রী নাওয়াখাওয়া ভুলে পথে নেমেছেন। আম আদমির কথা ভেবে তাঁরাও হাঁটছেন, তবে কিনা তাঁদের হাঁটাকে হাঁটা বলে না, বলতে হয় পদযাত্রা! আর এ সবের মাঝেই সেখানে আচমকা কোন এক ‘বেআক্কেল’ জিতু মুন্ডা তাঁর দিদি কালারা-র প্রায় কঙ্কালে পরিণত হওয়া দেহ কবর থেকে তুলে বস্তাবন্দি করে ব্যাঙ্কে এনে হাজির! জিতু থাকেন ওড়িশার কেওনঝড়ে। সেখানকার দিয়ানালি গ্রামের বাসিন্দা জিতুর দিদি মারা যান এ বছরেরই ২৬ জানুয়ারি। আঞ্চলিক ওড়িশা গ্রামীণ ব্যাঙ্কের মাল্লিপাসি শাখায় কালারা-র একটি অ্যাকাউন্টে ১৯ হাজার ৪০২ টাকা ছিল। যে-হেতু কালারা-র স্বামী ও সন্তানের আগেই মৃত্যু হয়েছে, তাই তাঁর আইনি উত্তরাধিকারী হিসেবে জিতু ব্যাঙ্কে গিয়ে সে টাকা দাবি করেন। ব্যাঙ্কের আধিকারিকেরা বলেন, ওই টাকা পেতে হলে হয় অ্যাকাউন্ট হোল্ডারকে সশরীরে ব্যাঙ্কে আসতে হবে অথবা তাঁর দিদির মৃত্যুর শংসাপত্র এবং আইনি উত্তরাধিকারীর শংসাপত্র (লিগাল এয়ার সার্টিফিকেট) লাগবে।

জনজাতি গোষ্ঠীর মুন্ডা সম্প্রদায়ের কার্যত নিরক্ষর জিতু সে সব কাগজপত্র পাবেন কোথায়? তিনি অতশত আইনি জটিলতা বুঝতে পারবেনই বা কী করে? আর, এটা তো আমাদের রোজের অভিজ্ঞতা, বিভিন্ন সরকারি বা সরকার নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানে উচ্চ চেয়ারে যাঁরা বসে থাকেন, তাঁদের অনেকের কাছে পোশাক, শিক্ষা বা আদবকায়দার গুরুত্ব অনেক বেশি। এক জন অনপড় মানুষকে ‘মাত্র’ ১৯ হাজার ৪০২ টাকার জন্য তাঁরা আর কত বোঝাবেন? অতএব, ফিরতে হয় জিতুকে। মুন্ডা সমাজ মৃতদেহ দাহ করে না, কবর দেয়। সেই দেহ আবার মাটি খুঁড়ে বার করাটা ‘পাপ’ হলেও জিতুকে সেই কাজটিই করতে হয় এবং তার পরে বস্তা কাঁধে জিতুর হেঁটে চলার একটি ভিডিয়ো ভাইরাল হয়ে যায় দেশ জুড়ে। আর কে না জানেন, এখন ভাইরাল না হলে কোনও কিছুই ঠিক জাতে ওঠে না!

এর পরেই ছুটে আসে পুলিশ, তৎপর হয়ে ওঠে জেলা প্রশাসন। তড়িঘড়ি তৈরি হয়ে যায় কাগজপত্র। শেষ পর্যন্ত জিতু সে টাকাও পেয়েছেন। মনে রাখতে হবে, এই কেওনঝড় কিন্তু যে সে জেলা নয়, ওড়িশার বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী মোহন চরণ মাঝির জেলা। তিনি নিজেও আদিবাসী। কেওনঝড়ের একাদিক্রমে চার বারের বিধায়ক। জিতু কিন্তু বলেছেন, “আমি বার বার ব্যাঙ্কে গিয়েছি, কিন্তু ওঁরা আমার কথা শুনতেই চাইছেন না। হতাশ হয়ে আমি এই কাজ করেছি।” প্রশ্ন উঠেছে, ব্যাঙ্কের আধিকারিকেরা কি একটু মানবিক বা সংবেদনশীল হতে পারতেন না? ওড়িশা গ্রামীণ ব্যাঙ্কের স্পনসর একটি রাষ্ট্রীয় ব্যাঙ্ক। তারা অবশ্য সমাজমাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে বলেছে, যথেষ্ট শক্তপোক্ত নথি ছাড়া তৃতীয় কোনও পক্ষকে টাকা তুলতে দেওয়া যায় না। ব্যাঙ্কের ম্যানেজার তা বুঝিয়েও দিয়েছেন।

ঠিকই। তাঁরা আইন বুঝিয়েছেন, কিন্তু মানবিক হননি। জনজাতি বা পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের কোনও মানুষের প্রতি যে আরও একটু সংবেদনশীল হওয়া যায়, সেই শিক্ষা তাঁদের কেউ দেয়নি, দেয়ও না। প্রান্তিক মানুষ এ দেশে যুগে-যুগান্তরে বঞ্চনা ও অবহেলার শিকার। দানা মাঝির কথা এক বার মনে করাই। দানা মাঝিও ওড়িশার আর এক পিছিয়ে পড়া কালাহান্ডি জেলার মানুষ। তাঁর স্ত্রী, আমাং দেই-এর মৃত্যু হয় যক্ষ্মায়। কালাহান্ডির ভবানীপাটনায় জেলা হাসপাতালে তাঁর স্ত্রীর মৃত্যুর পরে ২০১৬-র ২৪ অগস্ট দিনটা ইতিহাসে ঠাঁই পেয়েছে। না, উচ্চবর্ণের তৈরি করা উন্নয়নের ইতিহাস নয়, এ দেশের লক্ষ লক্ষ প্রান্তিক মানুষের না-জীবনের দিনলিপি‌ থেকে তিল তিল করে গড়ে তোলা ইতিহাস!

আমাং তো মারা গেলেন, কিন্তু কালাহান্ডির মেলঘার গ্রামে স্ত্রীর দেহ নিয়ে যাবেন কী করে দানা? ১০ কিলোমিটার দূরে তাঁর গ্রাম। হাসপাতাল থেকে সরকারি বা বেসরকারি কোনও শববাহী গাড়িই যেতে চাইল না আমাংকে নিয়ে। যাবে কী করে, সে গাড়ির ভাড়া কোথা থেকে দেবেন দানা মাঝি? অতএব, লহমায় তৈরি হয়ে যায় বঞ্চনার এক সড়ক, যে সড়ক ধরে স্ত্রীর দেহ কাপড়ে মুড়িয়ে, নাবালিকা মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে হাঁটতে শুরু করেন এক প্রান্তিক মানুষ, বেশি দূর তো নয়, মাত্র দশ কিলোমিটার! গোটা দেশ শিউরে উঠল সে দৃশ্য দেখে। এই ঘটনার মাসখানেক পরে সরকারি বিবেক জাগ্রত হয়ে ওঠে। যাতে আর কাউকে এ ভাবে মৃতদেহ বহন করতে না হয়, তার জন্য ওড়িশায় চালু হয় ‘মহাপ্রয়াণ’ প্রকল্প। নিখরচায় শববাহী গাড়ি পাওয়ার সুবিধা।

এ কাহিনির এখানেই শেষ হয়নি। ২০২১-এ দানা মাঝির সেই মেয়ে দশম শ্রেণির বোর্ডের পরীক্ষায় পাশ করে। সরকারি তরফে ও মূলস্রোতের মিডিয়ায় এই ‘সাফল্য’র ঘটনা রীতিমতো গুরুত্ব পায়। অথচ, এই প্রশ্নটা তোলা হয় না যে, দানা মাঝি ও তাঁর পরিবারের মতো আরও অজস্র প্রান্তিক পরিবার কেন যুগে যুগে এই বঞ্চনার শিকার হবে? দানা মাঝি ও জিতু মুন্ডাদের উপর সহানুভূতি বর্ষণ আসলে তো সেই মূল প্রশ্নের থেকে মুখ ফেরানো! কালাহান্ডির অপরিসীম দারিদ্র আর মৃত্যু মিছিলের পরিপ্রেক্ষিতে সাংবাদিক পি সাইনাথের বিশ্লেষণ ছিল, ওই জেলার অপরিসীম দারিদ্রের সঙ্গে পরিষেবা প্রদান সিস্টেমের দুর্নীতির যোগ রয়েছে।

লেখার শুরুতে বছর বারোর এক বালিকা, জামলো মকদমের কথা বলেছিলাম। তার বাড়ি ছত্তীসগঢ়ের বিজাপুর জেলায়। কিন্তু হা-হা দারিদ্রের পরিবার ছেড়ে, তার ছেলেবেলার জঙ্গল-নদী-লালচে মাটির দেশ ছেড়ে গ্রামেরই আরও কয়েক জনের সঙ্গে সেই মেয়ে গিয়েছিল সুদূর তেলঙ্গানায়, লঙ্কাখেতে কাজ করতে। এরই মধ্যে দেশে থাবা বসালো কোভিড। শুরু হল লকডাউন। ২০২০-র ২৪ মার্চ প্রথম দফা লকডাউনের সময়ে সে মেয়ে দলের বাকিদের সঙ্গে আধপেটা খেয়েও ধৈর্য ধরে অপেক্ষায় থেকেছে, ভেবেছে লকডাউন উঠলেই সে তার বাবা-মায়ের কাছে চলে যাবে। কিন্তু দ্বিতীয় দফায় আবার লকডাউনের মেয়াদ বাড়ার পরে জামলো ও তার গ্রামের লোকজন ঠিক করে, তারা হেঁটেই তেলঙ্গানার কান্নাইগুড়া থেকে বিজাপুরে ফিরবে। দূরত্ব? দেড়শো কিলোমিটার!

জাতীয় সড়ক ধরে যাওয়া চলবে না। আইনরক্ষকদের নজরদারি আছে। সুতরাং, জঙ্গলের পথ ধরে, হিংস্র পশু আর সরীসৃপদের ভয় উপেক্ষা করে দলটা হাঁটতে থাকে। সঙ্গে জল বা খাবার, তেমন কিছুই ছিল না তাদের। এক-আধ ঘণ্টা নয়, টানা তিন দিন নাগাড়ে হাঁটার পরে ছোট্ট জামলো আর পারেনি, পেটে অসম্ভব যন্ত্রণা নিয়ে লুটিয়ে পড়েছিল পথের ধারেই, আর ওঠেনি। চিকিৎসকেরা তার দেহ পরীক্ষার পরে জানিয়েছিলেন, নির্জলা হয়ে গিয়েছিল একরত্তির দেহ। সে মেয়ে কিন্তু মরে গিয়ে রোজগার করেছিল অনেক! ছত্তীসগঢ়ের তৎকালীন কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী ভূপেশ বাঘেল ঘোষণা করেছিলেন, জামলোর পরিবার পাবে এক লক্ষ টাকা। যার বাবা-মা জঙ্গলের কাঠ-পাতা কুড়িয়ে হাটে বেচে সংসার চালান, তাঁরা পাবেন এক লক্ষ টাকা! বাবা-মায়ের একমাত্র মেয়েটা জানত, কত কষ্ট করে তাকে বড় করছেন তাঁরা, তাই তো সামান্য কিছু রোজগারের আশায় সে হয়ে গিয়েছিল পরিযায়ী শ্রমিক! কারা তার মতো নাবালকদের ভিন রাজ্যে পাঠায়, তা জানতে নাকি মামলাও রুজু হয়েছিল! জামলোর ঘটনার আগে কেউ কিছু জানতেনই না!

‘সবকা সাথ সবকা বিকাশ’-এর এই মরসুমেও তাই ওঁরা হাঁটতে থাকেন অনন্তের পথে। দিদির কঙ্কাল কাঁধে নিয়ে জিতু মুন্ডা, স্ত্রীর দেহ নিয়ে দানা মাঝি, দেড়শো কিলোমিটার পথ হাঁটতে হাঁটতে অনন্ত বিশ্রামে চলে যাওয়া বারো বছরের বালিকা জামলো মকদম।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Bank Keonjhar

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy