রেললাইনের ধারে ঘন কুয়াশা। ধোঁয়াটে সকালের নিস্তব্ধতায় বছর বাষট্টির দুর্জন মাঝি দাঁড়িয়ে ছিলেন লাইনের পাশে। তাঁকে ব্লক অফিসে শুনানিতে যেতে বলা হয়েছিল। হাঁটু ব্যথা, চোখ ঝাপসা। টোটো মেলেনি, দেরি হয়ে যাচ্ছে। কেবল দীর্ঘ অপেক্ষা। তার পর— রেললাইনে পড়ে রইল ক্ষতবিক্ষত দেহ। সরকারি নথিতে লেখা রইল, ‘অনুপস্থিত’। এই দৃশ্য আমাদের সময়ের নির্মম প্রতীক। কেমন সেই রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে শুনানিতে সময়ে না পৌঁছলেই এক জন নাগরিকের অস্তিত্ব বিপন্ন? কোন গণতন্ত্রে নাগরিককে বার বার তাঁর নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণে জীবন-মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়?
নাগরিকের মৌলিক পরিচয় ভোটাধিকারে চিহ্নিত। এ অধিকার কারও দান নয়, রাষ্ট্র ও নাগরিকের বিশ্বাসের একটি চুক্তি। এতকাল তার নিয়ম ছিল সহজ: নাগরিককে স্বতঃসিদ্ধ ভাবে অন্তর্ভুক্ত ধরা হবে, আর রাষ্ট্র সন্দেহভাজন ব্যতিক্রম খুঁজবে। এসআইআর এই নীতি উল্টে দিয়েছে। নাগরিক এখন আর স্বতঃসিদ্ধ নন; বরং প্রথমেই ‘সন্দেহভাজন’। এই সন্দেহের দর্শনেই লুকিয়ে গভীর নৈতিক বিপর্যয়। নাগরিককে গোড়া থেকেই সন্দেহ করা: প্রমাণ করো তুমি নাগরিক, প্রমাণ করো তুমি মৃত নও, প্রমাণ করো তেইশ বছর আগের তালিকায় তোমার নাম ছিল। এই যান্ত্রিক যুক্তিতে মানুষ হয়ে ওঠে কেস, ফাইল, এন্ট্রি। নাগরিকত্বও হয়ে উঠছে যাচাইযোগ্য, শর্তাধীন এক ‘স্টেটাস’ মাত্র।
পশ্চিমবঙ্গ ও মধ্যপ্রদেশে নতুন সফটওয়্যারে সাড়ে তিন কোটিরও বেশি ভোটার ‘সন্দেহভাজন’ রূপে চিহ্নিত। ত্রুটিপূর্ণ ডিজিটাইজ়েশন ও সফটওয়্যারের অপরীক্ষিত অ্যালগরিদমের জেরে বিপুলসংখ্যক প্রকৃত ভোটারও সন্দেহের তালিকায়। নাগরিকের উপর এমন সন্দেহের কালিমা লেপন গণতন্ত্রে অভূতপূর্ব। রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে বিশ্বাসের চুক্তি ভেঙে গিয়েছে, রাষ্ট্র নাগরিককে দেখছে সম্ভাব্য ঝুঁকি বা সমস্যা হিসেবে। বিশ্ব জুড়েই বদলাচ্ছে রাষ্ট্র-নাগরিক সম্পর্কের ভাষা। ইউরোপের বিমানবন্দরে-সীমান্তে সাধারণ ভ্রমণকারীও সম্ভাব্য নিরাপত্তা-ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত। ব্রিটেনের ‘হোস্টাইল এনভায়রনমেন্ট’ নীতিতে বৈধ বাসিন্দাদের বার বার বৈধতা প্রমাণ করতে হয়েছে; নইলে চাকরি, বাড়ি, চিকিৎসা মিলবে না। নেদারল্যান্ডসে ‘এসওয়াইআরআই’ অ্যালগরিদম ব্যবহার করে কোনও অভিযোগ ছাড়াই গোপনে দরিদ্র পাড়াগুলোয় নজরদারি চালানো হয়। সন্দেহই এখন শাসনের নিয়ম।
ভারতের প্রেক্ষাপটে এই সন্দেহ-দর্শন আরও ভয়াবহ। এখানে নাগরিক পরিচয় গড়ে ওঠে বসবাস, শ্রম, ভোট, সামাজিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে। মানুষের কাছে নাগরিকত্ব মানে বহু বছর ধরে ভোট দেওয়া, কর দেওয়া, সন্তান বড় করে তোলা, একই জায়গায় বার্ধক্যে পৌঁছনো— এই সব মিলিয়েই তাঁর নাগরিক পরিচয়। ডেটাবেস-নির্ভর অ্যালগরিদম-যুক্তিতে এই জীবনঘনিষ্ঠ বাস্তবতা ‘ত্রুটি’ হিসেবে গণ্য হয়। জীবন তখন আর অভিজ্ঞতা নয়, হাজিরার রেকর্ড। যে রেকর্ডে নাম ওঠে না, সে মানুষ যেন আদৌ ছিলই না।
ভোটারতালিকা শুদ্ধ করা জরুরি, ভুয়ো নাম বাদ দেওয়া দরকার। কিন্তু গণতন্ত্রের নৈতিক মানদণ্ড বলে, কিছু ভুল নাম তালিকায় থেকে যাওয়া বরং সহনীয়; প্রকৃত নাগরিকের নাম কাটা নয়। এখানেই ভয়ঙ্কর বাঁক নিয়েছে আধুনিক রাষ্ট্রনীতি। বলা হচ্ছে: আগে সবাইকে সন্দেহ করো, পরে ভুল ঠিক করা যাবে। সেই ‘পরে’ আর আসে না, এক বার সন্দেহের দাগ লাগলে নাগরিককেই আজীবন সন্দেহের বোঝা বইতে হয়। প্রযুক্তির চোখে এই সন্দেহ আরও নির্দয়। সেখানে নাগরিক কোনও জীবন্ত ব্যক্তি নন, শুধু এক ‘এন্ট্রি’। যন্ত্রই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, রাষ্ট্রের নৈতিক দায়ও তাই অদৃশ্য।
ভোটারতালিকা সংশোধন প্রক্রিয়াতেও একদা এক নৈতিক-মানবিক বোধ ছিল: যুক্তিসঙ্গত সময় দেওয়া, মানবিক ভাবে শুনানি করা, নাগরিকের বাস্তবকে গুরুত্ব দেওয়া ইত্যাদি। রাষ্ট্রের নয়া সন্দেহ-দর্শনে সেই বোধ মুছে যাচ্ছে। অধিকার তখন আর নাগরিকের প্রাপ্য সম্মান নয়, যেন প্রশাসনের দয়ার দান। সবচেয়ে গভীর পরিবর্তনটি ঘটছে রাষ্ট্র ও নাগরিকের কথোপকথনের ভাষায়। আগে রাষ্ট্র বলত: তুমি নাগরিক, এ তোমার অধিকার। এখন সে বলছে: প্রমাণ করো তুমি নাগরিক। যে সন্দেহ একদা ব্যতিক্রম ছিল, আজ তা নিয়ম; আর নিয়ম হয়ে গেলেই ক্রমে তা রাষ্ট্রনীতিও। এ এমন এক ভবিষ্যতের শঙ্কা জাগায় যেখানে নাগরিকত্ব ক্রমে পুনরায় যাচাইযোগ্য, শর্তাধীন, যে কোনও সময় বাতিলযোগ্য এক তকমায় পরিণত হবে। সেখানে নাগরিকের জীবন নেমে আসবে প্রশাসনিক ডেটার স্তরে, চাইলে যে কোনও সময় তা মুছে ফেলা যাবে। আজ এক জন নাগরিককে নিজ অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য যে ভাবে দৌড়ঝাঁপ করতে হচ্ছে, তা এক ভয়ঙ্কর দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে: ভবিষ্যতে হয়তো জন্মসূত্রে পাওয়া নাগরিকত্বকেও বার বার এমন যাচাই-নথিভুক্তকরণের মুখে পড়তে হবে।
যে রাষ্ট্র নাগরিককে আগে থেকেই সন্দেহের চোখে দেখে, এক দিন তাকেও নাগরিকেরা বিশ্বাস করতে পারবে না। তখন ইভিএম, তালিকা, সফটওয়্যার সব থাকবে, গণতন্ত্রের আত্মা থাকবে না। রেললাইনের ধারে পড়ে থাকা দেহ আর খবর হয়ে উঠবে না; নাগরিকের এ ভাবে হারিয়ে যাওয়া স্বাভাবিক প্রশাসনিক ঘটনায় পরিণত হবে। রাষ্ট্রই নাগরিকের চোখে হয়ে উঠবে ‘অনুপস্থিত’।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)