E-Paper

বিনাশ নয়, পরস্পরের ভাবগ্রহণ

বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে যে সব ভ্রান্ত ধারণা ও বুজরুকি, সে-সব ভেঙে দিতে পিছপা হননি এই বীর সন্ন্যাসী। গোঁড়া হিন্দুদের অমানবিক কাজকর্মকে বিদ্রুপ করতে ছাড়েননি। দুর্ভিক্ষ-পীড়িত মানুষদের সাহায্য না করে, গোমাতাদের রক্ষা করতে গোরক্ষিণী সভার লোকেরা তাঁর কাছে সাহায্য চাইতে এলে ভর্ৎসনা করেছেন।

অরুণ মালাকার

শেষ আপডেট: ১০ জানুয়ারি ২০২৬ ০৭:৪৩

রোম্যাঁ রোল্যাঁকে লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, “যদি ভারতবর্ষকে জানতে চাও, বিবেকানন্দকে পড়ো। তার মধ্যে সব কিছু ইতিবাচক, নেতিবাচক কিছু নেই।” স্বামী বিবেকানন্দের লেখা, চিঠিপত্র পড়ে পরবর্তী কালে রোম্যাঁ রোল্যাঁর অনুভূতি, “ত্রিশ বছর আগে স্বামী বিবেকানন্দ যা বলে গেছেন, আজও সেই সব কথা পড়তে পড়তে আমার সারা শরীর রোমাঞ্চিত হয়ে ওঠে, এক বৈদ্যুতিক শিহরন অনুভব করি।” ভগিনী নিবেদিতার চোখে বিবেকানন্দ ‘ঘনীভূত ভারত’, আধুনিক ভারতের জীবনবেদ। কী চেয়েছিলেন এই সন্ন্যাসী, কেমন করে গড়তে চেয়েছিলেন এ দেশকে?

শ্রীরামকৃষ্ণের ‘খাপখোলা তরোয়াল’ চেহারায় যেমন, চরিত্রেও তেমনই দৃপ্ত। পরাধীন ভারতে মানুষের মধ্যে হীনম্মন্যতা, দাসসুলভ মনোবৃত্তি, আলস্য ঝেড়ে উঠিয়ে ‘জাগ্ৰত’ ও ‘নিবোধত’-এর পর্যায়ে উন্নীত করতে বলিষ্ঠতার বীজ বুনেছিলেন তাঁর বাচনে, লেখায়। এই প্রথম কোনও ভারতীয় সন্ন্যাসীকে আমরা দেখলাম, যাঁর ধ্যানের বিষয় তাঁর স্বদেশ। ভারত তাঁর কাছে শুধু জন্মভূমি নয়, পুণ্যভূমি। মানুষের মধ্যে বিদ্যমান সামর্থ্য শুধু নিজ স্বার্থের জন্য নয়, অপরের কল্যাণের জন্য না বিলিয়ে দিলে তার কোনও মূল্য নেই— তাঁর গুরু তাঁকে বুঝিয়েছিলেন। বহুমুখী প্রতিভার আধার নরেন্দ্রনাথ তাঁর কাছে নির্বিকল্প সমাধি চাইলে তিনি তিরস্কার করেছিলেন, “তুই শুধু নিজের মুক্তি চাস?” কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী, সারা ভারত ঘুরে বিবেকানন্দ প্রত্যক্ষ করেছেন মানুষের মধ্যে দেবত্বের রূপ, তাঁদের দুঃখ-যন্ত্রণাও। বুঝেছেন, শুধুই ‘আত্মমুক্তি’ লক্ষ্য নয়, চাই ‘জগদ্ধিতায়’ও। মানুষের দুর্দশা দেখে তাঁর হৃদয় কেঁদেছে, অন্য দিকে তাদের পরানুকরণ, দাস-মনোভাবও তাঁর মোটেই ভাল লাগেনি।

বিবেকানন্দের পত্রাবলি নেহাত চিঠিচাপাটি নয়, তেজস্ক্রিয় ক্ষমতার বারুদ। ছত্রে-ছত্রে, পরতে পরতে তা স-তেজ। চিঠিতে লিখছেন, “‘অমুক’ এত ভুগছে কেন? ‘দীনাহীনা’ ভাবের জ্বালায়।... ঘণ্টাভর বসে ভাবতে বলো— ‘আমি আত্মা’ আমাতে আবার রোগ কী? সব চলে যাবে।” মানুষের আত্মবিশ্বাস জাগ্ৰত করতে এত কালের বেদান্তের কাঠিন্য ভেঙে তার নির্যাসটুকু পরিবেশন করলেন সহজবোধ্য ভাষায়। বোঝালেন, আস্তিক হওয়ার প্রথম সোপান, নিজের উপর বিশ্বাস। প্রত্যেক মানুষের মধ্যে অনন্ত সম্ভাবনার বীজ লুকিয়ে আছে, তার প্রকাশ ঘটবে আমাদের প্রতিটি স্বার্থহীন কর্মে।

বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে যে সব ভ্রান্ত ধারণা ও বুজরুকি, সে-সব ভেঙে দিতে পিছপা হননি এই বীর সন্ন্যাসী। গোঁড়া হিন্দুদের অমানবিক কাজকর্মকে বিদ্রুপ করতে ছাড়েননি। দুর্ভিক্ষ-পীড়িত মানুষদের সাহায্য না করে, গোমাতাদের রক্ষা করতে গোরক্ষিণী সভার লোকেরা তাঁর কাছে সাহায্য চাইতে এলে ভর্ৎসনা করেছেন। শিকাগো বক্তৃতায় কুয়োর ব্যাঙ ও সাগরের ব্যাঙের গল্প শুনিয়ে প্রতিটি ধর্মের সঙ্কীর্ণ মনোভাব ও অন্ধবিশ্বাসের পাঁচিল ভেঙে দেন তিনি। বিবেকানন্দের ধর্মে কোনও বর্জন, অস্বীকার বা অবহেলা নেই, আছে গ্রহণ, সহিষ্ণুতা। ধর্মমহাসভার মঞ্চে বলেছিলেন, প্রত্যেক ধর্মের উদ্দেশ্য হবে— বিবাদ নয়, সহায়তা; বিনাশ নয়, পরস্পরের ভাবগ্রহণ; মতবিরোধ নয়, সমন্বয় ও শান্তি।” এক মুসলমান বন্ধুকে লিখছেন, “আমরা মানুষকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যেতে চাই যেখানে বেদও নেই, বাইবেল বা কোরানও নেই। তবুও এই আদর্শে পৌঁছতে হলে বেদ, বাইবেল ও কোরানের সামঞ্জস্য প্রয়োজন।”

সমস্যাপীড়িত দেশবাসীর মুক্তিই ছিল তাঁর ঈশ্বরোপাসনা। ১৮৯৭-এ বলেছিলেন, আগামী পঞ্চাশ বছর ভারতই হোক উপাস্য দেবতা। মূর্খ, দরিদ্র, চণ্ডাল, ব্রাহ্মণ, প্রত্যেক ভারতবাসী তাঁর ভাই, তাঁর প্রাণ। শিকাগো ধর্মমহাসভার প্রথম দিনেই তাঁর বক্তৃতা বিশ্ববাসীর মন জয় করে নিয়েছিল। রাতে এক ধনীগৃহে রাজকীয় বিলাসে থাকার সুযোগ ঘটে স্বামীজির। কিন্তু দেশের মানুষের দুঃখ-দৈন্যের কথা ভেবে সারা রাত তিনি ঘুমোতে পারেননি। পরাধীন ভারতে মনুষ্যত্বের অবমাননা, নিরন্ন মানুষের যন্ত্রণা তাঁর নিদ্রা হরণ করেছিল। সেবাধর্মের সর্বোচ্চ মহিমা প্রতিষ্ঠা করে স্বামী বিবেকানন্দ বুঝিয়েছেন, নিজের কর্মকে শুদ্ধ করে পরহিতে জীবনপাত করতে হবে। জীবকে শিবজ্ঞানে সেবা করতে হবে। আমরা যে যেখানে যে কাজই করি না কেন, প্রতিটি কর্মই পূজারূপে মানব-ঈশ্বরের চরণে অর্পিত হবে।

এই মানুষকে বাঁচানোর ভার স্বামীজি নিয়েছিলেন। অত্যাচারিত, বঞ্চিতকে দেবতার সম্মান দিয়ে, তাদের যন্ত্রণাকে নিজের দায় হিসেবে কাঁধে তুলে নিয়ে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাঁরই নির্দেশিত পথে আজও রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসীরা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়ান, গ্রামে গ্রামে গিয়ে সাধারণ মানুষকে শেখান স্বাবলম্বনের পাঠ। চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল, শিক্ষার জন্য স্কুল-কলেজ পরিচালনা করেন, বহু মানুষের সেবা ও শিক্ষা লাভের সুযোগ সেখানে। এই সব কিছুরও পরে, বিবেকানন্দের প্রকৃত শিক্ষা নিজেকে জানার শিক্ষা। পৃথিবী জুড়ে আজ ভেদাভেদ, বিদ্বেষের বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়ছে। তা থেকে পরিত্রাণের পথ দেখায় তাঁর বিশ্বজনীন সৌভ্রাত্রের আদর্শ। প্রতিদিনের জীবনচর্যায় তা দিশারি।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

vivekananda Hinduism Humanism

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy