কিছু দিন আগে নেটো মহাসচিব মার্ক রুটে-র উপর বেজায় চটেছিলেন ইউরোপীয় রাষ্ট্রনেতারা। এক আন্তর্জাতিক সভায় মহাসচিব রুটে জোর গলায় দাবি করেন, ইউরোপ যদি মনে করে যে তারা আমেরিকাকে ছাড়া নিজেদের রক্ষা করতে সক্ষম, তা হলে তারা ‘স্বপ্ন দেখছে’। উক্তিটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ ছিল যে-হেতু তার কিছু দিন আগে নেটোরই অংশীদার ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড ছিনিয়ে নেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পরে গ্রিনল্যান্ড দখলের ভাবনা থেকে ট্রাম্প সরে আসায় কিছুটা স্বস্তি মিললেও, ঘটনাটি আরও এক বার উস্কে দিয়েছে ইউরোপের প্রতিরক্ষার বিষয়টিকে। তার উপরে নেটো মহাসচিবের উক্তি তাতে আরও ঘৃতাহুতি দিল। ফলে মহাদেশের রাষ্ট্রনেতারা এখন মহা উদ্বিগ্ন— রাশিয়া যদি কোনও দিন সত্যিই অবশিষ্ট ইউরোপের দিকে হাত বাড়ায়, ইউক্রেনের মতো, তবে ইউরোপীয়রা কি আমেরিকাকে ছাড়া নিজেদের রক্ষা করতে পারবে? মোদ্দা কথা, ইউরোপে মাঝেমধ্যেই যে ‘স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি’ বা ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’-এর ভাবনা মাথাচাড়া দেয়, তা পেতে কি তারা আদৌ সক্ষম? প্রসঙ্গটি মহাদেশটিকে একটি কঠিন সত্যের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, যা বহু বছর ধরে তারা এড়িয়ে এসেছে।
শোনা যায়, সাম্প্রতিক কালে বারাক ওবামা ও তাঁর একাধিক পূর্বসূরি দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উপর ইউরোপীয়দের অতিরিক্ত নির্ভরতা নিয়ে অভিযোগ করে এসেছেন। বহু বার প্রতিরক্ষায় আরও বেশি খরচ করতে বলা হয়েছে ইউরোপীয়দের। কিন্তু পরে আমেরিকার শীর্ষনেতৃত্ব পিছিয়ে এসেছে এই ভাবনা থেকে যে, ইউরোপের প্রতিরক্ষায় খরচ কমানোর বিষয়টির বারংবার উত্থাপন এমন একটি জোটকে দুর্বল করে দিতে পারে, যা আমেরিকার বিশ্ব নেতৃত্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আর ইউরোপীয়দের যুক্তি? তাদের মতে, ৯/১১-র পর আফগানিস্তানে সৈন্য মোতায়েন করে এবং বিদেশে আমেরিকার অভিযানগুলিতে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে আমেরিকার দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা ‘অর্জন’ করেছে তারা।
সন্দেহ নেই, উদ্যোগগুলি গুরুত্বপূর্ণ। তবু আঞ্চলিক প্রতিরক্ষায় বিনিয়োগের বিকল্প হিসেবে ওয়াশিংটনের সহযোগিতার প্রত্যাশাটিকেই ধরে রাখা হবে কি? ট্রাম্প প্রশ্নটাকে উল্টে দিয়ে বলতে চান— আজ আমেরিকা যদি সমস্যায় পড়ে তা হলে এই ‘মিত্র’রা কি তার পাশে থাকবে?
আসলে, গত কয়েক দশক ধরে, ইউরোপের সরকারগুলি আমেরিকার সুরক্ষাকে অংশীদারি নয়, বরং অধিকার হিসাবে মনে করে এসেছে। আগে আমেরিকা যখন প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে কোটি কোটি ডলার ঢেলেছে, তখন এদের অনেকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছে সামাজিক কর্মসূচি, প্রাথমিক অবসর এবং অভিবাসন নীতিকে। এই নির্ভরতা ছড়িয়ে আছে তাদের সামরিক বিষয়ের বাইরে, কূটনৈতিক বিচার, এমনকি রাজনৈতিক ভাবনাতেও। সেই কারণে এখনও পর্যন্ত ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ করার সময়, নিজেদের মধ্যেই নানা আশঙ্কায় তারা গ্রস্ত হয়, এবং বার বার থমকে যায় ইউরোপের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের উদ্যোগ।
বাস্তবিকই আমেরিকা যদি আজ ইউরোপের উপর থেকে তার নিরাপত্তার ছত্রছায়া সরিয়ে নেয়, ইউরোপ কি পারবে নিজেকে রক্ষা করতে? উত্তর সম্ভবত— না। অনেকগুলি কারণ এর পিছনে। যেমন, গোয়েন্দা তথ্য, নজরদারি, যুদ্ধকালীন যোগাযোগব্যবস্থা ও ক্লাউড কম্পিউটিং, ভারী পরিবহণ বিমান, শত্রু বিমান প্রতিরক্ষা দমন— এমন নানা ক্ষেত্রেই এখনও ওয়াশিংটনের উপরেই নির্ভরশীল ইউরোপীয়রা। শুধু তা-ই নয়, নির্ভুল আঘাত হানার মতো দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রও বেশি নেই তাদের কাছে। গত বছর ‘ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ়’ তাদের এক প্রতিবেদনে অনুমান করেছিল যে, এককালীন সামরিক সরঞ্জাম কেনার খরচ এবং সরঞ্জামের জন্য ২৫ বছরের জীবনচক্র ধরে এগোলে, আমেরিকার অবদান সরাসরি বদলে ফেলতে ইউরোপীয়দের প্রায় ১ লক্ষ কোটি আমেরিকান ডলার খরচ পড়বে। তা ছাড়া, গুপ্তচর উপগ্রহের মতো কিছু ক্ষেত্রে আমেরিকার শূন্যস্থান পূরণ করতে বছর দশেক বা তারও বেশি সময় লাগবে।
তার উপরে রয়েছে পারমাণবিক সক্ষমতার বিষয়টি, এই মুহূর্তে যা রয়েছে ইউরোপের মাত্র দু’টি দেশে— ব্রিটেন ও ফ্রান্স। সমস্যা হল, এই ক্ষমতায় আজ রাশিয়া (যার পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা ৫,৫০০-এর কাছাকাছি) ব্রিটেন (২০০-র বেশি) ও ফ্রান্সের (প্রায় ৩০০) থেকে অনেক এগিয়ে। সে ক্ষেত্রে মস্কোর সঙ্গে পাল্লা দিতে হলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে সংখ্যায় এবং পরিধিতে এই দুই দেশের পারমাণবিক সক্ষমতাকে আরও বাড়াতে হবে।
তাই, ইউরোপের সামনে এখন কঠিন প্রশ্ন— সে কি এখনও আমেরিকার শরণাপন্ন থাকবে, না কি নিজের মতো স্বাধীন ভাবে এগোবে? এই প্রশ্নের উত্তরের প্রথম ও প্রধান শর্ত হল, আমেরিকার উপর মানসিক নির্ভরতা থেকে মুক্তি। নিজেদের সুরক্ষা ও ভবিষ্যতের দায়িত্ব মহাদেশের নেতাদের নিজেদের হাতেই নেওয়ার আত্মপ্রত্যয়। সেটা কিন্তু বেশ কম— এখনও পর্যন্ত।
অতএব, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য, আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোরদার করতে অতি সম্প্রতি ফ্রান্স, জার্মানি, ব্রিটেন, পোল্যান্ড এবং ইটালি কম খরচের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং স্বায়ত্তশাসিত ড্রোন তৈরির জন্য যৌথ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। গত কয়েক দশক ধরে শান্তির সুফল ভোগ করেছে ইউরোপ— পরনির্ভরতার আরাম উপভোগ করেছে। এ বার কি তবে, ‘উত্তিষ্ঠত, জাগ্রত’?
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)