E-Paper

নিঃস্বতার মুখোমুখি, এখনই

রাষ্ট্রপুঞ্জ নতুন একখানা রিপোর্ট বানিয়েছে জল নিয়ে। নামটাও দিয়েছে খাসা, ‘জল দেউলিয়া’ পৃথিবী। জল সমস্যা নয়, জলসঙ্কটও নয়, একেবারে জল দেউলিয়া। ঠিক কী কারণে ‘জল দেউলিয়া’ শব্দটি এল, দেখে নেওয়া যাক।

গোপা সামন্ত

শেষ আপডেট: ০৯ মার্চ ২০২৬ ০৪:৫৮

রাষ্ট্রপুঞ্জ আমাদের প্রায়ই সাবধান করে, “থামো, থামো, বিপদ ঘনাচ্ছে, আর বেশি দিন নয়, এ ভাবে চলা যায় না।” কিন্তু কে শোনে সে সব কথা! না শোনে দেশগুলির সরকার, না শোনে বাজার, আর না শোনে মানুষ। সবাই যেন ধ্বংসকে ত্বরান্বিত করার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। রাষ্ট্রপুঞ্জ নতুন নতুন শব্দ আনে আমাদের ভয় দেখানোর জন্য। কিছুই হবে না জেনেও তাদের এই প্রচেষ্টা প্রশংসনীয়। পরে অন্তত আমরা বলতে পারব না, কই বলা হয়নি তো।

রাষ্ট্রপুঞ্জ নতুন একখানা রিপোর্ট বানিয়েছে জল নিয়ে। নামটাও দিয়েছে খাসা, ‘জল দেউলিয়া’ পৃথিবী। জল সমস্যা নয়, জলসঙ্কটও নয়, একেবারে জল দেউলিয়া। ঠিক কী কারণে ‘জল দেউলিয়া’ শব্দটি এল, দেখে নেওয়া যাক। বিশ্বের অসংখ্য নদী অববাহিকা, জলাধার, জলাভূমি, হিমবাহ এবং অন্য দীর্ঘমেয়াদি পুনর্নবীকরণযোগ্য জলপ্রবাহগুলি তাদের সর্বনিম্ন ক্ষয়সীমা অতিক্রম করে গিয়েছে। তাদের পুনরুদ্ধার করে জলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আর তেমন কোনও সম্ভাবনা নেই। তাই এল এই শব্দ। শুধু শব্দ নয়, এটিকে মৃত্যুঘণ্টা বললেও ভুল বলা হয় না। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছে, ফেরার তেমন রাস্তা নেই।

ফিরতে চাইছেই বা কে? “আমার তো আছে। যার নেই সে ভাববে, আমি কেন ভাবব?”— এটাই জনগণের মনোভাব। বিশ্বে প্রায় ২২০ কোটি মানুষের নিরাপদ পানীয় জল নেই এবং ৪০০ কোটি মানুষ ন্যূনতম জলের জন্য বছরে অন্তত এক মাস প্রাণপণ লড়াই করেন। কিন্তু তাঁদের একটা বড় অংশ বছরে প্রায় ছ’মাসই জলের জন্য লড়েন। বিশ্বের জনসংখ্যার ৭৫ শতাংশ বাস করেন সেই সব দেশে যেগুলিকে বলা যায় জল-নিরাপত্তাহীন বা গুরুতর ভাবে জল-নিরাপত্তাহীন দেশ। দেশগুলি আছে আফ্রিকা, এশিয়া, লাতিন আমেরিকায়, যেখানে অদ্ভুত ভাবে গরিব মানুষের অনুপাতটাও বেশি।

ভূপৃষ্ঠের জলস্তর ব্যাপক হারে কমে যাচ্ছে। অনেক নদী জল নিয়ে সাগরে পৌঁছতে পারছে না। অনেক নদী আবার বছরের বেশির ভাগ সময় ন্যূনতম প্রয়োজনীয় প্রবাহও বজায় রাখতে পারছে না। গত তিন দশকে বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি বৃহৎ হ্রদ আয়তনে বিপুল পরিমাণে কমেছে, যাদের উপর বিশ্বের জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশের জল নিরাপত্তা নির্ভর করে। গত পাঁচ দশকে প্রায় ৪১ কোটি হেক্টর জলাভূমি হারিয়েছে, যা প্রায় সমগ্র ইউরোপীয় ইউনিয়নের এলাকার সমান। জলের সরবরাহ তো বটেই, তার উপরে যদি এর আর্থিক হিসাব ধরা হয়, দেখা যাবে এই জলাভূমি থেকে বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতির পরিমাণ ৫.১ লক্ষ কোটি ডলারেরও বেশি, যা বিশ্বের প্রায় ১৩৫টি দরিদ্র দেশের সম্মিলিত বার্ষিক জিডিপির সমান।

অন্য দিকে, ভূপৃষ্ঠের জলস্তর যত কমছে, ভূগর্ভস্থ জলের ব্যবহার তত বাড়ছে। এখন বিশ্বব্যাপী গার্হস্থ জল ব্যবহারের প্রায় ৫০ শতাংশ এবং সেচের প্রায় ৪০ শতাংশ ভূগর্ভস্থ জল থেকে আসে। সেই অতিরিক্ত প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে ভূগর্ভস্থ জলস্তর খুব দ্রুত গতিতে নীচে নামছে। বিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশ প্রধান জলস্তর দীর্ঘমেয়াদি হ্রাসের প্রবণতার কবলে। শহর বাড়ছে, শহরবাসী বাড়ছে, তাদের জন-প্রতি জলের ব্যবহার বাড়ছে। আর সে সবই আসছে ভূগর্ভস্থ জলস্তর থেকে।

উল্টো দিকে, ওই জলস্তর আর ভরাট হচ্ছে না, কারণ আমরা তার চিন্তা করিনি বা কোনও উপায় রাখিনি। সব জায়গার ভূমিভাগ থেকে ভূগর্ভস্থ জলস্তর সিঞ্চিত হয় না। তা হয় কেবল অ্যাকুইফারের প্রান্তবর্তী ভূপৃষ্ঠে উন্মুক্ত অংশ দিয়ে। সেই সব জায়গাকে ভূতাত্ত্বিক মানচিত্রের সাহায্যে চিহ্নিত করে জল নীচে নামার ব্যবস্থা না-করেই সেখানে হয়তো বিশাল আয়তনের শহর গড়ে তোলা হয়েছে। ভূগর্ভস্থ জল অতিরিক্ত পরিমাণে তুলে নেওয়ার ফলে ফাঁকা হয়ে গিয়ে ভূগর্ভে জমির অবনমন ঘটেছে। বিশ্বের মোট ভূভাগের প্রায় ৫ শতাংশ এলাকায় জমির অবনমন ঘটেছে। ফলে সেই সব এলাকার স্থায়ী ভাবে জল সংরক্ষণ ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। তার চেয়েও বড় কথা, এই অবনমন বেশি ঘটছে শহর এলাকায়, যেখানে প্রায় ২০০ কোটি মানুষ বাস করেন। সেখানে সামান্যতম ভূকম্পেও বহুতল বাড়িগুলির ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা প্রবল। উপকূল অঞ্চলের শহরগুলিতে বেশি করে ভৌমজল তুলে নেওয়ার ফলে ভৌমজল পুরোপুরি লবণাক্ত হয়ে গিয়ে ব্যবহারের অনুপযুক্ত হয়ে যাচ্ছে।

প্রতিটি দেশের যেমন একটা বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় থাকে আপৎকালীন অবস্থার মোকাবিলা করার জন্য, জলের ক্ষেত্রে সেই সঞ্চয় হল হিমমণ্ডল। কিন্তু সেই হিমমণ্ডলের অবস্থাও তথৈবচ। পৃথিবীর হিমমণ্ডলকে বলা হয় জলের টাওয়ার। তারা শীতের জলকে বরফের মধ্য দিয়ে সঞ্চয় করে এবং গরমে যখন জলের প্রয়োজন, তখন বরফ গলে সেই জলের জোগান দেয়। এখন সেই পরিস্থিতিও বদলে গেছে ব্যাপক হারে। হিমবাহ গলছে এবং ছোট হচ্ছে খুব দ্রুত হারে, বিশেষ করে ক্রান্তীয় অঞ্চলে, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উষ্ণতা বৃদ্ধির হার খুব বেশি। গত পাঁচ দশকে বিশ্বের হিমবাহগুলি তাদের ৩০ শতাংশ ভর বা আয়তন হারিয়ে ফেলেছে, যার একটা বিপুল অংশ নিম্ন এবং মধ্য-অক্ষাংশের পর্বতশ্রেণিতে অবস্থিত। আমাদের হিমালয় পর্বতও তার মধ্যেই পড়ে। এর প্রভাবে পার্বত্য অঞ্চলে গার্হস্থ জলের সরবরাহ, কৃষিব্যবস্থা এবং জলবিদ্যুৎ উৎপাদন প্রভৃতি জলনির্ভর কাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের জল নিরাপত্তা বিনষ্ট হচ্ছে। হিমমণ্ডলের আর একটি অদৃশ্য ক্ষতি হল দ্রুত গতিতে পারমাফ্রস্ট অবস্থার গলন। পারমাফ্রস্ট হল, ভূত্বক সংলগ্ন স্তর, যা দীর্ঘ সময় বরফ অবস্থায় রয়েছে। সেখানেও ছিল বিপুল জলের সংগ্রহ।

জল দেউলিয়া অবস্থার পিছনে কৃষিকাজের ভূমিকাও কোনও অংশে কম নয়। বিশ্বের মিষ্টি জলের উত্তোলনের প্রায় ৭০ শতাংশ কৃষিকাজে ব্যবহৃত হয়। প্রতি বছর বিপুল হারে সেচযোগ্য ফসলি জমি চলে যাচ্ছে জলের অভাবে চাষ-অযোগ্যের তালিকায়। সর্বোপরি, জলের গুণগত মান নষ্ট হওয়ার ফলে জল থাকলেও যে তা ব্যবহার করা যাবে, এমন নয়। ব্যবহারযোগ্য জলের ভিত্তি ক্রমাগত সঙ্কুচিত হচ্ছে। তাই ব্যবহারযোগ্য জলের সঙ্কটকে জলের পরিসংখ্যান থেকে ঠিক ভাবে বোঝা যাবে না। খনি, শিল্প এবং সেখান থেকে নিঃসৃত বর্জ্য পদার্থের ফলে বহু জায়গায় ভূপৃষ্ঠস্থ এবং ভূগর্ভস্থ জল হয় শুকিয়ে যাচ্ছে, নয়তো ব্যবহারের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ছে। তার উপর রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের মার। অথচ, এত কিছু সত্ত্বেও আমরা হাঁটছি ঠিক উল্টো দিকে। জলাভূমি ধ্বংস করার খেলায় মেতেছি উন্নয়নের দোহাই দিয়ে। বাজার অর্থনীতি যবে থেকে জলাভূমিকেও জমি দেখতে শিখেছে, তবে থেকেই জলের অন্তর্জলি যাত্রা শুরু। যেখানে জলের প্রচণ্ড সঙ্কট, সেখানেও ডিজিটাল শিল্পের ডেটার জন্য জল খরচ করা হচ্ছে বিপুল হারে।

এই পরিস্থিতিতে আমরা কী করব? সারা পৃথিবীর জল একটি চক্রেই যুক্ত, জল দেউলিয়া বিশ্বে সেখান থেকে কারও বাঁচার রাস্তা তেমন নেই। তাই এখন থেকেই খাতায় প্রতি দিন নিজ পরিবারের দৈনিক জল ব্যবহারের হিসেব রাখা শুরু করি আমরা, যার পোশাকি নাম জল ডায়েরি। তার সঙ্গেই যা কিছু ব্যবহার করি, তার জন্য ঠিক কত জল লাগে, তারও একটা হিসেব রাখি, যার নাম জলের ফুটপ্রিন্ট। আগে ঘর সামলাই, তার পর নাহয় বৃহত্তর ক্ষেত্রের কথা ভাবা যাবে!

বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়, ভূগোল বিভাগ

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Water crisis bankruptcy United Nations report United Nations

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy