চিকিৎসক হওয়ার প্রথম ধাপ সর্বভারতীয় পরীক্ষা নিট ইউজি। অথচ সেই ধাপ পেরোতেই কালঘাম ছুটছে দেশের ভবিষ্যৎ চিকিৎসকদের। চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়ে একবার পরীক্ষা দেওয়ার পর তাঁরা জানতে পারছেন, সেই পরীক্ষা বাতিল হয়েছে। কারণ পরীক্ষা দেওয়ার আগেই নাকি প্রশ্ন ফাঁস হয়ে গিয়েছিল। ২০২৪-এর পর ২০২৬-এও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়েছে।
গত ৩ মে আয়োজিত নিট ইউজি বাতিল হওয়ায়, আগামী ২১ জুন তা ফের নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে নিয়ামক সংস্থা ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (এনটিএ)। এ জন্য আলাদা করে প্রশ্নপত্র তৈরি করানো হয়েছে। কোনও ভাবেই যাতে প্রশ্ন ফাঁস না হয়, সে জন্য প্রশ্নকর্তাদের পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত কার্যত নজরবন্দি করে রাখা হবে বলে জানানো হয়েছে। পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা মোবাইল, ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারবেন না বলেও জানানো হয়েছে।
কিন্তু এতে কি প্রশ্নফাঁসের মতো ঘটনা রোধ করা যাবে কি না, তার নিশ্চয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই।
যন্ত্রেই আস্থা
এনটিএ-এর প্রবেশিকার আয়োজন ঘিরে নানা গাফিলতির অভিযোগ রয়েছে। সংস্থার তরফে কোনও ক্ষেত্রে সেই অভিযোগের দায়ও স্বীকার করা হয়েছে। একই ভুল বারবার কেন হচ্ছে? সেই প্রশ্ন তুলেছে শীর্ষ আদালতও। তাই পরীক্ষার ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করার জন্য যন্ত্রের উপর আস্থা রাখতে চাইছে এনটিএ।
সংবাদসংস্থা সূত্রে খবর, সংস্থার অন্দরে এই বিষয়ে একটি প্রস্তাবনাও পেশ করা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, ‘জিরো ট্রাস্ট আর্কটেকচার’ নামক একটি বিশেষ ব্যবস্থায় পরীক্ষা পরিচালিত হবে। এত দিন যে কোনও এক আধিকারিকের উপর পরীক্ষা পরিচালনার উপর নজরদারির দায়িত্ব দেওয়া হত।
এর বদলে উল্লিখিত সিস্টেম-এর মাধ্যমে সেই নজরদারি চলবে। অর্থাৎ মানুষের কাজের দায়িত্ব বিভিন্ন যন্ত্রের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হবে। তবে, সেই যন্ত্র কী ভাবে তৈরি, কারা পরিচালনা করবেন, তাঁদের আলাদা কোনও প্রশিক্ষণ নিতে হবে কি না— সেই সম্পর্কে তেমন কোনও তথ্য এখনও আনুষ্ঠানিক ভাবে জানায়নি এনটিএ।
প্রশ্নফাঁস রুখতে আরও নিরাপত্তার প্রয়োজন
প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় বারবার মুখ পুড়েছে এনটিএ-এর। পরীক্ষাকেন্দ্রে ৫জি জ্যামার, জিপিএসযুক্ত গাড়ির সাহায্যে প্রশ্নপত্র পাঠানোর মতো একাধিক ক্ষেত্রে নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তার ঘেরাটোপ পেরিয়েও প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। তাই প্রশ্ন তৈরি করা থেকে শুরু করে তা পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়া পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই আমূল পরিবর্তন আনার ভাবনা রয়েছে এনটিএ-এর।
পুলিশি তদন্তে জানা গিয়েছে, প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় অভিযুক্তদের অনেকেই বিষয় বিশেষজ্ঞ কিংবা অনুবাদক। তাই প্রশ্নপত্র তৈরির ক্ষেত্রেও কড়া নিয়ম জারি করার কথা ভাবছে এনটিএ। বিষয় বিশেষজ্ঞদের মধ্যে কে, কোন পরীক্ষার জন্য প্রশ্নপত্র তৈরি করতে চলেছেন, তা জানার সুযোগ থাকবে না।
সূত্রের খবর, আলাদা করে একটি ‘কোয়েশ্চন ব্যাঙ্ক’ গড়ে তোলা হবে। তাতেই তৈরি হওয়া প্রশ্ন জমা হতে থাকবে। সেখান থেকেই প্রয়োজন মতো প্রশ্ন ব্যবহার করা হবে। খুব কম সংখ্যক আধিকারিকেরা ওই ব্যাঙ্ক ব্যবহারের সুযোগ পাবেন। কিন্তু তাতেও কতটা সুরক্ষিত থাকবে প্রশ্নপত্র? প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষামহলের একাংশ।
পুনঃপরীক্ষায় কেন্দ্রের সহযোগিতা
২১ জুনের পরীক্ষার আয়োজনে কোনও খামতি রাখতে নারাজ কেন্দ্র। কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা যাতে না ঘটে, সে জন্য ইতিমধ্যেই পুনঃপরীক্ষার আগে যাঁরা প্রশ্ন তৈরি করেছেন, তাঁদের সুরক্ষার ঘেরাটোপে নজরবন্দি করে রাখা হয়েছে। উদ্দেশ্য, তাঁরা বন্দি অবস্থায় ইন্টারনেট এবং মোবাইল ছাড়া কী ভাবে সময় কাটাচ্ছেন, পর্যবেক্ষণ করা।
এ ছাড়াও দেশের বিভিন্ন পরীক্ষাকেন্দ্রে ৫ লক্ষেরও বেশি নিরাপত্তা কর্মী পরীক্ষার জন্য মোতায়েন করা হতে চলেছে। পরীক্ষাকেন্দ্র বায়োমেট্রিক ভেরিফিকেশন, ফেশিয়াল রেকগনিশন-এর মতো উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে পরীক্ষার্থীদের পরিচয় যাচাই করা হবে।
প্রশ্নপত্র অনুবাদের কাজে কৃত্রিম মেধাকে ব্যবহার করা যেতে পারে কি না, তা নিয়েও ভাবনাচিন্তা করছে এনটিএ। এ ক্ষেত্রে যন্ত্র প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ করলেও তা যাচাই করে নেবেন বিশেষজ্ঞেরা। তবে, প্রশ্নপত্র নিয়ে সম্পূর্ণ তথ্য যাতে কোনও বিশেষজ্ঞ বা আধিকারিকের কাছে না থাকে, সেই ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও বিবেচনা করে দেখা হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে।