ইদানীং ভারত ও আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক বেশ সঙ্কটে। কেবল মতবিরোধ নয়, বিষয়টা আরও গভীর। সত্যি বলতে, ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের ইতিহাস কোনও কালেই মসৃণ নয়। গণতান্ত্রিকমূল্যবোধ, সাংবিধানিকতা, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও আইনের শাসনের প্রতি আস্থা দুই দেশকে ঘনিষ্ঠ করতে পারত, কিন্তু ভৌগোলিক-রাজনৈতিক মতপার্থক্য, ভিন্ন ঐতিহাসিক গতিপথ, ঠান্ডা যুদ্ধের ফলে তৈরি দূরত্ব এবং প্রভাবশালী নেতাদের ব্যক্তিগত মতান্তর সেই সম্ভাবনাকে বাস্তব হয়ে উঠতে দেয়নি। ঠান্ডা যুদ্ধে আমেরিকার বিদেশনীতি ‘বন্ধু’ ও ‘শত্রু’র সাদাকালো দ্বৈত বিভাজনে নির্মিত হয় এবং ‘জ়িরো সাম গেম’-এর যুক্তি গ্রহণ করে— যার সঙ্গে ভারতীয় ভাবনা মেলেনি।
ঠান্ডা যুদ্ধের ভূরাজনৈতিক রূপান্তর দুই দেশের সম্পর্ক পাল্টায়। ৯/১১-র পর আমেরিকার কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গির বদল এবং ভারতের কূটনীতির পরিবর্তনের ফলে এক নতুন যুগের সূচনা হয়। পাকিস্তান-নীতিকে ভারত থেকে আলাদা করে দেখা এবং ভারতের অস্থির প্রতিবেশ নিয়ে আমেরিকার মধ্যস্থতার ব্যাপারে ওয়াশিংটনের অনীহা দিল্লিকে সন্তুষ্ট করে। সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ সবচেয়ে বড় সংযোগসূত্রে পরিণত হয়, আর প্রযুক্তি ও মুক্ত বাণিজ্য নীতিতে সহযোগিতা বাড়ে। তবুও, সমতা, প্রতিনিধিত্ব, সংস্কার ও ন্যায্যতার প্রশ্নে উদার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সঙ্গে ভারতের মতপার্থক্য থেকে গিয়েছিল।
ট্রাম্পের প্রথম প্রেসিডেন্ট-পর্বে কিছু ফাটল দেখা দিলেও, এক দিকে মোদী-ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সখ্য ও অন্য দিকে চিনের উত্থানজনিত উদ্বেগ ভারত-আমেরিকা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যায়। প্রেসিডেন্ট বাইডেন সেই ধারা বজায় রাখেন। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ বড় বিভাজন তৈরি করে— ভারত তার দীর্ঘ দিনের রাশিয়া-সম্পর্ক পরিত্যাগ করতে অস্বীকার করে, আর ভারতের দৃষ্টিতে আমেরিকার অবস্থান একপেশে বলে প্রতীয়মান হয়। তবুও চিন নামক চ্যালেঞ্জ ও বিশ্ব রাজনীতির অনিশ্চয়তা দুই দেশের অংশীদারিকে অপরিহার্য করে তোলে। নিরাপত্তা, লজিস্টিকস ও প্রযুক্তি চুক্তি ইঙ্গিত দেয় যে মতপার্থক্য সত্ত্বেও সম্পর্কের ভিত্তি অটুট।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ছবিটি আগাগোড়া পাল্টাতে থাকে। দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সম্পর্কের বদলে তিনি স্বল্পমেয়াদি লেনদেনকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি চাপিয়ে দেন। আগে যেখানে ভারতের উত্থান ও এশিয়ায় আমেরিকান নেতৃত্বকে পরিপূরক ধরা হত, সেখানে ট্রাম্প প্রশাসন ভারতকে কেবল বাণিজ্য প্রতিদ্বন্দ্বী ও তাৎক্ষণিক কৌশলগত সঙ্গী হিসাবেই দেখেন। মৌলিক ভূরাজনৈতিক স্বার্থকে অর্থনৈতিক ক্ষোভের যুক্তিতে অবহেলা করে দুই দেশের মধ্যে আস্থার ভিতটি দুর্বল করেন।
ভারতের বিদেশনীতি গত দুই দশক ধরে কয়েকটি ধারণার উপর দাঁড়িয়ে আছে: আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র ও চিনের প্রতিযোগিতায় নিরপেক্ষ থাকা; রাশিয়ার মিত্রতা রক্ষা করা; পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিযোগিতাকে নিজের অন্য কূটনৈতিক সম্পর্কে অপ্রাসঙ্গিক করে রাখা। ইতিমধ্যে প্রেক্ষাপট পাল্টাতে থাকে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনে আমেরিকার ভূমিকাকে ঘিরে অস্বস্তি তৈরি হয়। ইউক্রেন যুদ্ধ অবস্থানকে জটিল করে। ভারত ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব সমর্থন করায়, এবং রাশিয়ার থেকে তেল কেনায় ওয়াশিংটন ক্ষুব্ধ হয়।
ভারত চায়, একই সঙ্গে পশ্চিমি ও অপশ্চিমি শক্তির সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় থাক। ব্রিকস-এর মতো গোষ্ঠীতে ভারত ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর কণ্ঠস্বর। আর কোয়াড-এর মধ্যে দিয়ে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ালেও ভারত জোটে বাঁধা পড়েনি। অন্য দিকে, ভারত চিনের নেতৃত্বাধীন অর্থনৈতিক মঞ্চে যোগ দিয়েছে। ভারসাম্য রাখতে ভারতের প্রতিক্রিয়া হল নীতির বৈচিত্র বাড়ানো। এসসিও, আসিয়ান, ব্রিকস প্রভৃতি মঞ্চে সক্রিয় হওয়া। আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার সঙ্গে জোট গড়া। উত্তর-ঔপনিবেশিক দেশগুলিতে নেতৃত্ব জোরদার করা।
ভারতের বিদেশনীতিকে বুঝতে হলে রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘ সখ্যকে ভুললে চলে না। আজও ভারতের সামরিক সরঞ্জামের বড় অংশ রাশিয়া থেকে আসে। রাশিয়া উন্নত অস্ত্র বিক্রিতে বিধিনিষেধ আরোপ করে না (আমেরিকা ধারাবাহিক ভাবে শর্ত আরোপ করে)। মস্কোর সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হলে চিনের সঙ্গে রাশিয়ার ঘনিষ্ঠতা বাড়তে পারে, যা ভারতের জন্য বিপজ্জনক। তাই চিনকে সংযত রাখতে, আমেরিকার পাশাপাশি রাশিয়ার সমর্থনও ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ঐতিহাসিক শিকড়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭১ সালের ‘শান্তি, মৈত্রী ও সহযোগিতা’ চুক্তির পর থেকেই মস্কো প্রধান নিরাপত্তা অংশীদার। রাষ্ট্রপুঞ্জেও কাশ্মীর বিষয়ে রাশিয়ার সমর্থন ভারতের সম্পদ।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কে অনিশ্চয়তাই হল নিয়ম। ভারতকে এখন তার কৌশলগত স্বাধীনতা রক্ষা করতেই হবে। প্রথমত, ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি হল মূলত লেনদেনভিত্তিক— দ্বিপাক্ষিক চুক্তিকে প্রাধান্য দিয়ে তাৎক্ষণিক লাভ খোঁজা, এবং এর জন্য প্রয়োজনে যৌথ মূল্যবোধ বা আন্তর্জাতিক নীতিকে উপেক্ষা করা। বিপরীতে, ভারত কিন্তু এখনও বহুপাক্ষিকতাকে গুরুত্ব দেয়, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে প্রভাব বিস্তার ও বৈধতা অর্জনের মাধ্যম হিসেবেই দেখে, এবং অন্তত নীতির স্তরে— ন্যায়সঙ্গত বৈশ্বিক ব্যবস্থাকে সমর্থন করে।
দ্বিতীয়ত, একতরফা হস্তক্ষেপের প্রশ্নে ভারত ও আমেরিকার অবস্থানগত পার্থক্যটি বেশ প্রকট। ওয়াশিংটন দীর্ঘ দিন ধরেই আন্তর্জাতিক বিষয়ে একক ভাবে পদক্ষেপ করার পক্ষপাতী। অন্য দিকে, ভারত ঐতিহাসিক ভাবে অন্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের কারণে তার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপে অনাগ্রহী। বর্তমানে ট্রাম্পের আমেরিকার মূল সমস্যা তার বিদেশনীতির অনিশ্চয়তা। এমতাবস্থায়, ভারতের মতো দেশের উদ্বেগের কারণ যথেষ্ট। পাকিস্তান ও অন্যান্য পড়শি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ভাল নয় বলেও ভারত অতিরিক্ত উদ্বেগে আছে। ইতিহাস ও যুক্তি বলে— আমেরিকা নয়— রাশিয়াই সব সময় প্রয়োজনে ও সঙ্কটকালে দিল্লির পাশে থেকেছে। ট্রাম্পের ব্ল্যাকমেলও ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে দূরত্ব তৈরি করতে পারবে মনে হয় না।
তৃতীয়ত, ট্রাম্পের আমলে আমেরিকার নীতি স্বল্পমেয়াদি, যেখানে ব্যবসা ও বাণিজ্য ঘাটতি সংক্রান্ত তাৎক্ষণিক জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। ভারতের বিদেশনীতি কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সভ্যতাগত উত্তরাধিকার ও নৈতিক উদ্দেশ্যের মাপকাঠিতে রচিত। ট্রাম্পের খামখেয়ালিপনা যদি ভারতের পক্ষে অসম্মানকর হয়ে ওঠে, আত্মসম্মান, স্বীকৃতি ও ন্যায়ের প্রশ্নকে কেন্দ্র করে দুই দেশের ব্যবধান আরও বাড়বে।
চতুর্থত, ন্যায়বিচার ও ন্যায্যতার প্রশ্নে দুই দেশের ঐতিহাসিক অবস্থান আলাদা। আমেরিকা অনেক সময়ই আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে, নিজের স্বার্থে বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল করেছে এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থাকে তার কাঙ্ক্ষিত কর্তৃত্বের সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখেছে। বিপরীতে, ভারত বৈশ্বিক শাসনে সমতার পক্ষে অটল। যে দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, আন্তর্জাতিক ন্যায়ের প্রশ্নে ভারত সাধারণত সমঝোতা করে না। গত এক দশকে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও ভারতীয় প্রবল জাতীয়তাবাদ কিছু ক্ষেত্রে নয়াদিল্লির অবস্থানকে কিছুটা নমনীয় ও আপসপন্থী করলেও তা কোনও বড় নীতিগত পরিবর্তনের দ্যোতক নয়। পরিবেশ, বাণিজ্য ব্যবস্থা, রাষ্ট্রপুঞ্জে নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কার— সব ক্ষেত্রেই ভারত সাম্প্রতিক অতীতে ঐতিহাসিক ও নৈতিক যুক্তি তুলে ধরেছে, যা ট্রাম্পের আমেরিকার পক্ষে যথেষ্ট অস্বস্তিকর।
তদুপরি, বিশ্বব্যবস্থার নির্মাণ ও সংরক্ষণের প্রেক্ষাপটে বিচার করলে, দুই দেশের ক্ষমতার ধারণাতেও পার্থক্য আছে। ট্রাম্পের আমেরিকা ‘সুবিধাবাদী আন্তর্জাতিকতাবাদ’কে ঘোষিত আমেরিকার অবস্থানে পরিণত করতে বদ্ধপরিকর। অন্য দিকে, ভারত বাস্তববাদী নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে কেন্দ্রে রেখে এক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যাতে তার উত্থানকে যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এই স্বীকৃতিমুখী রাজনীতি দুই দেশের সম্পর্ককে আরও জটিল করেছে।
ট্রাম্পের নীতি আজকের বিশ্বব্যবস্থার অবসানের কথা বলে, যদিও তার পরিবর্তে আমরা কী ধরনের পৃথিবী নির্মাণ করব তার ইঙ্গিত দেখতে পাওয়া যায় না। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চিনের কর্তৃত্ববাদ প্রতিরোধের মতো কিছু অভিন্ন লক্ষ্য থাকা সত্ত্বেও, দুই দেশের সম্পর্ক শক্তিশালী করতে হলে এই বিরোধগুলির দিকে মনোযোগ দিতে হবে। পৃথক পথে চললেও যে এক সঙ্গে এগোনো সম্ভব, এটা ট্রাম্পীয় আমেরিকাকে বুঝতে হবে। একমাত্র তা হলেই ভারত-আমেরিকা সম্পর্কে আবার স্থিতি ফিরতে পারে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)