সি ভি রমনের পর ভারত কেন আর কোনও নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী পেল না? নোবেল-মনোনয়ন বা প্রাপ্তি যদিও শুধুই উচ্চমানের গবেষণা-নির্ভর নয়, রাজনীতি-কূটনীতিও জড়িয়ে। সে আলোচনা সরিয়ে রেখে শুরুর প্রশ্নটিকে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা তথা যুগান্তকারী আবিষ্কার ও অবদানের দিক থেকে বিচার করা যেতে পারে। প্রায় এক দশক আগে নোবেলজয়ী ব্রিটিশ-আমেরিকান বিজ্ঞানী ভেঙ্কটরামন রামকৃষ্ণন এ প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ভারতে বিজ্ঞান-গবেষণায় সীমাবদ্ধতার মূল কারণ প্রতিভার অভাব নয়; বৈজ্ঞানিক সংস্কৃতির অনুপস্থিতি, মৌলিক গবেষণায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগের ঘাটতি ও আন্তর্জাতিক মানের পরিকাঠামোর অভাব।
এ দেশে আন্তর্জাতিক মানের বিজ্ঞান-প্রতিভার অভাব ছিল না। মহেন্দ্রলাল সরকার প্রতিষ্ঠিত ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কালটিভেশন অব সায়েন্স-এ গবেষণা করেই সি ভি রমন নোবেল পান। জগদীশচন্দ্র বসু প্রতিষ্ঠা করেন বসুবিজ্ঞান মন্দির; সেমিকন্ডাক্টর, রেডিয়ো-যোগাযোগ’সহ নানা গবেষণায় পথিকৃৎ তিনি। ভারতে গবেষণা করে আন্তর্জাতিক অবদান রেখেছেন সত্যেন্দ্রনাথ বসু, মেঘনাদ সাহা, শ্রীনিবাস রামানুজন, হোমি জে ভাবা, জি এন রামচন্দ্রন, টি আর শেষাদ্রি, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ প্রমুখ। পরাধীন সময়েও তাঁরা বুঝেছিলেন, বিজ্ঞানচর্চার জন্য চাই মেধা, দক্ষ প্রতিষ্ঠান, দূরদর্শী নেতৃত্ব। এরই উত্তরাধিকার আইআইএসসি, আইআইটি, টিআইএফআর, সিএসআইআর। মেঘনাদ সাহার নেতৃত্বে এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, কলকাতায় ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার ফিজ়িক্স ও ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল সায়েন্স অ্যাকাডেমি গড়ে ওঠে। রামস্বামী মুদালিয়ার, এস এস ভাটনাগর ও মেঘনাদ সাহার উদ্যোগে গড়ে ওঠে সিএসআইআর। হোমি জে ভাবা তৈরি করেন টিআইএফআর।
ভারতে শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞান-প্রতিষ্ঠানের কথায় সর্বাগ্রে আসে আইআইএসসি-র নাম। সি ভি রমন, জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ, সতীশ ধওয়নের নেতৃত্ব এখানে তরুণ বিজ্ঞানীদের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। হোমি ভাবা, বিক্রম সারাভাই, আন্না মণি, কমলা সোহিনী বা সি এন আর রাও, বহু কৃতী বিজ্ঞানী ও বিজ্ঞান-প্রশাসক এখান থেকে উঠে এসে বিজ্ঞানক্ষেত্রে কীর্তি স্থাপন করেছেন। পরে জি এন রামচন্দ্রন, ই সি জি সুদর্শন, জি পদ্মনাভনের মতো বিজ্ঞানীরা এখানে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এ ছাড়া, ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব এগ্রিকালচারাল রিসার্চ-এর প্রধান হিসেবে ভারতীয় কৃষি গবেষণা ও নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান এম এস স্বামীনাথনের। জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন গবেষণায় নেতৃত্ব দানের পাশাপাশি স্বাধীন ভারতের প্রথম আইআইটির প্রতিষ্ঠাতা-নির্দেশক। ১৯৪০-এর দশকে এন এন দাশগুপ্ত সাহা ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার ফিজ়িক্স-এ এশিয়ার প্রথম ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ বানিয়ে এক নতুন অধ্যায় সূচনা করেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা করেন শম্ভুনাথ দে।
গত কয়েক দশক থেকে ধারাবাহিক ভাবে বিজ্ঞান-সংস্কৃতি ক্ষয়িষ্ণু হওয়ার অন্যতম কারণ বিজ্ঞান-নেতৃত্বের সঙ্কট। বহু বিজ্ঞান-প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব নির্বাচনে মেধা, বৈজ্ঞানিক কৃতিত্ব বা প্রশাসনিক দূরদৃষ্টির বিচার হচ্ছে না; রাজনৈতিক আনুগত্য, বা সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানী ক্ষমতাকেন্দ্রের কতটা সান্নিধ্যধন্য, তারই নিরিখে হয় বাছাই। ফলত, বিজ্ঞান-কেন্দ্রগুলিতে বিজ্ঞান-সংস্কৃতির মান হতাশাজনক। গবেষকদের প্রশ্ন করার পরিসর সঙ্কীর্ণ, ভিন্নমত গ্রহণের উদারতা স্পষ্ট। খোলামনে সমালোচনা গ্রহণের সংস্কৃতি উধাও হচ্ছে। অস্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ার জেরে ও পদোন্নতির প্রক্রিয়া যোগ্যতা অনুযায়ী না-হওয়ায় জন্ম হচ্ছে অযোগ্য অথচ ক্ষমতাধর বিজ্ঞান-ব্যক্তিত্বের। আমলাতান্ত্রিক হস্তক্ষেপের প্রাবল্যে বহু প্রতিশ্রুতিমান তরুণ গবেষক, এমনকি ভাটনগর পুরস্কারপ্রাপ্ত বিজ্ঞানীও প্রতিষ্ঠান বা দেশ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন। এ কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, ভারতীয় বিজ্ঞানের গভীর অবক্ষয়ের চিহ্ন। মৌলিক গবেষণায় রাষ্ট্রীয় সদিচ্ছার অভাব, গবেষণার পরিসরে ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে ভারতীয় বিজ্ঞান আজ সঙ্কটে।
গবেষণাখাতে আর্থিক অনীহাও কারণ। দেশে বিজ্ঞান-গবেষণা ও উন্নয়নে ব্যয় বহু বছরই নিম্নগামী, বর্তমানে জিডিপির মাত্র ০.৬৫ শতাংশ। তুলনায় চিন ব্যয় করে ২.৪৩ শতাংশ, আমেরিকা ৩.৪৬, দক্ষিণ কোরিয়া প্রায় ৫ শতাংশ। ভারতে মৌলিক গবেষণায় অর্থ বরাদ্দ দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হয় না বলে বিজ্ঞান গবেষণায় বরাদ্দ কম, অনিয়মিত, বিলম্বিত। প্রকল্প অনুমোদন ও তহবিল ছাড়ের অপেক্ষায় গবেষকদের সময় নষ্ট হয়, বিশ্বমানের গবেষণার ‘ঝুঁকি’ নিতে পারেন না তাঁরা। চটজলদি সাফল্য আসবে না, এমন গবেষণা যতই উচ্চমানের হোক, নিরুৎসাহিত হয়। নিরাপদ, স্বল্পমেয়াদি ফলপ্রসূ কাজ করে যেতে হয়।
প্রতিভা আজও আছে, গবেষণার সম্ভাবনাও। কিন্তু তাকে বিশ্বমানের আবিষ্কারে রূপ দিতে চাই উপযুক্ত পরিবেশ, পরিকাঠামো, স্বাধীনতা, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। চাই সৎ, নিরপেক্ষ, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্ব। এর অভাবই আজ দেশের বিজ্ঞানচর্চায় সবচেয়ে বড় বাধা। বিজ্ঞানকে স্বাধীন বৌদ্ধিক অন্বেষার ক্ষেত্র রূপে গড়ে তোলা জরুরি। নয়তো নোবেল-সহ বৈশ্বিক স্বীকৃতির প্রশ্ন বার বার ফিরে এসে আমাদের অস্বস্তি বাড়াবে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)