মহাদেব বা শিবকে ঘিরে বঙ্গভূমিতে প্রচলিত রয়েছে দু’টি বড় উৎসব— ‘শিবরাত্রি’ ও ‘শিবের গাজন’। শৈব রাজাদের শহর বর্ধমানেও এই দুই উৎসব মহা সমারোহে পালিত হয়। বিশেষ করে, শিবরাত্রিতে শহরের উত্তর প্রান্তে নবাবহাটের ১০৮ শিবমন্দির, দক্ষিণ প্রান্তে আলমগঞ্জের বড়-শিবের মন্দির এবং মাঝে গোলাপবাগের রমনার বাগানের বিজয়ানন্দেশ্বর শিবমন্দিরকে ঘিরে বর্ধমান যেন হয়ে ওঠে শৈবক্ষেত্র। 

বর্ধমানের রাজারা ধর্মবিশ্বাসে ছিলেন শৈব। তাই তাঁরা শহরের মধ্যে এবং শহরের বাইরে বহু শিবমন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শাক্ত মন্দির চত্বরেও তাঁরা শিবলিঙ্গ স্থাপন করেছিলেন। যেমন, সর্বমঙ্গলা মন্দির চত্বরেই রয়েছে রাজা চিত্রসেন প্রতিষ্ঠিত ‘চন্দ্রেশ্বর’ ও ‘ইন্দ্রেশ্বর’ শিব, রয়েছে রাজা তেজচাঁদ প্রতিষ্ঠিত ‘রামেশ্বর’, ‘কমলেশ্বর’ ও ‘মিত্রেশ্বর’ শিব। সোনার কালীবাড়িতে মহারানি নারায়ণকুমারী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘নারায়ণেশ্বর’ শিব। এ ছাড়া, বর্ধমান শহরের রাজাদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত শিবগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল নবাবহাটের ‘১০৮ শিব’ নামে পরিচিত বিশাল শিবতীর্থ। লক্ষ্মীনারায়ণ জিউ ঠাকুরবাড়িতে রাজা তিলকচাঁদ প্রতিষ্ঠিত ‘ভুবনেশ্বর’ শিব, অন্নপূর্ণা রাধাবল্লভ জিউ ঠাকুরবাড়িতে রাজা তেজচাঁদ ও কমলকুমারী প্রতিষ্ঠিত ‘রাজরাজেশ্বর’ শিব, কমলাকান্ত ঠাকুরবাড়িতে রাজা তেজচাঁদ প্রতিষ্ঠিত ‘ভৈরব লিঙ্গ’, শ্যামসায়রের ঈশান কোণে রাজা ঘনশ্যাম রাই প্রতিষ্ঠিত ‘ঈশানেশ্বর’ শিব, রমনার বাগানে এবং খান্নাজি ঠাকুরবাড়িতে মহারাজ বিজয়চাঁদ প্রতিষ্ঠিত যথাক্রমে ‘মহামৃত্যুঞ্জয়’ শিব ও ‘নর্মেদেশ্বর’ শিব।

শিবরাত্রিতে বর্ধমান শহরের সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ এবং লোকসমাগমের দিক থেকে সবচেয়ে বড়ো পুজোটি হয় নবাবহাটের ১০৮ শিবমন্দিরে। আর দ্বিতীয় বড় পুজোটি হয় আলমগঞ্জের বর্ধমানেশ্বর শিব বা বড় শিবের মন্দিরে। গোলাপবাগের ‘রমনার বাগ’ বা ‘বিজয়ানন্দ বিহার’-এ শিবের পুজোও হয় খুব ধুমধাম করে। বর্ধমানের মহারাজা তিলকচাঁদের পত্নী মহারানি বিষণকুমারী ১৭৮৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৭৯০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বর্ধমান শহরের উত্তর প্রান্তে নবাবহাটে ১০৮ শিবলিঙ্গ-সহ মন্দিরগুলি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আর সাড়ে বারো টন ওজনের ৫ ফুট ৯ ইঞ্চি উচ্চতার কালো উজ্জ্বল পাথরের বর্ধমানেশ্বর বা বড়-শিব পাওয়া গিয়েছিল ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে ১০ অগস্ট দামোদরের বুক থেকে। ভারতবর্ষের মধ্যে এটিই অন্যতম বৃহৎ শিবলিঙ্গ বলে দাবি করা হয়। অন্য দিকে, ‘বিজয়ানন্দ বিহার’-এর মধ্যস্থিত সরোবর ‘মুক্তগিরি’র উত্তরাংশে আগ্রার ফতেপুর সিক্রির পরিকল্পনা অনুসারে মহারাজ বিজয়চাঁদ স্থাপন করেছিলেন লাল পাথরের শিবমন্দির।

মহারানি বিষণকুমারীর বর্ধমানের নবাবহাটে ১০৮ শিবমন্দির প্রতিষ্ঠার এক দীর্ঘ ইতিহাস আছে। এই মন্দিরের নির্মাণ শুরু হয়েছিল ১৭৮৮ খ্রিস্টাব্দে। আর শেষ হয়েছিল ১৭৯০ খ্রিস্টাব্দে। জপমালার আদলে ১০৮টি কাঁঠি-সহ জপমালার ‘মেরু’ চিহ্নের মতো অতিরিক্ত আর একটি, অর্থাৎ মোট ১০৯টি স্থাপত্যকে গেঁথে প্রতিষ্ঠিত এই মন্দিরমালা বর্ধমানের এক অনন্য শিল্পকীর্তি। শোনা যায়, ওই ১০৯তম মন্দিরটি প্রতিষ্ঠার সময় সেখানে লক্ষ সাধুর সম্মিলন ঘটেছিল। তাঁদের পদধূলি নাকি, বর্ধমানের রাজপরিবার সংরক্ষিত রেখেছিল একটি স্বর্ণকলসে। মন্দিরগুলির গঠনপ্রণালী একই রকম। ওডিশার বালেশ্বরের মন্দিরের আটচালার নকশার আদলে নির্মিত হয়েছিল সেগুলি। মন্দিরগুলির অবস্থান যেমন পাশাপাশি, তেমনি প্রতিটি মন্দিরের সামনেই আছে খোলা টানা বারান্দা। প্রতিটি মন্দিরই এক দরজাবিশিষ্ট। আর সব মন্দিরেই বিরাজ করছেন কষ্টিপাথরে নির্মিত গৌরীপট্ট-সহ শিবলিঙ্গ। প্রতিষ্ঠার সময়ে সবগুলি মন্দিরের সামনেই রোপণ করা হয়েছিল একটি করে বেলগাছ। মন্দিরে প্রবেশের পথ পশ্চিমমুখী। বর্তমানে মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণ, নিত্যপুজো ও সেবাকার্যের দায়িত্ব পালন করে চলেছে ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে মহারাজাধিরাজ উদয়চাঁদ মহাতাব গঠিত অছি পরিষদ।

অন্য দিকে, আলমগঞ্জের বর্ধমানেশ্বর শিব বা বড় শিবও বর্ধমানের এক অন্যতম আকর্ষণ। এই শিবলিঙ্গ মাটির নীচে থেকে উদ্ভূত হয়েছিল বলে জনশ্রুতি আছে। ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের ১০ অগস্ট দামোদরে বক্ষ থেকে এই শিবলঙ্গটি সংগ্রহ করে আনা হয়েছিল। জানা যায়, নদীগর্ভ থেকে সেই বিশাল শিবলিঙ্গ তোলার জন্য ডাক পড়েছিল সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারদের। স্থানীয় জনগণের মুখে তিনি ‘বর্ধমানেশ্বর’ নামেই পরিচিত। বর্ধমানেশ্বরকে ঘিরে মানুষের আগ্রহ, ভক্তি, বিস্ময় থাকলেও ১০৮ শিবের মতো বর্ধমানেশ্বরের উপর অতখানি জনপ্রিয়তার আলো পড়েনি কোন দিনই।

মহারাজ বিজয়চাঁদ গোলাপবাগের নিকটবর্তী রমনার উদ্যান সংস্কার করে বাংলা ১৩২২ সালের ১৩ জ্যৈষ্ঠ শিব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিবলিঙ্গের বিশেষত্ব হল কালো পাথরের গৌরীপট্টের উপরে প্রায় এক ফুট ব্যাসের সাদা শিবলিঙ্গ। তাঁর মাথায় বজ্র। শিবমন্দিরের ভিতরে পিছনের দেওয়ালে রয়েছে সুন্দর কারুকার্যখচিত শ্বেতপাথরের উপর খোদাই করা ‘ওঁ’ চিহ্ন। সেই সঙ্গে খোদাই করা রয়েছে জলের উপরে পদ্মকুঁড়ি, পদ্মপাতা ও প্রস্ফুটিত পদ্মফুল।

শিবরাত্রিতে এই তিনটি শৈবভূমিতেই বহু লোকসমাগম হয়। ১০৮ শিবমন্দির এবং বর্ধমানেশ্বর শিবমন্দির চত্বরে মেলা বসে। হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও। রমনার বাগানের বিজয়ানন্দেশ্বর শিবের পুজোয় রাজবংশের উত্তরপুরুষদের কেউ না কেউ উপস্থিত থাকেন এবং পুজো পরিচালনায় অংশগ্রহণ করেন।  বর্ধমান শহরের শিবরাত্রি শুধু শিবপুজোই নয়, সর্বধর্ম সমন্বয়ের এক উৎসবও। এ দিন বর্ধমান যেন মানুষের মিলনভূমিতে পরিণত হয়।

পানাগড় বাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক