সদ্যপ্রয়াত নোবেলবিজয়ী লেখিকা টোনি মরিসন বিভিন্ন বক্তৃতা ও সাক্ষাৎকারে, লেখকদের প্রতি কিছু উপদেশ দিয়া গিয়াছেন। প্রধান উপদেশটি চিত্তাকর্ষক: তাহাই লিখুন, যাহা আপনি পড়িতে চাহেন। ইহা যে কোনও শিল্পেরই গোড়ার কথা, এক শিল্পী আসলে তাহাই রচনা করেন, যাহা অন্য শিল্পে অনুভব করিলে তিনি সর্বাধিক পুলকিত ও উত্তেজিত হইতেন। কারণ যে কোনও কবির প্রথম পাঠক তিনিই, যে কোনও চিত্রকরের প্রথম দর্শক তিনিই। শিল্প রচিত হয় নিভৃতে ও ‘এবার, বীণা, তোমায় আমায় আমরা একা’ চুক্তিভিত্তিতে, অর্থাৎ, শিল্পী দুইটি সত্তায় বিভক্ত হইয়া গিয়া, রচনা করেন ও উপভোগ করেন, উপভোক্তা সত্তা আপত্তি করিলে রচিত পঙ্‌ক্তি কাটিয়া পরিবর্তন করা হয় বা ক্যানভাসে অন্য বর্ণ যুক্ত হয়। টোনি মরিসন বলিয়াছিলেন, প্রথম বইটি তিনি লিখিয়াছিলেন, কারণ কৃষ্ণাঙ্গ বালিকাকে প্রবল গুরুত্ব প্রদান করিয়া রচিত গ্রন্থ তিনি পড়িতে চাহিয়াছিলেন। কেহ লিখে নাই, তাই তিনি নিজেই লিখিলেন। তাঁহার একটি ব্যবহারিক উপদেশ হইল, লেখা শেষ না করিয়া উচ্চৈঃস্বরে তাহা আবৃত্তি করা অনুচিত। কারণ পাঠক যখন পড়িবেন, তিনি কিছু শুনিবেন না। জোরে পড়িলে হয়তো শব্দঝঙ্কারের জন্য, বা পড়ার কায়দাটির জন্য, লেখকের মনে হইল লেখাটি দিব্য হইয়াছে। কিন্তু কাগজের উপর মুদ্রিত অক্ষর যাহার নির্ভর, সেই পাঠকের অনুভূতি আন্দাজ করিতে চাহিলে, ইহা ভুল প্রক্রিয়া। কিন্তু টোনি মরিসনের এক আশ্চর্য উপদেশ হইল, যাহা জানো, তাহা লিখিয়ো না। উনি বলিতেছেন, নব্য লেখকদের লেখা পড়িয়া মনে হয়, সকলে কেবল নিজের সম্পর্কেই লিখিতেছেন। নিজের প্রেম, নিজের মৃত্যু। অন্য সকলেই সেই কাহিনিতে গৌণ চরিত্র। কিন্তু টোনি যখন সৃষ্টিশীল রচনার ক্লাস লইতেন, বলিতেন, আমি আপনাদের বাবা মা বন্ধু ও প্রকৃত প্রেম সম্পর্কে জানিতে চাহি না। এমন কাহারও কথা ভাবুন যিনি আপনার অপরিচিত। যে ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়া ইতিমধ্যেই আপনি আসিয়াছেন, সেইটিকেই কাটিয়াছাঁটিয়া লেখা দাঁড় করাইবেন না। বরং এমন কাহারও সম্পর্কে লিখুন, যিনি আপনার জীবনের পরিধির বাহিরে। কল্পনা করুন, নির্মাণ করুন। নিজ অস্তিত্বের বাহিরে দাঁড়াইলে লেখকের উত্তম প্রশিক্ষণ হয়।

শেষোক্ত উপদেশটি তিনি নিশ্চয়ই অভিজ্ঞ লেখকদের দেন নাই, ওয়ার্কশপের নবিশদেরই দিয়াছেন, তাঁহাদের কল্পনাশক্তি ও রচনাশৈলীর বিকাশই এই উপদেশের উদ্দেশ্য, তথাপি মতটির প্রতি অনেকেই ভ্রু কুঁচকাইয়া তাকাইবেন। বঙ্কিমচন্দ্র নব্য লেখকদের কিছু উপদেশ দিয়াছিলেন। টাকার জন্য বা যশের জন্য লেখা উচিত নহে, লেখার পরে সেই লেখা না ছাপাইয়া কিছু দিন ফেলিয়া রাখা আবশ্যক— এমন কিছু কথা সেই তালিকায় ছিল। কিন্তু সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ সম্ভবত ছিল এইটিই: যে বিষয়ে যাহার অধিকার নাই, তাহাতে তাহার হস্তক্ষেপ অকর্তব্য। অর্থাৎ, যাহা জানেন না, তাহা লিখিবেন না। টোনি মরিসনের উপদেশটির সম্পূর্ণ বিপরীত। অধিকাংশ লেখকই এই ক্ষেত্রে বঙ্কিমচন্দ্রের পক্ষে থাকিবেন বলিয়াই মনে হয়। এমন মতও রহিয়াছে, এক শিল্পীর একমাত্র অধিকার কেবল নিজ মনের চিন্তাগুলির প্রতিই, কারণ বিশ্বের আর কোনও কিছুই তাঁহার পক্ষে সম্যক ভাবে জানা সম্ভব নহে। তত্ত্বকথায় না যাইয়াও বলা যায়, চিরকাল শহরে থাকিয়া যদি কেহ মাঝির দৈনন্দিনতা লইয়া ভাটিয়ালি গান রচনা করিতে চাহে, বা কৃষকের নিপীড়িত দারিদ্র লইয়া গদগদ সন্দর্ভ লিখিতে চাহে, তাহা মেকি হইবার সম্ভাবনা অধিক। যদিও অতিশয় নাগরিক চলচ্চিত্রকার গ্রামের পাঁচালি পর্দায় প্রস্ফুটিত করিয়া জগৎ জয় করিয়াছেন এবং শ্রমিক-সম্বন্ধীয় গানের সুরও শ্রমিক বড় একটা দেন নাই, তবু পরিচিত বস্তু ও পরিস্থিতি প্রকাশ করিবার ক্ষেত্রে রচয়িতার সুবিধাও ঘটে, বিশ্বাসও অধিক থাকে, অন্যের বিশ্বাস উৎপাদনও সহজ হয়। ওতপ্রোত নৈকট্য তাঁহাকে এমন কিছু অনুপুঙ্খের সন্ধান দেয়, যাহা কেবল কল্পনা (যতই প্রতিভাঋদ্ধ হউক না কেন) আয়ত্ত করিতে পারিত না। ইহাও সত্য, পরম ব্যক্তিগত উন্মোচন প্রায়ই সমষ্টির মর্মস্থলের সর্বাপেক্ষা সমীপবর্তী হয়। হয়তো অপরিচিতের চিত্তনিসর্গ বর্ণনা করিবার প্রয়াস চমৎকার মস্তিষ্ক-ব্যায়াম হইতে পারে, কিন্তু যে-রচনা আত্মা হইতে উৎসারিত হইবে, যাহার মধ্যে লেখক নিজেকে ও নিজস্ব সত্যকে প্রতিভাত করার চেষ্টা করিবেন, সেইটিতে পরিচিত দিনরাত্রির আলোক ও অন্ধকার বয়ন করিলে, তাহা ‘অধিকারী’র স্বাক্ষরে বহুমাত্রিক উন্মোচনে সমুজ্জ্বল হয়।