প্রশ্ন: আয়বৃদ্ধির সুফল সমাজের নীচের তলার মানুষের কাছে কী ভাবে পৌঁছে দেওয়া যায়, গত কয়েক বছরে সেটা নিয়ে খুব কম কথাই এ দেশের রাজনীতিতে শোনা গিয়েছে। এত দিন পরে আবার আলোচনাটা সেই দিকে নিয়ে আসার চেষ্টা হচ্ছে যে, যাঁদের কাছে কিছুই পৌঁছয়নি, তাঁদের জন্য কিছু করা দরকার। সেটাকে আপনি কী ভাবে দেখছেন? 

প্রণব সেন: কিছু পৌঁছয়নি বলাটা ভুল। পৌঁছেছে, কিন্তু অপেক্ষাকৃত কম। ব্যাপারটা হল, আপনার সামনে দুটো পথ আছে। প্রথমটা হল গ্রোথ বা আয়বৃদ্ধির প্রক্রিয়াটাকে আপনি এ রকম করে সাজাবেন, যাতে গরিবরাও তাতে ভাগ নিতে পারেন। আর, প্রথমটা যদি না করতে পারেন, তা হলে বেশি কর আদায় করবেন, এবং গরিবদের টাকা দেবেন। মানে ইনকাম ট্রান্সফার বা নগদ আয় হস্তান্তর। এত দিন বৃদ্ধির দিকেই নজর ছিল— তাতে চাকরি হবে, একেবারে নীচে পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। এখন মনে হচ্ছে, দুই প্রধান রাজনৈতিক দলই মোটামুটি হাল ছেড়ে দিয়েছে যে ও ভাবে হবে না। এই সরকারের সময় কর্মসংস্থানের কোনও বৃদ্ধি হয়নি, কংগ্রেস পার্টি হয়তো তার জবাবে এই ‘ন্যায়’-এর প্রকল্পটা করেছে। কিন্তু যখন নির্বাচনের কথা হচ্ছে, তখন চাকরি, কর্মসংস্থান, আয়বৃদ্ধি— এগুলো আর শোনা যাচ্ছে না। এখন কে কাকে কত দেবে, তা নিয়েই কথা হচ্ছে।

এত টাকা যদি হস্তান্তর করতে হয়, সেটা আসবে কোথা থেকে? দুই দলই বলছে আমরা দেব— কিন্তু কী করে দেব, কোথা থেকে নিয়ে দেব, সে বিষয়ে কেউ উচ্চবাচ্য করছে না। যদি এমন অবস্থা হয় যে এই টাকা দিতে গিয়ে কর এত বাড়াতে হল যে বৃদ্ধির হার কমে গেল, তা হলে বেশি দিন চালাতে পারবে না, কিন্তু রাজনৈতিক ভাবে ছাড়তেও পারবে না। 

প্র: এখন তো আরও বলা হচ্ছে, দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ৬ শতাংশ শিক্ষাখাতে খরচ হবে, স্বাস্থ্যে হবে ৩ শতাংশ। এই খরচটা কি আদৌ করা সম্ভব? 

উ: স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি খরচ হয় প্রাথমিক স্বাস্থ্যে। সেই খরচের পুরোটাই বহন করে রাজ্য। কেন্দ্র খরচ করে সেকন্ডারি আর টার্শিয়ারি খাতে। এখন আমাদের দেশে জিডিপির ১.৯ শতাংশ স্বাস্থ্যখাতে খরচ হয়। তার মধ্যে ০.৭ শতাংশ করে কেন্দ্র, বাকিটা রাজ্য। এটাকে যদি ৩ শতাংশে নিয়ে যেতে হয়, কেন্দ্রের খরচ খুব বাড়বে না। ০.২ থেকে ০.৩ শতাংশ-বিন্দু বাড়বে। বাড়বে বেশি রাজ্যের। ন্যূনতম ১ শতাংশ-বিন্দু খরচ বাড়াতে হবে। রাজ্যের কাছে সে টাকা আছে কি না, বড় প্রশ্ন। কেন্দ্রের কাছে যথেষ্ট টাকা আছে। শিক্ষার ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। আড়াই শতাংশ-বিন্দু জিডিপি বাড়াতে হবে। এবং সেটাও প্রধানত রাজ্যকেই বাড়াতে হবে। আসল সমস্যাটা হল রাজ্যের। কেন্দ্র থেকে আমি বলে গেলাম যে আমি বাড়াব, কিন্তু আমার সেটা করার এক্তিয়ার নেই। সেটা রাজ্যকেই করতে হবে। 

প্র: কেন্দ্রীয় সরকারের পিএম কিসান স্কিম বা কংগ্রেসের ‘ন্যায়’ প্রকল্পের মতো পথে কি বাস্তবে দারিদ্র দূরীকরণ হতে পারে? 

উ: না। দারিদ্র দূরীকরণ তখনই হতে পারে যখন সাধারণ গরিব মানুষ নিজেদের জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ নিজেরা রোজগার করতে পারবেন। যাঁদের অন্য কোনও উপায় নেই, কাজ করতে পারেন না— যেমন, বৃদ্ধ বা প্রতিবন্ধী— এ রকম প্রকল্প তাঁদের জন্য করুন। আজকাল আমাদের পেনশন স্কিম আছে, ওল্ড এজ পেনশন স্কিম, প্রতিবন্ধী পেনশন স্কিম— এগুলির মাত্রা খুবই কম, সেই মাত্রাটা বাড়ান। কিন্তু যাঁরা কাজ করতে পারেন, আপনার দায়িত্ব হল তাঁদের জন্য কাজ কী করে বাড়াতে পারেন, সেটা দেখা। 

প্র: আপনারা যোজনা কমিশন থেকে দারিদ্র দূরীকরণের ওপর একটা বড় কাজ করেছিলেন, যেটাকে ইউপিএ সরকার নিজেদের সাফল্য বলে দাবি করে। ওই সময় কখনও নগদ আয় হস্তান্তরের কোনও চিন্তাভাবনা করা হয়েছিল?

উ: হয়েছিল। আলোচনাও হয়েছিল। তার ফল ছিল জাতীয় কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা যোজনা। যিনি কাজ করতে পারেন, যিনি কাজ করতে চান, তাঁকে আমরা কাজ দেব। তিনি কাজ চাইলেই দেব। এমন নয় যে এটা চাকরির মতো, যে একটা নির্দিষ্ট সংখ্যক পোস্ট আছে। কাজ যিনি চাইবেন, তাঁকে, পরিবার পিছু, একশো দিন পর্যন্ত দিতেই হবে। এটা আইন। এই যে ২০০০ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে দারিদ্র এতটা কমেছে, তার একটা কারণ হল একশো দিনের কাজ।

প্র: যোজনা কমিশন তখন নগদ আয় হস্তান্তরের কথা ভাবেনি কেন? 

উ: আয় হস্তান্তরের সমস্যা হল, এটা প্রয়োজন মাফিক পরিমার্জন করা যায় না। ধরুন, আজকে আমি সমীক্ষা করে দেখলাম, একটি পরিবারের প্রধান যিনি, তিনি খুব গরিব। তাঁর দু’টি বাচ্চা আছে, তাদের মানুষ করতে, ভরণপোষণ করতে অনেক খরচ। সাত বছর বাদে বাচ্চারা বড় হয়ে কাজে যোগ দিল। পরিবারের আয় তিন গুণ হয়ে গেল। দায়দায়িত্ব কমে গেল। কিন্তু তখন যদি অনুদান বন্ধ করা হয়, তাতে মানুষের রাগ হবে, আইন-আদালত হবে, রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া হবে। 

প্র: এখন বলা হচ্ছে একশো দিনের কাজটা দেড়শো দিন হওয়া দরকার। তার মানে কি এই যে, কর্মসংস্থানের হাল আরও খারাপ হয়েছে?

উ: কিছু কিছু পরিবার থাকবেই যাদের একশো দিনের চেয়ে বেশি দিন কাজ প্রয়োজন। যেমন, যে পরিবারের সদস্যসংখ্যা বেশি। কিন্তু যখন এনআরইজিএ তার শীর্ষে ছিল, ২০০৯ সালে, তখন খরা হয়েছিল। বহু লোক তখন এনআরইজিএ-র সাহায্য নিয়েছিলেন। তখনও কিন্তু মাথাপিছু গড়ে ৬৫ দিন কাজ করেছিলেন। সেটাই সবচেয়ে বেশি। যে সময়টায় হাতে কোনও কাজ নেই, তখন সকলেই কিছু না কিছু কাজ করতে চান। কিন্তু অন্য কাজও তো আছে। যেই অন্য কাজটা চালু হল, তখন লোকে এনআরইজিএ ছেড়ে দিলেন। 

প্র: যথার্থ চাকরি তৈরির উপযোগী নীতি নির্ধারণে কি কোনও অভাব রয়েছে? 

উ: প্রশ্নটা হল, চাকরি আসবে কোথা থেকে? স্পষ্টতই, বিনিয়োগ আর বৃদ্ধি দরকার। কিন্তু কী রকম বিনিয়োগ, কী রকম বৃদ্ধি, কোন সেক্টরে, এগুলি নিয়ে ভাবনাচিন্তা না করলে হবে না। এখন সারা দুনিয়াতে আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স এবং রোবোটিক্স নিয়ে সবাই চিন্তায় পড়েছেন যে, চাকরি হারাতে হবে। সে চিন্তা কিন্তু আমাদের দেশেও আছে। কর্পোরেট সেক্টরে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এখনও পৌঁছয়নি, কিন্তু মেকানাইজ়েশন, রোবোটিক্স পৌঁছে গিয়েছে। আমাদের উৎপাদন বাড়ছে, জিডিপি বাড়ছে, কিন্তু চাকরি কমে যাচ্ছে।

প্র: সরকারের নতুন মুখ্য অর্থনৈতিক উপদেষ্টা বলেছেন, পাঁচ বছরে প্রায় ছ’কোটি চাকরি হয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন স্কিমে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে।

উ: এটা কর্মসংস্থানের হিসেব কষার ভাল পদ্ধতি নয়। যদি কোনও নির্দিষ্ট ক্ষেত্রের কথা বলেন, তা হলে হয়তো সেই ক্ষেত্রগুলিতে কাজ বেড়েছে। কিন্তু তাতে নেট কাজের পরিমাণ বেড়েছে কি না, বলা মুশকিল। 

প্র: প্রধানমন্ত্রীও কাজ বাড়ার নানা উদাহরণ দিয়েছেন। যেমন, দুটো গাড়ি বাজারে নতুন এসেছে তো পাঁচ জন লোকের কাজ হচ্ছে, রেলরাস্তা তৈরি হলে অনেকের কাজ বাড়ছে। 

উ: নিশ্চয়ই হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, ওঁরা আগেও চাকরি করছিলেন কি না। এটা নতুন কর্মসংস্থান কি না।

প্র: রঘুরাম রাজন প্রশ্ন তুলেছেন— চাকরি যখন হচ্ছে না, তবে কি সত্যিই ৭ শতাংশ হারে অর্থনীতির বৃদ্ধি হচ্ছে? জিডিপির হিসেব নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। 

উ: জিডিপি তিন ভাবে বাড়তে পারে। প্রথম, উৎপাদন বাড়ছে, সেই অনুপাতে কমর্সংস্থান বাড়ছে। দ্বিতীয় হল, উৎপাদন-ক্ষমতা বাড়ছে, তাতে উৎপাদন বাড়বে কিন্তু চাকরি তুলনায় কম হবে। তৃতীয়ত, পণ্যের মান উন্নত হয়ে যাচ্ছে। যেমন আগে এক রকমের গাড়ি বানাতেন, এখন বেশি দামি মডেলের গাড়ি বানাচ্ছেন। তাতে কর্মসংস্থানের হেরফের না হলেও জিডিপি বেড়ে যায়। জিডিপি বাড়া আর কর্মসংস্থান না বাড়া, এর অনেক কারণ থাকতে পারে। কেউ যদি বলেন, জিডিপি বাড়ছে মানেই কাজ বাড়ছে, তা হলে তিনি এই জটিলতাটা বুঝছেন না। 

প্র: আরও একটা প্রশ্ন হল, কর্মসংস্থানের মান নিয়ে। আন্ডারএমপ্লয়মেন্ট বা খণ্ড-বেকারত্বের কথা নীতি আয়োগও বলছে...

উ: নীতি আয়োগের কথা ছেড়ে দিন, খণ্ড-বেকারত্ব চিরকালই ছিল। আমাদের কর্মসংস্থানের তথ্য যদি দেখেন, প্রকট বেকারত্ব— অর্থাৎ যাঁরা একেবারেই কাজহীন— সেই অনুপাত ২-২.৫% হত। খণ্ড-বেকারত্বের পরিমাপ ৯ শতাংশের কাছাকাছি হত। এটা বহু বছর ধরে চলছে, নতুন কিছু নয়। যখন এক জন একেবারেই কাজ করছেন না, তখন তাঁকে যে কোনও কাজেই লাগানো হোক না কেন, তাঁর একটা উন্নতি হবে। কিন্তু যিনি খণ্ড-বেকার, তিনি কাজ করছেন কিন্তু পুরো সময়ের কাজ পাচ্ছেন না। যদি কৃষি ক্ষেত্রে দেখেন, আগে এক জন চাষি বছরে ১৬০ থেকে ১৮০ দিন কাজ করতেন, বাকি সময়টা কাজ করতেন না। এ রকম এক জন চাষিকে তো কোনও কারখানায় কাজ দিয়ে বলা যায় না যে আমি আপনাকে দিনে দশ ঘণ্টা কাজ দেব, আপনি চাষবাস ছেড়ে দিন। যেটা করতে হবে, তা হল, তিনি চাষবাস করবেন, আর ফাঁকা সময়ে অন্য একটা কাজ তাঁকে দিতে হবে। কর্মসংস্থান যোজনা এই চেষ্টা করছে। এবং এটা খারাপ প্রচেষ্টা নয়। এখন বছরে দু’বার বা কোথাও তিন বার শস্য ফলাচ্ছেন চাষিরা। ১০০ দিনের কাজ চাষিরা পেয়ে যাচ্ছেন এবং এই ভাবে খণ্ড-বেকারত্বের সমস্যার অনেকটা সমাধান হয়েছে। 

প্র: কিন্তু শহরে কী হবে? 

উ: শহরে যাঁরা ক্যাজ়ুয়াল শ্রমিক, তাঁরা দিনে চার-পাঁচ রকমের কাজ করেন। ফলে শহরের ক্ষেত্রেও এটা ভেবে দেখা যায়। যাকে বলা হচ্ছে গিগ ইকনমি— লোকেদের বাঁধা চাকরি নেই কিন্তু বাজারে কাজ আছে। এটা খণ্ড-বেকারত্বের সমাধান হতে পারে। কিন্তু, বেকারত্বের উত্তর নয়। (চলবে) 

 

ন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিকাল কমিশনের ভূতপূর্ব চেয়ারম্যান, যোজনা কমিশনের ভূতপূর্ব উপদেষ্টা ও কেন্দ্রীয় সরকারের ভূতপূর্ব চিফ স্ট্যাটিস্টিশিয়ান

সাক্ষাৎকার: প্রেমাংশু চৌধুরী