স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্যের ‘দুঃসাহস, না কি দুরভিসন্ধি’ (৮-১১) প্রবন্ধটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক। বিষয়টি বাঙালি ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও আবেগের উপর একটি চরম আঘাত। লেখকের তথ্যসমৃদ্ধ প্রতিবাদী লেখাটি বাঙালির আবেগে একটি প্রলেপ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অমর সৃষ্টি, ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটি গাওয়ার জন্য ‘দেশদ্রোহিতা’ বলে গণ্য করার ঘটনাটি গভীর উদ্বেগ ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিষয়টিকে পশ্চিমবঙ্গের কিছু বিজেপি নেতাও সমর্থন জানিয়েছেন। এই সিদ্ধান্ত শুধু রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, সাংস্কৃতিক ও নৈতিক দিক থেকেও অত্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ গানটি কেবল বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত নয়, এটি সমগ্র বাঙালির হৃদয়ের আবেগ, আত্মপরিচয় ও মাটির প্রতি ভালবাসার প্রতীক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন এই গানটি রচনা করেন, তখন ভারত ছিল ব্রিটিশ শাসনের অধীনে। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের প্রেক্ষাপটে বাঙালির একতার প্রতীক হিসাবে গানটি রচিত হয়েছিল। অর্থাৎ, গানটির মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশপ্রেম ও জাতীয় ঐক্যের বার্তা। অনেক পরে প্রতিবেশী বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে এটি স্বীকৃত হলেও, তার উৎস এবং ভাব সম্পূর্ণ ভারতীয় ও মানবিক। তাই এই গানকে দেশদ্রোহিতার প্রতীক হিসাবে দেখা কেবল ইতিহাস অজ্ঞতা নয়, এক বিপজ্জনক অভিসন্ধিও বটে।
বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো যথার্থ ভাবেই এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেবল পশ্চিমবঙ্গের নয়, ভারত তথা বিশ্বের অহঙ্কার। তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আমাদের দেশের জাতীয় সঙ্গীতের স্রষ্টা। বিভাজন রাজনীতির ছুরিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃষ্টিকে কেটে দেওয়া মানে ভারতীয় সংস্কৃতির শিকড়ে আঘাত করা। এই ঘটনায় প্রশ্ন জাগে— দেশপ্রেমের বা দেশদ্রোহিতার সংজ্ঞা কে নির্ধারণ করবে? কোনও রাজনৈতিক দল কি দেশপ্রেমকে নিজেদের মতাদর্শে বন্দি করতে পারে? কিংবা দেশদ্রোহিতার নতুন রাজনৈতিক সংজ্ঞা তৈরি করতে পারে? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান গাওয়া যদি দেশদ্রোহিতা হয়, তবে শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সব সীমানাই কি রাজনীতির নির্দেশে নির্ধারিত হবে? দেশপ্রেম মানে যদি অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনও ভাব বা স্মৃতি মুছে ফেলা হয়, তবে সেটা আসলে জাতীয়তাবাদ নয়, সাম্প্রদায়িক মনোভাব। ভারত ধর্মনিরপেক্ষ, বহুত্ববাদী দেশ। এখানে বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতির মানুষ এক সঙ্গে পাশাপাশি বসবাস করেন। রবীন্দ্রনাথ সেই ভারতের প্রতীক। যেখানে দেশপ্রেম মানে মানবপ্রেম, বিভেদ নয় ঐক্য। তাই এই অপবাদ কেবল একটি গানের প্রতি অপমান নয়, বরং ভারতীয় চেতনা ও সহনশীলতারও অপমান। আজ প্রয়োজন এই সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক চিন্তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথের সর্বজনীন ভাবধারাকে পুনরায় প্রতিষ্ঠা করা। তাই এই গান প্রতিবেশী বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে স্বীকৃত বলে ‘নিষিদ্ধ’ হলেও আজ পশ্চিমবঙ্গবাসীর কাছে প্রতিবাদের ভাষা হয়ে গিয়েছে। দিকে দিকে এই গান গেয়েই চলছে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ। কারণ শুধু আমাদের প্রতিবেশী বাংলাদেশের নয়, এ গান সমগ্র বাঙালির মাটির গন্ধ, হৃদয়ের সুর, আত্মার আলো। এই গান গাওয়া দেশদ্রোহিতা নয়, বরং মানবতা ও ঐক্যের মহান উচ্চারণ।
গৌতম পতি, তমলুক, পূর্ব মেদিনীপুর
গানের দর্শন
স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্যের ‘দুঃসাহস, না কি দুরভিসন্ধি’ শীর্ষক প্রবন্ধটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও সময়োচিত। সম্প্রতি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অমর সৃষ্টি ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটিকে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা গভীর আঘাত করছে প্রতিটি বাঙালির হৃদয়কে। এটি বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনা ও ভাষার সঙ্গে মিশে আছে। রয়েছে ইতিহাসের প্রাণস্পন্দন। আছে মাটির টান। অথচ আজ সেই গানকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘আমার সোনার বাংলা’ লিখেছিলেন বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সময়ে। তখন বাঙালির ভিতরে ছিল গভীর ক্ষোভ, হাহাকার এবং ভাঙনের বেদনা। সেই সময়ে এই গানটি ছিল প্রতিবাদের ভাষা, ঐক্যের আহ্বান এবং মাতৃভূমির প্রতি অটল ভালবাসার প্রতীক। এই গানেই তিনি বাঙালির মাটিকে তুলনা করেছেন সোনার সঙ্গে। যা সম্পদের কারণে নয়, আত্মার ঐশ্বর্যে ধনী।
এ গান কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতার গান নয়, এটি সাংস্কৃতিক মুক্তির গানও। অথচ আজ কিছু মানুষ এই গানকে প্রাচীন, অপ্রাসঙ্গিক বলে অবমাননা করছেন। তাঁদের কাছে প্রশ্ন, আমরা যদি নিজের দেশের মাটি, ভাষা, সংস্কৃতি ও মানুষের প্রতি ভালবাসাকে লজ্জার বিষয় মনে করি তবে আমরা কেমন নাগরিক? মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকতেই পারে, কিন্তু তা যেন কোনও জাতীয় ঐক্যের প্রতীককে ভাঙার অস্ত্র না হয়। রবীন্দ্রনাথ নিজে মানবতাবাদী ছিলেন, তিনি কখনও সঙ্কীর্ণ জাতীয়তাবাদের পক্ষপাতী ছিলেন না। অথচ আজ তাঁরই গানকে সঙ্কীর্ণতার অভিযোগে কাঠগড়ায় তোলা হচ্ছে। এ যেন তাঁর ভাবনারই বিকৃতি। কবিগুরু তাঁর লেখায় এবং জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের কথা বলেছেন, সম্প্রীতির বার্তা দিয়েছেন।
এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে দুই বাংলার মানুষ এই গানেই খুঁজে পেয়েছেন মিলনের সেতু, ভাষার ঐক্য ও সংস্কৃতির গৌরব। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতিগত যোগ এত গভীর যে, তা মুছে ফেলা সম্ভব নয়। আজ যখন সমাজে বিভাজন, ধর্মীয় মেরুকরণ ও বিদ্বেষ বাড়ছে, তখন এই গানের প্রাসঙ্গিকতা আরও বেশি। এই গানই মনে করিয়ে দেয় আমরা প্রথমত বাঙালি, মানবিক, রাজনীতির হাতিয়ার নয়।
আজকের বাঙালি সমাজের কাছে আবেদন রবীন্দ্রনাথকে শুধুমাত্র পাঠ্যবইয়ের পাতায় নয়, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ধারণ করতে হবে। তাঁর গান, তাঁর দর্শন, তাঁর মানবপ্রেমই আমাদের পথ দেখাতে পারে। বিতর্ক নয়, বোঝাপড়া হোক আমাদের সংস্কৃতির ভিত্তি। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন— ‘তোমার আকাশ তোমার বাতাস, আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি’। সেই সুরকে যেন কেউ নষ্ট না করে। এই সুরই বাঙালির অস্তিত্বের পরিচয়, জাতির অন্তরের মন্ত্র। বাঙালির সম্পদ।
বিপদতারণ ধীবর, বেলিয়াতোড়, বাঁকুড়া
দুঃখজনক
স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্যের লেখা ‘দুঃসাহস, না কি দুরভিসন্ধি’ বিষয়ে কিছু কথা। প্রবন্ধকার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ‘আমার সোনার বাংলা’ সম্পর্কে যে তথ্য তুলে ধরেছেন, স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সঙ্গে যাঁরা নাড়ির টান অনুভব করেন, তাঁদের তা ব্যথিত করে তুলবে।
গানটির মধ্যে ফুটে উঠেছে বাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সম্পদ, ভাষা ইত্যাদির গরিমা এবং সেই সঙ্গে মাতৃভূমির প্রতি প্রেম ও কৃতজ্ঞতা। প্রশ্ন জাগে— আজ এই গান কেউ যদি ইংল্যান্ড, আমেরিকা কিংবা ইউরোপের মাটিতে গেয়ে ওঠেন, সেই দেশ কি তাঁকে রাষ্ট্রদ্রোহী বলে দাগিয়ে দেবে? সম্ভবত না। অথচ, দেশের মাটিতে দেশের গান গাইতে গেলে রাষ্ট্রদ্রোহী বলে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এর চেয়ে দুঃখজনক আর কী?
বাবুলাল দাস, ইছাপুর, উত্তর ২৪ পরগনা
মুক্তি চাই
প্রেমাংশু চৌধুরীর লেখা ‘পিএম-শ্রী শিক্ষার হাল’ (৬-১১) প্রসঙ্গে কিছু কথা। এই রাজ্যের শিক্ষাক্ষেত্রে যে শব্দটা ভীষণ রকম দাপিয়ে বেড়াচ্ছে তা হল ‘নেই’। স্কুলের পরিকাঠামো নেই, ছাত্র নেই, শিক্ষক নেই, পড়াশোনা শিকেয়, চক ডাস্টার নেই, ঘণ্টা বাজানোর লোকও নেই। এ ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা কি কাম্য? সরকারি স্কুলগুলি একদা পঠনপাঠনে শিক্ষকগৌরবে এবং ছাত্রসাফল্যে উজ্জ্বল ছিল, সে দিন আজ অতীত। শিক্ষা-বহির্ভূত কাজে শিক্ষকদের ব্যস্ত রাখলে ছাত্রদের দিকে মন দেবেন কখন? মুক্তির উপায় খুঁজতেই হবে।
দিলীপ কুমার সেনগুপ্ত, বিরাটি, উত্তর চব্বিশ পরগনা
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)