E-Paper

‘ভাল একনায়ক’ নেই

কোনও এক স্বৈরশাসকের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দীর্ঘ এবং সুকঠিন লড়াইয়ের পর যিনি ক্ষমতায় আসেন, তিনিও ক্রমে হয়ে ওঠেন সেই স্বৈরশাসকেরই প্রতিমূর্তি, কখনও বা তাঁর চেয়েও ভয়ঙ্কর।

সুহাসিনী ইসলাম

শেষ আপডেট: ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫ ০৬:১১

গোটা দুনিয়ার কোনও এক জন সর্বাধিপত্যকামী একনায়ক শাসকও কি কখনও স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছাড়বেন? তাঁদের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভকে সম্মান জানিয়ে বলবেন, ‘আর নয়’? এই প্রশ্নের উত্তরটি দুর্ভাগ্যজনক ভাবে আমাদের জানা— না, এক জনও স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছাড়ার কথা ভাববেন না। বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বা ভ্লাদিমির পুতিনের মতো সুপরিচিত নামও যেমন যত দিন সম্ভব ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা করবেন, তেমনই চেষ্টা করবেন দুনিয়ার অন্যান্য দেশের ছোট-বড় সব সর্বাধিপত্যকামী শাসক।

কথাটা শুনলে আপাতভাবে মনে হতে পারে, এ আর নতুন কী! একনায়করা ক্ষমতা ছাড়তে চান না বলেই তো মাঝেমধ্যেই বিক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে, শাসকের প্রাসাদের দখল নেন সাধারণ মানুষ। কিন্তু, একনায়ক হলেই তিনি আমৃত্যু ক্ষমতায় থাকতে চাইবেন, এই পূর্বানুমান থেকে যদি সরে এসে ভাবা হয় যে, একটা নির্দিষ্ট বয়স পেরোলে তিনিও অবসর নিতে চান, নিরন্তর রাজনৈতিক চাল-পাল্টা চালের খেলা সাঙ্গ করে শান্তিতে কাটাতে চান শেষ বছরগুলো, তবুও কি তাঁর পক্ষে সম্ভব ক্ষমতা থেকে সরে আসা?

যদি ধরে নিই যে, আমাদের আলোচনার একনায়ক নির্ভেজাল শয়তান নন— তাঁর মধ্যে মানবিক প্রবৃত্তি ছিল, এবং খানিকটা অবশিষ্ট আছে; গণতন্ত্রকে পদপিষ্ট করায় তাঁর খানিক অনুশোচনাও হয়, অন্তত গোপনে— তেমন কারও পক্ষেও শেষ অবধি স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ত্যাগ করা অসম্ভব। কারণ, ক্ষমতায় থাকাকালীন তিনি যত লোককে নিষ্ঠুর ভাবে দমন করেছেন, যত শত্রু তৈরি করেছেন, তিনি ক্ষমতা ছাড়লে তাঁরা ছেড়ে কথা বলবেন না। হয় গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে তাঁর বিরুদ্ধে কমিশন বসবে, বিচার হবে; নয়তো সটান গর্দান যাবে। ফলে, আমাদের এই একনায়কের হাতে একটাই বিকল্প থাকে— দমনের মাত্রা উত্তরোত্তর বাড়িয়ে চলা। বছর দুয়েক আগে অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু এক গবেষণাপত্রে (দ্য মর্ফিং অব ডিক্টেটরস: হোয়াই ডিক্টেটরস গেট ওয়র্স ওভার টাইম, অক্সফোর্ড ওপেন ইকনমিক্স, দ্বিতীয় খণ্ড, ২০২৩) অঙ্ক কষে দেখিয়েছিলেন, কেন কোনও একনায়কের পক্ষে চাইলেও ক্ষমতা ত্যাগ করা সম্ভব নয়।

তার জন্য যে গোড়া থেকেই তাঁকে খল প্রবৃত্তির লোক হতে হবে, এমনটা নয়। দুনিয়ায় বহু উদাহরণ আছে, যেখানে কোনও এক স্বৈরশাসকের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দীর্ঘ এবং সুকঠিন লড়াইয়ের পর যিনি ক্ষমতায় আসেন, তিনিও ক্রমে হয়ে ওঠেন সেই স্বৈরশাসকেরই প্রতিমূর্তি, কখনও বা তাঁর চেয়েও ভয়ঙ্কর। গোড়ায় হয়তো তিনি সাধারণ মানুষের ভালর জন্যই কঠোর হাতে শাসন করতে আরম্ভ করেন, এমনকি কঠোর হতে তাঁর খারাপ লাগলেও— ‘বেনেভলেন্ট ডিক্টেটর’ বা ‘ভাল একনায়ক’ যাকে বলে। কিন্তু, এখানেই গোলমালেরও সূচনা। ধরা যাক, একটি নির্দিষ্ট সময় অন্তর তাঁকে ভোটে লড়ে ক্ষমতায় ফিরতে হবে। প্রতি দফাতেই নির্বাচন জিতে এসে তাঁকে ভাবতে হবে পরের বার জেতার কথা— এবং, সেই জয় নির্ভর করবে আগের দফায় অত্যাচারের মাত্রার উপরে। শাসন কালে কোনও রকম অগণতান্ত্রিক কাজ না করলে পরের দফায় জেতার সুযোগ নেই; আর অগণতান্ত্রিক কাজের মাত্রা যত বাড়বে, মানুষের ক্ষোভও ততই বাড়বে, ফলে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ানো কঠিনতর হবে। অতএব, আমাদের ‘ভাল একনায়ক’ যদি মানুষের উপকার চেয়েও শুরুতে এক বার গণতন্ত্রহীনতার পথে পা বাড়ান, তাঁর পক্ষে আর সে পথ থেকে ফেরার উপায় নেই। প্রতি দফায় তাঁকে অত্যাচারের মাত্রা বাড়িয়েই চলতে হবে— অন্তত যত দিন না তাঁর বিরুদ্ধে কোনও বিপ্লবের ‘বসন্ত বাতাস’ সুতীব্র হয়ে ওঠে। সে ক্ষেত্রে একনায়কদের পরিণতি হয় ভয়ঙ্কর।

এক বার অত্যাচারের পথে হাঁটলে যে আর ফিরে আসার উপায় নেই, এই কথাটা শাসনের একেবারে প্রথম দিনেই বোঝা সম্ভব, উপরের যুক্তিক্রমটি ব্যবহার করে। যে শাসক স্বভাবত মন্দ লোক নন, তাঁর এই শেষ দিনের কথা ভাবাই উচিত; এমনকি, যিনি চরিত্রগত ভাবেই মন্দ, তাঁরও ভাবা উচিত নিজের সম্ভাব্য পরিণতির কথা। ভাবলে, প্রথম দিন থেকেই কেউ আর দমনের পথে হাঁটবেন না, গণতন্ত্রের নিয়মকানুন মেনে চলবেন। কিন্তু গোটা দুনিয়া সাক্ষী যে, প্রায় সর্বত্রই কখনও না কখনও ক্ষমতায় এসেছেন কোনও সর্বাধিপত্যকামী একনায়ক। সেটা কী ভাবে হয়? তার সহজ উত্তর, দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যের সঙ্গে স্বল্পমেয়াদি কৌশলের সম্পূর্ণ সাযুজ্য বজায় রাখতে গেলে এক জনকে প্রতিনিয়ত যতখানি লাভ-ক্ষতির হিসাব কষতে হয়— অর্থশাস্ত্রের ভাষায়, অপটিমাইজ়েশন করে চলতে হয়— তা কোনও মানুষের পক্ষেই সম্ভব নয়। সে কাজ পারে অর্থশাস্ত্রের পাঠ্যবইয়ের পাতায় থাকা হোমো ইকনমিকাস বা অর্থনৈতিক মানব। অন্য দিকে, হোমো সেপিয়েন্স বা বাস্তবের রক্তমাংসের মানুষের চরিত্র হল, সে দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের কথা ভুলে সামনে থাকা সমস্যাটির সমাধান খোঁজে। একনায়করাও— কী আশ্চর্য— রক্তমাংসেরই মানুষ। ফলে, তাঁরাও দীর্ঘমেয়াদে পালাবার পথের কথা ভুলে আপাতত ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য উত্তরোত্তর অত্যাচারের মাত্রা বাড়িয়ে চলেন। এক কালের ‘ভাল একনায়ক’ পরিণত হন নিতান্ত দানবে।

তা হলে কি এই একাধিপত্যকামী একনায়কদের থামানোর কোনও উপায় নেই? অধ্যাপক বসু তাঁর গবেষণাপত্রে জানিয়েছেন, আছে। এক নয়, একাধিক উপায় সম্ভব। প্রথম উপায় হতে পারে, দেশের সর্বোচ্চ পদে থাকার মেয়াদ বেঁধে দেওয়া হল দুু’দফায়— অর্থাৎ, দু’বারের বেশি কেউ দেশের প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না। ফলে, যিনিই ক্ষমতায় আসুন, তিনিই জানবেন যে, দ্বিতীয় দফা শেষ হলে তাঁকে ক্ষমতা ছাড়তেই হবে। এমনিতেই যে কোনও শাসকের পক্ষে তাঁর শেষ দফায় অন্যায় না করাই ঠিক স্ট্র্যাটেজি। কেউ যদি জানেন যে, দ্বিতীয় দফার পরে আর সুযোগ নেই, প্রথম দফাতেই তিনি সংযত থাকবেন, সে সম্ভাবনা বাড়ে। এখানে একটা কথা বলে রাখা প্রয়োজন— ক্ষমতায় এলেই যে কাউকে অন্যায় বা দমনের নীতি গ্রহণ করতে হবে, এমন কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। বস্তুত, মানুষের ভাল করা বা অন্তত জনসমক্ষে তেমন একটা ধারণা বজায় রাখা রাজনৈতিক সাফল্যের জন্য জরুরি। কিন্তু, যে-হেতু সেই ‘ভাল’ স্ট্র্যাটেজি সব পক্ষই সমান ভাবে গ্রহণ করে, ফলে তার কার্যকারিতা ফুরিয়ে যায় কিছু দিনের মধ্যেই। তখন মন্দ নীতিই জোর। শাসকের মেয়াদ বেঁধে দিয়ে সেই নীতিকে খানিক ভোঁতা করা যায় বটে।

তবে, গোটা রাষ্ট্রক্ষমতা যিনি দখল করে নেন, তিনি আগে থেকে বেঁধে দেওয়া মেয়াদের গণ্ডিই বা মানবেন কেন? চাইলেই সংবিধান নিলম্বিত করে নিজের হাতে আরও বেশি ক্ষমতা তুলে নেবেন তিনি। এখানেই বৈশ্বিক ব্যবস্থার গুরুত্ব। প্রতিটি দেশ যদি রাজনৈতিক ভাবে বিচ্ছিন্ন একক হিসাবে অবস্থান না করে একটি বৈশ্বিক সংবিধানের মাধ্যমে বাঁধা থাকে, যাতে কোনও একটি দেশের শাসক গণতন্ত্রের চূড়ান্ত সীমা লঙ্ঘন করলে অন্য দেশগুলি জোটবদ্ধ ভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারে, তা হলে সেই হস্তক্ষেপের নিশ্চিত সম্ভাবনাই শাসকের স্বৈরতান্ত্রিক প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণে রাখবে।

বলতে পারেন যে, এই দুই সম্ভাবনাই সুদূরপরাহত। সত্যিই তাই। কিন্তু, তৃতীয় পথটিতে এখনই হাঁটা সম্ভব, কোনও সংবিধান না পাল্টে, বৈশ্বিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন না করেই। সে পথে সাধারণ মানুষকে শুধু মনে রাখতে হবে, ‘ভাল একনায়ক’ বলে কিছু হয় না। হতে পারে না। যতই মনে হোক যে, কোনও শাসক দেশের মানুষের ভাল চেয়েই বজ্রমুষ্টিতে শাসন করছেন, আসলে যে কালক্রমে তিনি প্রবল স্বৈরতন্ত্রী হয়ে উঠবেনই, এ কথাটা কখনও ভুললে চলবে না। কোনও নেতার ছাতির মাপ, মনের কথা, চোখের জলে যেন তাঁর স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতাকে আমরা সমর্থন না করে ফেলি, প্রতি মুহূর্তে সে বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Ruler Government

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy