Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

১৭ জানুয়ারি ২০২২ ই-পেপার

গদিতে যারাই বসুক না কেন

তাপস সিংহ
৩১ জানুয়ারি ২০১৯ ০০:০০

সরকার বদলায়, রাষ্ট্র বদলায় না। বদলায় না রাষ্ট্রশক্তিও। পুরনো কথাটা ছত্তীসগঢ়ের একটি ঘটনায় ফের মনে পড়ল। ১৫ বছরের বিজেপি শাসনের অবসান ঘটিয়ে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সে রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছে কংগ্রেস। ভূপেশ বাঘেল মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরে আশাব্যঞ্জক বেশ কিছু কথা শুনিয়েছেন। বস্তারের জনজাতি আসলে কী চাইছেন, তা বুঝতে তাঁদের সঙ্গে আলোচনার কথা জানিয়েছেন। দলের শীর্ষস্তরের নীতি মেনে কৃষিঋণ মকুবের কথাও জানিয়েছেন অন্যান্য রাজ্যের সতীর্থদের মতোই।

কিন্তু গোলমাল বেধেছে অন্যত্র। বিজেপির শাসনকালে বস্তারে পুলিশের আইজি ছিলেন শিবরাম প্রসাদ কাল্লুরি। সাম্প্রতিক অতীতে কাল্লুরির মতো বিতর্ক আর কোনও আইপিএস অফিসারকে ঘিরে দানা বাঁধেনি। নিপীড়ন, ধর্ষণ, হামলা, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। গণসংগঠন ও মানবাধিকার কর্মীদের বস্তারে কাজ করতে না দেওয়া, সাংবাদিকদের হুমকি, নানা পথে ‘মাওবাদী’দের আত্মসমর্পণ করানোর পিছনেও তাঁর বড় ভূমিকা থাকার অভিযোগ উঠেছে বার বার। সে সব অভিযোগ এক সময় এমন আকার নেয় তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী রমন সিংহের কাছের অফিসার বলে পরিচিত কাল্লুরিকে বস্তার থেকে সদর দফতরে নিয়ে যেতে বাধ্য হয় রাজ্য প্রশাসন। সেই কাল্লুরিকেই সসম্মানে ফিরিয়ে আনলেন ভূপেশ বাঘেল, করে দিলেন ছত্তীসগঢ়ের অর্থনৈতিক অপরাধ শাখা (ইকনমিক অফেন্সেস উইং) এবং দুর্নীতি দমন শাখার (অ্যান্টি করাপশন বুরো) প্রধান। সেই ভূপেশ বাঘেল, যিনি একদা এই কাল্লুরিকেই ‘ধর্ষক’ অভিহিত করে বলেছিলেন, গরাদের আড়ালেই তাঁর স্থান হওয়া উচিত!

প্রসঙ্গত, বাঘেলের ঘনিষ্ঠ মহল সূত্রে জানা যাচ্ছে, কাল্লুরির এই পুনরুত্থান আটকাতে নাকি সচেষ্ট হন কিছু সিনিয়র পুলিশ অফিসার। তাঁরা নাকি মুখ্যমন্ত্রীকে বলেন, কাল্লুরি কেন্দ্রীয় সরকারের এক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ। আবার, এই কাল্লুরিই ছত্তীসগঢ়ের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী অজিত যোগী এবং তাঁর স্ত্রী রেনু যোগীর কাছের মানুষ ছিলেন। বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরে মুখ্যমন্ত্রী রমন সিংহেরও প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন তিনি। রাজনৈতিক মহল বলে, এই আইপিএস অফিসারের সব থেকে বড় গুণ হল তিনি বিনা বাক্যব্যয়ে রাজনৈতিক প্রভুদের আদেশ পালন করেন। তাঁর সব থেকে বড় ক্ষমতা— দ্রুত শাসক দলের প্রিয়পাত্র ও আস্থাভাজন হয়ে ওঠার। ‘সিস্টেম’ এই ধরনের আমলাদেরই ভালবাসে।

Advertisement

কাল্লুরিকে পুনর্বাসন দিয়েই ক্ষান্ত হননি বাঘেল। গণবণ্টন ব্যবস্থায় (পাবলিক ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম) ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির তদন্তে ছত্তীসগঢ় সরকার যে বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) গঠন করেছে, কাল্লুরিকে তার শীর্ষে বসানো হয়েছে। এই দুর্নীতি প্রথম প্রকাশ্যে আসে ২০১৪ সালে, যা ‘নান’ কেস (নাগরিক আপূর্তি নিগম) নামে স্থানীয় ভাবে পরিচিত। তৎকালীন বিরোধী দল কংগ্রেসের অভিযোগ ছিল, ৩৬ হাজার কোটি টাকার এই কেলেঙ্কারিতে বহু রাঘব-বোয়াল জড়িত। তদন্তের জন্য সিট গঠনের দাবি জানিয়ে ছত্তীসগঢ় হাইকোর্টে জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেন আইনজীবী সুদীপ শ্রীবাস্তব। তাঁর অভিযোগ, এ ঘটনায় দুর্নীতি দমন শাখার দায়ের করা এফআইআর-এ ২৭ জনের নাম থাকলেও চার্জশিট দেওয়া হয়েছে ১২ জনের বিরুদ্ধে। পরে অবশ্য আরও ৬ জনের নাম চার্জশিটে জোড়া হয়। তাঁদের মধ্যে দু’জন আইএএস অফিসারও আছেন। চার্জশিটে পুলিশ বলে, গণবণ্টন ব্যবস্থার খাদ্যদ্রব্য মানুষের খাবার অযোগ্য। অথচ কিছু অফিসার সেটাই পাঠানোর অনুমতি দিয়েছেন।

কাল্লুরিকে এ হেন দুর্নীতির তদন্তভার দেওয়ার তীব্র সমালোচনা করেছে বিরোধী আসনে বসা বিজেপি। রমন সিংহ বলছেন, সিট গঠনই আইনসম্মত ভাবে হয়নি। মামলা এখন হাইকোর্টে, চার্জশিটও দেওয়া হয়ে গিয়েছে— সিট গঠনের যুক্তি কী? কংগ্রেস আসলে প্রতিশোধের রাজনীতি করছে।

রমনের এ কথা বলার কারণ আছে। কংগ্রেস সরকারের মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই স্থির হয়, এই দুর্নীতির তদন্তের জাল আরও ছড়ানো হবে, কারণ আরও অনেক প্রভাবশালী এখনও জালের বাইরে রয়েছেন। রমন নিশ্চয়ই ভোলেননি, বিরোধী আসনে থাকাকালীন বাঘেল ও অন্যরা এই ‘নান’ দুর্নীতিতে রমনের স্ত্রীর জড়িত থাকার অভিযোগ এনেছিলেন।

এখানেই চাণক্যের ভূমিকা নিয়েছেন বাঘেল। কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার পদ্ধতি তিনি ভালই জানেন। তিনি জানেন, কাল্লুরির মতো রমনের ‘ঘরের কথা’ খুব কম অফিসারেরই জানা। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন যখন কাল্লুরিকে দিল্লিতে ডেকে পাঠায়, তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা বিস্তর অভিযোগ সামাল দিতে যখন রমন সরকার হিমশিম খাচ্ছে, সে সময়, ২০১৭-র ২ জানুয়ারি তাঁকে ছুটিতে যেতে বলা হয়। সেই কাল্লুরিকে শীতঘুম থেকে জাগিয়ে এত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার তদন্তভার সঁপে দেওয়ার অর্থ হল, তাঁকে ‘কাজ করে’ দেখাতে হবে। হয় তাঁকে প্রভাবশালীদের ধরে আদালতে হাজির করিয়ে বর্তমান শাসকের প্রিয়পাত্র হওয়ার সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে হবে, নয়তো আবার চলে যেতে হবে নির্বাসনে।

দুর্নীতি দমন শাখার প্রধান হিসেবে কাল্লুরিকে সামনে রেখে অজিত যোগীকেও ‘সবক’ শেখানোর রাস্তায় হাঁটতে পারেন বাঘেল। অভিযোগ আছে, ২০১৪-য় অন্তাগড় কেন্দ্রের উপনির্বাচনে কংগ্রেসের প্রার্থীকে ঘুষ দিয়ে নির্বাচনী লড়াই থেকে সরাতে চেয়েছিলেন যোগী। সে তদন্তও করাতে পারেন বাঘেল। যোগীর এক কালের ‘ঘরের লোক’কে দিয়েই সেই লক্ষ্যভেদ করতে চাইছেন বাঘেল।

এই দেখে ঘরের কাছের অনেক কথাই মনে পড়ে। মনে পড়ে কংগ্রেস আমলের দোর্দণ্ডপ্রতাপ ও বিতর্কিত পুলিশ অফিসার রুনু গুহনিয়োগীর কথা। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের স্নেহভাজন রুনুকে কিন্তু বামফ্রন্টের মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুও ঘাঁটাতে চাননি। বরং বলেছিলেন, ‘‘ওকে ধরব কী, ও তো ডাকাত ধরে!’’

তা হলে? দিনের শেষে হাতে কী থাকে? হাতে থাকে ‘সিস্টেম’, যে সিস্টেম ক্ষমতাসীনের সঙ্গেই থাকে। রাজ্যপাট বদল হলেও সিস্টেমের বদল হয় না। যেমন বদল হয় না ইতিহাসকে ভুলে যাওয়ার ট্র্যাডিশনেরও। যে কোনও পোড়খাওয়া রাজনীতিকই জানেন, ক্ষমতার বদল হতে না হতেই পাল্টে যায় আমলাদের অবস্থান। তবু আমলাতন্ত্রে ‘নিজের লোক’ তৈরি করতে চান তাঁরা। রাজনীতিকরাই শুধু কাল্লুরিদের এ ভাবে কাজে লাগান না, কাল্লুরিরাও খুব ভাল জানেন, ক্ষমতায় থাকা রাজনীতিকদের কী ভাবে কাজে লাগানো যায়!

আরও পড়ুন

Advertisement