একটি পুস্তকের প্রকাশ ঘিরিয়া অভূতপূর্ব পরিস্থিতি সৃষ্টি হইয়াছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। যশস্বী কানাডীয় লেখক মার্গারেট অ্যাটউডের নূতন উপন্যাস ‘দ্য টেস্টামেন্টস’-এর প্রকাশদিবস ধার্য হইয়াছে ১০ সেপ্টেম্বর। এই বইটি আসলে দ্বিতীয় পর্ব— ‘দ্য হ্যান্ডমেড’স টেল’ নামের প্রথম পর্বটি প্রকাশিত হইয়াছিল চৌত্রিশ বৎসর পূর্বে। ১৯৮৬ সালের বুকার পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত চূড়ান্ত ছয়টি বইয়ের মধ্যে উহা স্থান পাইয়াছিল। ‘দ্য টেস্টামেন্টস’ও এই বৎসর বুকার পুরস্কারের শর্টলিস্টে জায়গা করিয়া লইয়াছে। লেখক ইতিমধ্যে বিস্তর লিখিয়াছেন, ততোধিক সম্মান-ভূষণ পাইয়াছেন। চৌত্রিশ বৎসর পরেও একটি উপন্যাসের দ্বিতীয় পর্বের প্রকাশ ঘিরিয়া পাঠকদের উৎসাহ-উন্মাদনা লেখকের সাহিত্যকৃতি ও জনপ্রিয়তারই সাক্ষ্য। আগের বইটি হইতে চলচ্চিত্র, অপেরা ও জনপ্রিয় টিভি সিরিজ় নির্মিত হইয়াছে, বোদ্ধারা উহাকে বিগত পঞ্চাশ বৎসরের প্রভাবশালী সাহিত্যকর্মগুলির অন্যতম বলিয়া মনে করিয়াছেন। এই সমস্ত কিছুই ‘দ্য টেস্টামেন্টস’ নামের নূতন বইটি ঘিরিয়া প্রত্যাশাকে তুঙ্গস্পর্শী করিয়াছে।

সুতরাং বইটি সমগ্র বিশ্বে একই দিনে প্রকাশ পাইবে, প্রকাশক এমনই স্থির করিয়াছিলেন। কোনও দেশের উন্মুখ পাঠক আগে হাতে পাইবেন, তাহা হইবার কথা ছিল না। কিন্তু দেখা যাইল, বইটি অনলাইন ক্রয় করিতে অর্ডার করিয়াছিলেন যাঁহারা, তাঁহাদের অনেকেই সাত-তাড়াতাড়ি ডাক-মারফত পাইয়া গিয়াছেন। বই হাতে পাঠকদের সোল্লাস ও সহাস্য নিজস্বী সমাজমাধ্যমে শোভমান, অতি-উৎসাহী কেহ কেহ ‘রিভিউ’ পর্যন্ত লিখিয়া বাহবা কুড়াইতেছেন। আমেরিকার একক ও স্বাধীন বই-বিপণিগুলি ক্ষিপ্ত। তাহারা কোথায় আগের রাত হইতে অপেক্ষমাণ পাঠকের সর্পিল সারির স্বপ্ন দেখিতেছিলেন, এখন আর তাহা হইবে না। বই অনলাইন পাওয়া যাইলে দোকান অবধি ছুটিবে কে? বুকার পুরস্কারের বিচারকেরা বলিয়াছেন, এই বই ঘিরিয়া যে নিরাপত্তা বলয় ছিল, এমনটি তাঁহারা আগে দেখেন নাই। বিশেষ ভাবে নির্দিষ্ট কয়েকটি কপি বিচারকদের নিকট নিশ্ছিদ্র গোপনীয়তায় পাঠানো হইয়াছিল। তাঁহারা ভিন্ন বাড়ির অন্য কেহই প্রেরিত পার্সেলটি গ্রহণ করিতে পারিবেন না। এক বিচারককে বিদেশযাত্রার বিমান-টিকিট ক্যানসেল করিতে হইয়াছে, দ্বিতীয় বার দুধ কিনিতে দোকানে যাইলে বই-বাহক আসিয়া হাজির, তিন বারের চেষ্টায় তিনি বইটি হাতে পান। অন্য এক বিচারক বই পাইয়াই তৎক্ষণাৎ দেরাজে তালাবন্ধ করিয়া রাখেন, পাছে বাড়ির কেহ দেখিবার আগ্রহ প্রকাশ করে! বিচারকদের সকলকেই প্রকাশককে লিখিত মুচলেকা দিতে হইয়াছে, কোনও ভাবে বই ‘ফাঁস হইয়া’ গেলে তাঁহারাই দায়ী থাকিবেন।

দেখিয়া শুনিয়া বিস্ময় জাগে, ইহা কি সত্যই ঘটমান বাস্তব, না কি চলচ্চিত্রের প্লট? শঙ্কা জাগিতে পারে: কোন গ্রহে আসিয়া পড়িলাম, ডাকহরকরা তিন বার দ্বারপ্রান্তে আসিয়া নিশ্চিত হইতেছে যে বইটি সত্যই হাতে আসিয়াছে কি না? তবে, বিস্ময় ও শঙ্কার সঙ্গে আনন্দের উদ্রেকও কম নয়। একটি বই বা তাহার স্রষ্টা কতখানি শক্তিধর, তাহা উপলব্ধি করিবার আনন্দ। প্রসঙ্গত মনে পড়িবে, হ্যারিয়েট বিচার স্টো-র ‘আঙ্কল টমস কেবিন’ উপন্যাসটির কথা, যাহা ঊনবিংশ শতকের সর্বাধিক বিক্রীত উপন্যাস, এবং সেই শতকের সর্বাধিক বিক্রীত পুস্তক (বাইবেল-এর পর)। প্রকাশের পর প্রথম বৎসরেই নাকি তাহার তিন লক্ষাধিক কপি বিক্রয় হইয়াছিল, সেই যুগে যাহা চমৎকার বলিলেও কম বলা হয়। একক হাতে মার্কিন সমাজকে বদলাইতে অনেকখানি সাহায্য করিয়াছিল ১৮৫২ সালে প্রকাশিত এই বই। ১৮৬১ সালে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার মধ্যে দাসপ্রথাকে কেন্দ্র করিয়া শুরু হয় সিভিল ওয়র। কথিত আছে প্রেসিডেন্ট লিঙ্কন সেই সময় নিজে গিয়া স্টো-র সহিত দেখা করেন, এবং বলেন, ‘‘সো দিস ইজ় দ্য লিটল লেডি হু স্টার্টেড আ গ্রেট ওয়র!’’ সে দেশের পরবর্তী সমাজ-রাজনীতি বুঝাইয়া দিয়াছে, লিঙ্কনের সহিত হ্যারিয়েটও হইয়া উঠিয়াছিলেন দাসপ্রথা-ধ্বংসকারী ‘আইকন’। বর্তমান বিশ্বের সঙ্গে ঊনবিংশ শতকের তুলনা চলে না। কিন্তু অ্যাটউডের বইয়ের সংবাদ একটি আশ্বাস আনিয়া দিতে পারে। এই বিশ্বদুনিয়া ক্ষমতার নানা রূপ-রূপান্তর দেখিয়া অভ্যস্ত হইলেও, শব্দ তথা সাহিত্যের ক্ষমতা কিন্তু সে সবের কাছে হারিয়া যায় নাই। বাজার হইতে রাষ্ট্র সকলেই জানে— শব্দ সত্যই ব্রহ্ম। তাহার অঙ্গুলিহেলনে সমাজ কাঁপিয়া যাইতে পারে।