দে খতে দেখতে পঁচাত্তর দিনও পার হয়ে গেল। সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন পর্বের মধ্য দিয়ে চলেছে কাশ্মীর। এক দিকে সরকারি কারফিউ, অন্য দিকে তিন নেতার লাগাতার একত্রিত প্রতিরোধ— সৈয়দ আলি শাহ গিলানি, মিরওয়াইজ উমর ফারুক আর ইয়াসিন মালিক। জেল থেকে কিংবা গৃহবন্দি থেকেই এঁরা তিন জনে কাশ্মীরের বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন, যে বিদ্রোহে এখনও পর্যন্ত ৮৬টি প্রাণ গিয়েছে, এবং ১১০০০ মানুষ আহত হয়েছেন। স্মরণকালের মধ্যে প্রথম বার কাশ্মীরে ইদ উৎসব পালিত হল না। শ্রীনগরে রাষ্ট্রপুঞ্জের অফিস পর্যন্ত জনমিছিল আটকানোর জন্য যে কারফিউ জারি হল, আজ পর্যন্ত তাতে অচল হয়ে রয়েছে দশ-দশটি জেলা। কোথাও কোনও সমাধানের চিহ্ন বা প্রতিশ্রুতি দৃষ্টিগোচর নয়, দিল্লি কিংবা শ্রীনগরের দুই সরকারই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে চূড়ান্ত ব্যর্থ। কেবল বলপ্রয়োগেই সমাধানের যা-কিছু চেষ্টা হয়ে চলেছে সেই ৮ জুলাই থেকে। এ বারের সংকটের চরিত্রটাই যে অন্য রকম, কেউ যেন তা বুঝতে চাইছে না। কাশ্মীরি তরুণদের হাতে এ বার পাথর ছাড়াও একটা নতুন অস্ত্র এসে গিয়েছে। সেই অস্ত্র হল তাদের দৃঢ় বিশ্বাস যে এ বারে করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে, চূড়ান্ত ফয়সালা। তার সঙ্গে রয়েছে একটা দৃঢ় প্রত্যয়ও যে এ ভাবে চললেই কাশ্মীর সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান আসবে, যে সমাধানের নাম, ভারতের থেকে মুক্তি। ‘আজাদি’।
আড়াই মাস হল, টানা কারফিউ আর হিংসা-প্রতিহিংসাই কাশ্মীরের একমাত্র বাস্তব। স্কুল-কলেজ বন্ধ। ব্যবসায়িক কাজকর্মে ঝাঁপ। স্বাভাবিক জীবনের স্বাদ-গন্ধই সকলে ভুলতে বসেছে। সরকার বলে চলেছে এ সবই পাকিস্তানের কারসাজি, আর কিছু হাতে-গোনা মানুষের রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার কৌশল। কিন্তু ঘটনা হল, সরকারের দিক থেকে সত্যিই একটিও সদর্থক পদক্ষেপ এখনও নেওয়া হয়নি, আর যেটুকু যা করা হয়েছে, তাতে কেবল সাধারণ কাশ্মীরি জনতার রাগ আরও ধাপে ধাপে চড়ছে। ২০০৮ বা ২০১০ সালের থেকে এখানেই এ বছরটা আলাদা। তখন সংকট কয়েক সপ্তাহ এগোনোর পরই সংকট-মুক্তির পথটা দেখা যেতে শুরু করেছিল। এ বার কিন্তু সংকট-মুক্তির উপায় কেউ বুঝতেই পারছে না, সবচেয়ে বড় কথা, কাশ্মীরিরা কোনও মুক্তি চাইছেও না। স্কুলকলেজ বন্ধ? কাজকর্ম শিকেয়? যাকগে। এগারো বছরের ছেলেদের পেলেট-ছিদ্রে ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ যখন মায়ের কোলে ফিরে আসছে, তখন সংকটমুক্তিতেই বা কী দরকার, ইদ পালনেই বা কী দরকার। ঘটনা হল, ইদের সময়ও পাঁচ-পাঁচটি মৃত্যু ঘটে গেল উপত্যকায়।
এই সার্বিক সংকটের মধ্যে একটা কথা স্পষ্ট। সরকার যে ভাবে এগিয়ে চলেছে, তার একটাই নাম: পয়েন্ট অব নো রিটার্ন। কাশ্মীরের প্রেক্ষিত থেকে বলতে পারি, এর দায়িত্ব কিন্তু দিল্লিকেই নিতে হবে। প্রথমত, বিষয়টিতে গোড়ার দিকে উচিত মনোযোগ দেওয়া হয়নি। দ্বিতীয়ত, শেষ পর্যন্ত যখন মন দেওয়া হয়েছে, তখন কতকগুলি ভাসা-ভাসা বুলি আউড়ে অবস্থা সামলানোর চেষ্টা হয়েছে। সর্বদলীয় ডেলিগেশন শ্রীনগরে এল ঠিকই, কিন্তু আসার সময় গত দুই মাসে দিল্লি যে উদাসীনতা ও অবজ্ঞা দেখিয়েছিল, সেটাও সঙ্গে করে নিয়ে এল। শোনা গেল যে দিল্লির প্রতিনিধিরা নাকি অত্যন্ত মর্মাহত। তাঁরা বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা গিলানির বাড়িতে গিয়ে দরজায় ধাক্কা দিয়েছেন, কিন্তু গিলানি দরজা খোলেননি। কাশ্মীরি আতিথেয়তার ঐতিহ্যের দিক দিয়ে কাশ্মীরি নেতার এই ব্যবহার নিশ্চয়ই সমর্থনযোগ্য নয়। তবুও একটা কথা মনে রাখতে হবে বইকী। যে ‘আলোচনা’র জন্য দিল্লির নেতারা গিয়েছিলেন, তাতে কিন্তু কাশ্মীরি নেতাদের দাবি-দাওয়ার কোনও সংযোগই নেই। দিল্লির নেতারা নিজেদের বক্তব্য জানিয়ে দেবেন, সেটাই হবে ‘আলোচনা’। প্রতিপক্ষকে এই ভাবে দেওয়ালের সঙ্গে ঠেসে ধরে তার পর সে কেন হাসিমুখে টেবিলে এসে বসছে না এই মর্মে অভিযোগ তুলতে চায় দিল্লি। এ ভাবে কি আর সমস্যার সত্যিকারের সমাধান সম্ভব? গিলানিও জানতেন, সম্ভব নয়।
এই যদি হয় দিল্লির মনোভাব, রাজ্য সরকারের অবস্থা আরও সঙ্গিন। এখনও পর্যন্ত স্বাভাবিকতার ছোঁওয়াটুকু টের পাওয়া যাচ্ছে না উপত্যকা জুড়ে। রাজ্য সরকার সমস্ত রকম ভাবে ব্যর্থ, এ ছাড়া কিছু বলার নেই। সংকটের প্রথম দিন থেকে যারা অবস্থা সামাল দিতে ব্যর্থ হয়েছে, আজও তারাই দায়িত্বে অধিষ্ঠিত। কী ভাবে তবে পরিবর্তন সম্ভব? এই সরকারের না আছে রাজনৈতিক বোধ, না আছে জনসমাজের সঙ্গে রাজনৈতিক সংযোগের কোনও পথ। একটা শূন্যতার মধ্যে ঝুলতে ঝুলতে রাজ্য প্রশাসন চলছে। এর মধ্যে পিডিপি-র প্রতিষ্ঠাতা-সদস্য আর সাংসদ তারিক কারা দল থেকে পদত্যাগ করলেন, নাৎসি পার্টির সঙ্গে দলের তুলনা করে নিজের দলের কঠোর নৈতিক সমালোচনা করলেন। বিজেপি-র সঙ্গে জোট বেঁধে সরকার গড়তে গিয়েও যেটা হয়নি, এ বার সেই গভীর নৈতিক প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে গেল পিডিপি। এক জন সম্মানিত প্রতিষ্ঠাতা এ ভাবে বেরিয়ে গেলেন, অন্য পক্ষের প্রতি প্রকাশ্য সহমর্মিতা দেখালেন, এর থেকে দুঃসময় আর কী হতে পারে। আর বিজেপি— দিল্লির কথাই তার কাছে বেদবাক্য। দিল্লির সেই কথাটি হল: কাশ্মীরে মানুষ ভোট দিয়ে সরকার গঠন করেছে, সরকার কাশ্মীরেরই প্রতিনিধি। এটা কিন্তু মনে রাখা হচ্ছে না যে, কারাও এক জন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। এবং যে-সে প্রতিনিধি নন, ২০১৪ সালে শ্রীনগর থেকে দাঁড়িয়ে তিনি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ফারুক আবদুল্লাকে হারিয়েছিলেন। এত বড় মাপের প্রতিনিধি যখন এমন পদক্ষেপ করেন, তখন কী ব্যাখ্যা হবে তার? তিনি যদি জনতার প্রতিনিধিত্ব না করে থাকেন, তবে কার কাছ থেকে জনতার আবেগ, জনতার দাবি শুনতে চান দিল্লির নেতারা? কাশ্মীরের মানুষদের উপর রাষ্ট্রীয় অত্যাচারের অভিযোগে সাংসদ সরে দাঁড়ালেন, এটাই কি একটা বিরাট বার্তা নয়?
ভারতীয় জওয়ানদের উপর উরিতে যে ভয়ানক আক্রমণ হল, ১৭টি প্রাণ গেল, এর ফলে ঘটনা ও আলোচনার গতি অনেকটাই পরিবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনা। এ বার হয়তো রাষ্ট্রপুঞ্জের দিকে ফোকাসটা সরে যাবে, সেখানে ভারত পাকিস্তান কী ভাবে পরস্পরের মোকাবিলা করবে, অন্যান্য দেশ কী অবস্থান নেবে, সেই সব বিষয় গুরুতর হয়ে উঠবে। সে দিক থেকে দেখতে গেলে, উরির ঘটনা দ্বিগুণ দুর্ভাগ্যজনক। সন্ত্রাসের দুর্ভাগ্য তো আছেই, তার সঙ্গে যুক্ত হতে চলেছে কাশ্মীরের নিজের তোলা প্রশ্ন অন্যান্য আন্তর্জাতিক কূটকচালিতে ঢাকা পড়ে যাওয়ার দুর্ভাগ্য। কাশ্মীরে মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে পাকিস্তান ভারতের উপর যে চাপ দিচ্ছিল, সেটা থেকে পাকিস্তানও হয়তো এ বার পিছিয়ে যাবে। ভারতের অভিযোগমতো এ বারের জঙ্গিরা যদি পাকিস্তান-ছাপযুক্ত হয়, তা হলে ইসলামাবাদ গভীর অভিযোগের সামনে পড়তে চলেছে, পাকিস্তানের মধ্যেই পারস্পরিক খেয়োখেয়ির বান বইবে আবার। দিল্লি তো ইতিমধ্যেই আরও কঠোর পদক্ষেপের ঘোষণা শুনিয়েছে। সব মিলিয়ে অবস্থা সঙ্গিন। সামনের কয়েকটি সপ্তাহের মধ্যেই বোঝা যাবে উরির ঘটনায় পুরো পরিস্থিতি আরও কতখানি খারাপ হল। রাষ্ট্রপুঞ্জে দুই দেশের ছায়াযুদ্ধ ঘন হয়ে উঠলে দুই পক্ষেরই অনেকটা ঝুঁকি: নভেম্বরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সার্ক বৈঠকে যোগ দেওয়ার জন্য পাকিস্তান যাওয়ার কথা। সব মিলিয়ে এটা আবারও দ্বিপাক্ষিক সংঘর্ষের গল্প হয়ে যাবে, মাঝখান থেকে উবে যাবে কাশ্মীরের নিজস্ব প্রতিবাদ।
এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কাশ্মীরের নেতারাও আগের মতো শক্ত হাতে আন্দোলনের রাশ রাখতে পারবেন কি না, সেটা একটা প্রশ্ন। এমনিতেই তাঁদের আন্দোলনের দমবন্ধকর ধারা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছিল। নেতারা কোনও ভাবে রাশ আলগা করতে রাজি নন, তার প্রতিক্রিয়ায় সরকার ও সেনাবাহিনীও কোনও ভাবে মানুষকে স্বাভাবিক চলাচল করতে দিতে রাজি নয়, এমনকী দুর্ঘটনা কিংবা জরুরি দরকার হলেও নয়। কাশ্মীরের মানুষ চির কালই এই ভাবে চলতে অভ্যস্ত, অসুবিধে ও বিপদের সঙ্গে সমঝোতা করতে অভ্যস্ত। কিন্তু নেতাদেরও তো একটু মানুষের দিকটা ভাবার দরকার!
অবশ্য স্ট্র্যাটেজি ভাবনা বা জন-সংযোগের সুযোগ হওয়ার আগে জেল বা বন্দিত্ব থেকে নেতাদের ছাড়া পাওয়াটা জরুরি। সরকার যদি তাঁদের দিনের পর দিন শুধু আটকেই রাখেন, তাঁদের আন্দোলনের ধরনধারণ নিয়ে সাধারণ মানুষ প্রশ্ন করার সুযোগটাই বা পায় কী করে!
shujaat7867@gmail.com