অভিরূপ সরকার (‘দ্বন্দ্বটা মূল দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই’, ৮-১১) নিবন্ধে যা লিখেছেন, তা আমরাও আর্থিক ক্ষেত্রে কাজ করার সুবাদে ১৯৯০ সাল অবধি জেনে এসেছি। হঠাৎ ও অভূতপূর্ব ভাবে আরবিআই ৭(১) ধারা নিয়ে অর্থ মন্ত্রকের নির্দেশ স্বাভাবিক ভাবেই ৮৪ বছরের ইতিহাসের প্রেক্ষিতে প্রশ্ন তুলেছে। মনে রাখতে হবে, ৮৪ বছরের মধ্যে ১৩ বছর রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া ছিল ব্রিটিশ শাসনে। ব্রিটিশরা তাদের অর্থনৈতিক সঙ্কটে, বিশেষ করে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় (১৯৩৯-৪৫), এই ধারা প্রয়োগ করেনি। ব্রিটিশরা করেনি বলে আমরা করব না, এই ঔপনিবেশিক ঘোরের কথা বলছি না, আদতে ভারতীয় আর্থিক ব্যবস্থার ভয়ঙ্কর দুর্বলতা ধামাচাপা দেওয়ার জন্য এই প্রয়োগ— সে কথাই স্পষ্ট হয়ে উঠছে এখন। এই দুর্বলতা আজ হঠাৎ গজিয়ে ওঠেনি।

অভিরূপবাবু চারটে বিষয় নিয়ে সরকারের সঙ্গে বিরোধিতার কথা উল্লেখ করেছেন। প্রথম বিষয় অনাদায়ী ঋণ, যার মূল ও বিশাল অংশ বড় ব্যবসায়ী ও কর্পোরেট সংস্থার দায়। স্বাধীনতা-উত্তর ভারতীয় অর্থনীতিতে, কাজে যা-ই হোক, অন্তত খাতায়-কলমে সরকারের ফিসকাল পলিসি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের মনিটরি পলিসি ও ক্রেডিট পলিসির মধ্যে ভারসাম্য, বোঝাপড়া চলার কথা। অনাদায়ী ঋণজনিত ভারসাম্যের অভাব স্পষ্ট হল ১৯৮০-এর দশকে। ১৯৯০-এর দশকে নরসিংহম কমিটি’র (১ ও ২) সুপারিশ কার্যকর করা থেকেই প্রকাশ পেয়েছে পাহাড়প্রমাণ অনাদায়ী ঋণের হিসাব বা আসলে হিসাবের গরমিল। রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক ও ভারতীয় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক ব্যবস্থা, ম্যানেজমেন্ট ও কর্মী সংগঠনগুলি অনেক দিন ধরে বলে আসছে সাবধান হতে, বলেছে খেলাপি ঋণগ্রহীতার নাম প্রকাশ করে সাধ্যমতো আদায় করার আইনি ব্যবস্থা করতে। এখনও পর্যন্ত যা পুনরুদ্ধার হয়েছে, তা খেলাপি ঋণের সামান্য অংশ। অর্থাৎ এই উদ্যোগ খাতায়কলমে থেকে গিয়েছে। কংগ্রেস ও বিজেপি, দুই সরকার থাকাকালীন এই অচলাবস্থা চলেছে। সম্প্রতি প্রাক্তন গভর্নর রাজন সতর্ক করলে কার্যত তাঁকে বিদায় করা হয়। কিন্তু আরও আগে কেন মাসি ভুবনের কান মলে দেয়নি? ৭(১) ধারা খুঁচিয়ে তুলল বলে ঘুম ভাঙল? 

দ্বিতীয় বিষয় সুদের হার। বাজার ব্যবস্থার প্রচার অনুযায়ী বাজার সুদের হার নির্ধারণ করবে। বাজারে অসরকারি বিনিয়োগ ব্যবস্থার ওপর ভরসা থাকার কথা। তারা সুদ কমাবে। তাদের ছেড়ে সরকারি ব্যাঙ্ক ব্যবস্থার ওপর ভরসা কেন? সরকারি ব্যাঙ্ক কেন গাড়ি-বাড়ির সুদের হার কমাবে? ভারতীয় নিজস্ব চরিত্রের জন্য কৃষিক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক, শিল্পে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ক্ষেত্রের জন্য সুদের হার হ্রাস করার দাবি সঙ্গত। কিন্তু সম্পন্ন চাষি, কর্পোরেট শিল্পপতি, বড় কৃষি বা শিল্প গোষ্ঠীর জন্য কেন কম সুদের ব্যবস্থা করা হবে? নির্মাণ শিল্পের বুদ্বুদের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা জেনেও রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক কেন ব্যবস্থা করবে না?

তৃতীয় বিষয়, রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের মতে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য লভ্যাংশ বেশি রাখার দরকার নেই। অভিরূপবাবু লিখেছেন, নিজের আয়ের বর্ধিত অংশও রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক সরকারকে দিতে রাজি নয়। দু’টি ক্ষেত্রেই প্রশ্ন আসে: রাজি থাকা, না-থাকা আধুনিক ব্যবস্থায় চলে না। চুক্তি কী শর্ত অনুমোদন করে? চুক্তিতে কী বারণ আছে? রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক আয়ের পাহাড় জমিয়েই বা কী করবে? যদি কিছু করার কথা ভাবত তবে এত কৃষককে আত্মহত্যা করতে হচ্ছে কেন? শিল্পশ্রমিককে বেকার হতে হচ্ছে কেন? ছদ্মবেকারি কেন গভীর সমস্যা? উৎপাদনশীলতার সঙ্কটের জন্য কেন প্রকৃত উৎপাদক দুর্ভোগ পোহাবে? 

চতুর্থ, এনবিএফসি-কে সাহায্য। রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের প্রাথমিক উদ্দেশ্য বিষয়ে এ ক্ষেত্রে রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের পক্ষে বলা হয়েছে আমানতকারীদের স্বার্থরক্ষা করা, ঋণগ্রহীতাদের উদ্ধার করা নয়। শুনতে ভাল লাগে। প্রশ্ন থেকে যায়, ‘প্রিভেনশন ইজ় বেটার দ্যান কিয়োর’ প্রবাদ মানলে সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্ক ফেল করে আমানতকারী বিপদে পড়ার আগে ব্যবস্থা করা হবে না কেন?

দেখা যাচ্ছে, প্রতিটি ক্ষেত্রে রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের ভূমিকা ও কার্যাবলির দুর্বলতার সুযোগে ৭(১) নং ধারা জেগে উঠেছে। সরকার এক পা পিছিয়ে বটে, কিন্তু দু’পা এগোনোর রাস্তা তৈরি হচ্ছে। দুর্ভাগ্য, আমাদের সেই সহজ ও স্বল্পমেয়াদি রাস্তা হল নির্বাচন। রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ককে সামনে রেখে কংগ্রেস ও বিজেপি, দু’পক্ষই আর্থিক নীতি প্রণয়ন করেছে। কে কাকে দোষ দেবে? মাঝখানে নোট বাতিল, জিএসটি, ভর্তুকি, আধার কার্ড সমস্যা ইত্যাদি নিয়ে উলুখাগড়া জনগণ প্রাণ দিয়ে যাবেন।

অভিযোগ উঠেছে, সরকার এ ভাবে রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের মূলধন দখল করতে চাইছে। তাও যদি সেটা দুর্বল উৎপাদকের উন্নয়নে ব্যবহার হত, সমর্থন করা যেত। শোনা যাচ্ছে, বড় ঋণখেলাপির ঋণ রাইট-অফ বা মুছে দেওয়ার কাজে ব্যবহার হবে। যদি তা-ই হয়, তা হলে এই বাজারের সচ্চরিত্র, স্বচ্ছতার আর কী বজায় থাকবে? যদি এর ফলে রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক দুর্বলতর হয়ে যায়, তবে স্বায়ত্তশাসনের যেটুকু অবশিষ্ট আছে, তা-ও যাবে। সবল কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের অভাবে ধীরে ধীরে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলিও দুর্বলতর হবে। এগুলি কিনে নিয়ে কার পোয়াবারো হবে বলাই বাহুল্য।  

অভিরূপবাবু এ ক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থার পার্থক্য দেখিয়ে বলেছেন, ‘‘যাঁরা এখন ক্ষমতায় আছেন তাঁরা দেশের মানুষের দীর্ঘমেয়াদি মঙ্গল নিয়ে ভাবছেন না। তাঁদের চোখ একমাত্র পরবর্তী নির্বাচনের দিকে।’’ স্বল্প বা দীর্ঘ অঙ্কের সংখ্যাগত বিচারে মেয়াদের মাপ বিচার না করাই ভাল। কারণ নীতি বা পরিকল্পনা সে ভাবেই তৈরি হয়। প্রশ্নটা গুণগত মানের। মূল ফারাক হল, এখন পরিকল্পনা বিষয়টা উঠিয়ে দেওয়া হয়েছে নতুন নীতি আয়োগের ব্যবস্থায়। সবই তো স্বল্পমেয়াদি। তাই রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের চরিত্র ও গড়ন, তাও বর্তমান সরকার চাইছে স্বল্পমেয়াদি হোক। দীর্ঘমেয়াদি নজরদারি ব্যবস্থা বাস্তবে বাতিল হলে রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের স্বনির্ভরতার কী প্রয়োজন? ১৯৯০-এর দশক থেকে মুক্ত অর্থনীতির প্রচারে উন্নয়ন বা ডেভেলপমেন্ট শব্দ চুপ হয়ে গেল। স্পষ্টতর হল গ্রোথ বা বিকাশের কথা। বড় গল্প, উপন্যাস, মহাভারত পড়ার ধৈর্য নেই। সিরিয়াল, অণুগল্পেই খুশি। দীর্ঘমেয়াদি শান্তি, উন্নয়ন এখন গল্পকথা। পাবলিক চাইছে না।

শুভ্রাংশু কুমার রায়

চন্দননগর, হুগলি

 

বিপজ্জনক

ঠাকুরপুকুর ৩এ বাস স্ট্যান্ড থেকে টালিগঞ্জের করুণাময়ী ব্রিজ পর্যন্ত যোগাযোগকারী মহাত্মা গাঁধী রোডের অবস্থা শোচনীয় হচ্ছে দিনকে দিন। মাঝেরহাট ব্রিজ ভাঙার পর রাত্রি দশটার পর থেকে বড় বড় ভারী মালবাহী ট্রাকের যাতায়াত এত বেড়ে গিয়েছে, রাস্তার ধারের বাড়িগুলো কেঁপে কেঁপে ওঠে আর রাস্তাটির কিছু অংশ সাংঘাতিক ভাবে ভেঙে যাচ্ছে।

সুব্রত সেনগুপ্ত

কলকাতা-১০৪

 

মহেশতলার দশা

বিগত পাঁচ বছর মহেশতলাবাসীর ধুলো ও ডাঙাতে নৌকাযাত্রা চলেছে। বাটানগর মোড় থেকে নয়াবস্তি পর্যন্ত রাস্তার অবস্থা দুর্বিষহ। এলাকাবাসী নাকে কাপড় বা রুমাল না বেঁধে চলতে পারেন না। একটা গাড়ি চলে গেলেই ধুলোয় ধুলোয় অন্ধকার। ওই রাস্তা দিয়ে বাসে চড়ে গেলে মনে হয়, ঢেউয়ে নৌকা চলেছে। যে কোনও সময় বাস উল্টে যেতে পারে। মাঝে মাঝে ধুলো রুখতে একটা লরি জল ছড়িয়ে যায়, কিন্তু তা হল মরুভূমিতে এক ফোঁটা জল দান। রাস্তার ধারে বা আশেপাশে স্কুল, দোকানপাট, বাড়িঘরের অকথ্য দুর্দশা। ফ্লাইওভার হয়েছে বাটানগর মোড় থেকে নয়াবস্তি পর্যন্ত, যাঁরা ফ্ল্যাট কিনবেন তাঁদের সুবিধার জন্য। আমরা যারা আশেপাশে বাস করি, তাদের কোনও সুবিধাই নেই। রাস্তার এই জঘন্য অবস্থার জন্য ২০-২৫ জন সাধারণ মানুষ প্রাণ দিয়েছেন। বিষমদ খেয়ে প্রাণ গেলে যদি দু’লক্ষ টাকা দেওয়া হয়, তবে মহেশতলার উন্নতির জন্য যাঁদের প্রাণ গিয়েছে, তাঁদের পরিবারকে কেন আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে না? 

প্রদীপ রায়

মহেশতলা

 

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা

সম্পাদক সমীপেষু, 

৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, কলকাতা-৭০০০০১। 

ইমেল: letters@abp.in

যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়। চিঠির শেষে পুরো ডাক-ঠিকানা উল্লেখ করুন, ইমেল-এ পাঠানো হলেও।