‘হিন্দি চাপানো’ (২৩-৬) শীর্ষক চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ষাট-সত্তর দশকের আকাশবাণী কলকাতার বিষয়ে কিছু তথ্য জানাতে চাই।

১) বাংলা গানের সাপ্তাহিক ‘অনুরোধের আসর’ অনুষ্ঠানে বাধ্যতামূলক ভাবে একটি করে হিন্দি সিনেমার গান তখন বাজানো হত। সেগুলি শোনার জন্য বাঙালি শ্রোতারা অনুরোধ করতেন, এমন মনে হয় না।

২) বিখ্যাত, জনপ্রিয় শিল্পীদের বহু বাংলা গান বাজায়নি কলকাতা কেন্দ্র। অনুরোধ করা সত্ত্বেও সে সব গান আজও বঞ্চিত রয়েছে।

৩) কলকাতা বেতার কেন্দ্রে গাইতে গেলে, উচ্চ গ্রেডের শিল্পীদেরও হিন্দি গীত-ভজন গাইতেই হবে, এমন কড়াকড়ি ছিল।

৪) বাংলা ছায়াছবির গানের সাপ্তাহিক অনুষ্ঠানে কয়েকটি রেকর্ড ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বাজানো হত। বহু বাংলা সিনেমার এমনকি হিট করা গানও বাজানো হয়নি।

৫) তখনকার দিনে খুব কম বাড়িতেই গ্রামোফোন থাকত এবং রেকর্ডের দামও সেই সময়ের নিরিখে যথেষ্ট বেশি ছিল (৬ টাকা)। সবাই সব রেকর্ড কিনে উঠতে পারত না। রেডিয়োই ছিল একমাত্র ভরসা।

৬) অতি খ্যাতনামা ছাড়া অন্যান্য শিল্পীর গান রেডিয়োয় না বাজলে কোনও প্রচার পেত না। তাই বাণিজ্যিক সফলতাও আসত না। নির্ধারিত সংখ্যার (৬০০) রেকর্ড বিক্রি না হলে, পরের পুজোয় গান রেকর্ড করার ডাক পেতেন না এই সব শিল্পী। পরবর্তী কালে, ক্যাসেটের যুগে, সেই গানগুলি শুনতে পেয়েছিলেন বাংলার শ্রোতারা। তখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে।

৭) কলকাতা-ক’র চিঠিপত্রের অনুষ্ঠান, সবিনয় নিবেদন-এ বলা হত, আর্থিক বরাদ্দের অপ্রতুলতার জন্য সব রেকর্ড কেনা ও বাজানো সম্ভব নয়। জানি না, রেকর্ড কোম্পানিরা অথবা শিল্পীরা নিজে থেকে এক কপি করে রেকর্ড আকাশবাণীকে কমপ্লিমেন্টারি দিতেন কি না, দিলে সেই রেকর্ডগুলো কোথায় যেত?

৮) তখন অন্য সাঙ্গীতিক কারণে শিল্পীদের লাইভ প্রোগ্রামে হারমোনিয়াম বা অর্কেস্ট্রার সঙ্গত নিষিদ্ধ ছিল। তাই গানগুলো কখনও কখনও জমত না।

৯) রেডিয়োর অপ্রতুলতার কারণে, গান-পাগল বাঙালি শ্রোতারা পাড়ার জলসার জন্যে অপেক্ষা করে থাকত। তা থেকেও শিল্পীদের গান জনপ্রিয় হত এবং রেকর্ড বিক্রি হত।

১০) প্রচুর উচ্চমানের শিল্পী ও যথেষ্ট রেকর্ড বাজারে থাকলেও, সারা সপ্তাহে মাত্র ৫০ মিনিটের ‘অনুরোধের আসর’ ও ৩০ মিনিটের ‘ছায়াছবির গান’— এই ছিল বাংলা গানের জন্য আকাশবাণীর বরাদ্দ। এর ফলে স্বভাবতই সব শিল্পীর সব গান ‘রিপিট’ বাজানোও সম্ভব হত না। অনেক শিল্পীর নাম মুছেই গেল।

১১) ১৯৬২ সাল নাগাদ কলকাতা-গ’র বিবিধ ভারতীর প্রচারের সঙ্গে পরিচিত হল কলকাতার বাঙালি। সেখানে প্রত্যহ সকাল থেকে রাত অবধি ‘মন চাহে গীত’, ‘জয়মালা’, ‘মনোরঞ্জন’, ‘একহি ফিল্ম কে গীত’, ‘শালিমার সুপারল্যাক জোড়ি’ ইত্যাদি অনুষ্ঠানে একের পর এক হিন্দি সিনেমার গান। শক্তিশালী অর্কেস্ট্রা ও সুস্পষ্ট রেকর্ডিংয়ে শ্রুতিমধুর গান বাজতে লাগল। হিন্দি তেমন না বুঝলেও, বাঙালি শ্রোতারা যথেষ্ট টান অনুভব করতে থাকল। ও দিকে সিনেমা হল-এও ঝকঝকে রঙিন হিন্দি ফিল্ম ও তার ক্ষিপ্র গতি। এই সব মিলিয়ে, ধীরে ধীরে বাংলা গান সরতে সরতে হিন্দি গানকে জায়গা দিতে থাকল।

পশ্চিমবঙ্গে বাংলার জায়গায় হিন্দি গান ও সিনেমার প্রচারের পিছনে ভারত সরকারের আকাশবাণীর কলকাতা কেন্দ্রেরও হাত ছিল, মানতেই হবে।

সুব্রত দাশগুপ্ত

কলকাতা-৫৬

এফএম চ্যানেল

আমাদের এ রাজ্যে বেশ কয়েকটি বেসরকারি বাংলা এফএম চ্যানেল আছে। বাংলা গান, বাংলা ভাষা নিয়ে তাদের দায়বদ্ধতা এত কম যে আশ্চর্য হতে হয়। ১৯৫০ থেকে ১৯৮০-র দশক পর্যন্ত স্বর্ণযুগের  বাংলা গান চালাতে তাদের প্রচণ্ড অনীহা। পৃথিবীর সব কিছুই যদি টিআরপি-নির্ভর হয়ে পড়ে, তবে তো খুব মুশকিল! আর একটা ব্যাপারে অবাক লাগে, গায়িকা বা গায়কের নাম বলা হলেও, গীতিকার, সুরকারেরা ব্রাত্য থেকে যান কেন?

অরূপরতন আইচ

কোন্নগর, হুগলি

এ রাজ্যের নাম

সম্প্রতি এই রাজ্যের রাজ্যপালের কাছ থেকে তাঁর স্বাক্ষরিত হিন্দিতে লেখা একটি চিঠি পেয়েছি। চিঠির লেটারহেডে উপরে বাঁ দিকে রাজ্যপালের নামের ঠিক নীচে দেবনাগরী অক্ষরে লেখা রয়েছে ‘রাজ্যপাল, পশ্চিমবঙ্গাল’। সেখানে ‘রাজ্যপাল, পশ্চিমবঙ্গ’ লেখা থাকবে না কেন?

আমাদের রাজ্যের সরকারি কাগজপত্রে, বিজ্ঞাপনে, সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে বাংলায় পশ্চিমবঙ্গ সরকার এবং ইংরেজিতে গভর্নমেন্ট অব ওয়েস্ট বেঙ্গল দেখি। একটি প্রশ্ন জাগে। ইংরেজি অনুবাদে বাংলা শব্দ ‘সরকার’-এর জন্য গভর্নমেন্ট ব্যবহার করা যেতেই পারে; কিন্তু রাজ্যের নাম ‘পশ্চিমবঙ্গ’কে কেন অনুবাদের মাধ্যমে ওয়েস্ট বেঙ্গল করা হবে? কেন বলা/লেখা হবে না গভর্নমেন্ট অব পশ্চিমবঙ্গ? যদি ইংরেজি অক্ষরে গভর্নমেন্ট অব ওয়েস্ট বেঙ্গল লেখা অব্যাহত রাখতে চান তা হলে বাংলায় ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল সরকার’ লেখা হোক।

ব্যাকরণের বিচারে এবং প্রয়োগে ‘পশ্চিমবঙ্গ’ একটি প্রপার নাউন; তার অনুবাদ হয় কী ভাবে? তা হলে তো ইংরেজিতে রবীন্দ্রনাথকে সান-লর্ড-মাস্টার কিংবা বঙ্কিমচন্দ্রকে কার্ভড-মুন লিখতে/বলতে হয়!

ভারতে ‘উত্তরপ্রদেশ’ নামে একটি রাজ্য রয়েছে; সে রাজ্যের সরকারকে গভর্নমেন্ট অব নর্থ প্রভিন্স বলা হয় কি? ভারতের আর কোনও ‘প্রদেশ সরকার’-এর নামে এ রকম ভিন্নচারিতা দেখা যায় না।

বাংলায় ‘পশ্চিমবঙ্গ সরকার’-এর সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ইংরেজিতে গভর্নমেন্ট অব পশ্চিমবঙ্গ লেখার ব্যবস্থা হোক। তখন রাজ্যের নাম সংক্ষেপে ডব্লিউ বি-এর পরিবর্তে পি বি লেখা হবে। কিছু দিন আগে এ রাজ্যের নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ হয়েছিল। তার একটি উদ্দেশ্য ছিল। বর্তমান সরকারি নাম ওয়েস্ট বেঙ্গল হওয়ায় আদ্যক্ষর অনুসারে এই রাজ্য অন্য সকলের পরে/পিছনে থাকছে। যদি নাম না বদলে, ইংরেজি বানানে পশ্চিমবঙ্গ লেখা হয়, তবে নামের অনুক্রমে এ রাজ্যের স্থান অন্তত রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশের আগে আসবে। পশ্চিমবঙ্গই বোধ হয় ভারতের একমাত্র রাজ্যে, যার তিনটি সরকারি নাম রয়েছে।

বিনোদ বি পাল

বেলুড় মঠ, হাওড়া

সময় ও কথা

১৯৬৫। সবে ক্লাস ফাইভে উঠেছি। আমাদের ইস্কুলের কয়েক জন স্যর ছাত্রদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলছেন। এক জন স্যর ব্যাট করছেন। আমি খেলা দেখছিলাম, স্যরকে উৎসাহ দেওয়ার জন্য বলছিলাম, “আরও জোরে প্যাঁদান স্যর!” দু’তিন বার বলেছি, তার পর হঠাৎ স্যর আমার কাছে এসে আমার দু’গালে দুটো থাপ্পড় মেরে বললেন, ‘‘‘প্যাঁদান’ কী কথা? ‘মারুন’ বলতে পারিস না?’’ মার খেয়ে বুঝেছিলাম, কথাটা ইস্কুলে স্যরেদের সামনে বলার মতো নয়। তাই যেখানে-সেখানে ‘প্যাঁদানো’ কথাটা বলতে এখনও কুণ্ঠিত হই।

কয়েক বছর আগে টিভির একটি জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো-র অনুষ্ঠানে শুনলাম, সঞ্চালক এক স্কুল-পড়ুয়া বাচ্চাকে বলছেন, ‘‘কী রে, তোর বাবা তোকে প্যাঁদায়?’’ আমার ধারণা হোঁচট খেল। বুঝলাম সময় বদলেছে, যেটা আগে মনে করা হত খারাপ কথা, এখন সেটা চালু হয়ে গিয়েছে। 

‘নচিকেতার গান, ... গুঞ্জন শুরু’ (২৩-৬) শীর্ষক প্রতিবেদনে পড়লাম, নচিকেতা ‘কাটমানি’ নিয়ে গান গেয়েছেন: ‘‘খেয়েছেন যারা কাটমানি/ দাদারা অথবা দিদিমণি/ এসেছে সময় গতিময়/ দাঁত ক্যালাতে ক্যালাতে ফেরত দিন।’’ আরও এক বার হোঁচট খেলাম, বুঝলাম ভাষা ‘আধুনিকতর’ হয়ে চলেছে। 

স্বপন কুমার ভারতী

মন্দির রোড, হুগলি

এবার শুধু খবর পড়া নয়, খবর দেখাও। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের YouTube Channel - এ।