E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: সত্যবাদী নচিকেতা

ভারতে নবজাগরণের পুরোধা রামমোহন রায় নচিকেতার যথার্থ উত্তরসূরি। রামমোহন এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ধর্মের নামে নারী-নির্যাতনের বিরুদ্ধে সরব হন। তৎকালীন সমাজের তথাকথিত নায়কদের মুখোশ খুলে তাঁদের নিষ্ঠুর মুখকে সামনে আনেন।

শেষ আপডেট: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৪:০৭

বিশ্বজিৎ রায়ের ‘সত্যের পথ প্রশ্নের পথ’ (১১-১) শীর্ষক প্রবন্ধটি বর্তমান সমাজিক ও রাষ্ট্রনৈতিক প্রেক্ষাপটে যথেষ্ট অর্থবহ। সমাজে ও রাষ্ট্রে সম্মানের আসনে থাকলেই কেউ সব স্তরের মানুষের শ্রদ্ধা পেয়ে যাবেন, এমন আশা করা ভুল। মান্যতা ও শ্রদ্ধা প্রাপ্তির মধ্যে তফাত কতটা, তা সুন্দর ভাবে দেখিয়েছেন প্রবন্ধকার। চাপে পড়ে মান্যতা দেওয়া, আর হৃদয়-উৎসারিত শ্রদ্ধা অর্পণ করা, এক নয়। প্রকৃত সত্য যাচাই করতে গিয়ে নচিকেতা দেখল, এর মধ্যে ভেজাল আছে, কপটতা আছে। পিতা সমাজে প্রতিপত্তি ও খ্যাতি অর্জনের জন্য, ‘দানবীর’ খ্যাতিতে ভূষিত হওয়ার জন্য, সক্ষম ও সচল গোসম্পদ দান না-করে অযোগ্য অচল গরুগুলিকে দান করতে চান। নচিকেতার প্রশ্নের উত্তরে তার পিতা ‘তোমাকে আমি যমকে দান করব’ বলায় প্রতিবাদী পুত্র নচিকেতা যমের বাড়িতেই চলে গেল। তার আত্মবিশ্বাস, নিজের প্রতি শ্রদ্ধা শিক্ষণীয়। সত্যের জন্য, সত্য উন্মোচনের জন্য আত্মবলিদান আছে বলেই পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে উত্তরণমুখী পরিবর্তন আসে। ইতিহাস আমাদের এই শিক্ষা দেয়।

ভারতে নবজাগরণের পুরোধা রামমোহন রায় নচিকেতার যথার্থ উত্তরসূরি। রামমোহন এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ধর্মের নামে নারী-নির্যাতনের বিরুদ্ধে সরব হন। তৎকালীন সমাজের তথাকথিত নায়কদের মুখোশ খুলে তাঁদের নিষ্ঠুর মুখকে সামনে আনেন। রবীন্দ্রনাথের দর্শনচিন্তায় ‘মহানুভবতা’-র অর্থ, আপন ক্ষুদ্র স্বার্থের বাইরে গিয়ে অন্যের বেদনার অনুভব।

মনোবিজ্ঞানী সিগমুন্ড ফ্রয়েডের উত্তরসূরি কার্ল ইয়ুং বলেন, মগ্নচৈতন্যের মধ্যে রয়েছে এক ইতিহাস-নিঃসৃত মনের স্রোতধারা, যে ইতিহাস কোনও বিশেষ দেশের নয়, সমগ্র মানবজাতি ও সভ্যতার উত্তরণমুখী অগ্রগতির। এই মগ্নচৈতন্যে রয়েছে মানবমনের দেশ-কাল নির্বিশেষে একাত্মবোধ। সে জন্যই বিশ্বের যে কোনও প্রান্তের মানুষের উপর অন্যায় হলে তার আর্তনাদ ভিন দেশের মানুষের মনেও অনুরণন তোলে। এই সহমর্মিতা হল মানবমনের মগ্নচৈতন্য। যে কোনও দেশে অন্যায়-অবিচার হলে বিশ্ব জুড়ে জেগে ওঠে যে প্রতিবাদী মুখ, প্রতিবাদী মিছিল, তাদের মধ্যেই বেঁচে রয়েছে সত্যবাদী নচিকেতা।

জগদিন্দ্র মণ্ডল, কলকাতা-১৫০

ভাষা-পার্বণ

যে নদীর পাড়ে বাস, তার ভাঙন শুরু হলে আমরা কি কিছু করব না? এ প্রশ্ন যখন সামনে এসে দাঁড়ায়, তখন তো রাতের ঘুম উড়ে যাওয়ার কথা। শিশির রায়ের ‘আমরা কিছু করব না?’ (২২-২) প্রবন্ধটি সেই উদ্বেগই জাগিয়ে তুলল। আত্মঘাতী বাঙালি (ভদ্রবিত্ত বাঙালি) চিহ্নিত হয়ে যাওয়ার পর আমাদের কি দু’কান কাটা গেল, না কি সহজলভ্য যা কিছু তা অবহেলায় নষ্ট করার মতো বালখিল্য স্বভাব আমাদের আত্মতৃপ্তি দান করল? কেউ বলেন— কোটি কোটি মানুষ যে ভাষায় কথা বলে, সে ভাষাই টিকে যায়। আর কেউ কেউ মনে করেন— উচ্চকোটি মানুষ যে ভাষায় কথা বলে, তা-ই প্রভুত্ব করে, জীবিত মান্য ভাষার স্বীকৃতি পায়।

এই উচ্চকোটি তো আসলে রাষ্ট্র। ইতিহাস বলে, পূর্বে রাজসভায় নবরত্নমণ্ডলী সুপরামর্শের ক্ষেত্রে প্রজাকল্যাণের কথা মাথায় রাখতেন। এখনও সে ব্যবস্থা আছে, তবে তাঁরা কি শুধুই আজ্ঞাবহ কর্মচারী? তা যদি হন, তবে যে কোনও নদীর ভাঙনের পিছনে কোনও গোপন উদ্দেশ্য থাকা অস্বাভাবিক নয়। বাংলা ভাষা ব্যবহারের প্রতিবন্ধক হিসেবে, বলা ভাল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ইংরেজি বা হিন্দিকে দাঁড় করিয়ে আমরা নিষ্কৃতি পেতে চাই। কিন্তু এ কথাও সত্যি, কোনও একটি ভাষা কখনও অন্য ভাষার অন্তরায় হতে পারে না, বরং সমৃদ্ধির সহায়ক হতে পারে। কারণ, এক সময় বাংলা মাধ্যম স্কুলে ইংরেজি তো বটেই, সংস্কৃত, হিন্দিও পড়ানো হত। তাতে বাড়তি চাপ বা ভাষার আগ্ৰাসন তো মনে হয়নি। বরং সে সময়ের বাঙালি আজও ভাষার অভিভাবকত্বের দাবিদার।

আসলে এ-ও বারো মাসে তেরো পার্বণের মতো ‘ফেব্রুয়ারি পার্বণ’ হয়ে গিয়েছে। বাকি এগারো মাস হরিপদ কেরানি, তথৈবচ। কবির কথা মন্ত্রের মতো বাজে, “দিবসগুলি পালিত হয়/ শপথগুলি নয়।”

তপনকুমার ভট্টাচার্য, কৃষ্ণনগর, নদিয়া

ভবিষ্যতের সেনা

“আমাদের চতুর্দিকেও এখন বাংলা ভাষানদীর পাড় ভাঙার অবিরল শব্দ, আমরা কিছু করব না?” ‘আমরা কিছু করব না?’ প্রবন্ধের শেষ বাক্য। প্রশ্নটি তীব্র অভিমানজাত। “হায় বাঙালি হায়, তুই আর বাঙালি নাই…”— সেই অমোঘ ভবিষ্যদ্বাণী এই বাঙালি খণ্ডাবে কী করে! শ্লেষে বিদ্রুপে অভিমানে কলকাতার আজকের বাঙালিকে টলানো যাবে না। ভাষার প্রতি মমত্ব ধুয়ে সে জল খাবে না; কড়ি-কাঞ্চন যোগ যেখানে নেই, সেখানে সে-ও নেই।

তাই কলকাতার মধ্যবিত্ত বাঙালি বাংলা মাধ্যম থেকে সন্তানকে সরিয়েই ক্ষান্ত হচ্ছেন না, যেখানে দ্বিতীয় ভাষাও নয় বাংলা, তৃতীয় বা একেবারে বাদ পড়ার দলে, সেখানেই মোক্ষলাভের জন্য ইট পেতেছেন। বাংলা-নিরপেক্ষ বাংলায় সন্তানকে বিশ্বায়নের দীক্ষা দেওয়ার স্বপ্ন চোখে মেখে বাঙালি অভিভাবককুল ইংরেজি তীর্থের দোরগোড়ায় ব্যাগ-ওয়াটার বটল কাঁধে প্রাত্যহিক হাজিরায়। দুয়োরানি বাংলা ভাষার ছায়া থেকে শত হস্ত দূরে রেখে সন্তানকে মানুষ করার শপথ নিয়ে ফেলেছেন তাঁরা। এই শপথ উচ্চবিত্ত থেকে মধ্যবিত্তের মধ্যে জারিত হয়ে নিম্নবিত্তের দিকে ধেয়ে যাচ্ছে। সেই শপথের স্রোত কলকাতা থেকে নিকটবর্তী মফস্‌সল শহরেও ক্ষীণকায়া থেকে স্ফীতকায়া হচ্ছে। ‘অ্যাংরি ইয়ং ম্যান’রা যত‌ই গোঁসা করুন, কলকাতার বাঙালি তাঁদের সন্তানকে বাংলা ভাষার সংস্রব থেকে সরাবেনই, সমাজমাধ্যমে ভুল বানানে একুশের বন্দনাও করবেন, বক্তৃতাসভায় বঙ্গ ও বঙ্গভাষার জন্য চোখের জল ফেলবেন, কারণ দর্শাতে ভূমিকা হিসেবে ‘কেন কি’ বলবেন!

এ সবের কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে এ লেখায় প্রবন্ধকার গুরুতর অভিযোগ তুলে বলতে চেয়েছেন, বাংলা ভাষার অর্জনে কলকাতার কোনও ভূমিকা নেই। সে একবিন্দু রক্ত ঝরায়নি, শুধু সে বাংলা ভাষার উপর অধিকার ফলিয়েছে। বাংলা লেখ্য ভাষার বিকাশে কলকাতার ঐতিহাসিক ভূমিকা হয়তো প্রবন্ধকার সাময়িক আবেগে বিস্মৃত হয়েছেন। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলা আকাদেমির ধারাবাহিক প্রচেষ্টা মান্য বাংলা গড়ে তুলতে অবশ্যস্মরণীয়। প্রকাশনার ক্ষেত্রে‌ও বাঙালি মনন-মেধা কলকাতা-কেন্দ্রিক। তবু কেন কলকাতার আমবাঙালি তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মকে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি-বিমুখ করে তুলছেন, সে প্রশ্নের উত্তর আর‌ও গভীরে। বহুভাষাবিশিষ্ট দেশে কাজের প্রয়োজনে বাংলার বাইরে সন্তানকে পাঠানোর চিন্তা বাঙালিকে কিছুটা শিকড়ছিন্ন করেছে। বাংলায় কাজের অভাব, হিন্দি-ইংরেজির সর্বগ্রাসী প্রভাব, কর্পোরেট জগতে চাকরির ভাষা-অর্জনের তাগিদ কাজ করছে প্রায়োগিক মনস্তত্ত্বে। বাংলাদেশ যেমন এক পূর্ণাঙ্গ দেশ, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য। ভাষার উপর সরকারি কর্তৃত্ব উভয়ের এক নয়। এই নানাবিধ কারণ ভাষার প্রতি যথেষ্ট গুরুত্ব আরোপের পরিপন্থী হয়ে উঠেছে।

এ সব সত্ত্বেও বাংলা ভাষার প্রতি নিবেদিতপ্রাণ মানুষকে রুখে দাঁড়াতে হবে এই গড্ডলিকা প্রবাহের বিরুদ্ধে। সমাজমাধ্যমে ভুল বাংলা, ভুল বানানের বিরোধিতা করতে হবে। ভাষার প্রতি ভালবাসা একটা আন্দোলনে পরিণত হলে অভিভাবকদের মগজে‌ও ঢুকবে, সন্তানকে মাতৃভাষার স্তন্যপান থেকে সরিয়ে রাখাটা তার বাকি জীবনের বিকাশে কতটা বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। ইংরেজি মাধ্যমে পড়ালেও প্রথম ভাষা বা দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে বাংলা পাঠ জরুরি। বাংলা শিশু-কিশোর সাহিত্যে তার মনের অবগাহন দরকার। যে স্কুলে বিষয় হিসেবে বাংলা নেই, সে-সব স্কুলকেও বাধ্য করতে হবে বাংলা পড়াতে। আর‌ও হয়তো অনেক কিছুর প্রয়োজন। রক্ত ঝরানো সম্ভব না হলেও এই বাংলার প্রতিটি ভাষাপ্রেমিক যেন হয়ে ওঠেন ভবিষ্যতের ভাষাসৈনিক।

সন্দীপ চট্টোপাধ্যায়, কলকাতা-৪২

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Society Respect

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy