টুটুল চক্রবর্তীর লেখা ‘অন্তরে আজ দেখব, যখন…’ (৭-৩) মনটাকে বিষণ্ণতায় ভরে দিল। আমরা জানি, অন্ধত্ব মানেই অবসাদ নয়। সে জন্মান্ধ হোক বা চোখের আলো হারিয়ে ধীরে ধীরে অন্ধকারে তলিয়ে যাওয়া মানুষ— সে জীবন অপূর্ণ নয়। তবে নিঃসন্দেহে তা বেদনাদায়ক, কষ্টকর। যে এক বার আলো দেখেছে, সে জানে আলোর মর্ম; সেই উপলব্ধি তাঁর শিরা-উপশিরায় প্রবাহিত হয়। তবু প্রতিকূলতাকে সঙ্গী করে লড়াই করে, প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে, অনেকেই নতুন পথের পথিক হয়ে বাঁচার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেন।
আমি এমন দু’জন শিক্ষক-শিক্ষিকার কথা জানি, যাঁরা মনের আলোয় দেখেন। তাঁরা তন্ময় নাগ ও কুমকুম চক্রবর্তী (ছবি)। নিজেদের চেষ্টা ও বাবা-মায়ের অনুপ্রেরণায় তাঁরা গড়ে তুলেছেন তাঁদের নিজস্ব সুন্দর জগৎ। দু’জনেই ছাত্রছাত্রীদের নয়নের মণি। সংসারের দায়িত্বও নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। আজ তাঁরা বহু মানুষের প্রিয় শিক্ষক-শিক্ষিকা। তন্ময় নাগ নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন ব্লাইন্ড বয়েজ় অ্যাকাডেমির প্রাক্তন ছাত্র। সাঁতার, খেলাধুলা, সঙ্গীত— সব ক্ষেত্রেই তাঁর দক্ষতা লক্ষণীয়। বিবেকানন্দের আদর্শে দীক্ষিত এই মানুষটি কিন্তু জীবনকে উপভোগ করতে জানেন।
এক বার আমরা এই স্কুলের এক অনুষ্ঠানে গিয়ে দেখলাম— ছাত্ররা কেউ গাছ লাগাচ্ছে, কেউ চাষবাস করছে, কেউ বা বিভিন্ন হাতের কাজে ব্যস্ত। মনে হল, এরা যেন অন্তরাত্মার আলোর দিশা খুঁজে পেয়েছে। নিজেরাই সাজিয়ে তুলেছে মঞ্চ, যেখানে তারা অভিনয় করবে। কিছুক্ষণ পরেই তারা স্টেজে উঠে দাঁড়াল। মনে হল ময়ূর পেখম মেলে দেওয়ার আনন্দে ভরপুর। অসাধারণ দক্ষ তারা, তাদের অভিনয় মুগ্ধ করেছিল উপস্থিত প্রতিটি দর্শককে। করতালিতে মুখরিত হয়ে উঠেছিল অনুষ্ঠান প্রাঙ্গণ। আন্তরিকতা ও পারস্পরিক সহযোগিতার জোরে তারা অন্ধকারের প্রাচীর টপকে খুঁজে পেয়েছে আলোর ঠিকানা, সাধারণত যার খোঁজে কেটে যায় গোটা জীবন। মনে পড়েছিল— “অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলো, সেই তো তোমার আলো।”
করবী হাজরা, নিউ টাউন, কলকাতা
ইচ্ছা করেই
টুটুল চক্রবর্তীর ‘অন্তরে আজ দেখব, যখন…’ মরমি প্রবন্ধের সূত্রে কিছু অসংবেদনশীল মানুষের কথাও মনে পড়ল। এই প্রসঙ্গে আমি চোখ থাকতেও দৃষ্টিহীন মানুষের কথা তুলতে চাই। হয়তো বিষয়টি তেমন অপ্রাসঙ্গিক হবে না।
আজ বিশ্ব জুড়ে যে অস্থিরতা, যে ধ্বংসাত্মক পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তার নেপথ্যে যাঁরা রয়েছেন, তাঁরা অনেকেই ইচ্ছাকৃত ভাবে চোখ বুজে থাকেন। অসংখ্য নারী, পুরুষ ও শিশুর মৃত্যু, যন্ত্রণা ও বিপর্যয় চোখের সামনে ঘটলেও তাঁরা তা দেখতে চান না। এই স্বেচ্ছা অন্ধত্বই সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক— কারণ এতে শুধু দৃষ্টি নয়, বিবেকও অন্ধ হয়ে যায়।
সূর্যকান্ত মণ্ডল, কলকাতা-৮৪
অস্বচ্ছতার ছবি
খরচের দৈন্য’ (৩-৩) শীর্ষক সম্পাদকীয়তে বাজেটে বিভিন্ন মন্ত্রকের বরাদ্দ অর্থ এবং সেই অর্থের প্রকৃত খরচের পরিসংখ্যান দেখে স্বাভাবিক ভাবেই মনে একটি প্রশ্ন জাগে— জনমুখী প্রকল্পে বড় বড় অঙ্কের বরাদ্দ কি কেবল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই ঘোষণা করা হয়? বোধ হয় সেই কারণেই বরাদ্দ অর্থ ও প্রকৃত খরচের মধ্যে এমন বিস্তর ফারাক থেকে যায়। সাধারণ মানুষ কেবল বাজেট বরাদ্দের অঙ্কটুকুই জানতে পারেন; কিন্তু প্রকল্পে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও সেই অর্থ খরচ না-হয়ে তহবিলে পড়ে থাকলে, তা তাঁদের জানানোর কোনও রাস্তা খোলা রাখা হয়নি। ফলে জনগণের কাছে বাজেটের ব্যবহারিক চিত্র কিন্তু এক ধরনের ধোঁয়াশার মধ্যেই থেকে যায়।
এটাও বরাবরই দেখা যায়, যদি বাজেট ঘোষণার সময় কোনও রাজ্য বা দেশের ভোটের দিনক্ষণ কাছাকাছি থাকে, তবে সেই বাজেট জনমুখী না-হয়ে ভোটমুখী হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ তখন জনমতকে প্রভাবিত করার লক্ষ্যেই বাজেট প্রণয়নে ব্যস্ত হন— যেন নির্বাচনের প্রস্তুতিই প্রধান উদ্দেশ্য, আর অর্থনৈতিক পরিকাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন অপেক্ষা করতে থাকে ভবিষ্যতের জন্য। প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা, জল জীবন মিশন এবং শিক্ষা খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে বরাদ্দ ও ব্যয়ের হিসাবের বিস্তর ফারাক নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। দেশের মানুষই বিভিন্ন খাতে রাজস্ব দেন; সেই অর্থ তো নানা প্রকল্পে ব্যয় করা হয়। ফলে প্রতিটি নাগরিকেরই কিন্তু সেই বরাদ্দ অর্থের উৎস এবং তার পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যয়ের হিসাব জানার অধিকার রয়েছে।
নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলি যেমন সংবাদমাধ্যমে তাদের প্রতিশ্রুতির বড় বড় বিজ্ঞাপন দেয়, তেমনই বাজেট ঘোষণার পর প্রতিটি খাতে বরাদ্দের পরিমাণ, টাকার উৎস এবং প্রকৃত খরচের বিস্তারিত হিসাবও শাসক দলের তরফে সংবাদমাধ্যম ও পত্রিকায় প্রকাশ করা উচিত— এমনটাই মনে হয়। জনগণের টাকা, তার হিসাবও জনগণ দেখবে, এটাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা। তবে এ-ও আজ মানুষের কাছে অজানা নয় যে, যে হিসাব প্রকাশিত হয়, তার স্বচ্ছতা নিয়েও সংশয় থেকেই যায়। মানুষ এটাও বুঝে গিয়েছে— শাসক দল সব সময়ই বাজেটকে অত্যন্ত ভাল বলে প্রচার করবে, তা যতই গতানুগতিক হোক না কেন; আর বিরোধীরা তাকে জনস্বার্থবিরোধী বলবেন। আসলে বাজেট জনমুখী না জনবিরোধী— এই জটিল হিসাবের মারপ্যাঁচ সাধারণ মানুষ আর বিশ্লেষণ করতে চায় না, কারণ তারা ভাল করেই জেনে গিয়েছে, এখন সব কিছুই অনেকাংশে ভোটকেন্দ্রিক।
কোথায় কত বরাদ্দ হল এবং সারা বছরে সেই খাতে কত খরচ হল— এই সরল তথ্য যদি সাধারণ মানুষের কাছে স্পষ্ট ভাবে পৌঁছয়, তবেই প্রকৃত স্বচ্ছতা বজায় থাকতে পারে। অন্যথায়, এক প্রকল্পের টাকা সরকারি তহবিলে পড়ে থাকা বা অন্য প্রকল্পের খাতে সরে যাওয়ার বিষয়টি সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে এমন এক সময়ে, যখন নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক দলগুলির ক্ষমতায় আসা অনেকাংশেই অনুদাননির্ভর হয়ে উঠেছে, তখন এই অস্বচ্ছতা আরও প্রশ্নের জন্ম দেয়। তদুপরি, কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের উন্নতি না হলে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন কঠিন— সেটাও ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
স্বরাজ সাহা, কলকাতা-১৫০
মননের দ্বন্দ্ব
ঈশানী দত্ত রায়ের ‘সংস্কৃতির ভণ্ডামি ও ন্যাকামি’ (৩-৩) শীর্ষক প্রবন্ধটি পড়লাম। সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসু তাঁর কন্যাকে এক চিঠিতে লিখেছিলেন, “...আমরা ভারতীয় বা বাঙালিরাই বিশেষভাবে খারাপ, এই কথাটা মানতে আমি রাজি নই।” যদিও অন্য এক চিঠিতে তিনি এ-ও লিখেছেন, “...কী হীন আমরা, কী ঈর্ষাপরায়ণ, পরশ্রীকাতর, নির্বোধ...”। এই দুই উক্তির মধ্যেই যেন বাঙালি মননের দ্বৈত সত্তার আভাস মেলে।
এই স্ববিরোধিতার কারণ খুঁজতে কয়েকটি অনুমান সামনে আনা যেতে পারে। সমাজতত্ত্ববিদদের মতে, আমাদের দেশে প্রকৃত অর্থে কোনও বৈজ্ঞানিক ও যুক্তিবাদী বিপ্লব ঘটেনি। ফলে আমরা পুরোপুরি বিজ্ঞানমনস্ক হতে পারিনি; সমাজ, রাজনীতি বা সংস্কৃতির প্রশ্নে প্রায়শই দোটানায় ভুগি। আমাদের মন যেন দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে কাজ করে। অন্য দিকে, মনীষীদের, বিশেষত রবীন্দ্রনাথের মতো প্রতিভার সামনে পড়ে আমরা অনেক সময় অভিভূত হয়ে যাই। আবেগের আতিশয্য থাকলেও রবীন্দ্রচেতনার সারবস্তু আত্মস্থ করতে পারি না। তবে রবীন্দ্রনাথকে আত্মস্থ করাও নিঃসন্দেহে কঠিন। তাঁর বিরল দার্শনিক চিন্তা ও সূক্ষ্মদর্শিতার যে কথা পুত্র রথীন্দ্রনাথ উল্লেখ করেছেন, তাতেই বোঝা যায়— ধারাবাহিক রবীন্দ্রচর্চা সত্ত্বেও কেন তিনি আমাদের কাছে অনেক সময় অধরাই থেকে যান।
শিবাশিস দত্ত, কলকাতা–৮৪
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)