E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: ভারসাম্য জরুরি

গণতন্ত্র কি শুধু জনসংখ্যার অঙ্কে নির্ধারিত হবে, না কি ন্যায় ও ভারসাম্যের নীতিতেও পরিচালিত হবে? যে রাজ্যগুলি দীর্ঘ দিন ধরে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে, তারা যদি রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে পিছিয়ে পড়ে, তবে তা এক ধরনের নীতিগত বৈপরীত্য তৈরি করে।

শেষ আপডেট: ২৮ মে ২০২৬ ০৬:৫৪

সীমানা পুনর্বিন্যাস (ডিলিমিটেশন) ও নারী সংরক্ষণ— এই দুই বিষয়কে ঘিরে বিতর্ক কেবল রাজনৈতিক অবস্থানগত সংঘর্ষ নয়; এটি ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো, অর্থনৈতিক পুনর্বণ্টন এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের জটিল সংযোগস্থল। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সফল রাজ্যগুলির প্রতিনিধিত্ব যাতে কমে না যায়, সেই কারণেই ২০২৬ সাল পর্যন্ত আসন পুনর্বণ্টন স্থগিত রাখা হয়েছিল। ডিলিমিটেশন কার্যকর হলে পশ্চিমবঙ্গের আসনসংখ্যা বর্তমান ৪২ থেকে উল্লেখযোগ্য ভাবে বাড়তে পারে— অনুমান করা হচ্ছে তা ৬৩ পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে উত্তরপ্রদেশ ও বিহারের মতো জনবহুল রাজ্যগুলির আসন আরও বেশি হারে বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে সংখ্যাগত বৃদ্ধি সত্ত্বেও জাতীয় রাজনীতিতে পশ্চিমবঙ্গের আপেক্ষিক গুরুত্ব কমে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন— গণতন্ত্র কি শুধু জনসংখ্যার অঙ্কে নির্ধারিত হবে, না কি ন্যায় ও ভারসাম্যের নীতিতেও পরিচালিত হবে? যে রাজ্যগুলি দীর্ঘ দিন ধরে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে, তারা যদি রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে পিছিয়ে পড়ে, তবে তা এক ধরনের নীতিগত বৈপরীত্য তৈরি করে। আবার নারী সংরক্ষণের বিষয়টিও ডিলিমিটেশনের সঙ্গে বেঁধে দেওয়ায় প্রশ্ন উঠছে, নারীদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ কেন আরও বিলম্বিত করা হবে। গণতন্ত্রের লক্ষ্য কেবল সংখ্যাগত প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি নয়, বরং এমন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ভারসাম্যপূর্ণ শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে উন্নয়ন, ন্যায়বিচার এবং আঞ্চলিক স্বার্থ— সব কিছুর মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় থাকে। আসন বাড়ে সংখ্যায়, উন্নয়ন বাড়ে নীতিতে— এই পার্থক্যটি না বুঝলে ডিলিমিটেশন ও নারী সংরক্ষণের প্রকৃত ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা কঠিন হবে।

অলোক কুমার মুখোপাধ্যায়, উত্তর ২৪ পরগনা

ন্যায়ের অঙ্ক

ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামো আজ গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে সীমানা পুনর্বিন্যাস (ডিলিমিটেশন) এবং মহিলা সংরক্ষণ বিল এক সঙ্গে একটি বড় রূপান্তরের ইঙ্গিত দিচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকার ঘোষণা করেছে, নতুন জনগণনা এবং তার ভিত্তিতে ডিলিমিটেশন সম্পন্ন হওয়ার পরই সংসদ ও বিধানসভায় মহিলা সংরক্ষণ কার্যকর হবে। এ নিয়ে কিছু আলোচনা।

কিছু লোকসভা কেন্দ্রে ভোটার সংখ্যা ২৫ থেকে ৩০ লক্ষ বা তারও বেশি, আবার কিছু কেন্দ্রে তা মাত্র ৩ থেকে ৫ লক্ষ। অর্থাৎ, এক জন সাংসদের প্রতিনিধিত্বের ভার কোথাও পাঁচ গুণ, কোথাও সাত গুণ বেশি। একই ভাবে বিধানসভা কেন্দ্রগুলিতেও কোথাও ৩-৪ লক্ষ ভোটার, আবার কোথাও ৫০ হাজার থেকে ১ লক্ষ। এই অসামঞ্জস্য শুধু সংখ্যার পার্থক্য নয়; এটি উন্নয়ন, প্রশাসন, জনসংযোগ এবং রাজনৈতিক প্রভাবের ক্ষেত্রেও সরাসরি বৈষম্য তৈরি করে। এক জন প্রতিনিধি যখন ৩০ লক্ষ মানুষের সমস্যার মোকাবিলা করেন, তখন তাঁর কার্যকারিতা স্বাভাবিক ভাবেই সীমিত হয়। অন্য দিকে, ৩-৫ লক্ষ মানুষের প্রতিনিধি তুলনামূলক ভাবে অনেক বেশি কার্যকর হতে পারেন।

এই বৈষম্য দূর করার জন্য ডিলিমিটেশন প্রয়োজন— এ কথা সত্য। কিন্তু ডিলিমিটেশন কী ভাবে করা হবে, সেটিই আসল প্রশ্ন। যদি শুধুমাত্র বর্তমান জনসংখ্যার ভিত্তিতে আসন পুনর্বিন্যাস করা হয়, তা হলে উত্তর ও মধ্য ভারতের জনবহুল রাজ্যগুলির আসন সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি পাবে। উত্তরপ্রদেশ, বিহার, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান— এই রাজ্যগুলি সংসদে আরও বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠবে। অন্য দিকে, দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলি— তামিলনাড়ু, কেরল, কর্নাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ— যারা গত কয়েক দশকে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে, তারা আসন সংখ্যার দিক থেকে পিছিয়ে পড়তে পারে।

এখানেই সবচেয়ে বড় ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। যারা উন্নত নীতি গ্রহণ করে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করেছে, তারা কেন রাজনৈতিক ভাবে শাস্তি পাবে? আর যারা এই ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে, তারা কেন বাড়তি রাজনৈতিক ক্ষমতা পাবে? এটি শুধু একটি প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি একটি নৈতিক ও নীতিগত সঙ্কট। যদি এই ধরনের নীতি কার্যকর হয়, তা হলে ভবিষ্যতে কোনও রাজ্যই জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আগ্রহী হবে না, কারণ তার সরাসরি রাজনৈতিক ক্ষতি হতে পারে।

এই পুরো প্রক্রিয়ার সময়সীমাও একটি বড় সমস্যা। জনগণনা এখনও সম্পন্ন হয়নি। তার পরে ডিলিমিটেশন কমিশন গঠন, তথ্য বিশ্লেষণ, মানচিত্র নির্ধারণ, খসড়া প্রকাশ এবং আপত্তি নিষ্পত্তি— সব মিলিয়ে এটি ৪-৫ বছরের দীর্ঘ প্রক্রিয়া। অর্থাৎ, মহিলা সংরক্ষণ কার্যকর হতে ২০২৯ বা তারও পরে সময় লাগতে পারে। তা ছাড়া, বর্তমান আসন কাঠামোর মধ্যেই ২০১১ সালের জনগণনার তথ্যের ভিত্তিতে মহিলা সংরক্ষণ কার্যকর করা যেত। এতে অন্তত নারীদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব দ্রুত বৃদ্ধি পেত। সীমানা পরিবর্তনের মাধ্যমে একটি এলাকার সামাজিক ও রাজনৈতিক গঠন সম্পূর্ণ বদলে দেওয়া সম্ভব। যদি এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ না হয়, তা হলে রাজনৈতিক সুবিধা অনুযায়ী সীমানা নির্ধারণের অভিযোগ উঠতে পারে, যা গণতন্ত্রের ভিত্তিকেই দুর্বল করে দিতে পারে।

সাধারণ ভোটারদের উপরও প্রভাব গভীর। কেন্দ্র বদলে গেলে ভোটারদের নতুন প্রতিনিধি, নতুন বুথ এবং নতুন প্রশাসনিক ব্যবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। ভোটদানে আগ্রহ কমতে পারে এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ দুর্বল হতে পারে।

সব শেষে একটি কঠিন কিন্তু বাস্তব প্রশ্ন উঠে আসে— গণতন্ত্র কি শুধুমাত্র জনসংখ্যার উপর নির্ভরশীল হবে, না কি সমতা, ন্যায়বিচার এবং দায়িত্বশীল নীতির উপর দাঁড়াবে? যদি শুধুমাত্র সংখ্যার ভিত্তিতে ক্ষমতা বণ্টন হয়, তা হলে তা আঞ্চলিক বৈষম্য বাড়াতে পারে। আবার যদি ন্যায্য ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়, তা হলে প্রয়োজন সুসংহত ও দীর্ঘমেয়াদি নীতি, যেখানে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, উন্নয়ন এবং প্রতিনিধিত্ব— সব কিছুর মধ্যে সামঞ্জস্য থাকবে।

সন্দীপন সরকার, পাল্লা রোড, পূর্ব বর্ধমান

খোলা হাওয়া

পুনর্জিৎ রায়চৌধুরীর ‘আরতি, অদিতি, কণা’ (১-৫) শীর্ষক লেখাটি পড়ে কয়েকটি কথা মনে হল। এই মেয়েরা কর্মসূত্রে ঘরের বাইরে পা রাখছেন। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও কর্মজগতের অভিজ্ঞতা তাঁদের চেতনায় পরিবর্তন আনছে।

তবে গৃহশ্রমে আবদ্ধ থেকেও নারীচেতনার পরিবর্তনের আভাস সত্যজিৎ রায়ের সিনেমায় অনেক চরিত্রেই মেলে। লেখক ঘরে বাইরে-র বিমলার কথা উল্লেখ করেছেন। মনে পড়ছে, পথের পাঁচালী-র সেজো খুড়ির কথাও। নিশ্চিন্দিপুর ছেড়ে বেনারস যাওয়ার আগের দিন সেজো খুড়ি বলেছিলেন, বছরের পর বছর এক জায়গায় কুনো হয়ে থাকলে মন বড় ছোট হয়ে যায়...। এক সময়ের খরভাষী সেজো খুড়ির এই মানসিক পরিবর্তনটি বিশেষ লক্ষণীয়। এই বদলের পিছনে কি সমাজের ধীরে ধীরে বদলে যাওয়া বাতাসেরও কোনও প্রভাব ছিল?

নীলকমল বন্দ্যোপাধ্যায়, গুসকরা, পূর্ব বর্ধমান

রক্তদান বিষয়ে

১৪ জুন বিশ্ব রক্তদাতা দিবস পালিত হলেও নিরাপদ রক্ত এবং রক্তের বিভিন্ন উপাদানের ঘাটতি এখনও বড় সমস্যা। আমাদের দেশে এখনও মূলত পূর্ণ রক্তদানের উপরেই নির্ভরতা বেশি। অথচ বহু রোগের ক্ষেত্রে প্লেটলেট ও প্লাজ়মার প্রয়োজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রক্তদানের ক্ষেত্রে দাতার পর্যাপ্ত হিমোগ্লোবিন, নির্দিষ্ট ওজন এবং রক্তবাহিত রোগের যথাযথ শনাক্তকরণ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে রক্ত সংগ্রহের পর তার সংরক্ষণ ও মাননিয়ন্ত্রণে নজর রাখাও জরুরি। স্বেচ্ছায় রক্তদানকে এক দিনের কর্মসূচি হিসাবে না দেখে সামাজিক দায়বদ্ধতা রূপে গ্রহণ করাই উচিত।

বিজুরিকা চক্রবর্তী, দমদম, কলকাতা

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Delimitation Women Reservation Women Reservation Bill indian politics West Bengal Politics

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy