মন ভাল নেই গোপালকদের। কারণ বর্তমানে গরু কেনাবেচার যে ছবিটা উঠে আসছে তাতে আগামী দিনে পরিস্থিতি সঙ্কটজনক হয়ে উঠতে পারে বলে তাঁদের আশঙ্কা। এমনকী মূলত দুধের জন্য যাঁরা গোপালন করেন, তাঁরাও সমস্যায় পড়বেন। কারণ গাভী থেকে দুধ পাওয়া গেলেও পুরুষ বা এঁড়ে গরু বিক্রি করা ছাড়া বিকল্প পথ নেই। তা ছাড়া, যে সমস্ত গরুর বাচ্চা হয় না, সেগুলিও বিক্রি করে দেওয়া হয়। গাভীর দুধ দেওয়া কমে গেলেও অনেক গোপালক তা বিক্রি করে দেন। সেই বিক্রির টাকা দিয়ে তাঁরা আবার গাভী কেনেন। কেউ কেউ বিপদে-আপদে জরুরি ভিত্তিতে গরু বেচে নগদ টাকাও জোগাড় করেন।
ফলে গরু যদি সুলভ মূল্যে বিক্রি করা না যায় তা হলে নগদ টাকায় তো টান পড়বেই, উল্টে অনুৎপাদী গবাদি পশুকে বসিয়ে খাওয়াতে হবে। তার খরচও কম নয়। আবার যাঁরা ঋণ করে গরু কিনে ব্যবসা করেন, তাঁদের মোটা টাকা অঙ্কের সুদ দিয়ে যেতে হবে। বিশেষ করে গ্রামগঞ্জে দুধের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ঘোষ সম্প্রদায়ের মানুষজন এই বিপদের আঁচ পেতে শুরু করেছেন।
ধুবুলিয়ার মায়াকোল গ্রামে প্রায় একশো শতাংশ ঘোষ সম্প্রদায়ের বাস। প্রতিটি বাড়িতেই দুইয়ের বেশি গরু আছে, কারও কারও বাড়িতে ছয়-সাতটা করেও আছে। এই গ্রামের মানুষ মূলত দুধের জন্য গোপালন করলেও, সময়ে সময়ে গরু বিক্রি করতে না পারলে আর্থিক সঙ্কটে পড়বেন বলে জানিয়েছেন। গ্রামের বাসিন্দা ভোলা ঘোষের চারটি গরু আছে। একটি দুধ দেয়, একটির দুধ দেওয়ার বয়স হয়েছে। আর দু’টি পুরুষ বা এঁড়ে গরু। ভোলা বলেন, “আমাকে তো কিছু দিনের মধ্যে তিনটে গরু বেচতেই হবে। কারণ এঁড়ে গরুর পিছু দিনে কম করে দুশো টাকা করে খাওয়া-খরচ আছে। সেগুলি বিক্রি করতে না পারলে আমাকে দিনে চারশো টাকা করে খরচ করতেই হবে। তার উপর গাভীটা দুধ দেওয়া বন্ধ করে দিলে তাকেও বসিয়ে খাওয়াতে হবে। আবার এই গরুগুলো বেচতে না পারলে নতুন গরু কেনার টাকাও পাব না।”
মায়াকোলেরই গোপালক দুষ্টু ঘোষ বলেন, “বকরি ইদের সময় গরুর চাহিদা থাকে বলে দামটাও ভাল পাওয়া যায়। এ বার সেটা হল না। এই ধাক্কা না হয় সামলে নিলাম, কিন্তু আগামী দিনেও যদি গরু কেনাবেচা বন্ধ থাকে, তা হলে কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে। সে ক্ষেত্রে বয়স্ক, এঁড়ে ও বাঁজা গরু রাস্তায় ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় থাকবে না।” একই কথা বলছেন আরও অনেক গোপালকই। রানাঘাটের আনুলিয়া পঞ্চায়েতের সদগোপ পাড়ার গোপালক সুজয় ঘোষ বলেন, “আমাদের পরিবার বংশপরম্পরায় গোপালন, দুধ বিক্রি ও গোবর সার তৈরি করেই সংসার চালিয়ে আসছে। গরু বেচাকেনা আমাদের ব্যবসার প্রধান উদ্দেশ্য নয়। তবে নিয়ম মেনেই যাতে সাধারণ খামারি ও গোপালকেরা কাজ করতে পারেন, সেই দিকটাও সরকারের দেখা উচিত।”
হোগলবেড়িয়ার যমশেরপুর দাসপাড়ার দীর্ঘদিনের গোপালক কার্তিক ঘোষের গোয়ালে ছোট-বড় মিলিয়ে ৬০টি গরু আছে। তিনি বলেন, “আমাদের মূলত দুধের ব্যবসা। তার জন্য গাভী ও বকনা গরু পালন করি। তবে স্বাভাবিক ভাবেই এঁড়ে বাছুর সময়-সুযোগ মতো বিক্রি করতে হয়।” দুগ্ধ ব্যবসায়ী চিরঞ্জিত ঘোষ আবার বলেন, “যাঁরা কেবলমাত্র গরু কেনাবেচা করেন তাঁরা হয়তো সমস্যায় পড়তে পারেন। তবে এখনও সেটা প্রকট ভাবে দেখা দেয়নি।”
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)