পশ্চিমবঙ্গে সরকার পরিবর্তন হয়েছে। নতুন সরকারে যাঁরা এসেছেন, তাঁদের পক্ষ থেকে সুন্দরবনের মৎস্যজীবীদের সমস্যা সমাধান এবং ইকো টুরিজ়্ম গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। নিঃসন্দেহে এই প্রতিশ্রুতি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সুন্দরবনের হাজার হাজার মানুষ প্রতি দিন জীবন হাতে নিয়ে নদী ও সমুদ্রে মাছ ধরতে যান। ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, কুমির, বাঘ, জলদস্যু— সব কিছুর সঙ্গে লড়াই করেই জীবিকার সংস্থান করেন তাঁরা। অথচ, সেই মাছ বাজারে পৌঁছনোর আগে বহু হাত বদল হয়, দামও কয়েক গুণ বেড়ে যায়। কলকাতা থেকে আন্তর্জাতিক বাজার— সব জায়গাতেই লাভের অঙ্ক বাড়ে, অথচ যাঁদের শ্রম ও ঝুঁকির উপর এই অর্থনীতি দাঁড়িয়ে, সেই জেলেদের ভাগ্যে জোটে সামান্য অর্থ। ফলে সুন্দরবনের বহু যুবক আজ বাধ্য হয়ে পরিযায়ী শ্রমিকে পরিণত হচ্ছেন। কেউ কেরলে নির্মাণ শ্রমিক, কেউ গুজরাতে কারখানায়, কেউ দিল্লির অচেনা শহরে দিনমজুর। নদীর পাড়ে জন্ম নেওয়া মানুষকে জীবিকার সন্ধানে ভিটেমাটি ছেড়ে বহু দূর চলে যেতে হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে ‘ইকো টুরিজ়্ম’ এখন বহুল উচ্চারিত শব্দ। শুনতে পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক। কিন্তু সুন্দরবনের মানুষের মনে এর সঙ্গে আশার পাশাপাশি আশঙ্কাও জড়িয়ে আছে। কারণ দেশের নানা প্রান্তে দেখা গেছে, পর্যটনের নামে পাহাড়, জঙ্গল ও সমুদ্রতট ধীরে ধীরে কয়েকটি বড় কর্পোরেট সংস্থার নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। তাই আজ প্রশ্ন উঠছে— সুন্দরবনের ইকো টুরিজ়্ম কি সরকারের সহায়তায় স্থানীয় মানুষের হাতে গড়ে উঠবে, না কি বড় সংস্থাগুলির রিসর্ট, জেটি ও বাণিজ্যিক প্রকল্পে ভরে যাবে দ্বীপাঞ্চল? যদি স্থানীয় মানুষকে বাদ দিয়ে কর্পোরেটভিত্তিক পর্যটন গড়ে ওঠে, তবে তা শুধু পরিবেশের ক্ষতিই করবে না, অর্থনৈতিক বৈষম্যও তৈরি করবে। সুন্দরবনের মানুষ তখন নিজের ভূমিতেই দর্শক হয়ে পড়বেন।
একই চিত্র দেখা যাচ্ছে সুন্দরবনের মধু শিল্পেও। এই মধু শুধু একটি পণ্য নয়, এটি মধু সংগ্রাহকদের জীবনসংগ্রামের ফসল। বাঘের ভয়, নদীর স্রোত, ঝড়— সব উপেক্ষা করে তাঁরা মধু সংগ্রহ করেন। অথচ, এখন বিভিন্ন কর্পোরেট সংস্থা নিয়ন্ত্রিত ভাবে বাক্স বসিয়ে মধু সংগ্রহ করছে এবং সেই মধু আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করে বিপুল মুনাফা করছে। অন্য দিকে, সাধারণ সংগ্রাহকদের জঙ্গলে প্রবেশের সময়সীমা কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
আরও প্রশ্ন হল, মধু প্রক্রিয়াকরণ ও পরিশোধনের ব্যবস্থা কেন সল্ট লেক-কেন্দ্রিক হবে? এই শিল্প যদি কাকদ্বীপ, গোসাবা বা জয়নগর এলাকায় গড়ে উঠত, তা হলে কি হাজার হাজার স্থানীয় মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থান হত না? উৎপাদন সুন্দরবনে, ঝুঁকি সুন্দরবনের মানুষের, অথচ প্রক্রিয়াকরণ ও মুনাফা শহরে— এই বৈষম্যে কি কোনও অঞ্চলের সুস্থায়ী উন্নয়ন হতে পারে?
সুন্দরবনকে রক্ষা করতে হলে শুধু প্রকৃতি নয়, এখানকার মানুষকেও বাঁচাতে হবে। উন্নয়নের নামে যদি স্থানীয় মানুষ ক্রমশ প্রান্তিক হয়ে পড়েন, তবে সেই উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত সুন্দরবনের অস্তিত্বকেই বিপন্ন করবে।
সুজিত পাত্র, পূর্ণচন্দ্রপুর, দক্ষিণ ২৪ পরগনা
প্রতিশ্রুতি রক্ষা
সাম্প্রতিক কালে তৃণমূল কংগ্রেসের পতনের দেওয়াল লিখন দৃশ্যত স্পষ্টতর হয়ে উঠছিল। যদিও প্রাক্তন শাসকের সাম্রাজ্য এ ভাবে ধূলিসাৎ হয়ে যাবে— তা এক সময়ের বিরোধী দল বিজেপিও হয়তো কল্পনা করতে পারেনি। সরকারে ক্ষমতাসীন থেকে সর্বগ্রাসী রাজনীতি করা এ রাজ্যে ঐতিহ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত শতকের সত্তর-আশির দশক থেকে চলে আসছে এই প্রবণতা। কংগ্রেস থেকে শুরু করে সিপিআই(এম), পরে তৃণমূল কংগ্রেস, কোনও দলই ক্ষমতার অপব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ দেখায়নি।
প্রসঙ্গত, ‘অভিষেক পর্ব’ (১১-৫) শীর্ষক সম্পাদকীয়তে যথার্থই বলা হয়েছে— একের পর এক শিল্প-সম্ভাবনার গোড়ায় কুঠারাঘাতের ইতিহাস উনিশশো ষাট-সত্তরের দশকের বামাদর্শ-যাত্রা থেকে শুরু করে একুশ শতকের প্রথম দশকের শেষে বাম-অস্তাচল ও তৃণমূল কংগ্রেসের উত্থান পর্যন্ত বিস্তৃত। কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি বিজেপির প্রচারে বারংবার উচ্চারিত— যার সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও সেই পরিকল্পনার দক্ষ রূপায়ণ সঠিক ভাবে হবে কি না সময়ই বলবে। আইনশৃঙ্খলা ও নারীনিরাপত্তা— এ বারের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় বিষয় হলেও, অভিজ্ঞতা অন্য কথা বলে। এ বিষয়ে বিজেপি-শাসিত অন্য রাজ্যগুলি কিন্তু এখনও যথেষ্ট পিছনের সারিতে। পরিশেষে, রাজ্যবাসীর কাছে যে প্রশ্নটি সব দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ তা হল— বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ায় যে-সব মানুষ অযৌক্তিক ভাবে ভোটাধিকারহীন হয়েছেন, তাঁদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার গুরুদায়িত্বটি যেন অগ্রাধিকার পায়। এই কাজটি যেন অকালে হারিয়ে না যায়।
শক্তিশঙ্কর সামন্ত, ধাড়সা, হাওড়া
প্রত্যাশা
সম্প্রতি রাজ্যে পালাবদল হয়েছে। নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে মানুষের এখন অনেক প্রত্যাশা। আগামী দিনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁর বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, কর্মসংস্থান ও শিল্পায়ন। রাজ্যে নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপন এবং বেকার যুবকদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া দরকার। দুই, কৃষক ও শ্রমিক কল্যাণের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। সারের দাম কমানো, সস্তায় কৃষি সরঞ্জাম সরবরাহ এবং উৎপাদিত ফসলের সঠিক ও ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা জরুরি। তিন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নে কড়া হাতে অনেক কাজ করতে হবে, যে কাজ কিছুটা শুরু হয়েছে। বিদ্যালয়, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও হাসপাতালগুলির আধুনিকীকরণ এবং সঠিক মানের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবা নিশ্চিত করতে পারলেই সাধারণ মানুষের মনে বিশ্বাসের জায়গাটি তৈরি করতে পারবে নতুন সরকার।
চার, প্রশাসন হোক দুর্নীতিমুক্ত। গড়ে উঠুক স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক শাসন ব্যবস্থা, যেখানে সাধারণ মানুষ সহজেই সরকারি সুবিধা পাবেন। সরকারি প্রকল্পের সুবিধা সকল স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। পাঁচ, শিল্প ও সংস্কৃতির বিকাশ জরুরি। শিল্পীদের জন্য নিরপেক্ষ ও রাজনৈতিক চাপমুক্ত কাজের পরিবেশ তৈরি করতে সঠিক পদক্ষেপ করতে হবে। বেশি জোর দিতে হবে নতুন শিল্প বাণিজ্য কলকারখানা গড়ে তুলতে। কলকারখানা হলে বাড়বে কর্মসংস্থানের সুযোগ। তবেই বাংলা আবার ফিরে পাবে তার হৃত গৌরব।
ফারুক আহমেদ, ঘটকপুকুর, দক্ষিণ ২৪ পরগনা
পালাবদল
শ্রাবণী মুখোপাধ্যায়ের ‘পরিবর্তনের স্বরূপ’ (১২-৫) শীর্ষক প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে এই চিঠি। তামিলনাড়ুর ভোটারদের কাছে রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে গত প্রায় ছয় দশক ধরে পছন্দের তালিকাটা ছিল খুবই সীমিত, হয় ডিএমকে নয়তো এআইএডিএমকে। রজনীকান্ত, কমল হাসনের মতো চলচ্চিত্রের তারকারা তামিল রাজনীতিতে এসেছেন, তবে তাঁরা খুব একটা সফল হননি। সে দিক থেকে মহাতারকা চন্দ্রশেখরন জোসেফ বিজয়-এর রাজনীতিতে উত্থান সব দিক দিয়েই নাটকীয় ঘটনা। কম বয়সে অভিনয়ে আসা, চলচ্চিত্র জগতের জনপ্রিয়তা থেকে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে এই উত্তরণ তামিল রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক নতুন ধারা নির্দেশ করছে। তামিলনাড়ুর এই রাজনৈতিক অধ্যায় আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে গণতন্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ হল নীতি, স্বচ্ছতা এবং জনআস্থা। বিজয় সরকারের সামনে তাই এক কঠিন কিন্তু সম্ভাবনাময় পথ উন্মুক্ত— যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপই শুধু রাজনৈতিক স্থায়িত্ব নয়, তামিলনাড়ুর অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
প্রদীপকুমার সেনগুপ্ত, ব্যান্ডেল, হুগলি
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)