E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: নির্জনতার কবি

জীবনানন্দের কাছে জীবনের সাধ অফুরন্ত। তবে সে সব রঙিন আকাঙ্ক্ষার শিয়রে তিনি দেখেছিলেন দেওয়ালের মতো জেগে থাকা ধূসর মৃত্যুর মুখ। জ্যোৎস্নার দখিনা বাতাসেও তিনি শুনেছিলেন ঘাই-হরিণীর ডাক ও বন্দুকের শব্দ।

শেষ আপডেট: ১৪ মার্চ ২০২৬ ০৬:২৫

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের ‘জনতাগভীর নির্জনতা’ (রবিবাসরীয়, ১৫-২) শীর্ষক প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা। জীবনানন্দ দাশ ছিলেন গভীরতর মনন-পথের যাত্রী। তাঁর কবিতার জগৎ— “এক সান্ধ্য, ধূসর, আলোছায়ার অদ্ভুত সম্পাতে রহস্যময়, স্পর্শগন্ধময়, অতি-সূক্ষ্ম-ইন্দ্রিয়চেতন জগৎ— যেখানে পতঙ্গের নিশ্বাসপতনের শব্দটুকুও শোনা যায়, মাছের পাখনার ক্ষীণতম স্পন্দনে কল্পনার গভীর জল আন্দোলিত হ’য়ে ওঠে।” (‘জীবনানন্দ দাশ-এর স্মরণে’, কালের পুতুল, বুদ্ধদেব বসু)। তিনি লক্ষ করেছিলেন মানুষের সৌন্দর্যবোধের বিপন্নতাও। পার্থিব জীবনের অসম্পূর্ণতা তাঁর কাব্যে প্রতিফলিত। আবার সৃষ্টিসম্ভাবনাহীন বন্ধ্যা যুগকে তিনি দেখেছিলেন হেমন্তের চিত্রকল্পে। ক্ষয়িষ্ণু যুগ প্রতিবিম্বিত হয়েছে হেমন্তের নিঃস্ব রূপে। আপন সত্তার গভীরতায় উঠে এসেছিল উত্তর-সামরিক মধ্যবিত্ত মানসের ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’।

জীবনানন্দের কাছে জীবনের সাধ অফুরন্ত। তবে সে সব রঙিন আকাঙ্ক্ষার শিয়রে তিনি দেখেছিলেন দেওয়ালের মতো জেগে থাকা ধূসর মৃত্যুর মুখ। জ্যোৎস্নার দখিনা বাতাসেও তিনি শুনেছিলেন ঘাই-হরিণীর ডাক ও বন্দুকের শব্দ। সৌন্দর্য ও হৃদয়হীন যুগে তিনি আপন মনকে মৃত হরিণের সঙ্গে একাত্ম করে দেখেছিলেন। প্রাণতপ্ত এই কবিতায় তুলেছিলেন প্রেমের ভয়াবহ গম্ভীর স্তম্ভ। আসলে বৈচিত্রহীন যান্ত্রিক যুগের নিষ্পেষণে মৃত্যু-কামনায় তাঁর মন হয়েছিল দিশাহারা। তাই ‘জীবনানন্দীয়’ সকল অনুভূতির শিয়রে দাঁড়িয়ে ছিল উদ্যমহারা শূন্যতা। নির্জন হৃদয়ের কঠিন বন্ধনে বেরিয়ে এসেছিল অশ্রুফোঁটা।

জীবনানন্দ শূন্যতা-সঞ্চারী ক্লান্তিবোধের কবি। বিষণ্ণতা, নিরর্থকতা, উদ্বেগজনিত কারণে মৃত্যু কল্পনা তাঁর কবিমানসকে প্রভাবিত করেছে। তিনি যুগের জ্বালা যন্ত্রণা অগ্নিদাহকে প্রকাশ করেছেন অনায়াস দক্ষতায়। ক্লান্তি, অবসন্নতা, মৃত্যু বা ইতিহাসচেতনা তাঁর শব্দের আশ্চর্য শরযোজনা ও চিত্রকল্পের ব্যবহারে পেয়েছিল অনন্য মাত্রা। মুমূর্ষু বা হতমান মানুষের প্রতীক হিসাবে যেমন ‘শেয়াল’-এর কথা এনেছিলেন, তেমনই সৃষ্টির প্রতীক হিসাবে ব্যবহার করেছিলেন ‘হাঁস’। তবে সময় বিশেষে বিদ্রুপের আঘাতে জীবন্ত হয়ে উঠেছে তাঁর অস্থির অনুভূতি।

বিমূঢ় যুগের সংশয়ী মানবাত্মায় ক্ষতবিক্ষত কবি জীবনানন্দ দাশ একক, অনন্য এবং স্বতন্ত্র। আজও তিনি নির্জনতম কবি। সেখানে ‘জনতাগভীর নির্জনতা’ বলে কিছু হয় না।

সুদেব মাল, খরসরাই, হুগলি

ঝরা পাতা

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের মুখ উজ্জ্বল করা জীবনানন্দকে নিয়ে সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় তাঁর প্রবন্ধ ‘জনতাগভীর নির্জনতা’-তে তথ্যসমৃদ্ধ গুরুত্বপূর্ণ কথা আলোচনা করেছেন। বরিশালে ১৮৯৯ সালে জীবনানন্দের জন্ম। তিনি তাঁর জীবনের শেষ আট বছর কলকাতায় বাস করেছেন এবং সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। তাঁর নশ্বর দেহের ছাইভস্ম ছড়িয়ে আছে বাংলার রূপ-রস-প্রকৃতিতে।

বাংলা কাব্যের আকাশে তিনি ছিলেন এক নক্ষত্র। ছিলেন নিভৃতচারী, অন্তর্মুখী। কিন্তু তাঁর কবিতার ভুবন ছিল অপরিসীম বিস্তৃত। প্রকৃতি, প্রেম আর গভীর নির্জনতা তাঁর কবিতার তিনটি প্রধান সুর। রবীন্দ্র-পরবর্তী সময়ে যখন বাংলা কবিতা নতুন পথের সন্ধানে, তখন জীবনানন্দ তাঁর স্বতন্ত্র ভাষা ও চিত্রকল্প নিয়ে আবির্ভূত হন। তাঁর কবিতায় গ্রামবাংলার মাঠ, ধানখেত, শালিক, নদী, কুয়াশা— সব যেন এক স্বপ্নময় আলোয় ভেসে ওঠে। “আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে”— এই আকাঙ্ক্ষায় তিনি প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এক গভীর আত্মীয়তার কথা বলেছেন। তাঁর প্রকৃতি কেবল দৃশ্য নয়, অনুভবের আশ্রয়; ক্লান্ত মানুষের শান্তির ঠিকানা। প্রেম তাঁর কবিতায় কখনও রোম্যান্টিক, কখনও বিষণ্ণ। বনলতা সেনের মতো এক নারীর মধ্যে তিনি খুঁজেছেন আশ্রয়, শান্তি ও মানবিক স্পর্শ। “হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে”— এই দীর্ঘ যাত্রার শেষে প্রেম যেন এক টুকরো বিশ্রাম। কিন্তু এই প্রেম উচ্ছ্বাসের নয়; এটি সময়-ঝরা, স্মৃতিবিদ্ধ, নীরব। নির্জনতা জীবনানন্দের কবিতার অন্তর্লীন সুর। শহরের ভিড়েও তিনি ছিলেন একাকী। তাঁর কবিতায় বার বার ফিরে আসে সন্ধ্যার অন্ধকার, ঝরা পাতা, কুয়াশার আড়াল— যেন অস্তিত্বের গভীর নিঃসঙ্গতা। তবে এই নির্জনতা হতাশার নয়; বরং আত্ম-অন্বেষণের, আত্ম-বিশ্লেষণের। নিঃসঙ্গতার ভিতর দিয়েই তিনি মানুষের অন্তর্লোককে আবিষ্কার করেছেন। জীবনানন্দের ভাষা ছিল চিত্রময় ও প্রতীকসমৃদ্ধ। তিনি শব্দের ভিতর গড়ে তুলেছেন দৃশ্যপট, সময় ও স্মৃতির মেলবন্ধন। তাঁর কবিতায় ইতিহাস ও বর্তমান পাশাপাশি চলে, যেমন ‘রূপসী বাংলা’-য় আমরা দেখি এক চিরচেনা অথচ স্বপ্নিল বাংলার রূপ।

আজও যখন আমরা ক্লান্ত হই, প্রকৃতির কোলে বা প্রেমের স্মৃতিতে আশ্রয় খুঁজি, তখন জীবনানন্দের কবিতা আমাদের সঙ্গ দেয়।

গৌতম পতি, তমলুক, পূর্ব মেদিনীপুর

শুভাকাঙ্ক্ষী

‘জনতাগভীর নির্জনতা’ প্রসঙ্গে দু’-চার কথা। অস্বীকার করার উপায় নেই যে, জীবনানন্দ দাশই প্রথম কবি, যিনি জৈবিক মৃত্যুর পাশাপাশি ইচ্ছা-মৃত্যুর কথাও বলেছিলেন। “আমরা দু-জনে মিলে শূন্য ক’রে চ’লে যাবো জীবনের প্রচুর ভাঁড়ার।” (আট বছর আগের একদিন)। জীবনানন্দীয় নির্জনতার গভীর স্তর থেকে উঠে এসেছে, “অর্থ নয়, কীর্তি নয়, সচ্ছলতা নয়—/ আরো-এক বিপন্ন বিস্ময়/ আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে/ খেলা করে;/ আমাদের ক্লান্ত করে...” কোন বিপন্ন বিস্ময়ের স্তর থেকে মানুষ ইচ্ছা-মৃত্যুর কথা ভাবে! এ প্রশ্ন করে, স্পষ্ট ভাবে তিনিই প্রথম আমাদের চিত্ত দুয়ারে ঘা দিয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, ইচ্ছা-মৃত্যুকে সমর্থনও করেছেন।

জীবনানন্দ দাশের স্বভাব যে কল্লোল কবিদের থেকে আলাদা সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বস্তুবাদীর চেতনাকে নিয়ে এক সরলরেখার বিপরীত দুই বিন্দুতে অবস্থান। মানুষের নিষ্ঠুরতাকে তিনি অন্তর থেকেই অনুভব করেছিলেন। তাই সবাই যখন এক বাস্তববাদী উন্নত সমাজের কল্পনায় সুধীন্দ্রনাথ দত্তের পরিচয়-এর হাত ধরে মার্ক্সীয় ভাবনায় মেতে গেলেন, তখন তিনি মানুষের উপর আস্থা না রেখে, প্রকৃতিতে অবগাহন করে আবার ফিরে আসতে চেয়েছেন এই বাংলায়, কিংবা বরিশালের সেই গ্রাম্য শ্যামলিমায়। তা বলে তিনি পলাতক নন। তাই সগর্বে বলতে পারেন, “হাতে তুলে দেখিনি কি চাষার লাঙল?/ বাল্‌টিতে টানিনি কি জল?/ কাস্তে হাতে কতোবার যাইনি কি মাঠে/ মেছোদের মতো আমি কতো নদী ঘাটে ঘুরিয়াছি;” প্রেমের পথে রূঢ়তা অনুভব করেছেন, ভালবাসা তখন ‘ধুলো আর কাদা’ (বোধ)। তাই তিনি জনতা বিচ্ছিন্ন নন, ‘তবু কেন এমন একাকী?’ এই জিজ্ঞাসা চিহ্নই হয়তো বলে দেয় তিনি একাকী ছিলেন না।

বুদ্ধদেব বসু যখন তাঁকে ‘আমাদের নির্জনতম স্বভাবের কবি’ বলছেন, ঠিক সেই সময় তিনি দাঙ্গা আর দেশবিভাগের প্রেক্ষিতে লিখেছিলেন ‘১৯৪৬-৪৭’ শিরোনামের কবিতা। কতখানি ভবিষ্যদ্রষ্টা ছিলেন তিনি, সেটা আজ আর মিলিয়ে দেওয়ার অপেক্ষা রাখে না।

রমজান আলি, মিঠাপুকুর, পূর্ব বর্ধমান

যৎসামান্য

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ‘মানবিক পেনশন’ প্রকল্পের মাধ্যমে রাজ্যের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মাসিক মাত্র ১,০০০ টাকা ভাতা প্রদান করা হয়। গত কয়েক বছরে দ্রব্যমূল্য যে ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, তাতে এই অতি অল্প অর্থ দিয়ে এক জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির ন্যূনতম জীবনযাপন করাও প্রায় অসম্ভব। তা ছাড়া প্রতিবন্ধীদের ক্ষেত্রে নিয়মিত চিকিৎসা, সহায়ক যন্ত্রপাতি, বিশেষ পরিবহণ বা পরিচর্যার প্রয়োজন হয়। দীর্ঘদিন ধরে মানবিক পেনশন অপরিবর্তিত থাকায় অনেক প্রতিবন্ধী মানুষ আর্থিক সঙ্কটে ভুগছেন এবং তাঁদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। একটি গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব হল সমাজের দুর্বল ও বঞ্চিত মানুষের মর্যাদা ও অধিকার রক্ষা করা। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা এই সমাজেরই অংশ। তাই তাঁদের জীবনযাত্রাকে সম্মানজনক করার জন্য রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে আরও কার্যকর সহায়তা প্রয়োজন।

কৌশিক বিশ্বাস, জালালখালি, নদিয়া

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Jibanananda Das Bengali Poet Bengali Poem

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy