সম্প্রতি অসমে জাতীয় নাগরিক পঞ্জি সংশোধনের সূত্রে যে অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। জাতি বিষয়টি বিশ্ব জুড়েই আজ এক জটিল সমস্যার সৃষ্টি করেছে। স্তালিন জাতির সংজ্ঞা নির্দেশ করে বলেন, জাতি হল এমন এক স্থায়ী জনসমাজ, যা এক ভাষাভাষী, একই বাসভূমি এবং অর্থনৈতিক ঐক্য ও জাতীয় চরিত্রবিশিষ্ট (মার্ক্সিজ়ম অ্যান্ড দ্য ন্যাশনাল অ্যান্ড কলোনিয়াল কোয়েশ্চেন)। যখন কোনও জনসমষ্টির উপযুক্ত জাতিগত বৈশিষ্ট্যগুলির প্রত্যেকটিই বর্তমান থাকে, কেবল তখনই তারা একটি জাতি বলে গণ্য হবে। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের অধিবাসীরা বা নরওয়ে ও ডেনমার্কের অধিবাসীরা এক ভাষাভাষী হলেও, তাঁরা এক জাতি নন, কারণ তাঁদের অন্য জাতিগত বৈশিষ্ট্যগুলি নেই।

প্রকৃতপক্ষে আধুনিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠার সঙ্গে জাতির উৎপত্তির বিষয়টি অঙ্গাঙ্গি। সামন্ততান্ত্রিক সমাজে যোগাযোগের অভাবে মানুষেরা বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত হয়ে বাস করত। বাজার সৃষ্টির তাগিদে, সামন্ততন্ত্রের নিগড় চূর্ণ করে পুঁজিবাদ জনসমষ্টিকে ঐক্যবদ্ধ করে তোলে। লেনিনের মতে জাতি ‘বুর্জোয়া যুগের একটি অনিবার্য রূপ’ (দ্য টিচিংস অব কার্ল মার্ক্স)।

পুঁজিবাদের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজন হয় কাঁচামাল, স্বল্প মূল্যে শ্রমশক্তি আর উৎপন্ন পণ্যের বাজার। তখনই আবির্ভূত হয় সাম্রাজ্যবাদ, যা লেনিনের ভাষায় ‘পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ স্তর’। তখনই ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলি উপনিবেশ সৃষ্টির তাগিদে সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রে পরিণত হয়, বিভিন্ন জাতির উপর চলে অমানুষিক শোষণ, পীড়ন, অত্যাচার— যা ব্রিটেন করেছিল ভারতের ক্ষেত্রে। পুঁজিবাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য যে হেতু অসম বিকাশ, সাম্রাজ্যবাদের প্রসাদধন্য কয়েকটি জাতি অন্যান্য জাতির উপর শোষণ, উৎপীড়ন চালাতে থাকে। শোষিত জাতি যখন উৎপীড়নের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়, তখনই রাষ্ট্র তাকে দমন করতে এগিয়ে আসে।

উৎপল দত্তের অনবদ্য সৃষ্টি জপেনদা উবাচ, ‘‘এ এমন দেশ যেখানে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট বলে দেন, তিনি পুরো নাগা জাতিটাকেই নিশ্চিহ্ন করে দেবেন। এ এমন জাতি নির্যাতনের লীলাক্ষেত্র যেখানে প্রধানমন্ত্রী লোকসভায় দাঁড়িয়ে বলার ঔদ্ধত্য রাখেন যে জাতিগুলি স্বাধিকারের কথা কইলে তিনি ফৌজ লেলিয়ে দেবেন, সে দেশে স্বভাবতই শাসক শ্রেণি আপ্রাণ চেষ্টা করছে প্রতিটি জাতির ভাষা, সংস্কৃতি, নিজস্বতা, স্বাতন্ত্র্য, স্বাজাত্যভিমানকে গুঁড়িয়ে দিয়ে শোষণের বধ্যভূমিকে একত্র করতে।’’ (শিকড়, জপেনদা জপেন যা)।

আবার এই ধনতন্ত্রই জাতিতে-জাতিতে সংঘর্ষ তথা জাতিসমস্যার প্রধান কারণ। সাম্রাজ্যবাদীরা অধিকৃত দেশগুলিকে শোষণ করার জন্য বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে নানা ভাবে বিরোধ সৃষ্টি করে বিভেদ অব্যাহত রাখার মরিয়া চেষ্টা চালায়। অসমিয়া এবং বাঙালিদের মধ্যে তৈরি হওয়া উগ্র জাতিবিদ্বেষ সাম্রাজ্যবাদীদের ষড়যন্ত্রের ফল।

১৯২৩ সালে রুশ কমিউনিস্ট পার্টির দ্বাদশ কংগ্রেসে, জাতিসমস্যা সম্বন্ধে স্তালিন যে রিপোর্ট পেশ করেন, তাতে অবিভক্ত ভারতের জাতি-জনজাতির সংখ্যা অন্তত আটশো বলে উল্লেখ করেন। ১৯৬১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী ভারতে এক হাজারের বেশি জাতি-জনজাতি। অথচ ১৯৪৬ সালে ‘ক্যাবিনেট মিশন’-এর কাছে রণদিভে পরিচালিত কমিউনিস্ট পার্টি যে স্মারকলিপি পেশ করে, তাতে ভারতবর্ষের মাত্র ১৮টি জাতির উল্লেখ করা হয়। সুপরিচিত মার্ক্সবাদী চিন্তক সুপ্রকাশ রায় সঠিক ভাবেই মন্তব্য করেছেন, আমাদের দেশের কমিউনিস্ট নেতৃত্ব জাতি সমস্যার প্রশ্নটিকে চির কাল অবহেলা করেছে (জাতি সমস্যায় মার্ক্সবাদ)।

নাগা, মিজ়ো, অসমিয়া, বাঙালি-সহ বহু জাতির বাসভূমি অসমকে এক ভাষাভাষী জাতির বাসভূমি বলে ঘোষণা করার মধ্যে সর্বনাশের বীজ নিহিত ছিল। ১৯৮৫ সালে হওয়া অসম চুক্তি আর একটি মারাত্মক ভুল। এ যেন নেলিতে সংগঠিত নৃশংস নরমেধ যজ্ঞের হোতা ও ঋত্বিকদের পুরস্কৃত করা হল, এবং মেরুকরণের পথ প্রশস্ত হল। ১৯৭১ সালের পর যাঁরা অসমে এসেছেন তাঁরা রাতারাতি হয়ে গেলেন অনুপ্রবেশকারী (অবশ্য এক অদ্ভুত যুক্তিতে হিন্দুরা শরণার্থী)।

অথচ ইতিহাসের সাক্ষ্য, এই অভিবাসীরা তাঁদের শ্রম, আন্তরিকতা দিয়ে দেশের অর্থনীতিকেই পুষ্ট করেন, তাঁরা জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিপজ্জনক নন। দেশের প্রকৃত শত্রু বিজয় মাল্য, নীরব মোদী বা মেহুল চোক্সীদের এবং তাঁদের পৃষ্ঠপোষক এক শ্রেণির রাজনীতিকদের ঘৃণ্য কার্যকলাপকে আড়াল করার জন্য, মানুষের দৃষ্টি অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য, এই খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষগুলিকে দেশদ্রোহী বলে দেগে দেওয়া হয়। কোথায় যেন ট্রাম্পের আমেরিকা আর অসহিষ্ণু আজকের ভারতবর্ষ মিলেমিশে একাকার।

শিবাজী ভাদুড়ী

সাঁতরাগাছি, হাওড়া

 

প্রাথমিক শিক্ষক

পুজোর ছুটিতে সপরিবার বেড়াতে যাওয়ার কথা ছিল। শেষমেশ ট্রেনের টিকিট, হোটেলের টিকিট সব কিছুই ক্যানসেল করতে হল। কারণ? জানানোর আগে আর একটা ঘটনা বলি। বন্ধু ফোন করে বলল, ‘‘এই রবিবার রি-ইউনিয়নের প্ল্যান করেছি।’’ বললাম, না রে হবে না, ডিউটি আছে রবিবার। বন্ধু অবাক হয়ে বলল, ‘‘কী এমন কাজ রে? রবিবারেও ছুটি নেই?’’

ওপরের দুটো ঘটনার পিছনে কারণ একটাই। আমরা প্রাথমিক শিক্ষক। সারা বছর ফাঁকি মারার তকমায় এবং আরও অনেক অভিযোগে অভিযুক্ত প্রাথমিক শিক্ষক। এ বার আমাদের একটা অভিযোগের কথা বলি।

প্রতি বছর আমাদের ওপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয় ডি ও এবং বুথ লেভেল অফিসারের ডিউটি। রবিবার, এমনকি পুজোর ছুটিগুলোও এই ডিউটির থেকে রেহাই নেই। কেন? রাইট টু এডুকেশন অ্যাক্ট ২০০৯, ২৭-এর সি ধারা অনুযায়ী, শিক্ষকরা শিক্ষাবহির্ভূত কোনও কাজ করতে বাধ্য নন। এ ছাড়াও সুপ্রিম কোর্টের ‘সেন্ট মেরি জাজমেন্ট’ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের কাজে প্রথমে ব্যাঙ্ক এবং সরকারি কর্মচারীদের নিয়োগ করতে হবে, তার পরও যদি প্রয়োজন হয় তখন শিক্ষকদের নেওয়া যেতে পারে।

কিন্তু দেখা যাচ্ছে, অনিচ্ছুক শিক্ষকদেরও জোর করে, পুলিশের হাত দিয়ে চিঠি পাঠিয়ে, ডিউটি করতে বাধ্য করা হচ্ছে। ডিউটির জন্য কত পারিশ্রমিক দেওয়া হবে সেটা জানতে চাইলে পর্যন্ত শো-কজ় করা হচ্ছে। এতে সুপ্রিম কোর্টের নিয়মের ব্যত্যয় তো হচ্ছেই, তার থেকেও বড় কথা, শিক্ষকদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে।

আমরা প্রাথমিক শিক্ষক, সরকারি ভৃত্য নই। আমাদেরও পুজো থাকে, ছুটি থাকে, ব্যক্তিগত জীবন থাকে। সেখানে অন্য কারও হস্তক্ষেপ আমরা কেন সহ্য করব?

অর্পণ কুমার মাজি

বাঁকুড়া

 

তখন কিন্তু

সম্প্রতি অসমের নাগরিক পঞ্জি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য ঘিরে অনেক বিতর্ক হয়েছে। এই প্রসঙ্গে দু’টি ঘটনার কথা বলব।

গত শতাব্দীর সত্তরের দশকে ইমার্জেন্সি চলছে। তখন গুয়াহাটির রাস্তাঘাট সংস্কারের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল। শহরের গুরুত্বপূর্ণ ফ্যান্সিবাজার এলাকায় অবস্থিত বিখ্যাত গুরুদ্বারটির কিছু অংশ, রাস্তা চওড়া করার আওতায় পড়েছিল। সে দিন সেবকরা কৃপাণ-সহ রাস্তায় নেমে এসেছিলেন। পঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ সিংহ বাদল কালক্ষেপ না করে সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন।

নব্বইয়ের দশকে হিন্দিভাষীদের অসম ছেড়ে যেতে বাধ্য করা হচ্ছিল। দলে দলে মানুষ চলেও যাচ্ছিলেন। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী লালুপ্রসাদ যাদব সটান গুয়াহাটিতে হাজির হয়েছিলেন। শহরের জর্জফিল্ড ময়দানে সভা করে স্বজাতির পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। মজার কথা, তখন এত বিতর্ক হয়নি।

চন্দন নাগ

সেবক রোড, শিলিগুড়ি

 

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা

সম্পাদক সমীপেষু,

৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, কলকাতা-৭০০০০১।

ইমেল: letters@abp.in

যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়। চিঠির শেষে পুরো ডাক-ঠিকানা উল্লেখ করুন, ইমেল-এ পাঠানো হলেও।