সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

জার্মানি সীমান্ত বন্ধের কথা ঘোষণা করতেই দেখি পুরো সুপারমার্কেট ফাঁকা! জীবনে প্রথম বার

এই লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের থেকে তাঁদের অবস্থার কথা, তাঁদের চারপাশের অবস্থার কথা জানতে চাইছি আমরা। সেই সূত্রেই নানান ধরনের সমস্যা পাঠকরা লিখে জানাচ্ছেন। পাঠাচ্ছেন অন্যান্য খবরাখবরও। সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন, এবং অবশ্যই আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি।

Letter from Germany
গ্রাফিক: শৌভিক দেবনাথ

জার্মানিতে আছি বেশ কয়েক বছর, সব মিলিয়ে ইউরোপে বেশ অনেকদিনই কেটে গেল! এমনিতে ভাষার সমস্যা ছাড়া তেমন খারাপ কিছু নেই। জার্মান, ফরাসি, ইটালীয়, স্পেনীয়, সব্বাই নিজের ভাষা নিয়ে খুব গর্বিত। তবে আমরা বিদেশি বলে তাও কিছুটা চার আছে, আর যদি ভাঙা ভাঙা কয়েকটা শব্দ বলতে পারি তাহলে তো আর কথাই নেই! সব্বার হাসি মুখ!

তো যখন করোনা ছড়িয়ে পড়ছিল, আমরা সবাই সতর্কতার সঙ্গে লক্ষ্য রাখছিলাম বটে কিন্তু তেমন কোনও উদ্যোগ চোখে পড়েনি, সরকারিও না বেসরকারিও না!  কিন্তু সপ্তাহ তিনেক আগে ব্যাপারটা এস্কালেট করল জার্মানিতে, ততদিনে ইটালিতে ফ্রান্সে সংক্রমণ বেশ ছড়িয়ে পড়েছে!

জার্মানরা কথাবার্তা সোজাসুজি বলে, আর যা বলে তা করবে বলেই বলে, কথার কথা না। তাই যে দিন আঙ্গেলা মর্কেল প্রেস কনফারেন্সে এসে বললেন সরকার ভয় পাচ্ছে জার্মানির ৬০-৭০% লোক করোনাতে আক্রান্ত হতে পারে সে দিন এমন চাঁচাছোলা কথা শুনে খুব অবাক হইনি!

দেশে একটু সন্ত্রস্ত আলোচনা শুরু হল, কারণ সরকারের ঘোষণাকে এরা খুবই গুরুত্ব দেয়! এর মধ্যেই অফিস থেকে জানানো হল বাড়ি থেকে কাজ করতে, অফিসে আসার দরকার নেই, সেটা ছিল ফ্রাইডে দ্য থারটিন্থ, ১৩ই মার্চ! আপাতত তিন সপ্তাহের জন্যে বাড়ি বন্দি! কিন্তু সব অফিস এ পথে হাঁটে নি! যেমন আমার বৌয়ের অফিস একটি বহুজাতিক কোম্পানি, তাদের কৰ্ম্মীদের বাড়ি থেকে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিতে নিতে পরের বুধবার হয়ে গেল! বেশিরভাগ বহুজাতিকই তাই, কিন্তু জার্মান কোম্পানিগুলো আগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছিল!

যাই হোক মার্চের মাঝামাঝি জার্মানি ইউরোপীয় সীমান্ত বন্ধ করে দিল, সুপারমার্কেট আর জরুরি প্রয়োজন ছাড়া সব দোকান বন্ধ হয়ে গেল!

দোকানপাটে কেনাকাটার ধুম পড়ল! খবর যেমন দেখলাম টয়লেট রোল নিয়ে মারামারি কিংবা শূন্য তাকের সামনে দাঁড়িয়ে বৃদ্ধদের কান্নাকাটি, সে রকম কিছু কোথাও দেখলাম না! তবে সুপারমার্কেটের তাক পুরো খালি এ জিনিস জীবনে প্রথম দেখলাম! হ্যাঁ টয়লেট রোল সব হাওয়া, হ্যান্ড স্যানিটাইজার নেই, এই সব মার্চের মাঝামাঝি! তার সঙ্গে শুকনো ফুড যেমন পাস্তা, নুডলস, চাল সবই শেষ!

আমরাও বেশ কিছু জিনিস কিনে আনলাম! তখন চারিদিকে চাপা টেনশন ছিল বটে, কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি আমরা খুব ভয় পাইনি! জার্মানি নিয়মনিষ্ঠার দেশ! লাল সিগনালে রাস্তা পার হওয়ার জন্যে বাচ্চাকেও বগলে ফুটবল নিয়ে অপেক্ষা করতে দেখেছি আমরা, যদিও রাস্তায় একটিও গাড়ি ছিল না, এরা নিয়ম থাকলে তা মেনেই চলে!

পরের সপ্তাহ আসতে না আসতেই লকডাউন, অবশ্য বাইরে বেরনো বন্ধ না, দু’জন এক সঙ্গে বেরতে পারে, সোশ্যাল ডিস্ট্যান্স রেখে, অর্থাৎ মিটার দুয়েক! বাইরে বেরনো মোটামুটি বন্ধ হল, তখন আমার দেশে তথাকথিত শিক্ষিত মানুষজনের কাণ্ডকারখানা দেখে রাগে গা জ্বলছে, আর দেশের বাড়িতে বাবা মা কে  যতটা সম্ভব বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করছি!  

বাড়ি থেকে কাজ মানে অফিসের কাজ কিছুই কমলো না, বরং এলোমেলো হয়ে যায় দিনগুলো, খাওয়ার সময় থাকে না, বানানোর সময় ও! তার থেকে অফিসে যাওয়াই প্রেফার করি, আর আমার অফিসে যাওয়ার রাস্তাটা এখানকার বিখ্যাত ইংলিশ গার্ডেনের মধ্যে দিয়ে গেছে, নানা ঋতুতে শহরের মধ্যেই প্রকৃতির দেখা পাওয়া যায়!

আমরা ঠিক করলাম প্রতিদিন বিকেলে অন্তত আধ ঘন্টা হেঁটে আসব! প্রথমদিন বেরিয়েই দেখি বাড়ির পাশের পার্কে সরকারি নোটিশ লাগানো, কি করা উচিত তা নিয়ে! রাস্তায় গাড়ি নেই, আধ ঘন্টায় ফুটপাথে জনা তিনেকের বেশি লোক পেলাম না! তাও তারা সবাই জগিং করতে বেরিয়েছেন! এ রকম দিন তিনেক করার পরে ইটালির অবস্থা দেখে আমরাও ঠিক করলাম দরকার না থাকলে বাইরে বেরোবো না!

চারিদিক নিস্তব্ধ, সেটা যদিও নতুন কিছু না, কিন্তু খেয়াল করে দেখলাম দূরাগত গাড়ির যে মৃদু আওয়াজ আসত তা নেই! লোকজনকে বাড়ির ব্যালকনিতে বেশি দেখা যাচ্ছে!

সপ্তাহখানেক পরে আবার সুপারমার্কেটে গেলাম, গিয়ে দেখি লাইন টেনে দেওয়া হয়েছে ক্যাশ কাউন্টারে, ২ মিটার দূরত্বে, যদিও কেনাকাটা করার সময়ে ডিসটেন্স রাখা সম্ভব হচ্ছে না! সুপারমার্কেট আবার ভর্তি! টয়লেট রোল ও আছে, নেই হ্যান্ড স্যানিটাইজার! ক্যাশ কাউন্টারে দাঁড়িয়ে লক্ষ করলাম লোকজন কেমন জিনিস কিনছে, কোথাও দেখলাম না স্তূপাকার জিনিস পত্র, সাধারণত যেমন হয় তেমনই আর কি!

এরই মধ্যে একজন জাপানি মহিলা দেখি লোকজনের লাইনের ছবি তুলছে,  লোকজনের মুখের অবস্থা দেখে মনে হল না তারা সেটা ভাল করে নিচ্ছে, কারণ মঙ্গোলয়েড লোকজনকে লোকে এ সময়ে একটু আড় চোখেই দেখছে, চাপা গলায় দু একটা জার্মান রাগী মন্ত্যব্যও কানে এলো!

ফেরার সময়ে দেখি পার্কে কয়েকজন ফুটবল খেলছে, দেখে বুঝলাম এরা অভিবাসী ছোকরারা! শুধু এরাই নয়,অনেক ইয়ং পাবলিকের এইরকমই মনোভাব, আমরা কিছু মানি না!

বাকি কেমন চলছে? এটা তৃতীয় সপ্তাহ, বাড়িতে বসে বসে খারাপ খুবই লাগছে, বাড়িতে চমৎকার রৌদ্রোজ্জ্বল দিন, গাছে গাছে নতুন পাতা বেরচ্ছে, জানি শহরের বাইরের আল্পসের কোলের লেকগুলো এখন সেজে উঠছে, কিন্তু কিছু করার নেই, বাড়িতে বসে থাকা ছাড়া! আমরা মানুষেরাই নিজেরাই নিজেদের এই দণ্ড দিয়েছি, প্রকৃতি তাই বাইরে থেকে হাসছে!

লোকের মনে ভয় অর্থনীতির কি অবস্থা হবে, অফিসের ভয় লোকজন ঝিমিয়ে পড়ছে নাকি, তাই ভিডিও কলে নানারকম জিনিস করা হচ্ছে, যেমন ভিডিয়ো কল করে ভার্চুয়াল লাঞ্চ, ভার্চুয়ালের কফি, ক্যামেরার সামনে নিজের ঘরে বসে চা খেতে খেতে অল্প আড্ডা! সত্যি কথা বলতে কি এসব ভালই লাগছে! এর মধ্যে জার্মান সরকার অর্থনৈতিক ত্রাণ ঘোষণা করেছে, কোম্পানিগুলো ইচ্ছে করলে তার সুবিধা নিতে পারে! মানে তাদের নিজস্ব আয় কমে গেলে সরকার তা পূরণ করবে, পুরোটা না, ৬০% থেকে ৯০%, মানে স্যালারিও লোকে ঐ রকম পাবে, এর সুবিধা হল যে কোম্পানির আয় কমলে লোকজনের আয়ও কমবে, কিন্তু লোকজন চাকরি হারাবে না! সরকার এই ত্রাণ একবছর অবধি দেয়! এটা করোনার জন্যে নতুন কিছু না, সরকারের এই প্রকল্প বরাবরই আছে, ২০০৮ সালেও লোকে এর সুবিধা পেয়েছে! জার্মান এবং ইউরোপের অনেক দেশই এরকম করে, সোশ্যালিস্ট নীতি মেনে চলে যেখানে সাধারণ মানুষের জব সিকিউরিটি অনেক বেশি!

সাধারণ লোকে বোকার মতন কাজ করছে নাকি? তা তো করছেই, সব দেশেই এরকম লোকজন আছে, যারা নিজেদের ছাড়া কিছু বোঝে না, তাই যেমন মেডিকেল ফেসিলিটি থেকে হ্যান্ড স্যানিটাইজার চুরির ঘটনা ঘটেছে তেমনি আমরা সুপারমার্কেটে দেখলাম, এক বয়স্ক মহিলা কাকে যেন হাত নাড়ছেন,  মুখে হাসি, আর চোখে তাকিয়ে দেখি দূরে একটি অল্পবয়স্ক ছেলে আর একটি মেয়ে, ওরাও প্রত্যুত্তর দিচ্ছে, ছেলেটির মুখ দেখে বুঝতে অসুবিধা হয়না বয়স্ক মহিলা ওর মা! মা ব্যাটার সুপারমার্কেটে দেখা হয়েছে, তারা কাছাকাছি আসেনি, সোশ্যাল ডিস্ট্যান্স বজায় রেখেছে! আমার বাড়ির নিচে মেন দরজার কাছে একজন একটা ছোট পোস্টার ঝুলিয়ে দিয়েছে, নিজের নাম এবং ফোন নাম্বার সমেত, যদি কোনও বয়স্ক বাসিন্দার বাজার দোকান করার দরকার হয় তা হলে যেন তাকে ফোন করে!

এই রকম সাধারণ মানুষই ভরসা এই পৃথিবীর! এইভাবেই আমরা এই দুর্ভোগকে জয় করব!

অরিন্দম চট্টোপাধ্যায়, জার্মানি

 

(অভূতপূর্ব পরিস্থিতি। স্বভাবতই আপনি নানান ঘটনার সাক্ষী। শেয়ার করুন আমাদের। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিয়ো আমাদের ইমেলে পাঠিয়ে দিন, feedback@abpdigital.in ঠিকানায়। কোন এলাকা, কোন দিন, কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই দেবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।)

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন