প্রহেলী ধর চৌধুরীর ‘মানুষের নয়, এ ধর্ম রাজনীতির’ (২৫-১২) শীর্ষক প্রবন্ধটি পড়ে কিছু কথা।
ধর্ম— যা আমাদের শিখিয়েছেন শ্রীচৈতন্যদেব, ঠাকুর রামকৃষ্ণ, স্বামী বিবেকানন্দ, মা সারদার মতো মনীষীরা— তার মূল বাণীই হল সকলকে আপন করে নেওয়া। যুগে যুগে তাঁরা শিখিয়েছেন ‘পরমতসহিষ্ণুতা’, ‘যত মত তত পথ’-এর মতো মানবিক দর্শন। কেউই সংখ্যাগুরুর আধিপত্যবাদকে প্রশ্রয় দেননি। কেউ নিজের মত অন্যের উপর চাপিয়ে দেননি। কেউই বলেননি যে কেবল তাঁর মতই শ্রেষ্ঠ।
বর্তমানের এই অসহিষ্ণু সমাজে কোনও ব্যক্তি যা বিশ্বাস করে, সে চায় বাকি সব মানুষও যেন তাই বিশ্বাস করে। মতান্তর তার পছন্দ নয়। সংখ্যাগুরু হওয়ার সুবাদে সর্বদা চেষ্টা থাকে সেই বিশ্বাসকে অবিশ্বাসীদের উপর চাপিয়ে দেওয়ার। এই চাপিয়ে দেওয়ার কাজে বর্তমানে সহযোগী হয়ে উঠেছে ক্রমাগত প্রচার। এই প্রচারের ফলেই বহু অহিন্দিভাষী মানুষও বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে হিন্দিই ভারতের রাষ্ট্রভাষা। ক্রমাগত প্রচারেই কিছু আমিষাশী মানুষ ভাবতে শুরু করেছে যে নিরামিষ আহারই বুঝি ভারতে একমাত্র গ্রহণযোগ্য। ক্রমাগত প্রচারের জোরেই অবিশ্বাস্য ঘটনাও বিশ্বাসযোগ্য বলে পরিগণিত হয়।
মৌলবাদী চিন্তাধারা মননশক্তির অবনমন ঘটায়। কিছু দিন আগেও মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি ছিল দরিদ্রের পাশে, শোষিতের পাশে, নিপীড়িতের পাশে দাঁড়ানো। কিন্তু মৌলবাদী মগজধোলাইয়ের ফলে ধীরে ধীরে মানুষের সেই মনুষ্যত্ব আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। সেই কারণেই দরিদ্র বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিক অন্য রাজ্যে নিগৃহীত হন, এমনকি মারা যান। সেই একই কারণে বড়দিনে টুপি বিক্রি করায় দরিদ্র টুপিওয়ালাকে হেনস্থার শিকার হতে হয়। এই কারণেই জবলপুরে দৃষ্টিহীন, সংখ্যালঘু খ্রিস্টান নারী এক নেত্রীর দ্বারা লাঞ্ছিত হন। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়— ‘ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে,/ অন্ধ সে জন মারে আর শুধু মরে।’
সুরজিৎ কুন্ডু, উত্তরপাড়া, হুগলি
ধর্মান্ধদের মেলা
প্রহেলী ধর চৌধুরীর ‘মানুষের নয়, এ ধর্ম রাজনীতির’ শীর্ষক প্রবন্ধ প্রসঙ্গে কিছু কথা।
শ্রীরামচন্দ্র এখন আর বাল্মীকির রচিত মহাকাব্য রামায়ণ-এর কাব্যিক চরিত্রমাত্র নন, তিনি হিন্দুদের একাংশের কাছে অন্যতম উপাস্য দেবতা। রামচন্দ্র নিরামিষাশী ছিলেন না আমিষাশী ছিলেন— তা নিয়ে অকারণ বিতর্ক শুরু হয়েছে। অনুগামীরা ‘আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে’ নিজের নিজের ঈশ্বর নির্মাণ করে নেন। রামচন্দ্রের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি।
রামচন্দ্র নিরামিষাশী ছিলেন— এই ভাবনা যাঁদের মনের গভীরে প্রোথিত, তাঁরা কখনওই তাঁকে আমিষাশী মানতে চাইবেন না। এঁরা সকলেই চান, তাঁদের মতকেই সবাই বিশ্বাস করুক। মহাকাব্যের রচয়িতা রামচন্দ্রের চরিত্র যে ভাবেই ব্যাখ্যা করুন, অন্ধ অনুগামীরা নিজেদের মতো করেই তাঁকে নির্মাণ করেছেন। সকলে সেই নির্মাণের পক্ষেই মত দেবে— এমনটাই তাঁদের প্রত্যাশা।
যে সহিষ্ণুতা ও বিবেচনাবোধ থেকে মানুষ অপরের যুক্তি ও বিশ্বাসকে মান্যতা দিতে সম্মত হন, সেটাই এঁদের মন থেকে চিরতরে হারিয়ে গিয়েছে। নিজের অবস্থানে অনড় থেকে তা অন্যের উপর চাপিয়ে দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এখানেই মৌলবাদ জমি খুঁজে পেয়েছে। ধর্মের সঙ্গে রাজনীতির মিশ্রণ ঘটানো সহজ হয়ে উঠেছে। সামাজিক মেরুকরণ তাই রাজনীতির হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। বিপন্ন গণতান্ত্রিক পরিবেশ। সুযোগ বুঝে গুজব ছড়ানোর কারিগরেরা সক্রিয় হয়ে ওঠায় নিরপরাধ মানুষ বেঘোরে প্রাণ হারাচ্ছেন।
ধর্মকে সামনে রেখে এমন নৃশংস ঘটনা আর কত দিন ঘটবে? না কি সব দেখেও চোখ বন্ধ করে রাখাটাই মানুষের অভ্যাসে পরিণত হচ্ছে? এ সব এখন যেমন বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের মনে আর ঝড় তোলে না, তেমনই বামপন্থীদের মনেও বিশেষ স্ফুলিঙ্গের সৃষ্টি করে না। ঈশ্বরবিশ্বাসকে কেন্দ্র করে পৃথিবীতে অসংখ্য ধর্মমত গড়ে উঠেছে। ধর্মের অনুশাসন মেনেই মানুষ নিজের নিজের ধর্ম পালন করে। এত দিন ধর্মের সঙ্গে রাজনীতির মিশ্রণ খুব সহজ ছিল না; এখন তা অনায়াসেই ঘটে চলেছে। মানুষের মনে নানা বিভ্রান্তি সৃষ্টি হওয়ায় সমাজে বাড়ছে ধর্মান্ধ মানুষের সংখ্যা। ফলে এক ধর্মের মানুষের সঙ্গে অন্য ধর্মের মানুষের সংঘাত বৃদ্ধির আশঙ্কাও দেখা দিচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গের নাগরিক জীবনে যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাতাবরণ ছিল, তা রাজনীতির সঙ্গে ধর্মের মিশ্রণের ফলে বিপন্ন হতে বসেছে। মানুষের মধ্যে বাড়ছে ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী রাজনৈতিক শিবির বেছে নেওয়ার প্রবণতা। সাধারণ খেটে-খাওয়া মানুষের কাছেও অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান— এই সব সমস্যার সমাধানের চেয়ে নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস প্রতিষ্ঠার তাগিদ প্রবল হয়ে উঠছে। ধর্ম রক্ষার লড়াইয়ের ময়দানে তাই ধর্মান্ধ মানুষের ভিড় বাড়ছে।
পাঁচ লক্ষ কণ্ঠে ঈশ্বরের জয়ধ্বনির আড়ালে চাপা পড়ে যায় ‘চিকেন প্যাটিস’ বিক্রেতার ক্ষীণ কণ্ঠস্বর। সুযোগ বুঝে ভুঁইফোঁড় নেতারা মসজিদ নির্মাণের কর্মসূচি ঘোষণা করে রাজনীতির ময়দানে মুনাফা লুটতে চাইছেন। দুর্গামণ্ডপ ও মহাকাল মন্দিরের উদ্যোগ সম্ভবত তারই পাল্টা কর্মসূচি। প্রশ্ন, ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক দেশে কি ধর্মীয় মেরুকরণের এই প্রবণতা চলতে থাকবে?
রতন রায়চৌধুরী, পানিহাটি, উত্তর ২৪ পরগনা
ক্ষুধাই নিয়ন্তা
‘মানুষের নয়, এ ধর্ম রাজনীতির’ শীর্ষক প্রবন্ধটি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত। ব্রিগেড ময়দানে গীতা পাঠের আসরে এক প্যাটিস বিক্রেতা হেনস্থার শিকার হন। ওই মুসলিম ব্যক্তি যদি ফুল নিয়ে কোনও মন্দিরের কাছাকাছি বিক্রি করতে যেতেন, দুর্গাপূজার মণ্ডপে যদি ঢাক বাজাতেন, মণ্ডপ নির্মাণের কাজে যদি সহযোগিতা করতেন, মূর্তি নির্মাণের সময় সাহায্য করতেন, বিয়েবাড়িতে যদি সানাই বাজাতেন, কোনও আনন্দ-উৎসবে ব্যান্ড পার্টির ড্রাম বাজাতেন, রথের মেলায় রথের রশি তৈরি করতেন— তখন কি কেউ তাঁর কোনও দোষ দেখত? তখন তো কেউ মারধর করত না, বা তাড়িয়েও দিত না।
আসলে ধর্মকে রাজনীতির সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হচ্ছে। মৌলবাদী ও হিন্দুত্ববাদীদের মনে রাখা দরকার, গরিব ‘দিন আনি দিন খাই’ শ্রমজীবী মানুষের কোনও ধর্ম হয় না। তাঁদের কিন্তু একটাই ভাগ্যনিয়ন্তা— ক্ষুধা, পেট, অনাহার।
স্বপন আদিত্য কুমার বিশ্বাস, অশোকনগর, উত্তর ২৪ পরগনা
দিল্লির দূষণে
‘সংসদে ব্রাত্য’ (২২-১২) সম্পাদকীয়ের আলোচ্য বিষয় ছিল দিল্লির বায়ুদূষণ। কেন্দ্রের পরিবহণমন্ত্রী নিতিন গডকড়ী স্বীকার করেছেন যে তাঁর অসুস্থতার অন্যতম কারণ বায়ুদূষণ। ভারতের রাজধানীর এই ভয়াবহ অবস্থা অবশ্য নতুন নয়। গত কয়েক বছর ধরেই একাধিক আন্তর্জাতিক মানের পরিবেশ-সমীক্ষক দিল্লির পরিস্থিতি সম্পর্কে সতর্ক করে আসছেন। কিন্তু কর্ণপাত করা হয়নি।
আন্তর্জাতিক সংস্থা ৭,০০০ শহরের বায়ুদূষণ নিয়ে একটি সমীক্ষা প্রকাশ করে। জানা যায়, পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষতিকর শহরগুলির অন্যতম দিল্লি। এখানে দূষণের প্রধান কারণগুলি হল, ৪১% যানবাহনের ধোঁয়া, ২১% বিভিন্ন কারণজনিত ধুলো এবং ১৮% শিল্পজনিত ধোঁয়া। দিল্লির ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বায়ুদূষণের মাত্রা বিভীষিকার রূপ নেয়। থর মরুভূমির বালিকণা মিশে আসা শুকনো ঝোড়ো হাওয়াও এর অন্যতম কারণ। আমাদের দেশের ক্ষেত্রেও আফ্রিকার মতো ‘গ্রেট গ্রিন ওয়াল’ কর্মসূচিই হতে পারে একটি কার্যকর সমাধান। কিন্তু এমন বিশাল কর্মসূচির বাস্তবায়ন করবে কে?
প্রবীর চক্রবর্তী, গোচারণ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)