‘জলের মূল্য’ (১২-৭) শীর্ষক সম্পাদকীয় বিষয়ে কয়টি কথা বলিবার আছে। রাস্তাঘাটে খোলা-মুখের পাইপ দিয়া যে অনর্গল জল বাহির হইয়া যায় তাহা অস্বীকার করিবার উপায় কী? সম্পাদকীয়তে, অপচয় রোধে গৃহস্থের বাড়ি মাথাপিছু দেড়শত লিটারের বেশি জল খরচের উপর জরিমানা ধার্যের সরকারি প্রস্তাব সমর্থন করা হইয়াছে। এই জরিমানা ধার্য করিবার পূর্বে, যদি বস্তির ঘরে ঘরে পুরসভার জলের সংযোগ পৌঁছাইয়া দেওয়া যায়, তাহা হইলেই রাস্তাঘাটে জল অপচয়ের প্রশ্ন ওঠে না। স্বাধীনতার সাত দশকেরও অধিক অতিবাহিত হইবার পরে যদি তাহা করিয়া ওঠা না যায়, কাহার দোষ? নাগরিকের, না, ৭২ বৎসরের প্রতিটি মহানাগরিকের? বলা হইয়াছে, জলাশয় বোজানো হইতেছে ও প্রোমোটারচক্র বহুতল বানাইয়া সেখানে ভূগর্ভস্থ জল সরবরাহ করিতেছে। এই দু’টি ঘটনাই সরকারি অনুমতিক্রমে ঘটে, যে দুয়েকটি পুকুর বোজানোতে সরকারি সিলমোহর থাকে না, তাহা আঞ্চলিক কাউন্সিলর-বিধায়ক-সাংসদ-বিরোধী নেতার ইচ্ছাকৃত অনুমোদন ব্যতিরেকে কী ভাবে সম্ভব? কাটমানির কথা আর উল্লেখ করিলাম না। 

কলিকাতার পূর্ব প্রান্তে যে বিস্তীর্ণ বর্জ্য জলাশয় ছিল, উন্নয়নের নামে তাহা কী ভাবে নষ্ট করা হইতেছে বিগত তিন দশক ধরিয়া? ইহাতে সরাসরি সরকারি হস্তক্ষেপ রহিয়াছে। প্রাকৃতিক উপায়ে, নিখরচায়, স্রেফ সূর্যকিরণ ও বাতাসের অক্সিজেনের সংস্পর্শে ওই স্থানে বর্জ্য জল পরিস্রুত হইত। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ, প্রয়াত ধ্রুবজ্যোতি ঘোষ মহাশয়, সরকারকে সচেতন করিয়া চিঠিপত্র দিয়াছিলেন, তদ্বির করিয়াছিলেন, ফল হয় নাই। এক বার জ্যোতি বসুকে ওই স্থলে লইয়া গিয়া জলাশয়ের উপরিভাগ হইতে এক গ্লাস জল তুলিয়া পান করিতে অনুরোধ করেন ঘোষমশাই। জ্যোতিবাবু ভয়ে পান করেন নাই, পাছে এই সামান্য কারণে বিশ্বখ্যাত এক কমিউনিস্টের প্রাণ যায়। ওঁর সম্মুখে ধ্রুবজ্যোতিবাবু ওই জল পান করিয়া দেখান।

গৃহস্থের উপর জরিমানা করিবার পূর্বে ‘সুশাসনের লক্ষ্যে’ আরও কয়েকটি বিষয় বিবেচনা প্রয়োজন। নরম পানীয় প্রস্তুতকারক বহুজাতিক কোম্পানিগুলি দৈনিক কয়েক লক্ষ লিটার ভূগর্ভস্থ জল উত্তোলন করে স্রেফ তাহাদের ব্যবসার কারণে। অধুনা প্রতি লিটার পরিস্রুত বোতলবন্দি জল তাহারা কুড়ি টাকায় বিক্রয় করিতেছে। সম্প্রতি এক পুর-ইঞ্জিনিয়ার বলিয়াছেন, এক লিটার জল পরিস্রুত করিতে তাঁহাদের খরচ পড়ে ০.৪ পয়সা। কোম্পানিগুলিরও খরচা ইহা অপেক্ষা বেশি হইতে পারে না, বরং কম হওয়া স্বাভাবিক, কারণ তাহাদের পরিচালন ব্যবস্থা পুরসভা হইতে উন্নততর বলিয়া আশা করা যায়। এক দিকে সরকারের পরিস্রুত জল দিতে না পারার কারণে এই কোম্পানিদের রমরমা ব্যবসা, অন্য দিকে লিটার পিছু পাঁচ হাজার গুণ মুনাফা কত দিন মানিয়া লওয়া হইবে?

ট্রেনে ট্রেনে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বোতলবন্দি জল বিক্রি করেন, যদিও তাহার দাম নামী কোম্পানিদের জলের তুলনায় নগণ্য। তাঁহাদের জল অস্বাস্থ্যকর, তাঁহাদের বিক্রয়ের অনুমতি নাই— এই দুই অভিযোগে শতাধিক বিক্রেতাকে সম্প্রতি পুলিশ গ্রেফতার করিয়াছে। যে সব নাগরিক কুড়ি টাকা দিয়া জল ক্রয় করিয়া পান করিবার ক্ষমতা অর্জন করেন নাই তাঁহারা এই গরমে কী করিবেন? পুর দফতর বহু ক্ষেত্রে যে আর্সেনিকদুষ্ট জল সরবরাহ করিয়া থাকে, তাহা কি অস্বাস্থ্যকর নয়? ইহার জন্য কোন মন্ত্রী বা প্রশাসককে গ্রেফতার করা হইয়াছে? কোম্পানির বোতলবন্দি জল পরীক্ষা করিয়া বহু বার দেখা গিয়াছে উহাতে অনুমোদিত মাত্রার অধিক কীটনাশক আছে। উহাও অস্বাস্থ্যকর। কোম্পানির কোন আধিকারিককে গ্রেফতার করা হইয়াছে? নরম মাটিতে আঁচড়াইবার অভ্যাস কী ভাল? 

সমীর সাহা পোদ্দার, কলকাতা-৪২ 

 

সেই যন্ত্র

সম্প্রতি খবরে প্রকাশ, কেন্দ্রীয় সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশের ৭৮০০ কিলোমিটার সমুদ্র সৈকত জুড়ে এক একটি নোনাজল পরিশোধন কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। প্রতি কেন্দ্রে মেশিন বসবে, যার কাজ সমুদ্রজল লবণমুক্ত করা। এই জল পাঠানো হবে পার্শ্ববর্তী রাজ্যে। কারণ এই বছর চেন্নাই ভয়ঙ্কর জল সঙ্কটে। এই প্রসঙ্গে দু’চার কথা জানাতে চাই।

সুন্দরবনের উপর দিয়ে আয়লা ঝড় বয়ে যায় ২৫ মে ২০০৯ সালে। ১৬ মাস পরেও গোসাবার মানুষ নোনা জল খেতেন। তৎকালীন বাম সরকারের এ ব্যর্থতা ঢাকার জায়গা ছিল না। আয়লার সময় নদীর লবণাক্ত জলকে ফিল্টার করে তা শুদ্ধ পানীয়ে পরিণত করার এক অভিনব যন্ত্র দেখেছিল সুন্দরবনের বাসন্তীর মানুষ। এই আশ্চর্য অভিনব উপহারের ব্যবস্থা করেছিলেন তৎকালীন সুন্দরবন উন্নয়নমন্ত্রী কান্তি গঙ্গোপাধ্যায় ও সেচমন্ত্রী সুভাষ নস্কর। গত ২২ জুন ২০০৯ থেকে বাসন্তীর নদী পার্শ্বস্থ পালপাড়ায় এই যন্ত্রটি চালু হয়। হোগল নদীর জল পাম্পের সাহায্যে এই যন্ত্রে প্রবেশ করে সুস্বাদু পানীয়ে রূপান্তর হচ্ছে দেখে এলাকার মানুষ বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান। বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে এ এক অসাধ্য সাধন হয়েছিল। এর ফলও হত সুদূরপ্রসারী। এই যন্ত্রের ব্যবহারে ভূনিম্নস্থ জলের অপচয় কমার যথেষ্ট সম্ভাবনা ছিল। যেখানে টিউবওয়েল বসানো যায় না, সুন্দরবনে যাঁরা পুকুরের জল পান করেন, আয়লায় যাঁরা নোনা জল খাচ্ছেন, তাঁরা শুদ্ধ পানীয় জল পাবেন, এমন আশা করেছিলেন এই এলাকার মানুষ।

‘এমএমপি ফিল্ট্রেশন প্রাইভেট লিমিটেড’ নামে এক কোম্পানি এই বিদেশি ফিল্টারাইজ়েশন যন্ত্রটি এখানে বসিয়েছিল। এক ঘণ্টায় দু’হাজার লিটার নদীর লবণাক্ত জল ফিল্টার করে হাজার হাজার বোতলে ভরে পানীয় হিসাবে পাঠাত গোসাবার আয়লা দুর্গত এলাকায়। এই জল উৎপাদনে প্রতি লিটারে তখন খরচ ছিল মাত্র ৫ পয়সা। গোসাবার পাখিরালয়ে একটা ইউনিট বসানোর কথা ছিল হেরিটেজ গ্রুপের। গোসাবার আরও দু’এক জায়গায় এই ইউনিট বসবে জেনে এলাকার মানুষ তখন খুশি হন। এই অত্যন্ত প্রয়োজনীয় যন্ত্রটি চালু হয়ে মাত্র ১৫ দিন চলেছিল। এর পর বন্ধ থাকে। তিন মাস বন্ধ থাকার পর হঠাৎ সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে কোম্পানি যন্ত্রটি ফেরত নিয়ে যায়। কোম্পানি কর্তৃপক্ষ এই যন্ত্রটির জন্য চেয়েছিলেন মাত্র ১৮ লক্ষ টাকা। কিন্তু পিএইচই (পাবলিক হেলথ ইঞ্জিনিয়ারিং) নাকি এই যন্ত্রের ছাড়পত্র দেয়নি। ফলে ওঁরা সেটি ফেরত নিয়ে যেতে বাধ্য হন। এখন প্রশ্ন, এ রকম একটা যন্ত্র চালানোর ছাড়পত্র দেওয়া হল না কেন? কেন বলা হয়েছিল, গোসাবায় কয়েক জায়গায় এই যন্ত্র বসানো হবে? এখন সারা দেশে পানীয় জলের জন্য হাহাকার তীব্রতর
হচ্ছে। সুতরাং এখন ওই যন্ত্র বসাতে আপত্তি কোথায়?

প্রভুদান হালদার, বাসন্তী, দক্ষিণ ২৪ পরগনা

 

নদী মৃতপ্রায়

আমি নদিয়া জেলার করিমপুর গ্রামের বাসিন্দা। নদিয়া জেলার উত্তরের শেষ সীমানা এই করিমপুরের পরেই পড়ছে মুর্শিদাবাদ জেলা। এই দুই জেলাকে ভাগ করেছে ‘খড়ি’ নদী, যা ‘শিয়ালমারি’ নদী নামেও পরিচিত। ২০ বছর আগেও এই নদী দিয়ে পাট-বোঝাই নৌকা চলাচল করত। তারও আগে বড় পালতোলা নৌকা চলতে দেখা যেত। বিশেষত বর্ষায় খুবই স্রোত থাকত। ভাগীরথীর প্রশাখা এ নদীতে সারা বছর জলসেচের স্থায়ী ব্যবস্থার পাশাপাশি মাছও পাওয়া যেত প্রচুর।

আজ এই নদী বড় কচুরিপানায় আক্রান্ত হয়ে শীর্ণকায়, জীর্ণ ও মৃতপ্রায়। কিছু লোভী স্বার্থপর মানুষ রাজনৈতিক মদতে বেপরোয়া ভাবে এ নদীর জমিকে দখল করে চলেছে। ও-পারের মুর্শিদাবাদের চাষিরা কচুরিপানা ভরাট করে নিজেদের জমির সীমানা বাড়িয়ে চলেছে। বামফ্রন্টের আমলের শেষে এ নদীর উপর নির্মীয়মাণ নদিয়া-মুর্শিদাবাদ সংযোগকারী ব্রিজটি ৮০ শতাংশ সম্পূর্ণ হওয়ার পরেও দীর্ঘ দিন তার কাজ বন্ধ হয়ে আছে। সারা দেশে ভয়াবহ জলকষ্টের আশঙ্কা, তাই এই নদীর পূর্ণ সংস্কারের এটিই ঠিক মুহূর্ত।

দেবতোষ বিশ্বাস, করিমপুর, নদিয়া

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা
সম্পাদক সমীপেষু, 
৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, 
কলকাতা-৭০০০০১। 
ইমেল: letters@abp.in
যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়। চিঠির শেষে পুরো ডাক-ঠিকানা উল্লেখ করুন, ইমেল-এ পাঠানো হলেও।

এবার শুধু খবর পড়া নয়, খবর দেখাও।সাবস্ক্রাইব করুনআমাদেরYouTube Channel - এ।