E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: বিজ্ঞানেও বৈষম্য

বিজ্ঞান দিবস পালনের উদ্দেশ্য বিজ্ঞানচেতনতার উন্মেষ ও বিকাশ, যা লিঙ্গনিরপেক্ষ হওয়াই বাঞ্ছনীয়। এটা অনস্বীকার্য যে, সারা পৃথিবীতেই বিজ্ঞানের উচ্চপর্যায়ের কাজকর্মে মেয়েদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো কম, যাকে পরিভাষায় বলা হয় ‘স্টেম-গ্যাপ’।

শেষ আপডেট: ১৬ মার্চ ২০২৬ ০৭:০৩

একটা কথা সেই কবে থেকে শুনে আসছি; যে কোনও সফল পুরুষের পিছনে নাকি এক জন নারী থাকেন। কথাটা লোকে নারীদের গৌরবান্বিত করতেই বলেন। এমনকি সব অসফল নারীর পিছনে এক জন পুরুষ থাকেন, এমন কথা বলেও কেউ কেউ চালু এক বিতর্ককে উস্কে দিতে চান। তবে এই বিষয়টা নিয়ে আবার নতুন করে ভাবতে হল এই বছরের বিজ্ঞান দিবসের (২৮ ফেব্রুয়ারি) থিমের কথা শুনে। ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে প্রায় বিজ্ঞান দিবসের মুখে এসে কেন্দ্রীয় সরকারের তরফ থেকে বহু বিলম্বিত থিমটি দেওয়া হল এই রকম— উইমেন ইন স্পেস: ক্যাটালাইজ়িং বিকশিত ভারত। বাংলায় বললে ‘বিজ্ঞানে নারীরা ও বিকশিত ভারতের (অগ্রগতি) ত্বরান্বিত হওয়া’। রসায়নে যদিও ‘ক্যাটালাইজ়’ করার অর্থে ত্বরান্বিত করা বা মন্থর করা উভয়ই হতে পারে (যেখানে যেটা দরকার), কিন্তু এই ক্ষেত্রে গৌরবায়নের উদ্দেশ্যে ত্বরান্বিত করা বলেই ধরা হল। সে যা-ই হোক রসায়নের ছাত্ররা জানেন ‘ক্যাটালিস্ট’ মানে অনুঘটক। কিন্তু তা শুধুমাত্র বিক্রিয়ার গতিকে বাড়াতে বা কমাতেই পারে, বিক্রিয়ক হিসেবে সরাসরি বিক্রিয়ায় ঢুকে পড়ে ‘প্রোডাক্ট’ তৈরিতে যোগ দিতে পারে না। বরং বিক্রিয়ার শেষে অপরিবর্তিত থাকে। তা হলে বিকশিত ভারতের মুখ্য বিক্রিয়ক কারা? পুরুষ বিজ্ঞানীরা? ২০২৬ সালে এসেও নারীকে তা হলে শুধু ‘অনুঘটক’ হয়েই রয়ে যেতে হবে, পুরুষ বিজ্ঞানসাধকদের পিছনে থেকে কিংবা পাশে থেকে, কিন্তু সামনে এগিয়ে গিয়ে নয়। সরকার কি সেটাই চায়? তা হলে তো এটা ২৮ ফেব্রুয়ারির বিষয় নয়, বরং ৮ মার্চের, অর্থাৎ নারীদিবসের বিষয়।

কারণ, বিজ্ঞান দিবস পালনের উদ্দেশ্য বিজ্ঞানচেতনতার উন্মেষ ও বিকাশ, যা লিঙ্গনিরপেক্ষ হওয়াই বাঞ্ছনীয়। এটা অনস্বীকার্য যে, সারা পৃথিবীতেই বিজ্ঞানের উচ্চপর্যায়ের কাজকর্মে মেয়েদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো কম, যাকে পরিভাষায় বলা হয় ‘স্টেম-গ্যাপ’। তার পিছনে যে লিঙ্গবৈষম্য ও সামাজিক বৈষম্য, তা নিয়ে কথা হওয়ার দরকার সর্বদাই আছে। কিন্তু তার জন্য বিজ্ঞান দিবসটা উপযুক্ত দিন নয়।

জানতে ইচ্ছে করে, এই থিম কে নির্বাচন করেছেন? তিনি কি বিজ্ঞান জগতের মানুষ? তা হলে এমন ভুল তিনি কী করে করলেন? আর বিজ্ঞানের লোক না হলে প্রশ্ন করব সরকারের দলে বিজ্ঞানী কি কম পড়েছিল? আসল কথা হল বিজ্ঞানকে এবং নারীকে ‘সিরিয়াসলি’ না নেওয়াটা একটা সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। তাই কেউ ভাবেনই না এই কথার মধ্যেকার শূন্যতার কথা। এই থিম প্রকশিত হওয়ামাত্র সবাই দলে দলে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন ভারতের মহিলা বিজ্ঞানীদের (বিভা চৌধুরী থেকে রকেট উওম্যান) নিয়ে কিন্তু কেউ প্রশ্ন করছেন না, আধুনিক ভারতের বিজ্ঞান মানচিত্রে এঁরা কেন বিক্রিয়ক নন, অনুঘটক মাত্র? এটা কি সেই উদাসীনতা, যাকে অজ্ঞতা বলেও চিনে নেওয়া যায়?

রূপালী গঙ্গোপাধ্যায়, কলকাতা-৪২

পরিসংখ্যান

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন আসন্ন। ভারতের উন্নয়ন-চিত্রে রাজ্যের স্থান নিয়ে তথ্য প্রাসঙ্গিক মনে করে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রাক্-বাজেট প্রকাশনা ইকনমিক সার্ভে (২০২৫-২৬) থেকে কিছু পরিসংখ্যান এখানে আলোচিত হচ্ছে। উন্নয়ন বলতে মানব উন্নয়ন ধর্তব্য, যার তিনটি উপকরণ— আয়, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য।

প্রথমে আসছে আয়, মাথাপিছু বাৎসরিক নিট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনজাত ও পরিষেবা-ঘাটতি আয় তৎকালীন মূল্যে। দেশের লোকসংখ্যার দিক থেকে বৃহৎ বাইশটি রাজ্যের মধ্যে আলোচনা হচ্ছে। ২০২৩-২৪ সালে রাজ্যবাসীর মাথাপিছু বার্ষিক আয় ছিল ১,৪৯,৫০০ টাকা; সর্বভারতীয় অনুরূপ আয় ১,৮৮,৯০০ টাকা। রাজ্যগুলির মধ্যে দিল্লির আয় ছিল সর্বাধিক ৪,৫৯,৪০০ টাকা। দ্বিতীয় থেকে দশম (উচ্চ থেকে নিম্ন) স্থানে যথাক্রমে তেলঙ্গানা, কর্নাটক, হরিয়ানা, তামিলনাড়ু, গুজরাত, কেরল, মহারাষ্ট্র, উত্তরাখণ্ড, অন্ধ্রপ্রদেশ। লক্ষণীয়, দক্ষিণের পাঁচটি রাজ্যই এই উচ্চবর্গে। রাজ্যের ক্রমিক স্থান ছিল ১৫তম। আয়ের দিক থেকে আমাদের ঊর্ধ্বে নিকট সঙ্গী রাজস্থান (১৩) ও ওড়িশা (১৪), নীচে ছত্তীসগঢ় (১৬) ও অসম (১৭)। অধিবাসীদের জনপ্রতি আয়ে সর্বনিম্ন স্থানাধিকারী রাজ্যগুলি হল: ঝাড়খণ্ড (২০), উত্তরপ্রদেশ (২১), বিহার (২২)। বিহারের মাথাপিছু আয় ছিল সর্বভারতীয় অনুরূপ আয়ের এক-তৃতীয়াংশ।

প্রসঙ্গত, আট বছর আগে ২০১৬-১৭ সালেও এই ২২টি রাজ্যের মাথাপিছু বার্ষিক আয়ের ক্রমবিন্যাসে রাজ্যের স্থান ১৫তমই ছিল— দিল্লি সর্বাগ্রে আর বিহার, উত্তরপ্রদেশ এবং ঝাড়খণ্ড নিম্নতম তৃতীয় স্থানে। এখানে এ-ও উল্লেখ্য যে, ২০২৩-২৪ সালে পশ্চিমবঙ্গের মাথাপিছু আয় ছিল সর্বভারতীয় অনুরূপ আয়ের ৭৯ শতাংশ। ২০১৬-১৭ সালে এই অনুপাত ছিল ৭৮ শতাংশের সামান্য বেশি। এর থেকে রাজ্যের আপেক্ষিক আর্থিক উন্নয়ন একেবারে অনড় বলতে না চাইলেও শম্বুকগতি বলা যায়— তা-ও সর্বভারতীয় পটে।

দুই, শিক্ষা সম্পর্কিত প্রাথমিক তথা মৌলিক তথ্য সাক্ষরতার হার পুরনো, ২০১১-র লোক গণনার। এই শুমারি অনুযায়ী ৭ ও তদূর্ধ্ব বয়সিদের ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গে সাক্ষরতার হার ছিল শতকরা ৭৬.৩ শতাংশ, সর্বভারতীয় হার (৭৩.০) থেকে কিছুটা বেশি। জাতীয় স্তরে সর্বাগ্রে ছিল কেরল (৯৪.০); পরবর্তী স্থানে দিল্লি (৮৬.২), তৃতীয় স্থানে হিমাচল প্রদেশ (৮২.৮)। এর পর থাকছে মহারাষ্ট্র (৮২.৩), তামিলনাড়ু (৮০.১), উত্তরাখণ্ড (৭৮.৮), গুজরাত (৭৮.০)। অষ্টম স্থানে পশ্চিমবঙ্গ। সর্বনিম্নে বিহার (৬১.৮), তার আগেই ঝাড়খণ্ড (৬৬.৪)। এই সব পরিসংখ্যানে সাম্প্রতিক অবস্থার প্রতিফলন নেই।

অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাব্যবস্থা অনেকটা বাধ্যতামূলক বলে পরবর্তী স্তর অর্থাৎ স্কুলের শেষ চার বছরের দিকে নজর দেওয়া যাক। ২০২৪-২৫ সালে পশ্চিমবঙ্গে প্রত্যাশিত হারের তিন-চতুর্থাংশ (৭৫.২%) বালক-বালিকা নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়াশোনা করে। এ বিষয়ে বাইশটি রাজ্যের ক্রমবিন্যাসে রাজ্যের অবস্থান দ্বাদশে, সর্বাগ্রে রয়েছে কেরল (৯৪.৩)। পরবর্তী চারটি স্থানে যথাক্রমে রয়েছে হিমাচল প্রদেশ (৯৩.৬), দিল্লি (৯১.৭), তামিলনাড়ু (৮৯.৪), উত্তরাখণ্ড (৮৭.২)। সবার শেষে রয়েছে বিহার (৪৪.৭)।

দ্বাদশ শ্রেণি-উত্তর শিক্ষাকে যদি উচ্চশিক্ষা বলা হয়, সেখানে এ রাজ্যের ক্রমাবস্থান চতুর্দশ। তথ্যের সময়কাল ২০২১-২২। ১৮ থেকে ২৩ বছর বয়সিদের মধ্যে ২৬.৩ শতাংশ উচ্চশিক্ষারত ছিলেন রাজ্যে। যদিও এ ক্ষেত্রে সর্বভারতীয় হার তুলনামূলক ভাবে বেশি, ২৮.৪%। ক্রমবিন্যাসে প্রথম পাঁচটি রাজ্য হল, দিল্লি (৪৯.০), তামিলনাড়ু (৪৭.০), কেরল (৪৪.১), হিমাচল প্রদেশ (৪৩.৮) ও উত্তরাখণ্ড (৪১.৮)। সব শেষে আছে অসম (১৬.৯), বিহার (১৭.১), ঝাড়খণ্ড (১৮.৬)।

তিন, এ বার আসছে স্বাস্থ্য। এ ক্ষেত্রে যদি সর্বাধিক অর্থবহ মাত্র একটি মাপকাঠি বেছে নিতে হয়, সেটি হল জন্মকালীন প্রত্যাশিত আয়ু। হিসাবের সময়কাল ২০১৯-২৩। পশ্চিমবঙ্গে সেই সময় এই প্রত্যাশিত আয়ু ছিল ৭২.৫ বছর, সর্বভারতীয় স্তর (৭০.৩) থেকে কিছুটা এগিয়ে। আলোচিত রাজ্যগুলির মধ্যে কেরল (৭৫.১) প্রথম, পরবর্তী চারটি রাজ্য জম্মু ও কাশ্মীর (৭৪.৪), হিমাচল প্রদেশ (৭৪.৪), দিল্লি (৭৪.২), তামিলনাড়ু (৭৩.৪)। মহারাষ্ট্র ষষ্ঠ স্থানে, পশ্চিমবঙ্গের ক্রম সপ্তম। সর্বশেষ ছত্তীসগঢ় (৬৪.৫)।

মানব উন্নয়ন সম্পর্কিত অনুশীলনে আয়, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে সমগুরুত্ব দিয়ে থাকে ইউএনডিপি-র মতো আন্তর্জাতিক সংস্থা। এ বিচারে ভারতের উন্নয়ন চিত্রে রাজ্যের অবস্থান বড়জোর মধ্যবর্তী বলা যেতে পারে— মাথাপিছু আয়ের ক্ষেত্রে প্রায় প্রান্তিক (১৫তম), শিক্ষায় কিছুটা মাঝামাঝি (১২, ১৪তম), স্বাস্থ্যে অগ্রণী দলে (সপ্তম)।

আনন্দ পাঠ, ককলকাতা-৬৫

কু-অভ্যাস

পুরসভা এলাকায় সাধারণত প্রশাসন থেকে গাড়ি বরাদ্দ থাকে আবর্জনা সংগ্রহের জন্য। কিন্তু খুব খারাপ লাগে যখন দেখি কেউ তাঁদের বাড়িতে জমে থাকা আবর্জনা একটা ক্যারি ব্যাগে করে যেখানে সেখানে ফেলে দেন। এটা শুধু দৃষ্টিকটুই নয়, বাসিন্দাদের স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও ক্ষতিকারক। এই ধরনের চিন্তাভাবনা ও মানসিকতার আশু পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে।

অর্ঘ্য চক্রবর্তী, বারাসত, উত্তর ২৪ পরগনা

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Gender Discrimination Scientists

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy