সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

সম্পাদক সমীপেষু: উদ্দেশ্য আর উপায়

Rape

এক সকালে দেখলাম, এক জন নাগরিককে ধর্ষণ করে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। কিছু দিন পরে আর এক সকালে উঠে দেখলাম, ধর্ষণ-খুনে অভিযুক্ত চার নাগরিককে এনকাউন্টারে মেরে ফেলল দেশের আইনরক্ষক পুলিশ। সরল সিদ্ধান্ত, এটাই তো আমরা চেয়েছিলাম! হলও তা-ই। সুতরাং ক্যাথারসিস। ভাবমোক্ষণ। শান্তি শান্তি। কিন্তু প্রশ্ন থাকে। থেকে যায়।

ধর্ষণ করে পুড়িয়ে মারা হয়েছে যে নাগরিককে, তিনি নারী না পুরুষ, দলিত না ব্রাহ্মণ, ডাক্তার না কৃষিজীবী, বয়েস সতেরো না একাত্তর, ত্বক কৃষ্ণ না শ্বেত— এ সব বিশ্লেষণ অহেতুক। তাঁর একমাত্র পরিচয়, তিনি নাগরিক, যাঁকে রক্ষা করতে পারেনি রাষ্ট্র। জীবিত নাগরিকের একটা বিশাল অংশ নানান রীতিভঙ্গিতে প্রতিবাদী হয়েছেন। প্রতিবাদ গড়িয়েছে প্রতিশোধে। ফলত সমাধানসূত্র— অনুসন্ধান নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। প্রতিশোধস্পৃহাই একমাত্র জ্বলজ্বল করছে। তাই অভিযুক্ত চার নাগরিক সত্যিই দোষী কি না, কিংবা কতটা দোষী, তা নির্ণয়ের জন্য আমরা আর অপেক্ষা করতে পারি না। বিচারব্যবস্থা বলে একটি বিষয় আছে, তা ভুলে যাই। এও ভুলে যাই, রাষ্ট্র তার চার নাগরিককে বিচারব্যবস্থার মধ্য দিয়ে শাস্তি দিতে ব্যর্থ হল। সব ভুলে আমরা উল্লাসে মেতে উঠলাম। কারণ, অভিযুক্তদের মেরে ফেলা গেল। যেন শোধবোধ।

তা হলে, রাষ্ট্রের কী ভূমিকা? খুনের বদলে খুন! 

রাষ্ট্র তার নাগরিককে সুস্থ চেতনা দিতে ব্যর্থ। অসুস্থ চেতনার শিকার হয়ে কেউ খুনি, কেউ ধর্ষক। দ্বিতীয়ত, অভিযুক্তকে আদালতের দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দিতেও ব্যর্থ। এই দুই ব্যর্থতাকে না দেখে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিশোধের উল্লাসে মজে আছে জনগণ।

আগামী এক সকালে যদি ধর্ষণ ও খুনে দোষী সন্দেহে রাষ্ট্র পাঁচ জনকে গ্রেফতার করে— আর পঞ্চম ব্যক্তি যদি নিরীহ পথচারী হন! সেই পথচারী যদি আমার আপনার পরিবারের সদস্য হন! সেই পাঁচ জনকেও যদি রাষ্ট্র আইনের মুখ না-দেখানোর আগেই মেরে ফেলে! 

উদ্দেশ্য মহৎ হলেই চলে না, উপায়কেও মহৎ হতে হবে— এ কথা রাষ্ট্রকেই জানতে হবে। কারণ, সব সময় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ঠিক কথা বলে না।

ঋত্বিক ত্রিপাঠী

লোকনাথ পল্লি, পশ্চিম মেদিনীপুর

 

উৎস কোথায়

সারা দেশ দোষীদের ফাঁসির সাজা চেয়ে উত্তাল হয়েছিল, যা হল তাতেও খুশি। কিন্তু এ-ই কি পথ? নারীদের উপর নারকীয় অত্যাচারকারীরা হয়তো ছোটবেলায় নিজেদের বাড়িতে দৈনন্দিন ভাবে মা’কে মার খেতে দেখেই বড় হয়েছে। অতএব দু’চার জনের ফাঁসি বা অনুরূপ শাস্তি দিয়ে লাভ হবে না, সমাজের ঘেঁটি ধরে গোড়া 

থেকে ঝাঁকুনি দিলে তবে এ পাঁক পরিষ্কার হবে। গার্হস্থ্য হিংসাই হল এই রোগের গোড়া। উৎপাটন দরকার ওখান থেকেই।

অজয় চৌধুরী

রাজারহাট 

 

নির্ভয়া তহবিল

‘‘ধর্ষণ ঠিক ‘মেয়েদের সমস্যা’ নয়’’ (৫-১২) শীর্ষক নিবন্ধে পড়লাম, ‘‘নির্ভয়া কাণ্ডের পর দেশজোড়া হইচইয়ের ফলে অনেক আইনি পরিবর্তন আনা হল, কিন্তু আজও ফাস্ট ট্র্যাকে ধর্ষণ কেস সমাধান করার ধারা তৈরি হল না।’’ ওই পরিবর্তন হয়েছে কাগজে। বাস্তব তার থেকে অনেক দূরে। ২০১৩ সালে গঠন করা হয় নির্ভয়া তহবিল নামে ১০০০ কোটি টাকার একটি তহবিল। উদ্দেশ্য: ইমার্জেন্সি রেসপন্স সাপোর্ট সিস্টেম, সেন্ট্রাল ভিক্টিম কম্পেনসেশন ফান্ড, মহিলা ও শিশুদের ওপর সাইবার অপরাধ প্রতিরোধ, ওয়ান স্টপ স্কিম, মহিলা পুলিশ ভলান্টিয়ার এবং মহিলা হেল্পলাইন প্রকল্পের জন্য খরচ করা। এই তহবিল যথাযথ ব্যবহার-সহ সুচারু ভাবে পরিচালনার জন্য রয়েছে ১০ সদস্যের ‘এমপাওয়ার্ড কমিটি’। নির্ভয়া কাণ্ডের পর সরকার এও ঘোষণা করেছিল, ধর্ষিতা ও যৌন নিগৃহীতাদের জন্য মেডিক্যাল, আইনি ও মানসিক সহায়তা একই ছাদের তলায় দেওয়া হবে। যাতে আক্রান্তদের কোনও ধরনের মানসিক হেনস্থার মুখে পড়তে না হয়। 

সম্প্রতি কেন্দ্রীয় নারী ও শিশু কল্যাণ মন্ত্রী, সাংসদদের এক প্রশ্নের উত্তরে জানিয়েছেন ‘নির্ভয়া তহবিল’-এর টাকা খরচই করতে পারেনি বেশির ভাগ রাজ্য। ২০১৮ পর্যন্ত কেন্দ্রের দেওয়া ৮৫৪.৬৬ কোটি টাকার মধ্যে, সমস্ত রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল খরচ করতে পেরেছে মাত্র ১৬৫.৪৮ কোটি। তা হলে কি তহবিল গঠনের পর মহিলাদের ধর্ষণ, অত্যাচার ও নিগ্রহের ঘটনা দেশে কমে গেল? 

সরকারি তথ্যে প্রকাশিত: পাঁচটি রাজ্য বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল নির্ভয়া তহবিলের টাকা খরচের ক্ষেত্রে এগিয়ে চণ্ডীগড় ৫৯.৮৩%, মিজোরাম ৫৬.৩২%, উত্তরাখণ্ড ৫১.৬৮%, অন্ধ্রপ্রদেশ ৪৩.২৩% এবং নাগাল্যান্ড ৩৮.১৭%। লজ্জার বিষয় হল, মণিপুর, মহারাষ্ট্র এবং লক্ষদ্বীপ একটি টাকাও খরচ করতে পারেনি। আমাদের রাজ্য যে খুব এগিয়ে তা বলা যাবে না। তবে দিল্লি ০.৮৪%, পশ্চিমবঙ্গ ০.৭৬%। এর মধ্যে দিল্লি যে টাকা খরচ করেছে তা কেবলমাত্র ক্ষতিপূরণের জন্য। অন্য দিকে ২১টি রাজ্য বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল ক্ষতিপূরণ তহবিলের টাকায় হাতই দেয়নি। অথচ ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস বুরোর তথ্য দেখাচ্ছে, ২০১১ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত চার বছরে নারীর উপর সংঘটিত অপরাধের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে ৩৪ শতাংশ।

এর পরও কি বলা যাবে না, কেন্দ্রীয় নারী ও শিশুবিকাশ মন্ত্রক, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক, রাজ্যে নির্বাচিত সরকার এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল, মহিলা সুরক্ষার প্রশ্নে গা-ছাড়া মনোভাব দেখিয়েছে? যেন প্রতিযোগিতা চলছে গণধর্ষণ এবং নৃশংসতার। কেবল বদলে যাচ্ছে নির্যাতিতা ও তাঁর শহর। 

নন্দগোপাল পাত্র

সটিলাপুর, পূর্ব মেদিনীপুর

 

আটকখানা

‘সব উদ্বাস্তু কলোনিতেই...’ (২৬-১১) শীর্ষক প্রতিবেদনে ‘ডিটেনশন সেন্টার’ শব্দবন্ধটির বিকল্প হিসেবে ‘কারাগার’ ব্যবহার করা হয়েছে। এই শব্দবন্ধের বাংলা কী হবে, জানতে চেয়ে ‘চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার দখল’ মামলায় দণ্ডিত বিপ্লবী পূর্ণেন্দু দস্তিদার, রবীন্দ্রনাথকে একটি চিঠি লেখেন ১৯৩১ সালে। জবাবে রবীন্দ্রনাথ, পূর্ণেন্দু প্রস্তাবিত ‘আটকখানা’ পরিভাষাটির পক্ষে সহমত জানিয়েছিলেন।

অরূপকুমার দাস 

অধ্যাপক, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়

 

বিপদ

এ বছর ২৩ মে সকালে উঠেই দেখি, যে-মানুষটা সুস্থ ছিল, আগের রাতে কথা বলল, সে ঘুম থেকে উঠছে না। দেখেশুনে মনে হল, স্ট্রোক হয়েছে। নার্সিং হোমে নিয়ে গেলাম, কিন্তু কর্মীদের বক্তব্য, এখন ডাক্তার নেই এবং ইমার্জেন্সি পেশেন্টকে ভর্তি নেওয়া হয় না। সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে ভর্তি করলাম। বেড পেলাম ৩০ মিনিট পর, এক ঘণ্টা পর ডাক্তার এলেন। নার্সদের কথা আর কী বলব, তাঁরা রোগীকে ক্যাথিটার বা রাইলস টিউব দেওয়ার ক্ষেত্রে অতি বিরক্ত, পরিজনদের সঙ্গে ব্যবহারও খুব খারাপ। পরে সিটি স্ক্যান করে জানা গেল, সেরিব্রাল স্ট্রোক। তবে রোগী কেমন আছেন, জানতে গেলে রাত্রি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে, কারণ এর মাঝে ডাক্তার আসেন না। রোগীকে আইসিইউ-তে রাখার অনুরোধ করলে, ডাক্তারবাবুর বক্তব্য, এই রোগী বেশি দিনের জন্য ‘গ্যারাজ’ হয়ে যাবেন। 

দু’দিন পর কলকাতার এক সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করলাম। সেখানেও আইসিইউ-তে সুযোগ হল না। মারা গেলেন ২৮ মে, সেপ্টিসেমিয়াতে। মৃত রোগীর থেকে যখন রাইলস টিউব খোলা হল, দেখা গেল, সেটা ঠিক ভাবে দেওয়াই হয়নি। সাধে কি সরকারি হাসপাতালে কাউকে ভর্তি করার কথা ভাবলে বুকটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে?।

অমিত নন্দী

রঘুনাথপুর, ঝাড়গ্রাম

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা
সম্পাদক সমীপেষু, 
৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, কলকাতা-৭০০০০১। 
ইমেল: letters@abp.in
যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়। চিঠির শেষে পুরো ডাক-ঠিকানা উল্লেখ করুন, ইমেল-এ পাঠানো হলেও।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন