এ রাজ্যের বেহাল শিক্ষাকে নিয়ে আর্যভট্ট খানের তিন কিস্তিতে লেখা ‘কোথাও খাঁ-খাঁ করছে স্কুল, কোথাও আকাল শিক্ষকের’ (১২-২), ‘নুন আনতে পান্তা ফুরোয়’ (১৩-২), এবং ‘শিক্ষাতেও কেন্দ্র ও রাজ্যের সংঘাত’ (১৪-২) পড়লাম। রাজ্যে শিক্ষার বর্তমান অবস্থার বাস্তব প্রতিফলন ঘটেছে প্রতিবেদনগুলিতে। সরকারি স্কুলে পঠনপাঠন চালানোর জন্য কম্পোজ়িট গ্রান্ট, মিড-ডে মিলের অর্থ, প্রয়োজনীয় সংখ্যক ক্লাসঘর, শিক্ষক ইত্যাদি সাধারণ সুযোগ-সুবিধাও প্রায় বিলুপ্ত। প্রতি বছর স্কুলছুট বাড়ে। মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিকের পরীক্ষার অ্যাডমিট কার্ড নিয়েও অনেক ছাত্রছাত্রী পরীক্ষায় বসছে না। অনেক স্কুলে শিক্ষকরা নিজেরা চাঁদা তুলে স্কুলের প্রাত্যহিক খরচ মেটান। এমন নানা সমস্যায় জর্জরিত বাংলার সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা। এ সমস্ত অভিযোগের কথা জেলা শিক্ষা দফতরে জানালে তাঁরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দায় সারেন। তাতে সমাধান কিছু হয় না। আসলে ভোটসর্বস্ব রাজনীতি এখন দলগুলিকে গিলে নিয়েছে। তারা শুধুই ক্ষমতায় টিকে থাকার কথা চিন্তা করে। সেই মতো পরিকল্পনা সাজায়। রাজ্যের সার্বিক কল্যাণ এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে তাদের নজর নেই।
পড়ুয়াদের জামা, জুতো, বইপত্র দেওয়া তো হচ্ছেই, একই সঙ্গে ছাত্রীদের কন্যাশ্রী, সবুজ সাথীতে সাইকেল, তরুণের স্বপ্নে দশ হাজার টাকা— নানাবিধ সাহায্য প্রকল্প চালু আছে। সেগুলি সময়মতো যাতে পড়ুয়াদের কাছে পৌঁছে যায়, তার তদারকিও করা হয়। অথচ স্কুলে পড়ার সুস্থ পরিবেশটাই নেই। শিক্ষা যুগ্ম তালিকার অন্তর্ভুক্ত হলেও এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রের বিমাতৃসুলভ আচরণও এই উপেক্ষা এবং ঔদাসীন্যকে ত্বরান্বিত করছে। মিড-ডে মিল পড়ুয়াদের পুষ্টির জন্য, কম্পোজ়িট গ্রান্ট সুষ্ঠু ভাবে স্কুল পরিচালনার জন্য বরাদ্দ অর্থ। সেখানে কেন্দ্রের টাকা আটকে রাখা বা যথেষ্ট পরিমাণে বরাদ্দ না-করা কোনও ভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। আসলে বর্তমান কেন্দ্র এবং রাজ্য উভয় সরকারের প্রধানরাই স্বচ্ছ প্রশাসন পরিচালনা অপেক্ষা আপন মহিমা প্রচারে বেশি তৎপর। এমন একপেশে রাজনৈতিক মনোভাবাপন্ন মানসিকতার মধ্যে রাজ্যের স্কুলশিক্ষায় যে নব নব সমস্যা উঠে আসবে, তাতে আর আশ্চর্য কী!
প্রদ্যোৎ পালুই, বিষ্ণুপুর, বাঁকুড়া
শিক্ষাব্যবসা
‘কোথাও খাঁ-খাঁ করছে স্কুল, কোথাও আকাল শিক্ষকের’ পাঠ করতে গিয়ে বিখ্যাত কবিতার পঙ্ক্তি “চেরাপুঞ্জির থেকে, একখানি মেঘ ধার দিতে পার গোবি-সাহারার বুকে?”— মনে পড়বে। এই কলকাতা শহর কি তার উপকণ্ঠে এমন সরকারি স্কুল রয়েছে, যেখানে পড়ুয়ার সংখ্যা শূন্য বা তার কাছাকাছি। অথচ আট-দশ জন শিক্ষক আছেন। বিদ্যুতের বিল বাকি থাকায় লাইন কাটা গেছে। বসার কাজে লাগে না বলে টেবিল-বেঞ্চ এক জায়গায় ডাঁই করে রাখা হয়েছে। উল্টো দিকে আবার গ্রামাঞ্চলের স্কুলে ছাত্রছাত্রী আছে যথেষ্ট সংখ্যায়। আকাল শিক্ষকের। অঙ্ক-বিজ্ঞান-ইংরেজির মতো বিষয়ের শিক্ষক নেই। দীর্ঘ দিন নতুন শিক্ষক যোগ দেননি। হয়তো বদলি-প্রকল্পের সুবিধা গ্রহণ করে বেশির ভাগ চলে গেছেন শহরে বা সুবিধাজনক জায়গায়। অভিভাবকেরা কোন ভরসায় ছেলেমেয়েকে পাঠাবেন সেই সব স্কুলে? ঘেঁটে-যাওয়া শিক্ষাব্যবস্থার সুযোগে ঘোলা জলে নেমে পড়েছেন কতিপয় শিক্ষা-ব্যবসায়ী। গত কয়েক দশকে সমৃদ্ধ হয়েছে অসরকারি ইংরেজি শিক্ষাব্যবসা, যারা বাইরের চাকচিক্যটি বজায় রাখে সুনিপুণ কায়দায়। তার জন্য পড়ুয়াদের দিক থেকে যে টাকা খরচ করতে হয়, কত জনের সামর্থ্যের মধ্যে পড়ে সেটি?
সম্প্রতি পরিচয় হয়েছিল এক দম্পতির সঙ্গে। স্বামী, স্ত্রী এবং এক শিশুপুত্র, সবে স্কুল যাওয়া শুরু করেছে। ভদ্রলোক একটি অসরকারি প্রতিষ্ঠানে খুব সাধারণ চাকরি করেন। পুত্রকে দামি স্কুলে ঢোকাতে মোটা টাকা ধার হয়ে গেছে। কী করে শোধ হবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন। মাসান্তে সেই স্কুলে চার অঙ্কের বেতন ছাড়াও আছে স্কুল যাতায়াতের গাড়িভাড়া, বই-খাতা, কেতাদুরস্ত পোশাক, নিত্যনতুন প্রোগ্রাম বা অন্য বাহানায় টাকা নেওয়ার পর্ব। এই অবস্থায় ইচ্ছে থাকলেও দ্বিতীয় সন্তানের কথা ভাবতে পারছেন না তাঁরা। অর্থাৎ, এক সন্তানকে ‘শিক্ষিত’ করে তুলতে নিজেদের স্বপ্নগুলিকে জলাঞ্জলি দেওয়া চলছে।
বিশ্বনাথ পাকড়াশি, শ্রীরামপুর, হুগলি
পড়ার বোঝা
আর্যভট্ট খানের “নিজের চেষ্টায় ‘দুই’, তা হলেই অঙ্কে পাশ” (২৪-২) শীর্ষক প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা। নতুন সিমেস্টার পদ্ধতিতে সমাপ্ত হয়ে গেল এ বারের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা। অভিযোগ, অঙ্ক পরীক্ষার প্রশ্ন এসেছে সিলেবাসের বাইরে থেকে? কোথাও কি অসঙ্গতি থেকে গেল? তা হলে কিসের এত নির্দেশিকা দেওয়া হল সারা বছর ধরে? চল্লিশ নম্বরের পরীক্ষায় দশ নম্বর সিলেবাস বহির্ভূত হলে কত শতাংশ নম্বর সিলেবাস থেকে দেওয়া হয়েছে, তা হিসাব করতে অঙ্ক বিশারদ হওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু যে ভাবে দশ নম্বর দিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সেটা বাস্তবিকই হাসির উদ্রেক করে।
উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের নতুন সিলেবাস নিয়ে যত কম কথা বলা যাবে, তত মঙ্গল। সাহিত্য বিষয়ের সিলেবাস এবং নম্বর বিভাজন যে কোনও পরীক্ষার্থীকেই চাপের সম্মুখীন করবে। একাদশ এবং দ্বাদশ মিলিয়ে চারটি সিমেস্টারে বিভক্ত পাঠ্যক্রমে একাদশ শ্রেণিতে দ্বিতীয় সিমেস্টারে সাহিত্যের ইতিহাসের জন্য নম্বর বরাদ্দ ৫, অথচ সেই পাঠ্যক্রমে রয়েছেন ঊনবিংশ শতাব্দীর লেখক থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের লেখকরাও। পাঁচ নম্বরের জন্য এত বিশাল তালিকা? তা ছাড়া রবীন্দ্রনাথ কিংবা বিদ্যাসাগরের সাহিত্য প্রতিভাকে অথবা বিহারীলাল বা মধুসূদনের প্রতিভাকে কি পাঁচ নম্বরের জন্য ব্যাখ্যা করা সম্ভব? পদার্থবিদ্যায় একাদশের দ্বিতীয় সিমেস্টারে রয়েছে সতেরোটি অধ্যায়। উচ্চ মাধ্যমিকের বাংলা দ্বিতীয় সিমেস্টারে যে বৃহৎ সিলেবাস দেওয়া হয়েছে, সেখানে ২০০ নম্বরের প্রশ্ন অনায়াসেই করা যায়। অথচ সেখানে নম্বর বরাদ্দ ৪০। সাহিত্য যদি বিকাশের লক্ষ্যে পড়ানো হয়, তবে কি সিলেবাসের বোঝা বাড়িয়ে দিলেই তা ফলপ্রসূ হবে?
নম্বর বিভাজন, সিলেবাস বানানো, পরীক্ষার সময়সূচি সব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট রূপরেখার অভাব। কোর্সের বোঝা চাপিয়ে, পরিকাঠামো তৈরি না করেই শিক্ষাবর্ষকে সিমেস্টারে ভাগ করে দিলে গোটা ব্যবস্থা সমস্যা জর্জরিত হয়ে যায়। মাল্টিপল চয়েস প্রশ্নের ক্ষেত্রে না-হয় সঠিক উত্তরের সঠিক মূল্যায়ন হল, কিন্তু রচনাধর্মী প্রশ্নের বেলায়? তা ছাড়া কোর্স যথাযথ ভাবে শেষ হয়েছে কি না, সব কিছু ঠিকঠাক নিয়মে চলছে কি না, নজরদারির কোনও ব্যবস্থা নেই। শিক্ষার এই গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলিতেই যদি ত্রুটি থেকে যায়, তা হলে এখনও যাঁরা সরকারি শিক্ষাব্যবস্থায় আস্থা রাখেন, তাঁদের অবস্থা কী হবে?
রাজা বাগচী, গুপ্তিপাড়া, হুগলি
রং নয়, শব্দ
দোল মূলত সম্প্রীতির উৎসব। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, এই উৎসবের দিনেও উচ্চ ক্ষমতার সাউন্ড সিস্টেম পুরো পরিবেশকে অস্বস্তিকর করে তুলছে। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত প্রচণ্ড শব্দে ডিজে বাজানোর ফলে বৃদ্ধ, অসুস্থ ব্যক্তি, শিশু এবং পরীক্ষার্থীরা মারাত্মক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। এমনকি হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশেপাশেও শব্দদূষণের মাত্রা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। রঙের উৎসব যদি শব্দদূষণের উৎসবে পরিণত হয়, তবে তা সমাজের পক্ষে শুভ নয়। এই পরিস্থিতি পরিবর্তনে প্রয়োজন সচেতনতা ও নিয়ম মেনে চলা, প্রশাসনের উচিত অনুষ্ঠানের নির্দিষ্ট সময় ও শব্দমাত্রা বেঁধে দেওয়া এবং তা কঠোর ভাবে প্রয়োগ করা। আনন্দ হোক, কিন্তু সীমার মধ্যে থেকে।
পার্থপ্রতিম মিত্র, ছোটনীলপুর, বর্ধমান
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)