‘মহান সাভারকর’ (২৫-১০) চিঠি প্রসঙ্গে কয়েকটি বিষয় উত্থাপন করা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক বলে মনে করছি। বিনায়ক দামোদর সাভারকর গত শতাব্দীর প্রথম দশকের বেশ কয়েক বছর অবশ্যই স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ১৯১০ সালে তাঁকে আন্দামানের সেলুলার জেলে ৫০ বছরের কারাবাসের সাজা দিয়ে পাঠানো হয়। এটা তো ইতিহাস। কিন্তু এর পরের ইতিহাস কেন ঊহ্য রাখা হবে? 
জেলের কঠিন জীবনযাপন কাটাবার মাসখানেকের মধ্যেই, ১৯১১ সালে সাভারকর তাঁর প্রথম ক্ষমাভিক্ষা চেয়ে আবেদন করেন ইংরেজ সরকারের কাছে। যেটি সঙ্গে সঙ্গে নাকচ হয়ে যায়। দ্বিতীয় বার ক্ষ‌মা প্রার্থনা করে আবেদন করেন ১৯১৩ সালে। সাভারকর লিখছেন, ‘‘সরকার বাহাদুর যদি কৃপাবশত আমাকে ক্ষ‌মা করে এবং মুক্তি দেয়,...’’ আরও লিখেছেন, ‘‘আমি কেবল এবং কেবলমাত্র ব্রিটিশ সরকার বাহাদুরের অনুগত, আজ্ঞাবহ সর্বশ্রেষ্ঠ সমর্থক হয়ে থাকব।’’ 
লিখেছেন, ‘‘ভারতে এবং বিদেশে আমার যারা অনুগামী ছিল, তাদেরকেও আমি ভ্রান্ত পথ থেকে ফিরিয়ে এনে সঠিক পথে পরিচালনা করতে পারি। আমার সামর্থ্য এবং ক্ষমতায় যতখানি সম্ভব, ততখানি ব্যবহার করে আমি সরকার বাহাদুরের খিদমতগার হয়ে থাকতে চাই, কারণ আমি সজ্ঞানে আমার মধ্যে এই বদল ঘটাচ্ছি। মহামহিম সরকার বাহাদুর যেন দয়া করে আমাকে ক্ষমা করে, মহামহিম সরকার বাহাদুর ছাড়া আর কে এক দুষ্ট, বিগড়ে যাওয়া সন্তানকে ফিরিয়ে আনবে তার পিতার ঘরে?’’
তৃতীয় ক্ষমাপ্রার্থনা ১৯১৭ সালে। চতুর্থ মুচলেকা ১৯২০ সালে। তিনি লেখেন, উত্তর দিক থেকে ‘এশিয়ার রক্তপিপাসু জনজাতির’ আক্রমণ ঘটতে পারে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ওপর, যারা আপাতদৃষ্টিতে সরকারের বন্ধু সেজে আছে, এবং তিনি নিশ্চিত যে এই সময়ে তাঁর মতো ‘‘যে কোনও বুদ্ধিমান ভারতপ্রেমিক এই সময়ে প্রাণমন দিয়ে, ভারতের স্বার্থেই ব্রিটিশ সরকারের পাশে এসে দাঁড়াবে এবং সব রকমের সহযোগিতা করবে।’’
বারবার ইংরেজ সরকারকে মুচলেকা লেখার পর সাভারকর তাদের নিশ্চিত করার জন্য চিঠি লেখেন, ‘‘সরকার যদি আরও বেশি করে নিশ্চিত হতে চায় আমার এবং আমার ভাইয়ের ব্যাপারে, তবে আমরা সম্পূর্ণ ভাবে লিখিত প্রতিশ্রুতি দিতে রাজি আছি যে সরকারের নির্ধারণ করে দেওয়া যে কোনও যুক্তিগ্রাহ্য সময়সীমা পর্যন্ত আমরা কোনও রকম রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপে নিজেদের যুক্ত রাখব না। অথবা অন্য যে কোনও প্রতিশ্রুতি যা সরকার বাহাদুর আমাদের কাছ থেকে লিখিয়ে নিতে চান, যেমন, নির্দিষ্ট একটি রাজ্যের চৌহদ্দির বাইরে কখনও না বেরোনো, অথবা মুক্তির পর আমাদের যে কোনও রকম যাতায়াতের সম্পূর্ণ খবরাখবর যে কোনও সময়কাল ধরে নিয়মিত পুলিশের কাছে জানানো— সরকারের ইচ্ছেমতো যে কোনও রকম শর্ত, সর্বতো ভাবে, আমি ও আমার ভাই, দেশের শান্তি ও নিরাপত্তার খাতিরে সানন্দে মেনে নিতে রাজি আছি।’’
১৯২১ সালে, সাভারকর এবং তাঁর ভাই রত্নগিরির একটি জেলে স্থানান্তরিত হন, এবং রত্নগিরি জেলার বাইরে কখনও পা ফেলবেন না, আর, জীবনে কখনও কোনও রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপের সঙ্গে যুক্ত হবেন না— এই শর্তে রাজি হওয়ার পর ১৯২৪-এ তাঁরা মুক্তি পান। এই নিষেধাজ্ঞার শর্ত তাঁদের ওপর থেকে ব্রিটিশ সরকার স্থায়ী ভাবে তুলে নেয় ১৯৩৭ সালে।
সাভারকর ‘হিন্দুত্ব’-এর প্রবক্তা হয়ে বাকি জীবন কাটিয়েছেন। ইংরেজের আনুগত্য নিয়ে কাটিয়েছেন, স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসাবে নয়। কারাবাসের সময় সাভারকর লিখতে শুরু করেন তাঁর বই, ‘এসেনশিয়াল্‌স অব হিন্দুত্ব’, যা প্রথমে প্রকাশিত হয় ১৯২৩ সালে, পরে ১৯২৮ সালে পুনর্মুদ্রিত হয় ‘হিন্দুত্ব: হু ইজ় আ হিন্দু?’ নামে। সাভারকরের হিন্দুত্বের আদর্শে কে বি হেডগেওয়ার প্রচণ্ড উৎসাহিত হয়ে ভারতকে কী ভাবে হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করা যায়, তাই নিয়ে তাঁর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করেন। কয়েক মাস পর ১৯২৫ সালের সেপ্টেম্বরে হেডগেওয়ার রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ বা আরএসএস প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৩৭-এ সাভারকর হিন্দু মহাসভার সভাপতি পদে নির্বাচিত হন।
হিন্দু মহাসভার কলকাতা অধিবেশনে বক্তৃতায় সাভারকর বলেন, দেশের সমস্ত কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় ‘‘অতি অবশ্যই যেন যুবকদের সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার জন্য উৎসাহ জোগায়, যে কোনও ভাবে এবং সব রকম ভাবে।’’ ১৯৪০ সালে মাদুরায় এক জনসভায় সাভারকর হিন্দুদের কাছে আহ্বান জানালেন, ‘‘যত বেশি সংখ্যায় সম্ভব, দলে দলে ব্রিটিশ সশস্ত্র বাহিনীর বিভিন্ন পদে যোগদান’’ করতে। এরই পাশাপাশি নেতাজি গঠন করছেন আজাদ হিন্দ ফৌজ, গাঁধীজি ডাক দিচ্ছেন ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের। ভারত ছাড়ো আন্দোলনের ফলে যখন কংগ্রেসের সমস্ত প্রথম সারির নেতা কারারুদ্ধ, সেই সময়ে হিন্দু মহাসভা সাভারকরের নেতৃত্বে মুসলিম লিগের সঙ্গে হাত মেলায় এবং সিন্ধ আর বাংলা প্রদেশে কোয়ালিশন সরকার গঠন করে। এটাই ছিল সাভারকরের ‘প্র্যাকটিকাল পলিটিক্স’।
সিন্ধ বিধানসভা ১৯৪৩ সালে ভারতকে টুকরো করে পাকিস্তান সৃষ্টি করার সিদ্ধান্ত অনুমোদন করে, হিন্দু মহাসভার মন্ত্রীরা তখনও সাভারকরের আপ্তবাক্য অনুসরণ করে কোয়ালিশন সরকারের নিজ নিজ পদে চুপ করে বসেছিলেন। এই সিদ্ধান্তের ১৬ বছর আগেই সাভারকর দ্বিজাতি তত্ত্বের কথা লিখেছেন: হিন্দু আর মুসলমানের জন্য দু’টি আলাদা দেশ হতে হবে, আর তার জন্য ভারতকে ভাগ করার দাবি জানাতে হবে। ভারত যখন ভাগ হল, সাভারকর দোষ দেওয়ার জন্য বেছে নিলেন গাঁধীকে। প্রচার শুরু করলেন, গাঁধীই নাকি দেশ দুই ভাগ হতে মদত দিয়েছেন। সেই প্রচারে হিন্দু মহাসভা এবং আরএসএসের মধ্যে রাতারাতি অনেক গাঁধীবিদ্বেষী তৈরি হল। নাথুরাম গডসে সাভারকরের এক জন অনুগত সৈনিক। তা, এই মানুষকে কেন্দ্রের বর্তমান সরকার ভারতরত্ন দেবে না? 
সুকুমার মিত্র
কলকাতা-১২৫

 

কামা কেন নয়

 ‘মহান সাভারকর’ চিঠিতে মাদাম কামা-র উল্লেখ আছে। মাদাম ভিকাজি কামা, ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আন্দোলন না করার মুচলেকা দেওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন, সেখানে সাভারকর একাধিক বার সেলুলার জেল থেকে মুক্তি পেতে ব্রিটিশ সরকারের কাছে স্বাধীনতা সংগ্রামে যুক্ত না থাকার মুচলেকা দেন। তা হলে, দুই ভারতীয়ের মধ্যে ‘ভারতরত্ন’ পাওয়ার যোগ্য কে? 

১৮৯৬ সালে বোম্বাই এলাকা দুর্ভিক্ষ ও প্লেগ আক্রান্ত হলে কামা মেডিক্যাল কলেজের সেবামূলক কাজে যোগ দেন ও নিজেও প্লেগে আক্রান্ত হন। স্বাস্থ্যোদ্ধারের জন্য লন্ডন যান। ১৯০৮ সালে বিপ্লবী শ্যামজি কৃষ্ণবর্মা ও দাদাভাই নৌরোজির সঙ্গে তার আলাপ হয়। তিনি নৌরোজির ব্যক্তিগত সচিব ছিলেন। কামা হোমরুল আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। ব্রিটিশ সরকার তাঁর এই কার্যকলাপ ভাল চোখে দেখেনি। ভারতে ফেরার জন্য তাঁকে মুচলেকা দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয় এই শর্তে যে তিনি ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে নিজেকে সংযুক্ত রাখবেন না। কামা এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। প্যারিসে গিয়ে প্যারিস ইন্ডিয়া সোসাইটি তৈরি করেন। ১৯০৭-এর ২২ অগস্ট তিনি জার্মানির স্টুটগার্ট শহরে অনুষ্ঠিত এক আন্তর্জাতিক সমাজবাদী সম্মেলনে, ভারতের তিনরঙা পতাকার নীচে দাঁড়িয়ে ভারতে ব্রিটিশ শাসন ও শোষণের তীব্র সমালোচনা করেন। যখন শ্যামজি কৃষ্ণবর্মার ঘনিষ্ঠ সহযোগী মদন লাল ধিংড়া, স্যর কার্জন উইলিকে হত্যা করে বিপ্লবীদের ওপর নির্যাতনের প্রতিশোধ নেন, সাভারকরকে গ্রেফতার করে বিচারের জন্য ভারতে পাঠানো হয়। কামাকেও ফেরত পাঠানোর দাবি তোলে ইংল্যান্ড, কিন্তু ফ্রান্স সরকার তা গ্রহণ না করায় ইংরেজ সরকার কামার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে। সোভিয়েট রাশিয়া থেকে লেনিন শ্রীমতী কামাকে আমন্ত্রণ জানান, যদিও কামা সেখানে যেতে পারেননি।

অভিজিৎ চট্টোপাধ্যায়
কাটোয়া, পূর্ব বর্ধমান