সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

সম্পাদক সমীপেষু: অক্ষয় ঐতিহ্য

Akshay Kumar Datta
অক্ষয়কুমার দত্ত।

সুশান্ত কুমার ভট্টাচার্যের ‘বাংলায় বিজ্ঞান চর্চা কেন নয়’ (১৫-১) নিবন্ধ প্রসঙ্গে বলি, প্রকৃতপক্ষে অক্ষয়কুমার দত্তই ছিলেন বাংলায় বিজ্ঞান সংস্কৃতি গড়ে তোলার মূল কান্ডারি। ১৮৪০ সালের জানুয়ারি মাসে, তত্ত্ববোধিনী সভার সহকারী সম্পাদক রূপে নির্বাচিত অক্ষয়কুমার, উক্ত বছরেই কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত তত্ত্ববোধিনী পাঠশালার শিক্ষক রূপে নিযুক্ত হন। এখানেই তিনি ভূগোল ও পদার্থবিদ্যা পড়ানোর সময়ে বাংলা ভাষায় ‘ভূগোল’ ও ‘পদার্থবিদ্যা’ নামে দু’টি পাঠ্যপুস্তক লিখে ফেলেন।

১৮৪১ সালে তাঁর লিখিত এই ‘ভূগোল’ই ছিল বাংলায় লেখা প্রথম বিজ্ঞান সম্পর্কিত বই এবং একই সঙ্গে এই বইয়ের মধ্য দিয়ে অক্ষয়কুমার দত্ত বাংলা ভাষায় প্রথম যতিচিহ্নের প্রবর্তন ঘটান। আর ‘পদার্থবিদ্যা’ (১৮৫৭) ছিল তাঁর লেখা বিশুদ্ধ বিজ্ঞানের (Pure Science) 

প্রথম বাংলা বই। বাংলায় বিজ্ঞানের পরিভাষা গঠনেও তাঁর অবদান চিরস্মরণীয়। আবার, ১৮৪২ সালের জুন মাসে প্রসন্নকুমার ঘোষের সহায়তায় অক্ষয়কুমার ‘বিদ্যাদর্শন’ নামে যে মাসিক পত্রিকা প্রকাশ শুরু করেন, তার মুখ্য উদ্দেশ্যই ছিল বাঙালি মননকে বিজ্ঞানচেতনায় সমৃদ্ধ করা। পাশ্চাত্য বেকনীয় দর্শনের গুণগ্রাহী অক্ষয়কুমার দত্ত মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের বিষয়ে সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন এবং সেই উদ্দেশ্য পূরণে তিনি নিজেই এগিয়ে এসেছিলেন। 

১৮৪৮ সালের জানুয়ারি মাস থেকে ‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা’-য় ব্রিটিশ phrenologist (করোটি পরীক্ষা দ্বারা কোনও ব্যক্তির চরিত্র ও বিবিধ গুণাবলি নির্ণয় করতে পারেন যাঁরা) জর্জ কুম্ব (George Combe)-এর 'The Constitution of Man Considered in Relation of External Object' পুস্তকের ভাবধারায় ভারতীয় প্রেক্ষিতে তাঁর লেখা ‘বাহ্যবস্তুর সহিত মানব প্রকৃতির সম্বন্ধ বিচার’ প্রকাশিত হতে থাকে। পরে এটাই দু’খণ্ডের বই হয়ে প্রকাশিত হয়। 

আর তিন খণ্ডে তাঁর লেখা ‘চারুপাঠ’ ছিল তৎকালীন সময়ের এক জনপ্রিয় পাঠ্যপুস্তক। সহজ, সরল ভাষায় ছোট ছোট প্রবন্ধের মধ্য দিয়ে বিজ্ঞান বিষয়ের নানা প্রবন্ধের মাধ্যমে এই বইয়ের মধ্য দিয়ে তিনি বিজ্ঞানকে বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে অনেকটা সম্পৃক্ত করে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন।

নিজের উপার্জনের প্রায় সব টাকাই তিনি বাংলায় বিজ্ঞান-সমৃদ্ধ সমাজ গড়ে তোলার কাজে নিঃস্বার্থে দান করেছিলেন। মৌলিক বিজ্ঞান গবেষণার কেন্দ্র রূপে তাঁর অকৃত্রিম দানেই গড়ে উঠেছিল আজকের ‘ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কালটিভেশন অব সায়েন্স’।

আজকের ভারতকে যখন কুসংস্কার আর অন্ধত্বের এক কঠিন বেড়াজালে আবদ্ধ করে ফেলার বন্দোবস্ত চলছে, তখন এই বাঙালি মনীষীর জন্মের দ্বিশতবর্ষের প্রাক্-মুহূর্তে (তাঁর জন্ম ১৮২০ সালের ১৫ জুলাই) দাঁড়িয়ে বাঙালির বিজ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে তাঁর অনন্যসাধারণ মৌলিক অবদানকে আজকের বাঙালি সমাজের সামনে তুলে ধরা আমাদের একান্ত কর্তব্য। আমরা তা পালন করব কি?

কৌশিক মুখোপাধ্যায়

কলকাতা-১৪৪

 

এখনও চলেছে

সুশান্ত কুমার ভট্টাচার্য লিখিত নিবন্ধ ‘বাংলায় বিজ্ঞান চর্চা কেন নয়?’ (১৫-১) এবং সেই সম্পর্কিত অরবিন্দ সামন্তের ‘বাংলায় বিজ্ঞানচর্চা’ (২২-১) শীর্ষক পত্রের পরিপ্রেক্ষিতে এই চিঠি। 

সুশান্তবাবু যে ‘লোকশিক্ষা গ্রন্থমালা’ ও ‘বিশ্ববিদ্যাসংগ্রহ’ পুস্তিকার আলোচনা দিয়ে লেখা শুরু করেছেন, সেটাই বাংলায় বিজ্ঞানভিত্তিক প্রবন্ধের সূচনা লগ্ন নয়। ১৮১৭ সালে হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে বাংলা সাহিত্যে বিজ্ঞানের লেখালিখি শুরু হয়েছে। তখন ইংরেজ লেখকেরাই বাংলা লেখালিখি করতেন। 

১৮১৭ থেকে ২০২০ পর্যন্ত বিজ্ঞান সাহিত্যের বয়সকে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়।

১। ইউরোপীয় লেখকদের আমল (হিন্দু কলেজের প্রতিষ্ঠাতা থেকে অক্ষয়কুমার দত্তের পূর্ব পর্যন্ত)।

২। অক্ষয়কুমার দত্ত থেকে রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী।

৩। রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী থেকে জগদানন্দ রায়। 

আমাদের এও মনে রাখতে হবে, অক্ষয়কুমার দত্তের হাত ধরেই বাংলায় বিজ্ঞান সাহিত্য সাবালকত্ব লাভ করে। বিজ্ঞান, গণিত ও ভূগোলের অসংখ্য পারিভাষিক শব্দও তৈরি করেছিলেন অক্ষয়কুমার। অণুবীক্ষণ, চুম্বক, জ্যোতির্বিদ্যা, দাহ্য পদার্থ, জড়, তড়িৎ, পরিমিতি, ধ্রুবতারা, অঙ্গার, বাষ্প, বজ্র, জোয়ার, রামধনু, সৌরজগৎ, মাধ্যাকর্ষণ, গ্রহণ, সুমেরু, কুমেরু, মানমন্দির, জ্বালামুখী, আগ্নেয়গিরি ইত্যাদি তাঁরই তৈরি করা বাংলা শব্দ। 

অরবিন্দ সামন্ত তাঁর চিঠিতে বাংলায় বিজ্ঞানচর্চার যে ধারাবাহিকতা তুলে ধরেছেন, তা অনবদ্য। তিনি রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীতে এসে শেষ করেছেন। তার পরেও বাংলায় বিজ্ঞানচর্চা ও বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ ও গ্রন্থ প্রকাশের যে ধারাবাহিকতা বজায় আছে তা অনুল্লিখিত। 

১৯১২ সালে প্রকাশিত হয় ‘বিজ্ঞান’ পত্রিকা (সম্পাদক ডা. অমৃতলাল সরকার)। প্রকাশিত হয় ১৯২৪-এ ‘প্রকৃতি’ পত্রিকা, কুড়ির দশকেই চিকিৎসা বিজ্ঞান বিষয়ক মাসিক পত্রিকা ‘চিকিৎসা জগৎ’, ত্রিশের দশকে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদের ‘পথ’, ১৯৪৮ সালে ‘জ্ঞান ও বিজ্ঞান’, ১৯৪৯-এ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কৃষি ও সমষ্টি উন্নয়ন বিভাগের ‘বসুন্ধরা’। 

১৯৬১ সালে মূলত মনোবিজ্ঞানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা ‘মানবমন’ (সম্পাদক মন-চিকিৎসক ডা. ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়)। এর পর প্রকাশিত হয় ‘স্বাস্থ্য দীপিকা’, ‘চিকিৎসা সমাজ’।

ষাট ও সত্তরের দশকে গণিত, পরিসংখ্যান, ধাঁধা-বিষয়ক বেশ কয়েকটি পত্রিকা বার হয়। ১৯৬৬-তে প্রকাশিত হয় ‘বিজ্ঞান বার্তা’। ষাটের দশকের শেষে ও সত্তরের দশক জুড়ে এই বাংলায় বিভিন্ন বিজ্ঞান ক্লাব গড়ে উঠেছিল। তাদের ভাবনা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য প্রকাশিত হয় বেশ কিছু বিজ্ঞান পত্রিকা। ১৯৭৭-এ ‘বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানকর্মী’, ১৯৮০-তে ‘উৎস মানুষ’ এই বাংলায় বিজ্ঞানমনস্কতা গঠনের অমূল্য উপাদান হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। 

১৯৮১-তে প্রকাশিত হয় ‘কিশোর জ্ঞান বিজ্ঞান’, ‘বিজ্ঞান মেলা’ ও ‘বিজ্ঞান’ পত্রিকা। ১৯৮২-তে সরকারি উদ্যোগের প্রথম বিজ্ঞান পত্রিকা ‘বিজ্ঞান জগৎ’। 

এর পর ১৯৮২ সাল থেকে আজ পর্যন্ত কলকাতা ও আশেপাশের অঞ্চল থেকে প্রকাশিত বিজ্ঞান পত্রিকার সংখ্যা একেবারেই হতাশাব্যঞ্জক নয়। লেখার মানও যথেষ্ট উন্নত। মরণোত্তর দেহদান আন্দোলনের সপক্ষে আমরা পেয়েছি ‘মুখপত্র গণদর্পণ’। 

১৯৮৬-তে পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ প্রকাশিত দু’টি পত্রিকা: ‘জনবিজ্ঞান’ ও ‘কিশোর বিজ্ঞানী’ প্রকাশিত হয়। গণবিজ্ঞান সমন্বয় কেন্দ্র, পশ্চিমবঙ্গ ‘বিজ্ঞান বার্তা’ প্রকাশ করে। ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতির পত্রিকা ‘যুক্তিবাদী’ প্রকাশিত হয় ১৯৯২ সালে, পরে এই পত্রিকার নাম হয় ‘একুশ শতকের যুক্তিবাদী’। ২০০৩ থেকে প্রকাশিত হয়ে চলেছে ‘হেতুবাদী সাময়িকী’।

কাঁচরাপাড়া বিজ্ঞান দরবার ১৭ বছর ধরে প্রকাশ করে আসছে গণবিজ্ঞান ভাবনার পত্রিকা ‘বিজ্ঞান অন্বেষক’। জেলা শহর বহরমপুর থেকে ‘এবং কি-কে-ও-কেন’ পত্রিকা প্রকাশ হচ্ছে গত ৩৪ বছর ধরে। ‘ব্রেক থ্রু’ ও ‘বিজ্ঞান ও নাস্তিকতা’র মতো পত্রিকা এই বাংলা থেকেই প্রকাশিত হয়।

ত্রিপুরার ‘জ্ঞান বিচিত্রা’ পত্রিকা ও প্রকাশনা বাংলায় বিজ্ঞানচর্চা ও জনপ্রিয় বিজ্ঞান বিষয়ক উন্নত মানের লেখার জোগান দিয়ে যাচ্ছে গত ৪৪ বছর ধরে। 

এখনও এই বাংলায় সরকারি এবং অ-সরকারি সাংগঠনিক প্রকাশনার মাধ্যমে বিজ্ঞানমনস্কতা, স্বাস্থ্য (শারীরিক ও মানসিক), প্রযুক্তি ও পরিবেশবিজ্ঞান বিষয়ক পত্রপত্রিকা প্রকাশ অব্যাহত আছে। তার সংখ্যাটা প্রায় ৪০। 

(তথ্যসূত্র: বিজ্ঞান যখন আন্দোলন— ইতিহাসের পথ বেয়ে। সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায়)

সাধন বিশ্বাস

নোনাচন্দনপুকুর, ব্যারাকপুর

 

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা
সম্পাদক সমীপেষু, 
৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, 
কলকাতা-৭০০০০১। 
ইমেল: letters@abp.in
যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়। চিঠির শেষে পুরো ডাক-ঠিকানা উল্লেখ করুন, ইমেল-এ পাঠানো হলেও।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন