Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ ই-পেপার

সম্পাদক সমীপেষু: ভুল ভাঙার লক্ষণ কই

২০ জুলাই ২০২১ ০৫:০০

অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়ের প্রবন্ধ ‘ভুল তো ভাঙল, অতঃপর?’ (১৩-৭) পড়ে কয়েকটি প্রাসঙ্গিক ভাবনা ভাগ করে নেওয়ার তাগিদে এই চিঠি। জনবাদী রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে যে জনগণের অধিকারের প্রসঙ্গটি সম্পূর্ণ উপেক্ষিত, এ কথা অস্বীকারের জায়গা নেই। কিন্তু এ কথাও ভুলতে পারি না যে, পশ্চিমবঙ্গে সরকারের সঙ্গে জনগণের দাতা-গ্রহীতার সম্পর্কটি বামপন্থী-কালেও সমান ভাবে লালিত হয়েছে। কেবল অর্থ বরাদ্দের মধ্যে এই সম্পর্ক সীমায়িত থাকে না। আরও নানা ভাবে সরকার তথা ক্ষমতাসীন দল বুঝিয়ে দেয়, আমার অনুগ্রহের উপর তোমার বাঁচা-মরা নির্ভর করছে। কিছু না দিতেও পারতাম, নেহাত আমি সদাশয়, তাই এই সব পাচ্ছ। সামাজিক ভাবে এই সত্য এখন প্রতিষ্ঠিত। বস্তুত, গণতান্ত্রিক পরিসর যত সঙ্কুচিত হবে, বা সঙ্কোচনের প্রয়াস বৃদ্ধি পাবে, তত জনসাধারণকে তাঁর অধিকার এবং ন্যায্য প্রাপ্য ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হবে। জনবাদী রাজনীতি মূলত দায়িত্বহীন বলেই নগদ কারবারের রাজনীতি করা তাদের পক্ষে সম্ভব। কিন্তু শ্রেণি-রাজনীতিতে এই ভাবনার প্রতিফলন ক্ষমার অযোগ্য।

রাজ্য সম্পাদকের বক্তব্য শুনে প্রবন্ধকারের মনে হয়েছে যে, বামপন্থী দলের ভুল ভেঙেছে। এবং তাঁরা আত্মসমালোচনার পথ নিয়েছেন। আমি অবশ্য নিশ্চিত নই যে, এখনও তাঁরা তাঁদের খামতির জায়গাটা সঠিক ভাবে চিহ্নিত করতে পেরেছেন কি না। ক্ষমতার বাইরে থেকে, একটি আসনও না পেয়ে কেমন করে মানুষের সঙ্গে থাকা যায়, এটা কোনও একটি সিদ্ধান্ত বা স্বীকারোক্তি-নির্ভর নয়। প্রতিনিয়ত চর্চার বিষয়।

প্রসঙ্গত, এখন প্রায়ই রেড ভলান্টিয়ার্স নিয়ে সগর্ব উক্তি শুনি। তাঁদের সংখ্যা, কাজ নিয়ে ফলাও করে দলীয় মুখপত্রে লেখা বেরোয়। এই গর্বিত ভাব দেখে একটা কথাই মনে হয়, জন-বিচ্ছিন্নতার সত্যটি নেতৃত্বের কাছে হয়তো ধরা পড়েছে। অভূতপূর্ব নির্বাচনী ফলাফলই সেটা ধরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু বামপন্থী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে এনজিও-র সামাজিক দায়বদ্ধতার কিছু ফারাক আছে। খাবার, ওষুধ পৌঁছে দেওয়া যেমন প্রাথমিক ভাবে জরুরি, ততটাই জরুরি জনগণের সঙ্গে কথোপকথন শুরু করা। শেখাতে যাওয়ার চেয়েও জরুরি শিখতে চাওয়ার মনটি প্রস্তুত করা। জনবাদী রাজনীতির বেঁধে দেওয়া পথ অনুসরণ করে নিজেদের পথ প্রস্তুত করে নেওয়া। দুঃখের বিষয়, সেই চৈতন্যোদয়ের কোনও লক্ষণ এখনও দেখা যায়নি।

Advertisement

বোলান গঙ্গোপাধ্যায়, কলকাতা-

সবই কথার কথা

‘ভুল তো ভাঙল, অতঃপর’ প্রবন্ধে অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায় মোক্ষম প্রশ্নটি তুলেছেন— নেতাদের ভুল ভাঙল, ভুলের ব্যাখ্যাও হল, কিন্তু নিজেদের পাল্টানোর কী ব্যবস্থা হবে? সমস্যাটা ঠিক এই জায়গাতেই। প্রথমত, এই ‘বামপন্থী’ দলটির ‘কমরেড’রা অন্যের কথায় কর্ণপাত করতে রাজি নন। এমনকি কেউ কিছু প্রশ্ন তুললেও প্রশ্নকর্তাকে বিরোধী দলের লোক হিসেবে বা ‘মাওবাদী’ ধরে নেন। দীর্ঘ ৩৪ বছর রাজত্ব করার ফলে যে অবাঞ্ছিত শ্লাঘা ওঁদের মগজে জমাট বেঁধেছে, তা বিগত ১০ বছরেও দূর হওয়ার কোনও লক্ষণ প্রকাশ পায়নি। ভবিষ্যতেও সম্ভাবনা ক্ষীণ।

দ্বিতীয়ত, কী ভাবে রাজ্যের শাসকশ্রেণির ‘জনবাদ’ রাজনীতির মোকাবিলা করা হবে, তার উত্তরে সূর্যকান্তবাবু জানিয়েছেন, “আমরা শ্রেণির পার্টি, শ্রেণিসংগ্রামকে তীব্র করাই আমাদের চ্যালেঞ্জ।” পার্টির নেতাদের মুখনিঃসৃত এহেন শব্দ বঙ্গবাসীর কাছে নতুন নয়। প্রশ্ন হল, ক্ষমতা হারানোর পর আজ পর্যন্ত রাজ্যের প্রকৃত বামমনস্ক মানুষজন ‘শ্রেণিসংগ্রাম’-এর বিন্দুবিসর্গ আঁচ অনুভব করেছেন কি? তাঁদের প্রত্যক্ষ অনুভব তো একটাই— শুধুমাত্র মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতা। বিগত ৭ বছর ধরে কেন্দ্রীয় সরকারের যে স্বেচ্ছাচার ও নিপীড়ন চলছে, তার বিরুদ্ধে কোনও কোনও ক্ষেত্রে কতটুকু আন্দোলনে শামিল হতে পেরেছেন বামনেতারা? পার্টির খোলনলচে না বদলালে, শরীরে-মনে-বিবেচনায় বৃদ্ধ কমরেডদের সসম্মানে রাজনীতি থেকে বিশ্রামে পাঠিয়ে, নতুনদের স্বাধীন ভাবে কাজ করার অধিকার না-দিলে সবই কথার কথা হয়েই থেকে যাবে।

সবুজ সান্যাল, ধাড়সা, হাওড়া

অসম্ভব নয়

ভোটে জিতে ক্ষমতায় থাকা যখন লক্ষ্য, তখন রাজ্যের বেশির ভাগ ভোটদাতাদের (যাঁরা অভাবী) জনবাদী নানা প্রকল্পে সন্তুষ্ট করা তো স্বাভাবিক। কিন্তু তাতে পুরো সমাজের এবং ওই অভাবী মানুষদের বৃহত্তর স্থায়ী কল্যাণ সম্ভব নয়, সে কথা বোঝাতে হবে তৃণমূল স্তরের মানুষকে। সে কাজটা সিপিএম করতে পারবে কি না বলা মুশকিল; কিন্তু বামপন্থীদের করতেই হবে। জনবাদী নানা প্রকল্পে অভাবী মানুষদের কিছু সাময়িক লাভ হলেও সমাজের ক্রমবর্ধমান রক্তাল্পতা গভীর ব্যামোর সৃষ্টি করবে। একটা জাতির প্রকৃত বিকাশ তাতে রুদ্ধ হতে হতে জীর্ণ অবস্থায় পৌঁছবে। ।

আগে প্রশাসনের নিম্নতম কেন্দ্র ছিল বিডিও অফিস। ক্ষমতা এবং দুর্নীতি (যদি কিছু হত) সবই মূলত ওই স্তরে সীমাবদ্ধ ছিল। ১৯৭৮ সালে পঞ্চায়েত স্তরে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের সঙ্গে সঙ্গে দুর্নীতিরও তৃণমূল স্তরে প্রসার ঘটেছে। সর্বগ্রাসী দুর্নীতি, হীনম্মন্যতা সমাজের মেরুদণ্ডকে ভেঙে দেয়। এই ক্লীব সমাজকে নিয়ে শাসকরা যা ইচ্ছা, তা-ই করতে পারেন। এই পরিণতির কারণ, তৃণমূল স্তরে কর্তব্য, সততা, সহিষ্ণুতা এবং চেতনার মানোন্নয়নের চর্চার ধারাবাহিক অনুপস্থিতি। বামপন্থীরা তৃণমূল স্তরে এই কাজটা দিয়েই শুরু করতে পারেন। কোনও কাজই সহজ নয়, তবে অসম্ভবও নয়। সমাজটা তো আমাদের, আমাদের এগোতেই হবে।

মানব গণ, কলকাতা-২৬

হাতে রইল কী

অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়ের প্রবন্ধ প্রসঙ্গে জানাই বামপন্থীদের ভুল করা আর ভুল স্বীকার করা অনেক দিনের অভ্যাস। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য মুখ্যমন্ত্রী হয়েই হুটহাট রিকশা চেপে মানুষের বাড়ি ছুটতেন। কথায় কথায় “ওটা ভুল হয়ে গিয়েছে” বলতেন। তবে ভুল কবুল করলেও তিনি পরবর্তী কালে দলকে বদলাতে পারেননি। কোন ফাঁকে খুব তাড়াতাড়ি বদলে গেল সব কিছু। ঘটে গেল নন্দীগ্রাম-সিঙ্গুর ‘আমরা-ওরা’। বেরিয়ে এল সেই উক্তি “দে হ্যাভ বিন পেড ব্যাক ইন দেয়ার ওন কয়েন!” তখন ন্যানো কারখানা আর পেট্রো কেমিক্যালস গড়ার স্বপ্নে বিভোর মুখ্যমন্ত্রী মানুষের মনের কথা শুনতে পেলেন না। জনগণও শুনল না তাঁর কথা।

বামপন্থী দলগুলোর ধারণা, দল চালানোয় জনগণের কোনও ভূমিকা নেই। দল চালাবেন নেতারা। মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন দলের কর্মসূচিতে ততটাই ঘটবে, দল যতটা মনে করবে। গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে থেকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে অস্বীকার করা বামপন্থীদের মজ্জাগত। বামপন্থী রাজনীতির তাত্ত্বিক ভিত্তি যে বৈজ্ঞানিক সমাজ দর্শন, এখানে অনেকে তাকে বেদবাক্য জ্ঞান করেন। সমাজ গঠনে আর মানসিক ঐক্যবদ্ধতায় ধর্মের যে ভূমিকা, সেটা বামপন্থীরা গ্রহণযোগ্যতার বাইরে রাখেন। অথচ, সেই ধর্মীয় উৎসবের সমাবেশে দলীয় পুস্তক বিক্রির স্টল দেন কী ভাবে, বোঝা কঠিন।

সুনির্দিষ্ট প্রকল্পের আওতায় এনে অনেক সংখ্যক মানুষকে নানা অনুদান বা সাহায্য পাইয়ে দেওয়া সাধারণ মানুষের কাছে মহাপ্রাপ্তি। বাম দলগুলো কয়েক দশক ধরে যে সংগঠন তৈরি করেছে, আজ ক্লাবগুলোকে লক্ষ লক্ষ টাকা দানের মাধ্যমে তার পাল্টা সংগঠন গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছে। সরাসরি মানুষের সঙ্গে যোগ রাখাও সহজ হয়েছে। প্রকাশ কারাটদের ইউপিএ থেকে সমর্থন তুলে নেওয়া আর জ্যোতি বসুকে প্রধানমন্ত্রী না হতে দেওয়ার ফলে যে ক্ষতি, তা বুদ্ধদেব বা জ্যোতি বসু বুঝেছিলেন। কিন্তু তাঁরা ফোঁস করলেও ছোবল দিতে পারেননি। তাই বামপন্থীদের এখন সম্বল টিনের তলোয়ার।

রঘুনাথ প্রামাণিক, কালীনগর, হাওড়া

আরও পড়ুন

More from My Kolkata
Advertisement