E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: আড়ালে সমস্যা

‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’-এ ৫০০ টাকা বৃদ্ধি, অর্থাৎ সাধারণ মহিলাদের জন্য ১০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫০০ টাকা করায় রাজ্যের গ্রামগঞ্জে এক অভূতপূর্ব বিজয়োল্লাস ও উৎসাহ-উদ্দীপনা চোখে পড়ছে।

শেষ আপডেট: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৫:০১

রাজ্য বাজেটের প্রেক্ষিতে অশোক কুমার লাহিড়ীর লেখা ‘শেষ অবধি রাজনীতিই’ (১০-২) প্রবন্ধটি যুক্তিসঙ্গত। এ বার রাজ্যে যে খয়রাতি বা ভাতাকেন্দ্রিক পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ হয়েছে, তা শুধু ভোটের রাজনীতি নয়, রাজ্যের গত ১৫ বছরের শাসনে আর্থিক দেউলিয়াপনা এবং বিভিন্ন প্রকল্পের ভাতার মাধ্যমে ভোটারদের মন জয়ের প্রচেষ্টারই পরিচায়ক।

এর ফলে যেমন ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’-এ ৫০০ টাকা বৃদ্ধি, অর্থাৎ সাধারণ মহিলাদের জন্য ১০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫০০ টাকা করায় রাজ্যের গ্রামগঞ্জে এক অভূতপূর্ব বিজয়োল্লাস ও উৎসাহ-উদ্দীপনা চোখে পড়ছে। রাস্তায় রাস্তায়, অলিতে-গলিতে শাসক দলের নেতা-নেত্রী ও সমর্থকদের মধ্যে আবির মাখানো, বাজি ফাটিয়ে জয়োল্লাস, এমনকি পাড়ার মোড়ে মোড়ে ‘লক্ষ্মী এল ঘরে’ শিরোনামে চিত্রপ্রদর্শনী পর্যন্ত চলছে। মনে হচ্ছে, রাজ্য বাজেটের মূল লক্ষ্যই ছিল বিভিন্ন প্রকল্পের ভাতা বৃদ্ধি।

কেন্দ্র বা রাজ্যের প্রকৃত বাজেট হওয়া উচিত সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা ও বিভিন্ন অংশের মানুষের নির্দিষ্ট সমস্যাকে গুরুত্ব দেওয়া— যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প, পরিকাঠামো ও কর্মসংস্থান এবং তার সংস্কারের মাধ্যমে উন্নয়নের রূপরেখা নির্ধারণ করা। কিন্তু এ বারের বাজেটে অর্থমন্ত্রী বা সরকার সেই সংস্কারের দিকে বিশেষ গুরুত্ব না-দিয়ে ঋণ করে নির্বাচনের বৈতরণি পার হওয়ার লক্ষ্যে খয়রাতি ও বিভিন্ন প্রকল্পের ভাতার উপর জোর দিয়েছেন। এর ফলে রাজ্যের মূল সমস্যাগুলি আড়াল হয়েছে। আশাকর্মীরা তাঁদের ন্যায্য পাওনা ও চাকরির স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত হয়ে হতাশ। পার্শ্বশিক্ষকেরা ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি না হওয়ায় ক্ষুব্ধ। শিক্ষিত বেকারেরা কর্মসংস্থানের অভাবে কর্মবিমুখ হয়ে পড়ছেন। গ্রামে কর্মসংস্থানের অভাবে বহু যুবক কাজের সন্ধানে ভিনরাজ্যে পাড়ি দিচ্ছেন। এ ছাড়া বার্ধক্য ভাতা বৃদ্ধি থেকে প্রবীণ নাগরিক ও প্রতিবন্ধীদের উন্নয়নমূলক সুযোগ-সুবিধার বঞ্চনাও রয়ে গিয়েছে। অতএব, রাজ্যের নির্বাচন প্রাক্কালে এই বাজেটে ভাতা বৃদ্ধি এবং ‘যুবসাথী’ নামে শিক্ষিত বেকারদের জন্য নতুন ভাতা প্রকল্প— এ সব নির্বাচনী চমক ও ভোটের রাজনীতি ছাড়া আর কিছু নয়।

তপনকুমার বিদ, বেগুনকোদর, পুরুলিয়া

চেনা কৌশল

অশোক কুমার লাহিড়ী তাঁর ‘শেষ অবধি রাজনীতিই’ প্রবন্ধে রাজ্য বাজেটের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মূলত অভিযোগ করেছেন যে প্রশাসন আগামী ভোটের স্বার্থে কেবল রাজনীতি করেছে, যা নাকি অনৈতিক। অন্তর্বর্তিকালীন— অর্থাৎ আগামী বিধানসভা গঠিত না-হওয়া পর্যন্ত। এই অন্তর্বর্তী বাজেট কখনও পূর্ণাঙ্গ ২০২৬-২৭ সালের বাজেট নয়, হতেও পারে না। অথচ সেই বাজেটেই সরকার দূরবর্তী ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখানোর চেষ্টা করেছে। অর্থনীতি ও রাজনীতির দিক থেকে এই বক্তব্য অবশ্যই তাৎপর্যপূর্ণ।

রাজনৈতিক দল রাজনীতি করবেই। বর্তমান সময়ে পশ্চিমবঙ্গ বা অন্যান্য রাজ্যই নয়, কেন্দ্রীয় সরকারও মানুষকে নানা প্রতিশ্রুতি ও স্বপ্ন দেখিয়ে ভোট সংগ্রহে সচেষ্ট। গণতান্ত্রিক দেশে রাজনীতির উদ্দেশ্য মূলত দু’টি। প্রথমত, ভোটে জয়ী হয়ে শাসনক্ষমতা অর্জন করা এবং দ্বিতীয়ত, সেই শাসনকে দীর্ঘকাল ধরে বজায় রাখা। রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এতে দোষের কিছু আছে কি?

মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী এক জন রাজনীতিক হিসাবে এই কৌশলে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন, এ কথা ভারতের অনেকেই স্বীকার করবেন। প্রতিশ্রুতি ও আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে তিনি পশ্চিমবঙ্গে নিজের এবং দলের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং ২০১১ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত তা বজায় রেখেছেন। এই দুই অস্ত্রে বিরোধী পক্ষ বার বার পরাস্ত হয়েছে। ২০২৬ সালে তার ব্যতিক্রম ঘটবে কি না, তা ভবিষ্যৎই বলবে। তবে দুর্ভাগ্যের বিষয়, পশ্চিমবঙ্গ সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রতিযোগিতায় ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছে। নিঃশর্ত আর্থিক উপঢৌকনের বহর বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজ্যের ঋণের পরিমাণও বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুধু লেখকই নন, আরও অনেক অর্থনীতিবিদ এই সতর্কবার্তাই দিচ্ছেন।

নতুন প্রজন্ম এক বিপুল ঋণের ভার নিয়েই জন্মাবে। এই দায় শেষ পর্যন্ত কে নেবে?

বিমল চট্টোপাধ্যায়, কলকাতা-১৯

অন্ধকারের পথে

অশোক কুমার লাহিড়ীর লেখা ‘শেষ অবধি রাজনীতিই’ প্রবন্ধ প্রসঙ্গে কিছু কথা। ‘খেলা-মেলা, দান-খয়রাতি’র ভোটব্যাঙ্ক রাজনীতিতে এ রাজ্যের অর্থনীতি আজ যেন ‘আইসিইউ’-এ, কোমাচ্ছন্ন। এই অবস্থায় রাজ্যের অর্থনীতিতে প্রয়োজনীয় স্যালাইন দিয়ে চাঙ্গা করার বদলে যে ভাবে দিশাহীন এক ভোটমুখী বাজেট পেশ করা হল, তাতে আর্থিক বিকাশ হওয়া তো দূর, এই বাজেট বর্তমান প্রজন্মকে গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট বলেই মনে করি।

দেখা যাচ্ছে, প্রতি বছর এই রাজ্য থেকে পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ছে। শিক্ষিত ছেলে-মেয়েরা চাকরির জন্য অন্য রাজ্যে বা বিদেশে পাড়ি দিচ্ছে। যদি সত্যিই আর্থিক উন্নয়ন হয়ে থাকে, তবে বেকার ভাতা চালু করার প্রয়োজন কেন? কেন রাজ্য সরকারি কর্মীদের ন্যায্য ডিএ দিতে পারছে না সরকার? কেন আশাকর্মী ও পার্শ্বশিক্ষকদের সম্মানজনক বেতনের দাবিতে পথে নামতে হচ্ছে? এই সব প্রশ্নই কি রাজ্যের আর্থিক অবস্থার বাস্তব চিত্র তুলে ধরে না?

মিহির কানুনগো, কলকাতা-৮১

আশাহত

২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের কেন্দ্রীয় বাজেট মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং মধ্যবিত্তের কর-স্বস্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলিকে উপেক্ষা করায় জনমনে গভীর হতাশা তৈরি হয়েছে। উৎপাদন বৃদ্ধি ও পরিকাঠামো উন্নয়নে জোর দেওয়া হলেও আয়-ব্যয়ের ভারসাম্যহীনতা এবং ঘাটতি বাজেটের প্রেক্ষিতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমার সম্ভাবনা ক্ষীণ। কর্মসংস্থান বৃদ্ধির কোনও বাস্তবমুখী পরিকল্পনা না-থাকায় বাজেটটি সমালোচিত হয়েছে। প্রতি বছর কেন্দ্রীয় বাজেট পেশের আগে দেশবাসী ও অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা নতুন আশায় অপেক্ষা করেন। কিন্তু ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের বাজেট সেই প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে। বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী-সহ বহু সমালোচক এই বাজেটকে বাস্তব পরিস্থিতি থেকে বিচ্ছিন্ন এবং হতাশাজনক বলেছেন।

খাদ্যদ্রব্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে লাগাম টানার কোনও সুস্পষ্ট পদক্ষেপ বাজেটে দেখা যায়নি। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়াবে। বেকারত্ব দেশের অন্যতম বড় সমস্যা। কিন্তু এ বারের বাজেটে নতুন কর্মসংস্থান বা কাজের সুযোগ বৃদ্ধির কোনও বাস্তবসম্মত রূপরেখা বা প্রকল্পের উল্লেখ নেই, যা যুবসমাজকে হতাশ করেছে। ব্যক্তিগত আয়কর বা কর কাঠামোয় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন না-হওয়ায় মধ্যবিত্তের আর্থিক চাপ অব্যাহত থাকবে। কৃষকদের আয় বৃদ্ধির দাবির বিপরীতে প্রকৃত বরাদ্দ পর্যাপ্ত নয় বলে অভিযোগ উঠেছে। গ্রামীণ উন্নয়ন নিয়েও প্রশ্ন রয়ে গিয়েছে। এ ছাড়া, আয়-ব্যয়ের একাধিক হিসাব বিশেষজ্ঞদের কাছে অবাস্তব বলে মনে হয়েছে। পরিকাঠামো ও বৃহৎ শিল্পে জোর দেওয়া হলেও আমজনতার দৈনন্দিন জীবনের সমস্যার কার্যকর সমাধান এই বাজেটে অনুপস্থিত।

কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপের অভাবেই এই বাজেট মানুষের কাছে হতাশার কারণ। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম যে ভাবে ক্রমাগত বাড়ছে, তাতে গরিব ও নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনধারণ ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। আগামী দিনে অসহায় সাধারণ মানুষ কী ভাবে সংসার চালাবেন, কী ভাবে ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্যব্যয় সামাল দেবেন, সে প্রশ্নও ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে।

সুদীপ্ত দে, কলকাতা-১০২

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

West Bengal Assembly Election 2026 west bengal budget bankruptcy West Bengal government Government Schemes

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy