Advertisement
০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩
Letters To The Editor

সম্পাদক সমীপেষু: এ কেমন কৌশল?

সাভারকর কেমন ‘সুকৌশলী চিন্তাবিদ’ ছিলেন, সেটা ইংরেজ সরকারের কাছে লেখা বিভিন্ন চিঠি থেকে কিছুটা আন্দাজ করা যায়।

সাভারকরকে ইংরেজ সরকার ১৯১০ সালে ৫০ বছরের জন্য কারাবাসের শাস্তি দিয়ে সেলুলার জেলে পাঠায়।

সাভারকরকে ইংরেজ সরকার ১৯১০ সালে ৫০ বছরের জন্য কারাবাসের শাস্তি দিয়ে সেলুলার জেলে পাঠায়।

শেষ আপডেট: ২১ অক্টোবর ২০২০ ০২:৩২
Share: Save:

বিদ্যুৎ চক্রবর্তী সাভারকরের মুচলেকা দিয়ে মুক্তির ইচ্ছার প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘‘যদি কেউ মনে করেন তিনি এই মুচলেকা দেওয়ার মাধ্যমে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে সাহায্যের অঙ্গীকার দিয়েছিলেন, সেটা কিন্তু খুবই সরলীকরণ হবে,... তিনি যে এক জন সুকৌশলী চিন্তাবিদ, এখানে তারই পরিচয় পাওয়া যায়।’’ (‘সাভারকরের ভাবাদর্শ’, ১০-১০)। তিনি কেমন ‘সুকৌশলী চিন্তাবিদ’ ছিলেন, সেটা ইংরেজ সরকারের কাছে লেখা বিভিন্ন চিঠি থেকে কিছুটা আন্দাজ করা যায়। সাভারকরকে ইংরেজ সরকার ১৯১০ সালে ৫০ বছরের জন্য কারাবাসের শাস্তি দিয়ে সেলুলার জেলে পাঠায়। মাত্র এক বছরের বন্দিজীবনে তিনি অতিষ্ঠ হয়ে ১৯১১ সালে ক্ষমা ভিক্ষার আবেদন জানিয়ে ইংরেজ সরকারের কাছে চিঠি লিখেছিলেন। সেই আবেদন নাকচ হয়ে যাওয়ার পর ১৯১৩ সালে লিখলেন— ‘‘আমি কেবলমাত্র ব্রিটিশ সরকার বাহাদুরের অনুগত, আজ্ঞাবহ সর্বশ্রেষ্ঠ সমর্থক হয়ে থাকব... আমি সরকার বাহাদুরের খিদমতগার হয়ে থাকতে চাই... সরকার বাহাদুর যেন দয়া করে আমাকে ক্ষমা করে, মহামহিম সরকার বাহাদুর ছাড়া আর কে এক দুষ্ট, বিগড়ে যাওয়া সন্তান ফিরিয়ে আনবে তার পিতার ঘরে?’’ ফের ক্ষমা প্রার্থনার আবেদন জানান ১৯১৭ সালে। সেই চিঠিতে ছত্রে ছত্রে ইংরেজ সরকারের প্রশংসা এবং ক্ষমার আবেদন। সেটাও বাতিল হয়। আবার ১৯২০ সালে লিখলেন, ‘‘যে কোনও বুদ্ধিমান ভারতপ্রেমিক এই সময়ে প্রাণমন দিয়ে, ভারতের স্বার্থে ব্রিটিশ সরকারের পাশে এসে দাঁড়াবে এবং সব রকমের সহযোগিতা করবে।’’

Advertisement

এর পর অন্য একটি চিঠিতে লিখলেন, ‘‘প্রতিশ্রুতি দিতে রাজি আছি যে সরকারের নির্ধারণ করে দেওয়া যে কোনও যুক্তিগ্রাহ্য সময়সীমা পর্যন্ত কোনও রকম রাজনৈতিক কার্যকলাপে নিজেকে যুক্ত রাখব না...।’’ প্রায় যে কোনও শর্ত তিনি ও তাঁর ভাই যে মানতে রাজি, তা নানা ভাবে লিখেছেন।

১৯২১ সালে মুচলেকা দিলেন, জীবনে আর রাজনৈতিক কাজকর্মের সঙ্গে যুক্ত হবেন না। অবশেষে ১৯২৪ সালে তিনি মুক্ত হন এবং ইংরেজ সরকারও যাবতীয় নিষেধাজ্ঞা তাঁর উপর থেকে তুলে নিল ১৯৩৭ সালে। এই সব চিঠির সূত্র ধরে কি বলা যায় তিনি ‘সুকৌশলী চিন্তাবিদ’ ছিলেন!

রতন চক্রবর্তী, উত্তর হাবড়া, উত্তর ২৪ পরগনা

Advertisement

দুই দেশ

মুচলেকা দান নিজেকে কারামুক্ত করার জন্য একটা কৌশল হতে পারে। কিন্তু তার জন্য সাভারকর দেশের কাছে বিশেষ চিন্তাবিদের পরিচিতি লাভ করতে পারেন না। বিদ্যুৎ চক্রবর্তী তাঁর নিবন্ধে বলেছেন, তিনি সর্বপ্রথম ভারতীয় চিন্তাবিদ, যিনি স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য হিন্দু-মুসলমানদের এক ছাতার তলায় আসার আহ্বান জানিয়েছেন। হিন্দু-মুসলিম ঐক্যে সাভারকর কতটা আগ্রহী ছিলেন, তা বোঝা যেতে পারে তাঁর কথা থেকে। ১৯২০ সালের চিঠির এক অংশে বলছেন, ‘‘মধ্য এশিয়ার উন্মত্ত বাহিনী বহু যুগ ধরে ভারতবর্ষের অভিশাপ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এর আগে তারা এসেছে শত্রু হয়ে।... কিন্তু সন্দেহ নেই যে তারা আবারও অভিশাপের ভূমিকা নেবে। অতএব আমার বদ্ধমূল ধারণা এই যে, যে কোনও বুদ্ধিমান ভারতপ্রেমী এখন মনপ্রাণ দিয়ে ইংরেজদের সহায়তা করবেন ভারতবর্ষের স্বার্থে। এই কারণেই আমি ১৯১৪ সালে যুদ্ধ লাগতেই সরকারকে জানাই যে আমি স্বেচ্ছায় ভারতে হতে চলা জার্মান-তুর্কো-আফগান হানাদারির মোকাবিলা করতে প্রস্তুত।’’ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তিনি ভারতীয় হিন্দুদের ব্রিটিশ-বিরোধিতা না করে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে বলেন। ঠিক এই সময়ে নেতাজি ব্রিটিশকে পরাজিত করতে বিদেশের মাটিতে এই যুদ্ধকে কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন।

অম্বেডকরের লেখা থেকে তাঁর ভাবাদর্শ বোঝা যায়— ‘‘সাভারকর আর জিন্না, এক দেশ বনাম দুই দেশের প্রসঙ্গে একে অপরের বিরুদ্ধে না হয়ে সম্পূর্ণ একমত। তাঁরা দু’জনেই দাবি করেন যে ভারতবর্ষের ভিতরে দু’টি আলাদা দেশ আছে। একটা মুসলমান দেশ আর একটা হিন্দু দেশ। ওঁদের দু’জনের দ্বিমত কেবল দুই দেশের বাসিন্দারা কেমন ভাবে থাকবে,
সেই নিয়ে।’’

নরেন্দ্রনাথ কুলে, কলকাতা-৩৪

ভাবাদর্শ

মুচলেকা দিয়ে সাভারকরের জেল থেকে বেরিয়ে আসা কোন বিচারে ‘কৌশলগত কারণ’, সেটা আজও ঠিক বোঝা যায়নি। দেখতে হবে মুক্তির পরে তিনি কোন পথ নিলেন। প্রকাশিত নথি, সরকারি তথ্য ও হিন্দুত্ববাদীদের প্রচারিত নানা সূত্র থেকে দেখা যায়, ১৯২০ থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত হিন্দু মহাসভা, আরএসএস এবং অন্যান্য অনামী হিন্দু সংগঠন প্রকাশ্য ভাবে ফ্যাসিবাদে আগ্রহী ছিল। মুসোলিনির জীবন ও রাজনৈতিক দর্শনের প্রতি তাঁরা এতটাই আকৃষ্ট ছিলেন যে, ইটালির শাসকের রচনা, উদ্ধৃতি তাঁরা উচ্চৈঃস্বরে প্রচার করতেন।

১৯৩৮ সালের পর সাভারকরের অধিনায়কত্বে হিন্দু মহাসভার মূল আকর্ষণ হল নাৎসি জার্মানি। হিটলারের জাতিগত ভাবাদর্শ তাঁরা ভারতে ‘মুসলমান সমস্যা’ সমাধানের মডেল হিসেবে গ্রহণ করেন এবং সম্ভবত আজও হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির প্রবক্তারা এই ধারণা পোষণ করেন, পারলে কাজেও লাগান। ১৯২০ সালের পর থেকে সাভারকর যে আদর্শ প্রচারে মন দেন, সেখানে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের থেকেও বেশি আশঙ্কাজনক হিসেবে প্রতিভাত হন মুসলমানরা। ১৯৩৯ সালের ৯ অক্টোবর সাভারকর লর্ড লিনলিথগোর সঙ্গে দেখা করে ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে কাজ করার প্রস্তাবে বলেন— বর্তমান পরিস্থিতিতে ‘হিজ় ম্যাজেস্টি’-র সরকার হিন্দুদের দিকে দৃষ্টি ফেরাক ও তাঁদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করুক।... এখন গ্রেট ব্রিটেন ও ভারতের স্বার্থ এতটাই ঘনিষ্ঠ ভাবে যুক্ত যে, তাদের মধ্যে অতীতের শত্রুতার আর কোনও প্রয়োজন নেই।

ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নানা ধারার— জাতীয় কংগ্রেস, বিপ্লবী সংগঠন, মুসলিম লিগ, প্রতিটিই কোনও না কোনও পর্যায়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে তাদের প্রধান শত্রু হিসেবে বিবেচনা করেছে। একমাত্র ব্যতিক্রম সাভারকরের ভাবাদর্শ পরিচালিত হিন্দুত্বের ধারাটি। হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মূল ভাবনা তাঁর হাতেই তৈরি।

প্রবুদ্ধ বাগচি, কলকাতা-৫২

ভুল ধারণা

আন্দামানের সেলুলার জেল নয়, ১৯২৩ সালে মহারাষ্ট্রের রত্নগিরি জেল থেকে মুক্তি পান সাভারকর। সেলুলার জেল থেকে ১৯২১-এ তাঁকে রত্নগিরি জেলে চালান করা হয়। সেখানে থাকাকালীন তিনি তাঁর ‘হিন্দুত্ব’ প্যামফ্লেটের খসড়া তৈরি করেন। সেখানে তিনি হিন্দুত্বের ৫০টি সম্ভাব্য অর্থ দেখান, কিন্তু শেষে বলেন যে, ‘হিন্দু’-র কোনও নির্দিষ্ট অর্থ নির্ধারণ করা অসম্ভব। তাই তিনি নিজেই ‘হিন্দুত্ব’-এর সংজ্ঞা দিয়ে একটি সূত্র রচনা করেন। শুভনীল দত্ত তাঁর চিঠিতে (‘পুণ্যভূ’, ১৭-১০) যে দাবি করেছেন, সাভারকরের বিচারে খ্রিস্টান বা মুসলমানদের ‘‘নাগরিকত্বের দাবি থাকা উচিত নয়’’— এটা সম্পূর্ণ ঠিক নয়। ভারত কেবল হিন্দুদেরই পিতৃভূমি ও পুণ্যভূমি, তাই এখানে অন্য সম্প্রদায়ের তুলনায় হিন্দুদের প্রাধান্য থাকবে, মনে করতেন সাভারকর। কিন্তু অন্য ধর্মাবলম্বীদের বাদ দেওয়ার কথা তিনি বলেননি।

১৯১৯ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়। ১৯২০ সালে সাভারকর ব্যতীত সমস্ত স্বাধীনতা সংগ্রামীকে বিনা আবেদনে সেলুলার জেল থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। তাঁকে অবিশ্বাস করত ব্রিটিশ সরকার। তাই ১৯১১-১৯২০ পর্যন্ত তাঁর চারটি ক্ষমার আবেদন তারা নাকচ করে। তাঁর সব আবেদন বা ‘ক্লেমেন্সি পিটিশন’ যে আসলে ছিল কৌশল বা ছল, সে বিষয়ে নিশ্চিত ছিল ব্রিটিশ সরকার। তাই সেগুলি মানেনি। উল্টে ১৯২০ সালে সাভারকরকে অন্য জেলে পাঠানো হয়। দুঃখের কথা, সাভারকরকে আজও আমরা ভুল বুঝি।

নির্মাল্য মুখোপাধ্যায়, কলকাতা-২৬

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা

সম্পাদক সমীপেষু,

৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, কলকাতা-৭০০০০১।

ইমেল: letters@abp.in

যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়। চিঠির শেষে পুরো ডাক-ঠিকানা উল্লেখ করুন, ইমেল-এ পাঠানো হলেও।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)
Follow us on: Save:
Advertisement
Advertisement

Share this article

CLOSE
Popup Close
Something isn't right! Please refresh.