E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: একটু সহানুভূতি

মানুষকে মানুষ হিসাবে সম্মান জানানো এক মৌলিক মানবিক গুণ। এটি পারস্পরিক বিশ্বাস, সহায়তা ও নিরাপত্তার ভিত গড়ে তোলে, সুস্থ সামাজিক সম্পর্কের জন্ম দেয়। এটি এক মৌলিক প্রত্যাশা।

শেষ আপডেট: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ ০৫:৪৩

‘শুধু মুনিশ, মানুষ নয়?’ (১৬-৩) শীর্ষক সুজিত মাঝি-র প্রবন্ধ আমাদের শিক্ষা, সংস্কৃতি, বিবেক ও চেতনার দিকে আঙুল তোলে। মানুষকে মানুষের সম্মান জানাতে পারা এক মৌলিক নৈতিক শিক্ষা।

আমাদের গ্রামে শীতকালে ধান কাটতে বহু নারী-পুরুষ তাঁদের শিশু-সন্তানদের নিয়ে বাঁকুড়া ও ঝাড়খণ্ড থেকে আসতেন। আমাদের খেতের ধান যাঁরা কাটতেন, তাঁদের দুপুরের খাবার হত আমাদের বাড়িতেই। মা-কাকিমারা সকাল থেকে নানা পদ রান্না করে যত্ন করে খেতে দিতেন। ছোটদের নাম ধরে জিজ্ঞাসা করতেন— আর কিছু লাগবে? বড়দের ‘দাদা’ বা ‘দিদি’ বলে সম্বোধন করতেন। আমরাও তাঁদের ‘জেঠু’, ‘কাকু’, ‘কাকিমা’, ‘দাদু’ বলে ডাকতাম। সন্ধ্যায় কাজের শেষে তাঁরা বাড়িতে এসে চাল, ডাল, আনাজ (সিধে) নিয়ে যেতেন। মা তাঁদের সঙ্গে সুখ-দুঃখের গল্প করতেন। তখনই শুনতাম— কত অভাব ও কষ্টের মধ্যে পড়ে তাঁরা বাধ্য হয়ে ঘর-সংসার ছেড়ে দূর দেশে কাজ করতে এসেছেন। অস্থায়ী ঘর বানানোর জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বাবা-কাকুরা জোগাড় করে দিতেন, সর্বতোভাবে সাহায্য করতেন। কেউ অসুস্থ হলে ডাক্তার দেখানো, ওষুধ এনে দেওয়াও চলত নিয়মিত। এ সব দেখে আমরা শিখেছি মানুষকে ভালবাসতে, তাঁর শ্রমকে সম্মান করতে। শিক্ষাগত যোগ্যতা বা আর্থিক অবস্থান যেমনই হোক, সর্বোপরি তিনি মানুষ; আর তাঁদের শ্রম ছাড়া আমরা অসহায়। তাঁরাও আমাদের স্নেহ করতেন, ‘দাদা-বৌদি’ ডাকতেন। অল্প ক’দিনেই গড়ে উঠত আন্তরিক সম্পর্ক।

মানুষকে মানুষ হিসাবে সম্মান জানানো এক মৌলিক মানবিক গুণ। এটি পারস্পরিক বিশ্বাস, সহায়তা ও নিরাপত্তার ভিত গড়ে তোলে, সুস্থ সামাজিক সম্পর্কের জন্ম দেয়। এটি এক মৌলিক প্রত্যাশা। অপরকে সম্মান জানানোর মধ্যেই নিজের সম্মান নিহিত থাকে। শ্রেণি বা আর্থসামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে কাউকে ‘তুই’ সম্বোধন করা আসলে নিজের অহংবোধ ও হীন মানসিকতার পরিচয়। এতে মানুষের আত্মসম্মানে আঘাত লাগে এবং সমাজে বিভেদের প্রাচীর আরও পোক্ত হয়।

প্রয়োজন উপযুক্ত পরিকাঠামো। শিক্ষার সুযোগ পেলে পরম্পরার গণ্ডি ভেঙে তাঁরাও বেরিয়ে আসতে পারেন। প্রতিবাদের ভাষা খুঁজে পেতে, তথাকথিত শিক্ষিত সমাজের কাছে প্রতারিত বা অসম্মানিত হওয়া বন্ধ করতে— শিক্ষাই হতে পারে প্রথম হাতিয়ার। প্রশাসনিক সহায়তার পাশাপাশি, সমাজের প্রতিটি মানুষেরই বাড়িয়ে দিতে হবে বন্ধুত্বের হাত। কারণ, ব্যবহারই মানুষের আসল পরিচয়।

কেকা চৌধুরী, হরিপাল, হুগলি

অবজ্ঞার বেদনা

সুজিত মাঝি-র ‘শুধু মুনিশ, মানুষ নয়?’ প্রবন্ধটির প্রসঙ্গে কয়েকটি কথা। পুরনো দিনের বাংলা সিনেমা ও যাত্রায় ‘আদর্শ মনিব’ ও ‘আদর্শ পরিচারক’-এর চরিত্রে উত্তম কুমার, পাহাড়ী সান্যাল-এর মতো দক্ষ অভিনেতাদের অভিনয় আমরা দেখেছি। মনিব প্রয়োজনে বাড়তি অর্থসাহায্যও করতেন, আর পরিচারকরা শ্রদ্ধা ও ভক্তিতে সর্বস্ব উজাড় করে প্রভুসেবা করতেন। প্রভু-পরিচারকের এই তথাকথিত ‘আন্তরিক’ সম্পর্ক দেখে দর্শকেরা অভিভূত হতেন। শিল্প-সাহিত্যও এই সম্পর্ককে যথেষ্ট প্রশ্রয় দিয়েছে।

আগে যাঁদের ‘মজুর’ বলা হত, এখন তাঁদের ‘লেবার’ বলা হয়। কিন্তু নাম পাল্টালে কি সম্মান বাড়ে? ‘লেবার’ শব্দটি যেন এক অচেনা, নামহীন পরিচয়ে তাঁদের বেঁধে ফেলে। গ্রামের ঘরে অনেক সময় ‘লেবার’দের চা-টিফিন ঘরের ভিতরেই খেতে দেওয়া হয়। কিন্তু শহরের তথাকথিত শিক্ষিতসমাজে তা অনেক সময়ই কল্পনাতীত। শৌচালয় ব্যবহার করতে দেওয়া দূর, ভাল কাপেও চা দেওয়া হয় না। অথচ সেই একই ব্যক্তি যদি অজানতে অতিথি হিসাবে বাড়িতে আসেন, তখন কিন্তু এই সব নিষেধাজ্ঞা হঠাৎই শিথিল হয়ে যায়। তবু এই দ্বিচারিতাকে হাস্যকর বলে মনে করা হয় না।

উপকারী শ্রমজীবী মানুষের প্রতি এই অবজ্ঞা আপাতদৃষ্টিতে অকারণ মনে হলেও, আসলে এর মধ্যে লুকিয়ে থাকে শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করার প্রবণতা। এর মাধ্যমে আর্থিক শোষণ ও ক্ষমতার উপভোগকে স্বাভাবিক করে তোলা হয়। প্রায় আশি বছরের গণতন্ত্র ও শিক্ষার অগ্রগতি সত্ত্বেও, আকাশছোঁয়া আর্থসামাজিক বৈষম্যকে সঙ্গে নিয়েই কী স্বচ্ছন্দে বেঁচে আছে এই দেশ— সেটা দেখাই বড় কষ্টকর।

দুর্গেশ কুমার পান্ডা, সোনারপুর, দক্ষিণ ২৪ পরগনা

ক্ষমতার আঁধার

সুজিত মাঝি-র লেখা ‘শুধু মুনিশ, মানুষ নয়?’ পড়ে বহু দিন আগের একটি ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল। কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা মনে করেন অন্যকে অসম্মানজনক ভাষায় সম্বোধন করলেই যেন নিজের সম্মান রক্ষা পায়। তাই এই শ্রেণির মানুষ অন্য জন বয়সে বড় হোক বা ছোট— নির্বিচারে ‘তুই’ বলতে দ্বিধা করেন না।

এক বার আমাদের এলাকায় গ্রীষ্মকালে একটি পুকুরের জল শুকিয়ে গিয়েছিল। সেই পুকুর কাটাতে কিছু নারী-পুরুষ শ্রমিক এসেছিলেন। কয়েক জন মহিলাকে পিঠে কাপড় বা গামছা জড়িয়ে শিশুদের নিয়ে আসতে দেখেছিলাম। পুকুরপাড়ের জঙ্গল পরিষ্কার করে বাঁশ-কঞ্চি ও শুকনো পাতা দিয়ে তাঁবুর মতো করে কোনও রকমে দিন কাটাতেন তাঁরা। রাতের বেলায় ছোট্ট কুপি জ্বালাতেন, বেশি রাত না করে মশা-মাছি-পোকামাকড় উপেক্ষা করে শুয়ে পড়তেন।

সকালবেলায় সবাই মিলে বসে পান্তাভাত আর কাঁচা পেঁয়াজ খেতেন। মহিলা-শ্রমিকদের পোশাক ছিল শাড়ির উপর পুরুষদের একটি জামা। পুকুরের ধারে কচি বাচ্চাদের কাঁথা বা ভাঁজ করা শাড়ির উপর শুইয়ে রাখতেন।

যিনি এই পুকুরটির ইজারা নিয়েছিলেন, তিনি নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলকেই ‘তুই’ বলে সম্বোধন করতেন। আমি তখন খুব ছোট। তবু তাঁকে প্রশ্ন করেছিলাম, “দাদা, তুমি ওদের ‘তুই’ বলছ কেন? ওরা তো তোমার থেকে বয়সে অনেক বড়!” দাদা হেসে বলেছিলেন, “ওরা ‘তুই’ শুনতেই পছন্দ করে, তাই বলছি।”

তার পর তো গঙ্গার জল অনেক দূর গড়িয়েছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে বুঝেছি— এটি আসলে এক ধরনের ক্ষমতা প্রদর্শন, দাম্ভিকতা; নিজেকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করার সহজ উপায়। তখনই উপলব্ধি করেছিলাম, যাঁদের ‘তুই’ বলা হচ্ছে, তাঁদের প্রতিবাদ করার সাহস ছিল না। সামান্য রোজগারটুকু হারানোর ভয়ে তাঁরা মুখ বুজে অপমান সহ্য করতেন। পেটের জ্বালা বড় জ্বালা। এই ইজারাদারই ছিল তাঁদের প্রভু। তিনি যা কাজ বলতেন, তাঁরা তাই করে যেতেন। চাপিয়ে দেওয়া এই প্রভু-ভৃত্যের সম্পর্ক আজও অনেক ক্ষেত্রে বহাল।

তবে সবাই এক রকম নন। কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা শ্রমিকদের ‘তুই’ বলে সম্বোধন করেন না। তাঁরা যথাযথ সম্মান দিয়ে কথা বলেন। শুনতেও ভাল লাগে, আর তাতেই বোঝা যায়— ব্যবহারই মানুষের আসল পরিচয়।

তমাল মুখোপাধ্যায়, ডানকুনি, হুগলি

অনিশ্চয়তা

নবকুমার বসু-র লেখা ‘শাস্তি শুধু যাত্রীদেরই প্রাপ্য?’ (১৯-৩) প্রবন্ধটি নিয়ে কিছু কথা।

পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের আঁচ সরাসরি এসে পড়েছে আমাদের ভারতীয় হেঁশেলে। জীবনযাত্রা ক্রমশ কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দামবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে চাপে ফেলছে।

নিজেদের ও পরিবারের সচ্ছলতার আশায় যাঁরা বিদেশে গিয়েছেন, তাঁদের অবস্থাও যেন অনিশ্চয়তায় ঘেরা। দিন গোনা ছাড়া তাঁদের সামনে আর কী-ই বা করার থাকে? প্রতি দিনের জীবন যেন এক অদৃশ্য আতঙ্কের সঙ্গে সহাবস্থান। এই পরিস্থিতিতে এই প্রশ্ন জাগে যে— বিশ্বরাজনীতির সংঘাতের বোঝা কি কেবল সাধারণ মানুষকেই বইতে হবে?

গীতিকা কোলে, কলকাতা-৫২

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Respect Caste Discrimination Religious Discrimination Society Gender Discrimination Moral norms

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy