E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: অনন্ত বিভেদনীতি

শ্রীচৈতন্যদেব, রবীন্দ্রনাথ, রামকৃষ্ণদেব, বিবেকানন্দ, নজরুলের বাংলা এখনও কতটা তাঁদের অনুসারী, বাঙালির মনে তাঁদের প্রভাব এখনও কতটা— তারই পরীক্ষা এ বারের নির্বাচন।

শেষ আপডেট: ১৫ মার্চ ২০২৬ ০৫:৫৩

আসুন, এ বার আমরা পশ্চিমবঙ্গের জনগণ একটি চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করি। দেখা যাক, এখনও এই বাংলায় শুভবুদ্ধিসম্পন্ন, বিবেকবান, মানবতার ধ্বজাধারী মানুষ কত জন আছেন, আর অধর্মের বিষে জারিত, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষে সওয়ার ঘৃণার রাজনীতির রথের সারথি কত জন। সেমন্তী ঘোষের প্রবন্ধ ‘ছায়াভূতের ভবিষ্যৎ’ (৮-২) কিন্তু এই প্রশ্নকেই উস্কে দিল।

শ্রীচৈতন্যদেব, রবীন্দ্রনাথ, রামকৃষ্ণদেব, বিবেকানন্দ, নজরুলের বাংলা এখনও কতটা তাঁদের অনুসারী, বাঙালির মনে তাঁদের প্রভাব এখনও কতটা— তারই পরীক্ষা এ বারের নির্বাচন। গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে যে ঘৃণাভাষণ চলছে মাঠে-ময়দানে, সমাজমাধ্যমে, সংবাদমাধ্যমে, এমনকি সংসদ ভবনও যার হাত থেকে রেহাই পায়নি, শেষ পর্যন্ত জয় কি তারই হবে, না কি অন্ধকার সরিয়ে আলো দেখা যাবে বাংলা তথা ভারতের রাজনীতির আঙিনায়?

শুধু নির্বাচনকে পাখির চোখ করার ফলে পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দলও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের বিরুদ্ধে সপাটে নামতে পারছে না। সব সময়ই ভাবছে, তাতে যদি অন্য কেউ রাজনৈতিক সুবিধা পেয়ে যায়! সুবিধাবাদী রাজনীতির এটাই মুশকিল, নির্বাচনে আসন জেতা ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারে না। তাতে যদি সমাজ, দেশ, এমনকি পৃথিবীও চুলোয় যায়, তাতেও যেন কিছু যায় আসে না। বঙ্গবাসী হিসাবে আমাদের দুর্ভাগ্যের সূচনা এখানেই। তাই তো আমাদের মনের ভিতরে জমে থাকা ক্রোধ, ঈর্ষা, জীবনের বহু না-পাওয়াকে উস্কে দিয়ে একমুখী সমাধানের পথ হিসাবে সাম্প্রদায়িকতার রমরমা চলছে। মূল সমস্যাগুলি থেকে সাধারণ মানুষের দৃষ্টি সরিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করার এও এক কৌশল। সাম্প্রদায়িকতার এই বিভাজনে কণ্ঠরোধ হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের বিশ্বমানবতার ধারণার, প্রান্তিক হয়ে যাচ্ছে কাজী নজরুলের ধর্মীয় মিলনের আহ্বান।

ধর্মের বিভাজন ছড়ানোর কারবারিরা জানেন, ধর্মের ভেদাভেদের পরেও পড়ে থাকবে আরও অসংখ্য ভেদাভেদ: জাতপাতের ভেদাভেদ, প্রাদেশিকতার ভেদাভেদ, ভাষার ভেদাভেদ, গ্রাম-শহরের ভেদাভেদ। এর শেষ কোথায়? সাধারণ মানুষ কবে বুঝবেন? আদৌ কি বুঝবেন?

সুরজিৎ কুন্ডু, উত্তরপাড়া, হুগলি

সমাধান নয়

সেমন্তী ঘোষের ‘ছায়াভূতের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক প্রবন্ধটি বর্তমান রাজনৈতিক আবহে অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং চর্চার বিষয়। বিজেপির আমাদের রাজ্যে উত্থানের নেপথ্যে রাজ্য শাসক দলের দুর্নীতি একটি কারণ, এ কথা ঠিক। কিন্তু সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতিই তাদের রাজ্যের প্রধান বিরোধী শক্তি হিসাবে সামনে নিয়ে এসেছে। সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, অর্থাৎ ধর্মকে সামনে রেখে জনমানসে প্রভাব বিস্তার— এই নীতি বা অ-নীতি রাজ্যের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ যতই অপছন্দ করুন না কেন, তার মোকাবিলায় রাজ্য প্রশাসনের অন্যতম অস্ত্র হয়ে উঠেছে ‘নরম হিন্দুত্ব’। অবাঙালিদের বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে দলগত ভাবে অংশগ্রহণ করা বা তার জন্য সরকারি ছুটি ঘোষণায় প্রশাসনের উৎসাহ দেখার মতো।

নরম হিন্দুত্ব যে কোনও সমাধান নয়, তা বোঝা যাচ্ছে ভোটবাক্সের দিকে তাকালেই। নানা অনুদানের মাধ্যমে মানুষকে তুষ্ট রাখা হয়তো দলের বিস্তার ঘটাতে সাহায্য করে, বা চটজলদি সমাধান বলে মনে হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা; মানুষের কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য প্রভৃতি মৌলিক অধিকারের দিকে নজর দেওয়া। মেরুকরণের রাজনীতি সাধারণ মানুষকে তা ভুলিয়ে দিতে বসেছে, পিছনের সারিতে ঠেলে দিচ্ছে বাংলা ও বাঙালির ঐতিহ্যকে।

এমন পরিস্থিতিতে অধর্মের রাজনীতি ও সাম্প্রদায়িকতার এই ছায়াভূতের হাত থেকে মুক্তি পেতে যে প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির উত্থান প্রয়োজন ছিল, তার কোনও লক্ষণই চোখে পড়ে না। রাস্তায় নেমে আন্দোলনে অনীহা বাম দলগুলিকে ক্রমশ মানুষের থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে; দেখা দিচ্ছে অস্তিত্বের সঙ্কট। অন্য দিকে, কংগ্রেসও সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে দু’-একটি জেলায়। গরিব, অসহায় ও বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোই যে প্রকৃত ধর্ম— এই বোধ যদি কোনও রাজনৈতিক দল এখনও দেখাতে পারে, তবে মানুষের আশীর্বাদ তাদের প্রতিই থাকবে। আর সেই আশীর্বাদই ফিরিয়ে আনতে পারে পশ্চিমবঙ্গের হারানো গৌরব।

অশোক দাশ, রিষড়া, হুগলি

বিষবৃক্ষ

সেমন্তী ঘোষের ‘ছায়াভূতের ভবিষ্যৎ’ প্রবন্ধটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। ধর্মীয় বিভাজনের বিষাক্ত হাওয়া ইতিমধ্যেই দেশে তথা পশ্চিমবঙ্গে যে ভাবে পাক খাচ্ছে, তাতে শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি কী আকার ধারণ করতে পারে, তা ভাবলেও শিউরে উঠতে হয়। বাংলায় এই ধরনের লাগামছাড়া সাম্প্রদায়িক কথাবার্তা এর আগে কোনও রাজনৈতিক দলের নেতাদের মুখে শোনা যায়নি।

বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ বঙ্গভাষী মানুষ নিশ্চিত ভাবেই অনেক বেশি উদারমনস্ক। ভাষা-ধর্ম নির্বিশেষে অপরের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন, অসাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন, সকলকে নিয়ে চলতেই তাঁরা অভ্যস্ত। শ্রীচৈতন্যের সময় থেকেই আমাদের বঙ্গভূমি এই ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আমরা অনেকটা পথ হেঁটে এসেছি। অনেক কিছু বদলেছে বটে, কিন্তু কারও স্বাধীন ধর্মাচরণে হস্তক্ষেপ করা, কারও রান্নাঘরে উঁকি দেওয়া, কে কী খাবে সেই বিষয়ে নির্দেশ দেওয়ার মতো যুক্তিহীন দখলদারিতে অধিকাংশ বাঙালি সায় দিতে পারে না।

কিন্তু এখন এক শ্রেণির রাজনীতির কারবারিরা বাঙালিকে জোর করে সেই দিকেই টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। রাজ্যের বাম ও কংগ্রেস যদি নিজেদের শক্তি অটুট রাখতে পারত, তা হলে বাংলার বুকে বসে হিন্দুত্ববাদীরা ধর্ম নিয়ে এমন বিভাজনের সুযোগই পেত না।

বাম ও কংগ্রেসের দ্রুত ক্ষয় রাজ্যে হিন্দুত্ববাদীদের কলেবর বৃদ্ধিতে যথেষ্ট সহায়ক হয়েছে। এর ফলে এক দিকে যেমন সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিষবৃক্ষ পুষ্ট হচ্ছে, অন্য দিকে তেমনই বাঙালির জীবনে বদলের ছায়া। বাম ও কংগ্রেসকে মানুষ বর্জন করেছে বলেই শাসক তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান বিরোধী শক্তি হিসাবে বিজেপি উঠে আসতে পেরেছে। আর তার ফলেই বাংলার রাজনীতি আজ সাম্প্রদায়িক ভাগাভাগি ও ধর্মীয় সঙ্কটের অন্ধ গলিতে ঢুকে পড়েছে। তবে এটাও ঠিক, সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধিতে আচ্ছন্ন কিছু শক্তিকে ভয় পেলে বা প্রশ্রয় দিলে সমস্যা দিনে দিনে বাড়বে ছাড়া কমবে না।

রতন চক্রবর্তী, উত্তর হাবড়া, উত্তর ২৪ পরগনা

উপেক্ষার ফল

ইন্দ্রজিৎ সেনগুপ্তের প্রতিবেদন ‘লজ্জার বিদায়ে প্রশ্নের মুখে অভিমন্যুরা, ইতিহাস নবীদের’ (১৯-২) প্রসঙ্গে কয়েকটি কথা। ক্রিকেট মরসুমের হিসাব-নিকাশ করলে দেখা যাবে, বার বার এক-দু’জন ব্যাটারের উপর ভর করেই বাংলা কোনও রকমে ভদ্রস্থ রান করেছে। বড় দল হিসাবে টিকে থাকার লক্ষ্যে বিভিন্ন রাজ্য থেকে খেলোয়াড় এনে বাংলার ভূমিপুত্রদের উপেক্ষা করেছেন রাজ্যের ক্রিকেটকর্তারা। বাংলার মধ্য থেকেই প্রতিভাবান খেলোয়াড় তুলে আনার কোনও উদ্যোগ আছে? অতীতে দুই বাঙালি খেলোয়াড় অপমানিত হয়ে বাংলা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন— সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে কি তেমন ভাবে প্রতিবাদ উঠেছিল?

একই ছবি দেখা যাচ্ছে বাংলার বয়সভিত্তিক দলগুলিতেও। বাঙালি মুখ সেখানেও যৎসামান্য। এ বছরেও ক্লাব-রাজনীতির কারণে অনেক অযোগ্য খেলোয়াড়কে এক-দু’টি ম্যাচ খেলিয়ে দেওয়া হয়েছে। অন্য রাজ্যের দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা নিজেদের ভূমিপুত্রদের সুযোগ দেয়, ভরসা করে, বছরের পর বছর খেলায়। ফলও পায় কিছু দিনেই।

সমীর দাশগুপ্ত, কলকাতা- ৫৫

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

West Bengal Assembly Election 2026 West Bengal Politics

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy