E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: সূর্য ডোবার পরে

শুধু বিপজ্জনক সমুদ্রসৈকতই নয়, বহু ধারাবাহিক ও সিনেমার শুটিং হয় জঙ্গল ও পাহাড়ি এলাকায়। যতই ‘বাফার’ এলাকায় কাজ হোক না কেন, হাতি, বাইসন, বুনো শুয়োরের মতো আক্রমণাত্মক বন্যপ্রাণ যে কোনও সময় হানা দিতে পারে।

শেষ আপডেট: ০৯ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৩২

অভিনেতা, সাহিত্যিক ও সমাজকর্মী রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের আকস্মিক অকালপ্রয়াণ আসলে রুপোলি পর্দার হাজার ওয়াট আলো-ধোয়া ঝাঁ-চকচকে, চোখধাঁধানো রঙিন পৃথিবীর আড়ালে থাকা এক অপেশাদারিত্ব, অবহেলা, অব্যবস্থা ও বিশৃঙ্খলার জমাট অন্ধকারকেই বেআব্রু করে দিল। প্রকাশ্য দিবালোকে— জনমানুষবিবর্জিত নয়, এমন এক সৈকতের কিনারা-সংলগ্ন জলরাশির মধ্যে ডুবতে থাকা মানুষটিকে বাঁচানো গেল না— এই ঘটনা হতবাক করল। আউটডোর শুটিং-এর স্থান নির্বাচনের সময় সেখানকার পরিবেশ, ভূগোল ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকা ভীষণ জরুরি। তালসারি তো নরম কাদা, চোরাবালি ও চোরাস্রোতের মারণফাঁদ— নৌকা বা বোট ছাড়া সেখানে জলে নামা যায় না, কে না জানেন! সেই মতো পূর্বপ্রস্তুতি ও পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা দায়িত্বপ্রাপ্তরা যথাযথ ভাবে রেখেছিলেন? স্থানীয় প্রশাসন, মৎস্যজীবী ও নুলিয়াদের সংগঠনগুলির কাছ থেকে প্রয়োজনীয় অনুমতি ও ছাড়পত্র নেওয়া হয়েছিল কি? যদি তা হয়ে থাকে, তবে তাঁরা সে দিন প্রহরায় থাকবেন না, এমন তো হওয়ার কথা নয়।

শুধু বিপজ্জনক সমুদ্রসৈকতই নয়, বহু ধারাবাহিক ও সিনেমার শুটিং হয় জঙ্গল ও পাহাড়ি এলাকায়। যতই ‘বাফার’ এলাকায় কাজ হোক না কেন, হাতি, বাইসন, বুনো শুয়োরের মতো আক্রমণাত্মক বন্যপ্রাণ যে কোনও সময় হানা দিতে পারে। তার জন্য বন দফতরের প্রশিক্ষিত কর্মী, কুইক রেসপন্স টিম, চিকিৎসক, অ্যাম্বুল্যান্স— এ সবের যথাযথ ব্যবস্থা থাকে? না কি বাজেটের মুখ চেয়ে পুরো ইউনিটের সুরক্ষার সঙ্গে আপস করা হয়?

পর্দায় বহু শিশু ও বয়স্ক শিল্পীকে দেখা যায়। তাঁদের জন্য অতিরিক্ত সতর্কতা ও যত্ন নেওয়া হয় তো? শিল্পীদের পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পারিশ্রমিক ইত্যাদি নিয়েও নানা গুঞ্জন। এমনিতেই এই পেশা অনিশ্চিত জীবন এবং অননুমেয় মানসিক কষ্টের সৃষ্টি করে। আজ যিনি ধারাবাহিকের প্রধান মুখ, কালই তিনি কর্মহীন হতে পারেন। তার সঙ্গে নির্মাতাদের এ-হেন শীতল আচরণ এই শিল্পের ভবিষ্যতের জন্য ভাল লক্ষণ নয়।

পলাশ মান্না, সবং, পশ্চিম মেদিনীপুর

হারানোর বেদনা

মনখারাপ নিয়েই রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের বন্ধু শুভব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘অশ্রুঝলমল স্মৃতির খোলা চিঠি’ পড়লাম (পত্রিকা, ৪-৪)। জানলাম, আর পাঁচটা ছেলের মতোই এঁরা সাইকেল নিয়ে অভিযানে যেতেন, ফুটবল-ক্রিকেট খেলতেন; কিন্তু লাইব্রেরিতে যাওয়া, লেখার প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করা— এই সবই তাঁদের আলাদা করে তুলেছিল।

অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়, সিনেমার রাহুল, উদীয়মান সূর্যের মতোই নিজের প্রতিভার প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন। ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’য় তাঁর লেখাগুলি একটানে পড়ে ফেলতাম— তা সে সরস্বতী পুজো উদ্‌যাপন নিয়ে হোক বা একই রকম দেখতে মানুষদের নিয়ে। এক লেখায় তিনি লিখেছিলেন, সমাজমাধ্যমে অনিল চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যুদিনের ছবি দেখে তাঁর বাড়িতে ফোন এসেছিল— তিনি ঠিক আছেন কি না জানতে। সেই ঘটনা যে কাকতালীয় ভাবে রূঢ় বাস্তব হয়ে উঠবে, কল্পনা করা যায় না।

তাঁর ওষ্ঠসঞ্চালনে জ়ুবিন গর্গের গাওয়া ‘পিয়া রে, পিয়া রে’ গানটি অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছিল। কাকতালীয় ভাবেই সেই গায়ক ও নায়কের এমন আকস্মিক সলিলসমাধি মেনে নেওয়া যায় না। আমাদের মতো সাধারণ দর্শক-পাঠকেরাও যেন ঘরের ছেলে হারানোর হাহাকার অনুভব করছেন।

শিখা সেনগুপ্ত, বিরাটি, উত্তর ২৪ পরগনা

কেয়ার মতো...

চিরকালের মতো অস্তাচলে চলে গেলেন রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়— ভীষণই অসময়ে। এমন তো হওয়ার কথা ছিল না। হাজারটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে অগণিত ভক্তের মনে। এক জন প্রকৃত ভদ্র, শিক্ষিত, সমাজসচেতন মানুষের এই ভাবে চলে যাওয়া কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না।

অনেক বছর আগের একটি ঘটনা মনে পড়ে। গঙ্গাবক্ষে শুটিং করতে গিয়ে হঠাৎ জলে পড়ে যান তৎকালীন নাট্যজগতের বিশিষ্ট অভিনেত্রী কেয়া চক্রবর্তী। তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে ওঠা নানা বিতর্কের আজও মীমাংসা হয়নি। তখন সংবাদজগতের এত বিস্তার ছিল না, ফলে ধীরে ধীরে তাঁর মৃত্যুর রহস্যও চলে যায় জলের তলায়। এই ঘটনার ক্ষেত্রে যেন সেই পুনরাবৃত্তি না ঘটে।

উপযুক্ত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য সামনে আসুক। কেন এক তরতাজা অভিনেতা তথা সমাজসচেতন মানুষকে এমন অসময়ে চলে যেতে হল— জানুক মানুষ এবং তাঁর পরিবার। তবেই শিল্পীর স্মৃতির প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানো সম্ভব হবে।

সুকুমার মুখোপাধ্যায়, কলকাতা-১৪৯

অসমাপ্ত কথা

এক শাশ্বত ভোরের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন রাহুল ‘যে ভোর চির-অমলিন’ (রবিবাসরীয়, ২১-৯) প্রবন্ধে। অথচ চলে গেলেন অসময়ে। তাঁর সিনেমা বা থিয়েটারের থেকেও তাঁকে আরও কাছ থেকে চিনতে শুরু করি তাঁর লেখা পড়ে, আর ‘সহজ কথা’ শুনে। সেখানে ভালবাসা, শ্রদ্ধা আর খানিকটা নিজের না-পারার বেদনা মিশে থাকত।

রাহুল চলে গেলেন। ফলে পাঠকদের ইন্দ্রদা আর ভারতীদির গল্প আর শোনা হবে না, শ্রাবণীর কথা কেউ লিখবে না আর। কেউ স্মৃতি খুঁড়ে লিখবে না— পুচু আর নেই। আমরা সবাই ছিটকে গেছি। কিন্তু এটাও সত্যি, আমরা এক সঙ্গে ছিলাম।

বুকপকেটে আনন্দ রাখার মানুষ ছিলেন রাহুল। ব্যক্তিগত জীবনে উত্থান-পতন দেখেছেন, তবু মানুষের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল আলাদা। লেখার মধ্যে ছিল এক সাবলীল সত্তা— আবেগ আর অতীতের মিশেলে গড়া। সেই মানুষটিই তো লিখতে পারে— “আজ হোক না রং ফ্যাকাশে, তোমার আমার আকাশে।” জীবন নিয়ে তাঁর নিজস্ব দর্শন ছিল। সে কথাও লিখেছিলেন, তারাপদ রায়ের পঙ্‌ক্তি উদ্ধৃত করে—“...হয়ত জানা যাবে না/ যে/ তোমার সঙ্গে আমার/ অথবা/ আমার সঙ্গে তোমার/ আর দেখা হবে না।” সেই কথা সত্যি হবে, যাত্রা যে এ ভাবে হঠাৎ থেমে যাবে, কেউ ভাবেনি। সহজ কথার আসরে ভাল থেকো তুমি, রাহুল।

তন্ময় কবিরাজ, রসুলপুর, পূর্ব বর্ধমান

উদয়ের পথে

জনপ্রিয় অভিনেতা ও লেখক রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের আকস্মিক প্রয়াণে আমরা মর্মাহত হলাম। এই একটি মৃত্যু কিন্তু অনেক প্রশ্নের সামনে আমাদের দাঁড় করিয়ে দিল। মৃত্যু তো এক নিমেষে শূন্যতা তৈরি করে, তার পর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নানা ঘটনা ঘটে এবং অনেক ক্ষেত্রেই সেই শূন্যতার বোধ চাপা পড়ে যায়। সময় এগিয়ে চলে ঠিকই, কিন্তু মানুষের মনের সংবেদনশীলতা কি এ ভাবেই হারিয়ে যাবে?

এই মুহূর্তে মনে পড়ছে রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা প্রবন্ধ ‘যে ভোর চির-অমলিন’। কী অসাধারণ অনুভূতির প্রকাশ ছিল সেখানে! শুধু সাবলীল অভিনয়ই নয়, তাঁর সাবলীল লেখাও মানুষের ভালবাসা কুড়িয়েছে— আমার মতো অনেক পাঠককেই মুগ্ধ করেছে।

খুব ব্যথিত মনেই এই খোলা চিঠি লিখছি। জনপ্রিয় অভিনেতা, সুলেখক এবং ‘সহজ কথা’র উপস্থাপকের এমন আকস্মিক প্রয়াণ বিশ্বাস হয় না। পুলিশ, প্রশাসন, প্রযোজনা সংস্থা এবং সমস্ত কলাকুশলীর পারস্পরিক সহযোগিতায় ঠিক তদন্ত হোক, যাতে প্রকৃত ঘটনাটি সকলের সামনে আসে। মনের সংশয় দূরে সরিয়ে সকলের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসেই এক নতুন অরুণোদয়ের প্রভাত আসুক— সেটাই প্রত্যাশা।

সোমা বিশ্বাস, কলকাতা-৭৬

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Rahul Arunoday Banerjee Tollywood Industry

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy