‘সেই আর জি কর, লিফ্টে থেঁতলে মারা গেলেন যুবক’ (২২-৩)— শিউরে ওঠার মতো এই প্রতিবেদন পড়ে সাধারণ মানুষের মনে কী প্রতিক্রিয়া জন্মায়? কোন আশায় তাঁরা মুমূর্ষু আত্মীয়কে নিয়ে ছুটবেন সরকারি হাসপাতালে, যেখানে বার বার পরিকাঠামোগত বিপর্যয় ঘটে, এবং যথাযথ পরিষেবা পাওয়ার আশায় গিয়েও মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয়?
এক হৃদয়বিদারী সমাপতন চোখে পড়ল। চল্লিশতম জন্মদিনেই মৃত্যুপথযাত্রী হলেন দক্ষিণ দমদমের বাসিন্দা অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়। বাবার জন্মদিনে কেক কাটার সময় ছেলে আরুষ খেলতে গিয়ে পড়ে যায়, ডান হাত ভেঙে যায় তার। পড়ে থাকে পায়েসের বাটি। ছেলের চিকিৎসার জন্য দম্পতি ছুটে যান আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে— ভাগ্যের পরিহাসে ফিরে এল অরূপের নিথর দেহ।
প্রতি দিন, অহরহ নানাবিধ অপরাধ ও অব্যবস্থার ঘটনাকে মেনে নিয়েই বেঁচে থাকেন সাধারণ মানুষ, নাগরিক সমাজ। প্রতিবাদ উঠতে না উঠতেই তা দমন করার প্রবণতা এখন খুবই স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছে। মানবিক বোধসম্পন্ন মানুষ গুমরে মরেন, সীমিত ক্ষমতায় তাঁরা চিৎকার করেন, কিন্তু কোনও সুরাহা মেলে না।
নিজের জন্মদিনেই লিফ্টে আটকে থেঁতলে প্রাণ হারালেন অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়। যাঁরা চলে যান, তাঁরা আর ফেরেন না; রেখে যান বৃদ্ধ বাবা-মা, স্ত্রী, সন্তানকে। অসুস্থতার কারণে মৃত্যু হলে মনকে তাও কোনও মতে সান্ত্বনা দেওয়া যায়, কিন্তু এ ধরনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানোর যন্ত্রণা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। বিস্ময়ে স্তম্ভিত হয়ে ভাবতে হয়— আধুনিক প্রযুক্তির এই যুগেও এমন ঘটনা কী করে ঘটে? আর কত নিরপরাধ মানুষের প্রাণ এ ভাবে ঝরে যাবে? হয়তো প্রশাসনিক তৎপরতায় অরূপের স্ত্রীর একটি চাকরির ব্যবস্থা হবে, এককালীন আর্থিক সহায়তা মিলবে, সন্তানের শিক্ষার দায় নেবে প্রশাসন। কিন্তু এই অপূরণীয় ক্ষত কি কোনও দিন ভরাট হবে? সময়ের ওষুধেরও সেই ক্ষমতা নেই।
ধ্রুবজ্যোতি বাগচী, কলকাতা-১২৫
শাস্তি চাই
‘হাসপাতালে ছিলেন না লিফ্টকর্মীরা’ (২২-৩) শীর্ষক প্রতিবেদন প্রসঙ্গে কিছু কথা। আর জি কর রাজ্য সরকারের অন্যতম নামী ও প্রাচীন হাসপাতাল। আবার কোনও আধাশহর বা গ্রামেও নয়— এর অবস্থান রাজ্যের রাজধানী খাস কলকাতার বুকে।
এমন একটি হাসপাতালে প্রশাসনিক অব্যবস্থা যে কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে, তা সকলের কাছে স্পষ্ট। বছর দেড়েক আগে এক চিকিৎসক-পড়ুয়ার ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার পরেও হাসপাতালের চেহারার সামান্যতম পরিবর্তন ঘটেনি। সাম্প্রতিক লিফ্ট-কাণ্ড সেই বাস্তবতাকেই আবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।
প্রয়োজনীয় সময়ে লিফ্টগুলির দেখাশোনার জন্য কর্মী না থাকার দায় কার? নিঃসন্দেহে আর জি কর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের, এবং লিফ্টগুলির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট কর্মী ও আধিকারিকদের। যাঁদের নজরদারির অভাব ও অব্যবস্থার কারণে হাসপাতালের মধ্যে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে, এবং একই প্রতিষ্ঠানে তা বার বার ঘটছে— তাঁদের দায় কি কোনও ভাবেই এড়ানো যায়?
আমার অনুরোধ: আর জি কর লিফ্ট-কাণ্ডে শাস্তিদানের ক্ষেত্রে যেন কোনও রকম শৈথিল্য না দেখানো হয়। জড়িত সকলের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই এখানে একমাত্র প্রাপ্য। তা না হলে সমাজের উপর এর বিরূপ প্রভাব পড়বে, এবং সকলের চোখে আমাদের রাজ্যের মান আরও নেমে যাবে— এই আশঙ্কাই জোরালো হয়।
তাপস সাহা, শেওড়াফুলি, হুগলি
নারীর সিদ্ধান্ত
‘গর্ভপাত: মহিলার ইচ্ছাতেই সায় সুপ্রিম কোর্টের’ (৭-২) শীর্ষক প্রতিবেদন প্রসঙ্গে বলতে চাই, আন্তর্জাতিক আইনের ব্যাখ্যায় সাধারণত নারীর জীবন, মর্যাদা ও শরীরের উপর তার নিজের অধিকারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়— এই নীতিকেই সুপ্রিম কোর্টের রায় সমর্থন করেছে।
যথাসময়ে মাতৃত্ব এক জন নারীর কাছে অতীব আনন্দের, সেই সঙ্গে গর্বেরও। কিন্তু অবাঞ্ছিত, অপ্রত্যাশিত গর্ভধারণ যখন নারীর নিজের জীবনকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়, বা সেই গর্ভধারণে তাঁর জীবন বিপন্ন হয়, তখন গর্ভপাতের মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার অবশ্যই তাঁর থাকা উচিত।
পুরুষশাসিত সমাজে নারীর গর্ভধারণ ও গর্ভপাতের প্রশ্নে তাঁকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখাই যেন দস্তুর, এবং সেই ভাবনাতেই বিষয়টি পরিচালিত হয়। বিষয়গুলিতে অজ্ঞতার কারণে আইন তার জায়গাতেই থেকে যায়; বাস্তবের রূঢ় জমিতে তার প্রয়োগ ঘটে না বলেই অনিচ্ছাসত্ত্বেও বহু নারীকে গর্ভধারণজনিত জটিলতায়, ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভাবস্থা বহন করতে গিয়ে অথবা সন্তান জন্মদানের সময় মৃত্যুবরণ করতে হয়। যে ভ্রূণের গর্ভপাত করালে নারী সুস্থ-স্বাভাবিক ভাবে বেঁচে থাকতে পারতেন, তাঁকেই অনেক ক্ষেত্রে বাধ্য করা হয় জটিল গর্ভাবস্থা সম্পূর্ণ করতে। ফলে মাতৃমৃত্যুর ঘটনাও ঘটে।
আলোচ্য ক্ষেত্রেও মেয়েটি নাবালিকা অবস্থায় গর্ভবতী হয়। বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে, যখন মেয়েটি তার গর্ভাবস্থা সম্পূর্ণ করতে ইচ্ছুক নয়, তখন তার ইচ্ছাকেই গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বিচারপতির মন্তব্যটি তাই বিশেষ ভাবে স্মরণীয়— আমরা কার স্বার্থ সুনিশ্চিত করতে চাইছি? না-জন্মানো শিশুর, না কি যিনি তাকে ধারণ করছেন তাঁর?
এ ক্ষেত্রে মেডিক্যাল বোর্ড জানিয়েছে, অস্ত্রোপচার করে গর্ভপাতে কোনও ঝুঁকি নেই। তবে সবারই মনে রাখা প্রয়োজন, নাবালিকার গর্ভধারণ, গর্ভপাত কিংবা গর্ভাবস্থা সম্পূর্ণ করে মা হওয়া— কোনওটিই কাম্য নয়। এতে মা ও সন্তানের উভয়ের জীবনেই ঝুঁকির সম্ভাবনা বেশি, এবং সামাজিক ক্ষতিও অনিবার্য।
সমাজের একটি বৃহৎ অংশে এখনও নারীকে শুধুমাত্র সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র হিসাবেই দেখা হয়। পুত্রসন্তান জন্ম দিতে না-পারা পর্যন্ত নারীকেই দোষারোপ করা হয়, এবং এখনও, কন্যাভ্রূণ হত্যার অভিপ্রায়ে আইনের তোয়াক্কা না করে জোরপূর্বক ভ্রূণের লিঙ্গ জানার চেষ্টা করা হয়। নারীর শরীরের কথা না ভেবে বারংবার গর্ভধারণে বাধ্য করা হয় পুত্রসন্তানের আশায়।
চন্দনা মুখোপাধ্যায়, কৃষ্ণনগর, নদিয়া
অদ্ভুত নিয়ম
ইদানীং প্রায়ই শুনতে পাই, মানুষ পুস্তক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। আজকাল কেউ গ্রন্থাগারে যায় না। তাই জেলায় জেলায় অবস্থিত লাইব্রেরিগুলো পাঠকাভাবে ধুঁকছে বা উঠে যাচ্ছে। মুঠোফোন পড়ার অভ্যাস গ্রাস করে নিচ্ছে।
আমি আমার একটি অভিজ্ঞতার কথা বলি। আমার বাড়ির অত্যন্ত কাছের একটি গ্রন্থাগারে সদস্যপদ গ্রহণ করার জন্য গিয়েছিলাম। সেখানে এক জন কর্মী ছিলেন। তিনি জানান যে, বিভিন্ন প্রমাণপত্র লাগবে। আমি জানাই— নিশ্চয়ই দেব। এর পর আসল কথাটি সামনে আসে। তিনি বলেন, এক জন ব্যক্তির সাক্ষ্য প্রয়োজন, যিনি উক্ত গ্রন্থাগারের সদস্য এবং আমাকে ব্যক্তিগত ভাবে চেনেন।
এখানেই আমি বেশ সমস্যায় পড়ে গেলাম। এমন কোনও ব্যক্তি তো আমার সন্ধানে নেই। এর আগে আমি চুঁচুড়া জেলা সদর লাইব্রেরি এবং পুরুলিয়া জেলা লাইব্রেরির সদস্য ছিলাম। কাজেই লাইব্রেরির নিয়মকানুন আমার অজানা নয়। এ কি কোনও নতুন নিয়ম— আমি জানতে চাই। সে ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে নতুন সদস্যপদ গ্রহণ করা কারও পক্ষে হয়তো আর সহজে সম্ভব হবে না। না কি শুধুমাত্র পরিচিত মানুষের মাধ্যমেই সদস্যপদ প্রাপ্তি সম্ভব হবে? এই সমস্যার কি আদৌ কোনও বাস্তবসম্মত সমাধান আছে? যদি থাকে, আমি অন্তত খুব উপকৃত হব।
কাকলি কারক, মানকুন্ডু, হুগলি
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)