E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: নির্বাচনের পরিবেশ

রক্তপাতশূন্য ভোটের আয়োজন এ রাজ্যে সোনার পাথরবাটি-সম। ভোট-পরবর্তী হিংসায়ও বহু কর্মী ঘরছাড়া হন। বহু মায়ের কোল খালি হয়, কেউ তাঁর স্বামী বা বাবাকে চিরতরে হারিয়ে ফেলেন নির্বাচন পর্বেই।

শেষ আপডেট: ২০ এপ্রিল ২০২৬ ০৭:২৪

দু’দফায় রাজ্য বিধানসভা ভোটের নির্ঘণ্ট প্রকাশিত হয়ে গিয়েছে। রাজ্য জুড়ে নির্বাচনী প্রচার, প্রতিশ্রুতি, কটূক্তি, অপশব্দ প্রয়োগ, হিংসা, পোস্টার ছেঁড়া, ‘জয় শ্রীরাম’-এর পরিবর্তে ‘জয় বাংলা’ প্রতিহুঙ্কার, বোমা, মতান্তরে আতশবাজি ফাটার ফলিত চর্চা চলছে। এমনিতে গত নভেম্বর থেকে এসআইআর ঘিরে উৎকণ্ঠা রাজ্যবাসীর সব মৌলিক সমস্যা শুষে নিয়েছে। আসন্ন নির্বাচনেও জনসাধারণের সমস্যা আলোচনার কেন্দ্রে আসার সম্ভাবনা কম। পরিবর্তে মেরুকরণের পাল্টা তোষণ সংস্কৃতি, গঙ্গা আরতি বনাম জগন্নাথ মন্দির, লক্ষ কণ্ঠে গীতাপাঠ বনাম দুর্গা মণ্ডপ বা মহাকাল মন্দির ঘিরে তুলনামূলক আলোচনা অবশ্যম্ভাবী। নিশ্চিত ভাবে পিছনের সারিতে থাকছে রাজ্য সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী রাজ্যের কয়েক হাজার স্কুলে পড়ুয়া না থাকা, এক জন শিক্ষক নিয়ে কয়েকশো স্কুল চলা বা বহু স্কুল বন্ধের পরিসংখ্যান। ঊহ্য থাকছে মিড-ডে মিল প্রকল্পে বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া, ক্রমবর্ধমান স্কুলছুট, উচ্চ শিক্ষায় আগ্রহ হারানো, পরিযায়ী শ্রমিকের পাল্লা ভারী, নাবালিকা বিবাহ, নারী পাচারের উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান। কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি আজ আর কোনও বিষয় নয়, দুর্নীতির অভিযোগে জেল খাটা প্রাক্তন মন্ত্রীর পুনরায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে অসুবিধা হয় না। ভোটের আলোচনায় কর্মসংস্থান, পরিবেশ নিয়ে আজ আর গুরুতর আলোচনা হয় না। পক্ষান্তরে ভাতের চেয়ে ভাতা আজ ভোটের ময়দানে ভীষণ প্রাসঙ্গিক।

রক্তপাতশূন্য ভোটের আয়োজন এ রাজ্যে সোনার পাথরবাটি-সম। ভোট-পরবর্তী হিংসায়ও বহু কর্মী ঘরছাড়া হন। বহু মায়ের কোল খালি হয়, কেউ তাঁর স্বামী বা বাবাকে চিরতরে হারিয়ে ফেলেন নির্বাচন পর্বেই। আধা সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি সত্ত্বেও হানাহানি সংখ্যার বিশেষ পরিবর্তন ঘটে না। রাজনীতি সচেতন জাতি হিসেবে বাঙালির আত্মশ্লাঘার আদৌ কি কোনও ভিত্তি আছে? এসআইআর দিয়ে ভোট-পর্বের যে নান্দীমুখের সূচনা, এফআইআর দিয়ে যেন এই গণতন্ত্রের পুজোর সমাপ্তি না ঘটে।

রাজশেখর দাশ, কলকাতা-১২২

উন্নয়ন কই

সমাজব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটতে বা ঘটাতে পারার আগে পর্যন্ত প্রান্তিক মানুষের উন্নয়ন বলতে কী বুঝি? মোটামুটি ভাবে বলা যেতে পারে, উন্নয়ন বলতে জীবনযাত্রার উন্নয়ন। তা দুই ভাবে ঘটে। প্রথমত, যিনি যে পেশাতে ছিলেন, সেই পেশার পরিসর বৃদ্ধি, আয়বৃদ্ধি, পেশাগত নিরাপত্তা ও আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি। আর দ্বিতীয়টি, যিনি একটি পেশার মাধ্যমে উপার্জন করেন, বা সেই পেশাটিকে বেছে নিতে বাধ্য হন, তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের সামনে সেই বাধ্যবাধকতার পরিবর্তে পেশা বেছে নেওয়ার সুযোগ বৃদ্ধি। পরবর্তী প্রজন্ম যদি সামাজিক সম্মানের দিক থেকে তুলনামূলক ভাবে উচ্চতর পেশায় যেতে পারেন, তাকেও উন্নয়ন হিসেবে দেখা যায়। যিনি দিনমজুরের কাজ করেন, তাঁর সন্তান যদি লেখাপড়া শিখে প্রাথমিক শিক্ষক হন, তা উন্নয়ন বইকি।

ভোটের আগে এই কথা কেন? কথাটা এ জন্যই, কেননা, তথাকথিত সম্মানজনক পেশায় যুক্ত মানুষজনের মুখে ভোটের আগে যা মতামত শোনা যায়, তার সঙ্গে প্রান্তিক মানুষের বাস্তবতার ঢের অমিল। এবং সেই অমিল, প্রতি বারই, প্রকাশ পায় ভোটের ফলে। ভোটের দিন ও তার অব্যবহিত আগে বা পরে রাজনৈতিক হিংসা ও ভয় দেখানো এই রাজ্যের ভোটের প্রায় অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু শুধুই কারচুপি করে বা ভয় দেখিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকা যায় না। সুতরাং, এটুকু বলা যেতেই পারে যে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতি এই রাজ্যের মানুষের একটা বড় অংশের সমর্থন রয়েছে, বিশেষত রাজ্যের তথাকথিত প্রান্তিক মানুষের।

কিন্তু প্রশ্নটা হল, এই প্রান্তিক শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করার মাধ্যমে সরকারে আসীন দলটি সংশ্লিষ্ট শ্রেণির উন্নয়নের জন্য ঠিক কী করছে? রাজ্য ও কেন্দ্র উভয় সরকারেরই বিভিন্ন ধরনের ভাতা চালু হয়েছে। এ সব হল ‘ইন্টেরিম রিলিফ’, যা অল্প সময়ের জন্য স্বস্তি দিতে পারে। তবু ভাতা-মডেলের প্রসার বেড়ে চলেছে। কেন?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে, রাজ্যের রাজনীতিতে সংখ্যার হিসেবে ভদ্রলোক-শ্রেণির প্রান্তিক হয়ে যাওয়ার তাৎপর্য বোঝাটা জরুরি। আজ যাঁরা তথাকথিত ভদ্রলোক শ্রেণিভুক্ত, হয়তো এক কি দুই প্রজন্ম আগেও, তাঁদের অনেকেই, উচ্চ-মধ্যবিত্ত তো দূর, মধ্যবিত্তও ছিলেন না। অথচ, এঁদেরই সন্তানরা সরকারি স্কুলে বিনাপয়সায় পড়ে কেউ শিক্ষক হয়েছেন, কেউ অধ্যাপক, কেউ বা ডাক্তার। এমনটা হলে তা আশেপাশের আরও অনেককে লেখাপড়ায় মন দিতে অনুপ্রাণিত করে। এই পথ বন্ধ হয়ে গেলে, আর্থসামাজিক শ্রেণিও জলচলহীন বর্ণাশ্রম ব্যবস্থায় পরিণত হয়, যা এই রাজ্যে হয়েছে। সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা ভগ্নপ্রায় হয়ে পড়ছে। সবাই জানে যে পড়লেও চাকরি নেই, বরং ‘যুবসাথী’-র ভাতা তো আছে। স্বাস্থ্য, কৃষি ইত্যাদি সব ক্ষেত্রেই এ ধরনের উদাহরণ রয়েছে।

শ্রেণি-উন্নয়নের পথ বন্ধ করে পিছিয়ে-থাকা শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করে নির্বাচনী সাফল্য রাজনৈতিক দলের পক্ষে আকর্ষণীয় মডেল হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এ এক বিপজ্জনক পরিকল্পনা। দুর্ভাগ্য আমাদের, রাজ্যের নির্বাচনী তরজায় এক দিকে এই পরিকল্পনা আর অপর দিকে ধর্মীয় বিভাজন ও প্রান্তিক মানুষকে নির্বাচনী হিসাবনিকাশের বাইরে রেখে দেওয়ার ভয়ঙ্কর পরিকল্পনা। এর বাইরে অন্য কণ্ঠ যা কিছু রয়েছে, ভোট-রাজনীতির জটিল অঙ্কে তা এতই মৃদু যে তা কোনও শ্রেণিরই কর্ণগোচর হচ্ছে না।

বিষাণ বসু, কলকাতা-৯৯

দায়বদ্ধতা

নাগরিক পরিসরে রাজনৈতিক দলগুলোর পরিবেশ সম্বন্ধে দায়বদ্ধতা নিয়ে সম্পাদকীয় ‘সভা ও সভ্যতা’ (২১-৩) খুবই প্রাসঙ্গিক। কোনও জনসভার পর মানুষের ব্যবহৃত প্লাস্টিকের থালা, বোতল, কাপ, ছেঁড়া কাগজ বা ফেস্টুন যে ভাবে সংশ্লিষ্ট সভাস্থলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকে, তা এক দিকে যেমন দৃষ্টিকটু, অপর দিকে পরিবেশের প্রতি সংশ্লিষ্ট দলের সামাজিক দায়বদ্ধতার অভাবেরও ইঙ্গিতবাহী। প্রত্যেক দলই এই নির্বাচনী যুদ্ধে নিজেদের দল বা প্রার্থী সম্বন্ধে সচেতনতার বিজ্ঞাপনে ভুলিয়ে রাখবে মানুষকে। অথচ নির্বাচন মিটে যাওয়ার পর এরাই বেমালুম ভুলে যাবে পরিবেশ ও চার পাশকে দৃষ্টিনন্দন করে তোলার স্বার্থে নির্বাচন-পূর্ববর্তী অবস্থায় দেওয়ালগুলি ফিরিয়ে দিতে বা প্রচারে ব্যবহৃত সরঞ্জাম সরিয়ে নিতে। অবশ্য রাজনৈতিক দলগুলো যদি সত্যিই পরিবেশ সম্বন্ধে সচেতন হত, তবে তাদের নির্বাচনী ইস্তাহারে পরিবেশ সম্বন্ধে এমন কোনও বক্তব্য থাকত, যা উৎসাহিত করতে পারে জনগণকে।

তবে ব্যতিক্রমী ঘটনার কথাও মনে পড়ে। সম্ভবত ২০২৪ সালে সিপিএমের যুব সংগঠনের ব্রিগেডে সভার পরের দিন, সেই সংগঠনের নেতৃত্ব হাত লাগিয়েছিলেন ব্রিগেডের আবর্জনা পরিষ্কার করতে, যা দৃষ্টান্ত হিসেবেই দেখা উচিত। মনে হয়, এ বার নির্বাচন কমিশনের ভাবার সময় এসেছে, দেওয়াল লেখার জন্য সংশ্লিষ্ট দেওয়ালের মালিকের লিখিত আগাম অনুমতি এবং নির্বাচন মিটে যাওয়ার পর দেওয়াল আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দিয়ে সেই মালিকের কাছ থেকে স্বীকৃতিপত্র নিয়ে কমিশনে জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা। নির্বাচনী ফেস্টুন ও হোর্ডিং টাঙানোর ক্ষেত্রেও একই রকম ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। তবেই নির্বাচন সর্বাত্মক ভাবে সফল হবে।

অশোক দাশ, রিষড়া, হুগলি

হিন্দিতে কেন

বেশির ভাগ বাংলা সিরিয়ালে অভিনেতা অভিনেত্রীরা কথা বলেন বাংলা ভাষায়, কিন্তু গান করেন হিন্দিতে। এমনটা কেন হচ্ছে? বাংলা গান কি কম পড়েছে?

শিবনাথ মুখোপাধ্যায়, নিমেরহাটি, হাওড়া

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Political parties West Bengal Politics

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy