Advertisement
E-Paper

সতী হওয়া যখন নারী-অধিকার

রক্ষণশীল হিন্দুদের কঠোর ধর্মীয় বিধি থেকে মেয়েদের বার করার জন্য রামমোহন, বিদ্যাসাগরকে প্রতি মুহূর্তে আক্রমণের মুখে পড়তে হয়েছিল।

আফরোজা খাতুন

শেষ আপডেট: ১৮ মে ২০১৯ ০০:০২

ভারতীয় জনতা পার্টির কর্মী-সমর্থকরাই কি বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙল? এখনও নিশ্চিত নয়। কিন্তু তারাই যদি ভেঙে থাকে, বিজেপির মহিলা সদস্যরা লজ্জা পাবেন না। আপনারা তো চাননি সনাতন হিন্দু ধর্মের সংস্কার। সতীদাহ বন্ধ, বিধবার বিয়ে, স্ত্রীশিক্ষা চালু, বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ রোধ, বিবাহবিচ্ছেদ চালু, পৈতৃক সম্পত্তিতে মেয়েদের অধিকার, এ সব আপনারা চেয়েছিলেন কি? রক্ষণশীল হিন্দুদের কঠোর ধর্মীয় বিধি থেকে মেয়েদের বার করার জন্য রামমোহন, বিদ্যাসাগরকে প্রতি মুহূর্তে আক্রমণের মুখে পড়তে হয়েছিল। তারও পরে, স্বাধীন ভারতে হিন্দু নারীদের আইনি অধিকার দেওয়ার বিরোধিতা করেছিল হিন্দু মৌলবাদ। প্রসঙ্গত, হিন্দু-কোড বিলের আগে ‘রাও বিল’ নামে একটা বিল পার্লামেন্টে পাশ হয়েছিল? তাতে নারীর অধিকার ছিল সঙ্কুচিত।

পরে এল হিন্দু কোড বিল। এই বিলে বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ বন্ধ ও বিবাহবিচ্ছেদের কথা আসে। আর আসে পৈতৃক সম্পত্তিতে মেয়েদের অধিকারের কথা। হিন্দু কোড বিলের সমর্থনে কমিউনিস্ট পার্টির পার্লামেন্ট সদস্য রেণু চক্রবর্তীর নেতৃত্বে স্বাক্ষর সংগ্রহ চলে পার্লামেন্টে পাঠানোর জন্য। কাজটা সহজ হয়নি। কারণ, বিলের বিরোধিতায় যাঁরা নেমেছিলেন, তাঁদের অন্যতম শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও তাঁর হিন্দু মহাসভা। এই

বিল পার্লামেন্টে যাতে পাশ করানো যায় তার চেষ্টায় রেণু চক্রবর্তী, মণিকুন্তলা সেনরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে বুঝিয়ে স্বাক্ষর সংগ্রহ করেন। এই কর্মসূচির শেষ পর্যায়ে তাঁরা একটি সভা আয়োজন করেন ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হল-এ। স্থির হয়, প্রধান বক্তা হবেন সরোজিনী নাইডু, সভামুখ্য প্রভাবতী দেবী সরস্বতী।

দিল্লি দখলের লড়াই, লোকসভা নির্বাচন ২০১৯

সভার দিন আয়োজকরা ইনস্টিটিউট হল-এর সামনে এসে দেখেন, অনেক আগেই মানুষে ভর্তি হয়ে গিয়েছে চার দিক। মঞ্চে বসে আছেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও তাঁর সঙ্গীরা। গ্যালারি জুড়ে ঘোমটা-টানা অবাঙালি মহিলা। হিন্দু কোড বিল সমর্থকদের আয়োজিত মঞ্চ সে দিন হিন্দু মহাসভা দখল করেছিল। কমিউনিস্ট নেত্রী মণিকুন্তলা সেন তাঁর জনজাগরণে নারীজাগরণে বইতে লিখেছেন, ‘‘শ্যামাপ্রসাদকে বললাম, এটা তো আমাদের ডাকা সভা, মিসেস নাইডু এসেছেন বক্তৃতা করতে। উনি বললেন, ‘বেশ তো করুন না মিটিং।’... কোনও রকমে মিসেস নাইডুকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে আমরা তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে রইলাম। মিসেস নাইডুর কম্বুকণ্ঠ ডুবে গেল সভাস্থ লোকের হল্লায়। খানিকক্ষণ বলার বৃথা চেষ্টা করে তিনি বসে পড়লেন। এই মিটিং আমরা করতে পারব না বুঝে বিশেষ অতিথিদের নিয়ে পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে এলাম।’’

পরে আয়োজকরা জানতে পারেন, শ্যামাপ্রসাদের দল প্রচার করেছিল, সব হিন্দুকে মুসলমান করে দেওয়ার আইন হতে চলেছে। তাকে বন্ধ করার জন্য হলে উপস্থিত থাকতে হবে। পাথুরিয়াঘাটার মহিলারা হিন্দু সভার পাঠানো গাড়িতে এসে ঘিরে ফেলা হল। তাঁদের নাকি দু’টাকা করে দেওয়াও হয়েছিল। আজ বিদ্যাসাগরের মূর্তির উপর আক্রমণ করে কোন দুর্জয় ঘাঁটি জয় করতে চান আপনারা? বিশ্ব হিন্দু পরিষদের ফতোয়া অনুসারে, ‘শাঁখাসিঁদুরের সংস্কৃতি’ ফিরিয়ে আনতেই কি এই প্রচেষ্টা? মেয়েদের ‘লাভ জেহাদ’ থেকে বাঁচানোর সতর্ক প্রহরা? মেয়েদের মাতৃত্বে সীমাবদ্ধ করে রাখার লক্ষ্মণ-গণ্ডি?

আপনারা এর পরেও নারীর অধিকার নিয়ে কথা বলেন? মুসলিম মেয়েদের অধিকার পাইয়ে দেওয়ার জন্য মাননীয় মোদীজির মতো আপনারা পথে নেমেছেন দেখতে পাই। অধিকার-সচেতনতা না থাকলে কেউ অধিকার আদায়ের লড়াই করতে পারে না। যে দলের ভিত্তি তৈরি লিঙ্গবৈষম্যের ওপর, সেই দলে বিশ্বাস রেখে নারীর অধিকার নিয়ে কথা বলেন? হিন্দু মহিলাদের অধিকার আইন (হিন্দু কোড বিল) তৈরিতে যাঁরা বাধা দিয়েছিলেন আজ তাঁদের সারিতে দাঁড়িয়ে, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের আদর্শ শিরোধার্য করে মুসলিম মেয়েদের অধিকারের কথা বলাটা কি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নয়?

বিজেপির নির্বাচনের প্রচারে এসেছে মৌখিক তালাক বন্ধের কথা। ভোটের প্রয়োজন আর বিভাজন নীতিতে আস্থা রেখেই মুসলিম মেয়েদের আইনি অধিকারের দাবিগুলোতে আপনারা মনোযোগী। মুসলিম মেয়েদের মুশকিলের আসান একমাত্র বিজেপি, সেটাই আপনারা প্রচার করেছিলেন। কিন্তু কী দেখা গেল? লিঙ্গসাম্যের দাবি নিয়ে মুসলিম মেয়েদের যে আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে, সেই আন্দোলনকে গ্রাস করতে নামল বিজেপি সরকার ও দল। মোদী সরকার তৈরি করল লিঙ্গবৈষম্যে বোনা ‘মুসলিম তালাক বিল’।

আপনারা প্রশ্ন করুন, হিন্দু রাষ্ট্রে আপনাদের অবস্থা কী হবে? পারবেন তো হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী পিতৃতন্ত্রের বেড়ি পরে আদর্শ সতী-সাধ্বী, গৃহলক্ষ্মীর ভূমিকায় ফিরে যেতে? ১৯৮৭ সালে রূপ কানোয়ারের সতী হওয়ার ঘটনার পর বিজেপি নেতা কল্যাণ সিংহ বলেছিলেন, সতী হওয়া নারীর অধিকার। এই ‘অধিকার’ আপনারাও হয়তো সমর্থন করেন। নইলে বিজেপির ছাতার তলায় যাবেনই বা কেন? আপনাদের দল বিদ্যাসাগর, রামমোহনের মূর্তি ভাঙলে তাই অবাক হই না।

বিদ্যাসাগর কলেজে বিদ্যাসাগরের মূর্তি যদি ভেঙে থাকে বিজেপি দলের সমর্থকরা, তা হলে আপনাদের তরফ থেকে ভুল কিছু করেননি। সমাজ-সংস্কারক, দেশপ্রেমিকদের মূর্তি ভাঙবেন, বেত মারবেন এটা আপনাদের পরম্পরা। তৎকালীন উপাচার্য শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নির্দেশে বিদ্যাসাগর কলেজের এক ছাত্রকে বেত মারা হয়েছিল। কারণ সামরিক শিক্ষার অঙ্গ হিসেবে ব্রিটিশ পতাকা ইউনিয়ন জ্যাককে কুর্নিশ করা বাধ্যতামূলক করেছিলেন শ্যামাপ্রসাদ, কিন্তু সেই ভারতীয় ছাত্রটি ব্রিটিশ পতাকাকে কুর্নিশ করতে চাননি। বহিষ্কার করেন ওই কলেজের দুই ছাত্রকেও। কলকাতার ছাত্রসমাজ সে দিন শ্যামাপ্রসাদ-বিরোধী আন্দোলনে গর্জে উঠেছিলেন। চাপের মুখে তিনি প্রত্যাহার করেন এই ভ্রষ্ট নীতি (শ্যামাপ্রসাদ: কিছু বাংলা কথা, সৌরভ রায়)। এই শ্যামাপ্রসাদকেই বাংলার মুখ করে তুলছে বিজেপি। এঁদের উত্তরসূরিরাই নাগরিকদের দেশভক্তির পরিচয় তলব করছেন। প্রশ্ন করাকে দেশদ্রোহিতা বলছেন। ভারতের মুসলিমদের বাংলাদেশ, পাকিস্তান পাঠানোর নিদান দিচ্ছেন। তাঁরা কখনও কি নারী-মুক্তির কথা ভাববেন? মুসলিম নারীদের কথা? যুক্তিবাদী, মুক্তমন যার তৈরি হয়নি, সে কখনওই পারে না লিঙ্গবৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে। কথাগুলো মিলিয়ে নেবেন।

Lok Sabha Election 2019 লোকসভা নির্বাচন ২০১৯ Vidyasagar College Vandalization অমিত শাহ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় Mamata Banerjee BJP TMC
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy