ভোটে ‘ছেলের বাপ বলে দেয় কোন চিহ্নে ছাপ দিব’
কয়েকজন মহিলাকে বোঝানোর চেষ্টা চলছিল, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নিজের ভোট নিজের পছন্দের প্রার্থীকে দেওয়ার অধিকার রয়েছে। হরিমতি শোনেন সব কিছু। কিন্তু তাতেও তাঁর সংশয় যায় না।
Jungle

ভোট নিজের পছন্দে দেওয়ার অধিকার বুঝতে এখনও দেরি। নিজস্ব চিত্র

সহজ কথাটাই সহজ ভাবে বোঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছিল। কিন্তু হরিমতিকে বোঝানো গেলে তো! ঝাড়গ্রামের চাকাডোবায় বাসের প্রতীক্ষায়। সঙ্গে এক শিক্ষিকা। কয়েকজন মহিলাকে বোঝানোর চেষ্টা চলছিল, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নিজের ভোট নিজের পছন্দের প্রার্থীকে দেওয়ার অধিকার রয়েছে। হরিমতি শোনেন সব কিছু। কিন্তু তাতেও তাঁর সংশয় যায় না। বলেই ফেলেন, ‘‘নিজের ভোট নিজে দিলে যদি কোনও ভুলচুক হঁইয়ে যায়? তখন কে আমকে ঘরে মরদের হাত থেকে রক্ষা করবেক?’’ আবার বোঝানোর চেষ্টা হল, এটা তাঁর অধিকার, নিজের মতন বুঝে নিজেই বোতামে টিপ দেবে। সেটাই অধিকার প্রয়োগের আসল মানে। বরের কথা শোনার দরকার নেই।

নারাজ হরিমতিকে (লেখায় যথাযথ কারণেই মেয়েদের নামগুলো পাল্টাতে হল) বোঝাতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত হার মানতে হয়। ধরা হয় আর এক মহিলাকে। তিনি চাষি বউ। নাম সুন্দরী। সুন্দরী আবার নতুন প্রশ্নের সামনে ঠেলে দেন। বলে ওঠেন, ‘‘ভোটের অধিকারে সমান হয়ে কী হবে? আমাদের তো এখনও অনেক অধিকার সমান-সমান হয়নি। আমরা কি মহিলা কৃষক হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছি? জমি-পাট্টা কি আমাদের নামে হয়? বহু জায়গায় আমাদের মজুরি সমান-সমান নয়। পুরুষ দিনমজুর যে দর পায় আমরা আজও সেই দর পাই না।’’ সুন্দরী বলেই চলেন, ‘‘সম্পত্তির অধিকার আজও মহিলাদের নামে সুনিশ্চিত নয়।’’ সুন্দরী, হরিমতির সংশয়, প্রশ্নের সামনে দিশেহারাই লাগে। ভোটাধিকার রয়েছে। কিন্তু পছন্দ মতো ভোটদানের অধিকার কবে পাবেন মেয়েরা!

ভোটের বাজারে মেয়েদের চিন্তা ভাবনার তল পেতেই একটু চেষ্টা করা হয়েছিল। জঙ্গলমহলের মেয়েরা কী ভাবছেন? কতটা অধিকার তাঁরা প্রয়োগ করতে পারেন? এই সব দীর্ঘদিনের প্রশ্ন নিয়েই হাজির তাঁদের সামনে। এই মেয়েরা জানেন না কোন দেশের মেয়েরা প্রথম ভোটাধিকারের জন্য আন্দোলনে নেমেছিলেন। সেটা ইংল্যান্ড না কানাডা তা নিয়েও মাথাব্যথা নেই তাঁদের। অনেকের কাছেই তো ভোট দেওয়া মানে মরদের কথা শুনে বোতাম টেপা। এই যেমন সুখিমণি হেমব্রম। ‘মেরা ভোট মেরা অধিকার’ কথাগুলো শুনে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন সুখিমণি। মুখে বলল, ‘‘দিদিমণি কি যে বলিস?’’ মনে হল সুখি হিন্দি কথার মানে বোঝেননি। তাই আবার বাংলায় বলা, ‘‘সুখি তোমার ভোট তুমি দাও কি?’’ সুখি সন্ধিগ্ধ চোখে চারদিক তাকিয়ে আমায় বলল, ‘‘দিদিমণি জঙ্গলেরও কান আছে, হাওয়ায় ভাসে যায় সব কথা। উহাদের কথাই আমাদের শুনতে হয়, উহারা কারা জান না? গাঁইয়ের মাথা, পার্টির নেতা, ভাকুতেল খাওয়া গাঁ-ঘরের মরদগুলাকে যা শিখাবে সেই মতো কথা শুনে আমাদেরও চলতে হবে।’’ 

দিল্লি দখলের লড়াই, লোকসভা নির্বাচন ২০১৯

সুখিমণির ঘর জঙ্গলখণ্ডের বিনপুর ২ অঞ্চলের চাকাডোবা গ্রামের দক্ষিণ প্রান্তে। এখানে প্রধানত কুড়মি সম্প্রদায়ের বাস। কয়েক ঘর সিং, সর্দার অর্থাৎ ভূমিজ এবং কয়েক ঘর সাঁওতাল রয়েছেন। সুখির বয়স জানতে চাইলাম। ও বলল, আনুমানিক দু’কুড়ি হবে। কোনও বার কি নিজের পছন্দ মতো চিহ্নে ভোট দিয়েছেন? সুখির উত্তর, ‘‘না গো দিদিমণি। আমার আবার পছন্দ কী? বিয়ে হয়েছে সেই কবেই। বেটার বয়স এক-কুড়ির উপর, বিয়ের পর যতবার ইস্কুলে ভোট হয়েছে, ততবার ছেলের বাপ আমার সঙ্গে গেছে। ঘেরা ঘরে ঢোকার আগে বারবার বলেছে কোন চিহ্নে ছাপ দিবো। অখনতো বোতামে টিপ দি।’’ সুখির সঙ্গে কথা বলতে বলতে আরতি, মালতি, মিনতি, গাবুর মা সব চলে এল। সকলের মুখে একই কথা, ‘‘আমরা কি কিছু বুঝি দিদিমণি?’’ মিনতির কথায়, ‘‘আমি উচ্চ মাধ্যমিক পাশ। কিন্তু কোনও ভাবেই নিজের মতে ভোট দেওয়ার কোনও অধিকার আমার নেই।’’ নেই কেন? উত্তর এল, মিনতিকে স্বামীর কথাই শুনতে হয়। মিনতি বলেন, ‘‘গ্রামের মোড়ে, হাটে-বাজারে, চা-দোকানে ঘোরাঘুরি করে বলে আমার স্বামী এই ব্যাপারটা বেশি বোঝে। বাপও বুঝত। তাই বাপের ঘরে থাকতে বাপ যা বলত তাই শুনতাম। এখন ছেলের বাপ যা বলে তাই শুনি। কোন চিহ্নে টিপ দেব, সেটা ঘরের লোকের কথা শুনেই আমাকে দিতে হয়। কোনও ভাবে যদি জানতে পারে অন্য চিহ্নে টিপ দিয়েছি তাহলে কী যে হবে! ’’ 

মেয়েরাই জানালেন, পাশের এক মহিলাকে বেদম মেরেছিলেন তাঁর স্বামী। কেন না তাঁকে যে চিহ্নে ভোট দিতে বলা হয়েছিল তা পালন করেননি ওই মহিলা। জানাজানি হতেই হরিমতিকে হুমকি, ধমক কতো কি চললো, এবং তার স্বামী এসে বেদম মার মারল।

‘চাপ দিয়ে ভোট নয়, ভেবে করুন বিচার, মনোনীত প্রার্থী বেছে নিন, এটাই গণতান্ত্রিক অধিকার’। এই কথাগুলো জানানো গেল। শুনলেও মেয়েরা। কিন্তু সেসব কতটা কাজে আসবে তা নিয়ে তো সন্দেহ থেকেই গেল। ‘মরদ কি বাত’ই কি চলতেই থাকবে লোকসভা, পঞ্চায়েত বা বিধানসভা নির্বাচনে? স্বাধীনতার ৭১ বছর পরেও নারীর রাজনৈতিক চেতনা তথা নারী স্বাধীনতার একটা দিক অন্ধকারেই রয়ে গেল। অপরের প্রভাবিত থেকে গেল। শহরের শিক্ষিত সচেতন মহিলাদের কথা বাদই দিলাম। তাদের দিয়ে তো সম্পূর্ণ নারীজগতের বিশ্লেষণ করা যায় না। এই লেখকের অন্যরকম অভিজ্ঞতা রয়েছে। বছর পনেরো আগে বুথে যাওয়ার দেরির কারণে ‘ভূতে’ ভোটটা দিয়ে দিয়েছিল। বুথে গিয়ে শুনতে হয় ভোট হয়ে গিয়েছে আমার। বহু ক্ষেত্রে ঘরের পুরুষটি ছাড়াও মহিলাদের অন্য ভয় থাকে। সেটা বাইরের ভয়। ‘সাদা থানে’র ভয়। এই কথাটি শুনলেই মহিলারা স্বাভাবিক ভাবেই ভয়ে সিটিঁয়ে যান। 

মেয়েদের আরেকটি সমস্যাও রয়েছে। ভোটে জয়ী মহিলা প্রার্থীদের নিজস্ব মতামত থাকে? তাঁদের নিশ্চয় একটি রাজনৈতিক পরিকাঠামোর মধ্যে থেকে অঞ্চলপ্রধান বা বিধায়ক বা সাংসদের কাজ করতে হয়। বহু জায়গায়, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে, মহিলা গ্রামপ্রধানের কাছে অনেক ক্ষেত্রে শংসাপত্র বা জরুরি স্বাক্ষর করতে গেলে তাঁকে দেখা যায় স্বামীর সঙ্গে আলোচনা করতে। তার পরেই তিনি সইসাবুদ করেন বা মতামত প্রকাশ করেন। তার মানে এই নয় যে কেউই যোগ্য নন। কিন্তু বহু ক্ষেত্রেই মহিলা জনপ্রতিনিধি কারও না কারও দ্বারা প্রভাবিত হন। 

যদিও গত একদশক ধরে পশ্চিমবঙ্গে মহিলাদের নির্বাচনে মহিলাদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। কিন্তু এটাও মনে রাখতে হবে, বহু ক্ষেত্রে বংশ পরম্পরা বা কাকা-বাবা-মামা রাজনীতি করতেন বলে তাঁকে প্রার্থী করা হয়। মুশকিলটা হল, সমাজের সব স্তরের মহিলারাও যে এখনও বহু ক্ষেত্রে নারীর অধিকার নিয়ে বেশি মাথা ঘামান না। 

লেখক সমাজকর্মী

নির্বাচনী নির্ঘণ্ট

২০১৪ লোকসভা নির্বাচনের ফল

  • সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর নিচ্ছি না। রাহুল প্রধানমন্ত্রী হলে তাঁর দিকেই বসব।

  • author
    এইচ ডি দেবগৌড়া জেডিএস নেতা

আপনার মত